জাপানে ব্যাপক বোমাবর্ষণে ঐ দিন ধূলিসাৎ হয়ে গেল টোকিওর অনেকটা এলাকা।
মারিয়ানায়–অর্থাৎ হাওয়াই এবং ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের মাঝামাঝি প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্জন দ্বীপে–ঐ দিন 509 নং কম্পোসিট গ্রুপ পারমাণবিক বোমার সাময়িক পান্থশালাটি নির্মাণ শেষ করল।
যাই হোক, ইন্টেরিম কমিটির দ্বিতীয় মিটিং বসল পেন্টাগনে, ত্রিশে মে। কমিটির সদস্যেরা বললেন-বৈজ্ঞানিক দলের ভিতর থেকে কিছু বিশেষজ্ঞকে কমিটিতে কোঅপ্ট করা দরকার। না হলে এই বোমা নিয়ে কী করা উচিত তা ওঁরা নির্ধারণ করতে পারছেন না! তৎক্ষণাৎ সদস্য সংখ্যায় যুক্ত হল আরও চারটি নাম। কম্পটন, ফের্মি, লরেন্স এবং ওপেনহাইমার। শেষোক্ত ব্যক্তি বাদে তিনজনই বিজ্ঞানে নোবেল-লরিয়েট।
ওই চারজন ছাড়া বাদবাকি কেউই সেদিন জানতেন না অ্যাটম বোমা সাফল্যমণ্ডিত হয়েছে কিনা। প্রস্তুত হওয়ার আগেই একটি কমিটি নির্ধারণ করতে বসেছেন–কোথায় ওটা ফেলা হবে। খবরটা ওঁরা পেতে শুরু করলেন ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে।
ওয়াইৎসেকার একজন অতি উচ্চপদস্থ মার্কিন সামরিক অফিসারকে এই সময় গাউডসমিটের রিপোর্টখানা দেখিয়ে বলেছিলেন, এতদিনে নিশ্চিত হওয়া গেল কী বলেন? জার্মান জুজুর আর ভয় নেই। আমাদেরও তাহলে এই নারকীয় কাণ্ডটা করতে হবে না।
অভিজ্ঞ সামরিক অফিসারটি জবাবে বলেছিলেন, তাই কি হয় স্যার? এত খরচ পড়ল যার পেছনে সেটা ব্যবহারই হবে না? দেখবেন, বোমা ঠিকই পড়বে।
অবাক হয়ে গিয়েছিলেন ওয়াইৎসেকার।
***
বস্তুতপক্ষে এই বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের পরিণাম সম্বন্ধে অনেক প্রথম শ্রেণির বৈজ্ঞানিকই ততদিনে ভাবতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে গাউডসমিট-এর রিপোর্ট পাওয়ার পরে। এঁদের মধ্যে প্রফেসর নীলস বোহর, ৎজিলাৰ্ড, ফ্রাঙ্ক, রোবিনোভিচ ইত্যাদি মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাদের প্রচেষ্টার কথা একে একে বলি।
সর্বপ্রথম এ বিষয়ে অগ্রণী হয়েছিলেন দার্শনিক প্রকৃতির প্রফেসর বোহর। পরমাণু-বোমা তৈরি হবার ঠিক এক বছর আগে তিনি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সঙ্গে দেখা করেন ছাব্বিশে অগাস্ট 1944-এ। একটি সুলিথিত স্মারকলিপি ধরিয়ে দেন প্রেসিডেন্টের হাতে। এই রিপোর্টে বোহর প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেন অনাগত পরমাণু-বোমা প্রয়োগের বিষয়ে চিন্তা করতে। প্রফেসর বোহর রাজনীতিক ছিলেন না–কিন্তু এই রিপোর্টে তিনি অদ্ভুত দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। একস্থানে তিনি বলেছেন, বিশ্বাস সৃষ্টিকারী আক্রমণকারীদের স্বপ্ন ইতিমধ্যে ভেঙে গেছে। তাদের পতন অনিবার্য এবং আসন্ন। কিন্তু আমার আশঙ্কা হয়, যে সব জাতি এ আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে আজ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে যুদ্ধান্তে তাদের মধ্যেও মতবিরোধ দেখা দেবে–কারণ। তাদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ধ্যান-ধারণার মধ্যে মৌল পার্থক্য আছে।
এজন্য বিশ্বশান্তির মুখ চেয়ে তিনি মিত্রপক্ষের তিন শীর্য-শক্তির ভিতর এই অসীম শক্তিধর অস্ত্রের বিষয়ে একটা সমঝোতায় আসতে প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দিয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এইভাবে গোপন সাক্ষাৎকারের কোনো রেকর্ড রেখে যাওয়া পছন্দ করতেন না। নীল বোহরের সঙ্গে আলোচনার সময় তৃতীয় ব্যক্তি ছিল না কেউ। প্রেসিডেন্ট কাউকে বলে যাননি তাদের কী কথাবার্তা হয়েছিল। যুদ্ধান্তে প্রফেসর বোহর-কে এ বিষয় প্রশ্ন করা হলে নৈতিক কারণে তিনি কোনো জবাব দিতে অস্বীকার করেন। বলেন, প্রেসিডেন্ট যখন তা বলে যাননি–তখন আমার কিছু বলা শোভন হবে না।
মোটকথা, প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে অগ্রসর হয়ে কিছু করলেন না। নীলস বোহর অতঃপর চার্চিলের সঙ্গে দেখা করেন। সে সাক্ষাৎকারের সময় বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা লর্ড চেরওয়েলও উপস্থিত ছিলেন। প্রফেসর বোহর পরমাণু-বোমার ফলশ্রুতি সম্বন্ধে দীর্ঘ আধঘন্টা ধরে বলেন। ধৈর্য ধরে এতক্ষণ শুনছিলেন চার্চিল। হঠাৎ তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। লর্ড চেরওয়েলকে বলেন : লোকটা কী বলতে চায়? রাজনীতি না পদার্থবিদ্যা?
What is he really talking about? Politics or Physics?
নীলস বোহর এ ব্যাপারে কী বলবেন ভেবে পাননি।
***
মর্মাহত হয়েছিলেন আলেকজান্ডার সাও। পারমাণবিক-বোমা প্রায় তৈরি হয়ে এল অথচ জার্মানি বা জাপান তা তৈরি করেনি জেনে ধনকুবের সাও রীতিমত বিচলিত হয়ে পড়েন। তার মনে হয় বর্তমান যুদ্ধে এ অস্ত্র ব্যবহৃত হলে লক্ষ লক্ষ লোকের মৃত্যুর জন্য তিনিই পরোক্ষভাবে দায়ী হয়ে থাকবেন। তিনি প্রেসিডেন্টকে একটা খসরা দাখিল করেন 1944-এর ডিসেম্বরে।
তার প্রস্তাবটা ছিল–মিত্রশক্তি এবং নিরপেক্ষ দেশগুলির বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক, ধর্মজগতের প্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সামনে এই অস্ত্রের কার্যকারিতা পরখ করে দেখানো হবে। এভাবে এ অস্ত্রের প্রয়োগক্ষমতা প্রমাণ করে জার্মানি ও জাপানকে চরমপত্র দেওয়া উচিত নির্দিষ্ট তারিখের ভেতর আত্মসমর্পণের নির্দেশ জানিয়ে।
এ পত্রটিও রুজভেল্ট বিবেচনার জন্য রেখেছিলেন তার দপ্তরে। যুদ্ধসচিবকে এর কথাও কিছু বলে যাননি।
পরমাণু-বোমার প্রয়োগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে উদ্যোগী হন হাঙ্গেরিয়ান বৈজ্ঞানিক ৎজিলাৰ্ড। 1939 সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তিনিই ছুটে গিয়েছিলেন আইনস্টাইন-এর কাছে। এবার 1945-এ তিনি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ চিত্র মানসচক্ষে দেখে শিউরে উঠলেন। তার মনে হল, এ বোমার জন্য তিনিই একান্তভাবে দায়ী। বোমা যাতে বর্ষিত না হয় সেজন্য প্রাণপাত করেছিলেন। ৎজিলাৰ্ড। ক্রমাগত চেষ্টা করেও হ্যাঁরী ট্রম্যানের সঙ্গে কোনো সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে পারলেন না তিনি। অতিব্যস্ত প্রেসিডেন্ট তার সাক্ষাৎপ্রার্থীকে পাঠিয়ে দিলেন জেমস বার্নের্স-এর কাছে। বার্নের্স একজন ক্ষমতাশালী ডেমোক্র্যাট সেনেটর। বস্তুত ওৎজিলার্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের এক-সপ্তাহের ভিতরেই তিনি সেক্রেটারি অফ স্টেট পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
