ৎজিলাৰ্ড মানবিকতার দোহাই পেড়ে ধুরন্ধর বার্নের্সকে কাবু করতে পারলেন না। অবশেষে অন্য যুক্তির অবতারণা করলেন তিনি, আমার মনে হয় এখনই রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের চুক্তিবদ্ধ হওয়া উচিত। আমি স্যার, বর্তমান বিশ্বযুদ্ধের কথা ভাবছি না। ভাবছি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা।
বার্নের্স হেসে বলেছিলেন, তাহলে বলব, বড় তাড়াতাড়ি ভাবছেন আপনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধই এখনও শেষ হয়নি। আর ফর যোর ইনফরমেশন, প্রফেসর, রাশিয়ায় ইউরেনিয়াম আদৌ নেই।
হতাশ হয়ে ফিরে এলেন ৎজিলাৰ্ড লস অ্যালামসে। দেখলেন, সেখানে তাঁর সহকর্মী বৈজ্ঞানিকরা অনেকেই তার সঙ্গে একমত। তাঁরা বলছেন, জার্মানি যখন পরাজিত, জাপান নতজানু, তখন এ বোমা বর্ষণের কোনো অর্থই হয় না।
কে একজন (নামটা জানা যায়নি) বলেছিলেন, কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের যুক্তি না শোনেন তবে আমরা এ কারখানায় ধর্মঘট করব। মার্কিন সরকার আমাদের সঙ্গে অলিখিত ভদ্রলোকের চুক্তি করেছিলেন যে, এ অস্ত্র শুধুমাত্র আত্মরক্ষার্থে ব্যবহৃত হবে- আগ্রাসী রণনীতির জন্য নয়। সরকার যদি চুক্তি না মানেন তবে সেটা হবে সরকারের চরম বিশ্বাসঘাতকতা!
ফুকস্ নাকি জবাবে বলেছিলেন, এখন এ প্রকল্প যে অবস্থায় আছে তাতে আন্ডার-গ্র্যাজুয়েটদের দিয়েই বাকি কাজটা সম্পন্ন করা সম্ভব। নাট-বোল্টুগুলো তো শুধু কষতে বাকি, বন্ধু!
লস অ্যালামসে সেদিন রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনেকক্ষণ এ নিয়ে আলোচনা হল। শিবিরে ইতিমধ্যে দুটি দল হয়ে গেছে। একদলের নেতা ওপেনহাইমার,–সে দলে আছেন ইন্টেরিম কমিটির বাকি তিনজন সদস্য–ফের্মি, কম্পটন আর লরেন্স। অপর দল বোমাবিরোধী। সে দলের দলপতি অভিজাত জার্মান বৈজ্ঞানিক নোবেল-লরিয়েট জেমস্ ফ্রাঙ্ক এবং তার সক্রিয় কর্তা ৎজিলাৰ্ড। ঐরাত্রেই সাতজন বৈজ্ঞানিক তৈরি করলেন একটি রিপোর্ট। তার নাম ফ্রাঙ্ক রিপোর্ট। তাতে সই দিলেন–ফ্রাঙ্ক, ৎজিলাৰ্ড, রোবিনোভিচ এবং আরও চারজন। রিপোর্টখানি নিয়ে ৎজিলাৰ্ড উপস্থিত হলেন ক্লাউস ফুকস-এর চেম্বারে। কিন্তু সই দিতে অস্বীকার করলেন ফুকস।
-কেন? আপনি তো বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে বলেই চিরকাল জানতাম আমি।
–আজ্ঞে না! ভুল জানতেন! এই বোমা তৈরি করতে দুই বিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। বুঝেছেন? দুই বিলিয়ন ডলার।
-তাহলে আপনি কি কিছুই করবেন না?
–কেন করব না? জাপান যখন জ্বলবে তখন বেহালা বাজাব। নীরোও তো তাই করেছিলেন। এই তো ইতিহাসের শিক্ষা।
ঝড়ের বেগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন ৎজিলাৰ্ড। শেষদিকে ফের্মি মত বদলেছিলেন। তিনি এবং আই রাবি একটা যৌথ পত্র লিখেছিলেন প্রেসিডেন্টকে, “এই অস্ত্রের বিধ্বংসী ক্ষমতার কথা মনে করে আমরা পরামর্শ দিই নৈতিক কারণে এর প্রয়োগ আপনি বন্ধ করুন।”
নীলস বোহর-এর পত্র, ফ্রাঙ্ক রিপোর্ট, ফের্মির চিঠি–কিছুতেই কিছু হল না। আরও একটা চেষ্টা করেছিলেন ওৎজিলাৰ্ড। একক প্রচেষ্টা। গাড়ি নিয়ে একাই চলে গিয়েছিলেন লং-আইল্যান্ডের দক্ষিণতম প্রান্তে। এবার বাড়িটা চিনতে অসুবিধা হয়নি। বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক এবার সহজেই চিনতে পারলেন ৎজিলাৰ্ডকে। ছয় বছর আগে তাকে দেখেছিলেন, সে ওঁর ছাত্র। আদ্যোপান্ত সব কথা খুলে বললেন ৎজিলাৰ্ড। আইনস্টাইন তৎক্ষণাৎ রাজি হলেন পুনরায় রুজভেল্টকে একটি পত্র লিখতে।
25 মার্চ 1945 চিঠি লেখা হল। সেই চিঠিখানি নিউ ইয়র্কের হোয়াইট-হাউসে পৌঁছাল এপ্রিলের বারো তারিখ। কিন্তু প্রাপকের হাতে সেটা পৌঁছল না। পূর্বরাত্রে চিঠির প্রাপক ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট অন্তিম নিশ্বাস ফেলেছেন। চিঠিখানা রাখা ছিল, না-খোলা অবস্থায়, তার স্থলাভিষিক্ত হ্যারি ট্রুম্যানের টেবিলে। অপাত্রের হাতে। নিতান্তই নিয়তির পরিহাস!
.
১২.
পাঁচই জুলাই 1945। তিনখানি টেলিগ্রাম করলেন ওপেনহাইমার। একই বয়ান। প্রাপক তিনজন হচ্ছেন শিকাগোর আর্থার কম্পটন, বার্কলের আর্নেস্ট লরেন্স এবং নিউইয়র্কের লেসলি গ্রোভ। তিনজনেই আমেরিকান। টেলিগ্রামের বক্তব্য ‘পনের তারিখের পরে মাছ ধরতে যাব। বৃষ্টি না পড়লে পরদিনই মাছ ধরা যায়।
তিনজনেই প্রস্তুত ছিলেন। সাঙ্কেতিক ভাষার বক্তব্য বুঝলেন। রওনা হলেন দেখতে।
তিনটি বোমা তৈরি হয়েছে এতদিনে। দুটি প্লুটোনিয়াম পরমাণুর, একটি ইউরেনিয়ামের। সর্বমোট খরচ হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। অঙ্কশাস্ত্রের হিসাবে তিনটিই ব্রহ্মাস্ত্র। তবে সব কিছু খাতায়-কলমে।
প্রশ্ন মাত্র একটাই : ফাটবে তো?
স্থির হল, একটিকে ফাটিয়ে পরখ করা হবে। লস অ্যালামস থেকে 339 কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে জনমানবহীন এক বিজন প্রান্তরে। জায়গাটার নাম অ্যালমগডো। মাস-ছয়েক আগেই স্থানটি নির্বাচিত হয়েছিল। ছয়মাস ধরে যাবতীয় ব্যবস্থা করা হচ্ছে ঐ মরুপ্রান্তরের গভীরে। সে ব্যবস্থার একটু পরিচয় দিই।
যেখানে বোমাটা ফাটবে তাকে বলা হল ‘গ্রাউন্ড জিরো’। প্রশ্ন হল : কতদূরে রাখা হবে যন্ত্রপাতি? মানুষের পক্ষেই বা নিরাপদ দূরত্ব কতটা? পরমাণু-বোমার বিস্ফোরণের পূর্বঅভিজ্ঞতা তো কারও নেই! আন্দাজে ভুল হলে যে শেষ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকেরাই উড়ে যাবেন!! কী করা যায়? সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব ছিল ক্রিস্টিয়াকোস্কির নেতৃত্বে গঠিত একটি বিশেষ কমিটির উপর। কিস্টি ছিলেন বিস্ফোরক-বিশারদ। কিস্টি বললেন, প্রথমে একটি নমুনা বোমা ফাটাও। সাতই মে সেই বোমা ফাটানো হল–পরমাণু বোমা নয়, একশ-টন ওজনের ডিনামাইট স্তূপ। তার বিস্ফোরণের নিখুঁত হিসাব করা হল। এবার ‘স্কেল ফেলে’ কতদূরে কে থাকবেন স্থির করা হল। পরমাণু-বোমার বিস্ফোরণ ক্ষমতা হিসাবমতো হবে 5,000 টন টি.এন.টি.র সমান। অর্থাৎ 50 গুণ সব কিছু বাড়ানো হল। নমুনা-বোমার যে যন্ত্রটা এক কিমি দূরত্বে নিরাপদ মনে হয়েছে তাকে পরমাণু বোমার ক্ষেত্রে 50 কিমি দূরে বসাতে হবে!
