যে কথা বলছিলাম। ঠিক সাতটা বেজে নয় মিনিটে ডায়াসের উপর উঠে দাঁড়ালেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। সেই ইতিহাসের ক্যাবিনেট রুম। উপরে ঝুলছে উড্রো উইলসনের তৈলচিত্র। ঘরে রুজভেল্ট-ক্যাবিনেটের সব কয়জন সভ্য। গত রাত্রে মারা গেছেন রুজভেল্ট। তার মরদেহ তখনও মাটির বুকে ফিরে যায়নি। চিফ জাস্টিস হারলান স্টোনের হাত থেকে বাইবেলটা নিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট–আই, হ্যারি এস. ট্রুম্যান, ডু সলেলি সোয়্যার…
সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান। দশ মিনিটের ভেতরেই শেষ। পূর্ববর্তী ক্যাবিনেটের সদস্যরা একে একে ঘর ছেড়ে বার হয়ে গেলেন। হারল্ড আইকস, হেনরি ওয়ালেস, হেনরি মর্থে্নথাও…ইত্যাদি ইত্যাদি।
ঘর ফাঁকা হয়ে গেলে ডায়াস থেকে নেমে এলেন সদ্যনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট এবং তখনই তার নজরে পড়ল কোণায় চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন একজন। একমাথা সাদা ধপধপে চুল, বলিরেখাঙ্কিত বৃদ্ধ–হেনরি স্টিমসন, যুদ্ধসচিব।
–আপনি যাননি?
–যাবার উপায় নেই। অত্যন্ত জরুরি একটা কথা আপনাকে এখনই জানাতে
চাই।
-যুদ্ধের সব কথাই তো জরুরি।
-না, যুদ্ধক্ষেত্রের কথা নয়। এখানকার কথাই। আপনার মনে আছে প্রেসিডেন্ট-এনকোয়ারি কমিটির চেয়ারম্যান ক্যাবিনেট-সদস্য হ্যারি ট্রুম্যানের বাড়িতে গিয়ে তাকে আমি একটি ব্যক্তিগত অনুরোধ করেছিলাম।
–আছে মিস্টার সেক্রেটারি। ম্যানহাটান-প্রজেক্ট! যেখানে কোটি কোটি ডলার খরচ হয়েছে অথচ এক আউন্সও ফিনিশড প্রডাক্ট বার হয়নি।
-ইয়েস! ম্যানহাটান-প্রজেক্ট।
ঘড়ির দিকে এনজর দেখে নিয়ে ট্রুম্যান বললেন, দু-মিনিটের মধ্যে মূল তথ্যটা বলুন।
–ম্যানহাটান-প্রজেক্টে পরমাণু বোমা তৈরি হচ্ছে, সত্যিই কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে। আমাদের আশা চারমাসের মধ্যে সেটা তৈরি হয়ে যাবে। একটি বোমায় হয়তো লক্ষ লোককে হত্যা করা যাবে। অসীম শক্তিশালী এই বোমা!
ম্লান হাসলেন হ্যারি ট্রুম্যান। বললেন, মিস্টার সেক্রেটারি। আমার অভিনন্দন! আশ্চর্য! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্টকে পর্যন্ত এখবরটা জানাননি। কে কে জানেন?
তার চেয়ে শুনুন- কে কে জানেন না। ডগলাস ম্যাকআর্থার জানেন না, জেনারেল প্যাটন জানেন না, আইসেনহাওয়ার জানেন না,
-চার্চিল জানেন?
–জানেন।
–স্তালিন?
–না।
***
চিঠি লেখা হল। সেই চিঠিখানা নিউইয়র্কের হোয়াইট-হাউসে পৌঁছাল এপ্রিলের বারো তারিখ।
কর্মভার বুঝে নিতে দিন সাতেক সময় লাগল ট্রুম্যানের। যুদ্ধসচিব কিন্তু নাছোড়বান্দা। প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এত বড় একটা ব্যাপার তিনি কিছুতেই আর গোপন রাখবেন না। অগত্যা সময় করে নিয়ে পঁচিশে এপ্রিল 1945 সকালে ট্রুম্যান বসলেন যুদ্ধসচিবের সঙ্গে ম্যানহাটান-প্রকল্পের কথা আলোচনা করতে। সে আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন আর একজন মাত্র তৃতীয় ব্যক্তি–জেনারেল গ্রোভস।
প্রেসিডেন্ট প্রথমেই প্রশ্ন করলেন, এ প্রকল্পে হাত দেওয়া হল কার পরামর্শে?
গ্রোভস্ ফাইল থেকে একটি চিঠি মেলে ধরলেন। দীর্ঘ পত্র। লিখেছেন আলবার্ট আইনস্টাইন, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে। তারিখটা দোসরা অগাস্ট 1939। তার লাল পেন্সিলে দাগ দেওয়া কয়েকটা ছত্রের ওপর দ্রুত চোখ বুলিয়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট :
“…it has been made probable–through the work of Joliot in France as well as Fermi and Szilard in America… that it may be come possible to set up a nuclear chain reactions in a large mass of uranium… This new phenomenon would also lead to the con struction of bombs… extremely powerful bombs….” ‘জুলিও-ৎজিলাৰ্ড-ফের্মি সব অচেনা নাম, ‘চেন রিয়্যাকসান-অফ ইউরেনিয়াম’ ব্যাপারটা বোঝা গেল না–কিন্তু শেষ পংক্তিটা বুঝতে পারলেন ট্রুম্যান–অসীম শক্তিধর বোমার জন্ম হতে পারে।
–কিন্তু কী হবে এ বোমা দিয়ে? জার্মানির পতন হতে তো আর এক সপ্তাহ। প্যাসিফিক-ফ্রন্ট থেকেও যে খবর পাচ্ছি–
বাধা দিয়ে অভিজ্ঞ স্টিমসন বলেন, প্রেসিডেন্ট! এই পরমাণু বোমার ব্যবহার করবো কি করবো না, করলে কেমন করে, কোথায় করবো তা স্থির করতে পারে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি। তাদের সুপারিশ আপনি মানতেও পারেন, নাও মানতে পারেন
–ঠিক কথা। এমন একটি কমিটি তৈরি করুন তাহলে।
–আপনার এইরকম অভিরুচি হতে পারে মনে করে আমি পূর্বেই একটি খসড়া তৈরি করে এনেছি। এতে পাঁচজন সদস্য আছেন।
প্রেসিডেন্ট কমিটি সভ্যদের নাম অনুমোদন করলেন। পাঁচজনই সমর-বিশারদ। বৈজ্ঞানিকদলের একজনও ছিলেন না কমিটিতে–অর্থাৎ যে বৈজ্ঞানিকদল প্রত্যক্ষভাবে পরমাণু-বোমা তৈরি করছিলেন।
ঐ পঁচিশে এপ্রিলই গঠিত হয়ে গেল ‘ইন্টেরিম কমিটি।
*
পঁচিশে এপ্রিল তারিখটা বুঝে নিতে আবার একবার পৃথিবীর উপর চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। ঐ দিন:
ইতালির গণ-অভ্যুথান হল। গুপ্তআবাস থেকে ফ্যাসিস্ট বেনিতো মুসোলিনি আর তার শয্যাসঙ্গিনী ক্লারাকে বের করে আনলো উন্মত্ত বিদ্রোহীরা। হত্যা করে ‘পাবলিক স্কোয়ার’-এ ঠ্যাঙ ধরে ঝুলিয়ে দিল, মাথা নিচের দিক করে।
জার্মানিতে ঐ একই দিনে রাশিয়ান লালফৌজ বার্লিন উপকণ্ঠে প্রথম প্রাচীর ভেঙে ভেতরে ঢুকল। ঈভা ব্রাউন এলেন বার্লিন-বাঙ্কারে হিটলারের পরিণাম ভাগ করে নিতে।
