জবাবে ওপেনহাইমার যা বলেছিল, সেটাই তার জীবনে সবচেয়ে বড় মিথ্যাভাষণ।
তিনজন বৈজ্ঞানিকের মধ্যে দুজনের নাম সে বলেনি, বলেছিল মাত্র একজনের নাম। সে নামটা: রবার্ট জে, ওপেনহাইমার। দালালের নামটাও প্রকাশ করে দিয়েছিল সে এবার। তার নাম হাকন শেভেলিয়ার।
সজ্ঞান মিথ্যাভাষণ! বাস্তবে যা হয়েছিল তা এই : অন্য দুজন বৈজ্ঞানিক অলীক!
হাকন শেভেলিয়ার ওর দীর্ঘদিনের বন্ধু। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের অধ্যাপনা করছেন 1938 থেকে। ওপনেহাইমারের ঝোঁক ছিল সাহিত্যের প্রতি। কাব্যপাঠে তার সখ ছিল। শুধু ইংরাজি নয়, ফ্রেঞ্চ ও জার্মান সাহিত্যও পড়তেন তিনি। এমন কি সংস্কৃতও। যত্ন নিয়ে সংস্কৃত শিখেছিলেন। সেই সূত্রেই এই দার্শনিক মনোভাবাপন্ন নির্বিরোধী সাহিত্যের অধ্যাপকটির সঙ্গে আলাপ। কৈশোরে এবং যৌবনে ওপেনহাইমার সাম্যবাদের দিকে ঝুঁকেছিলেন একথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। সেই আমলেই এটেন্টনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল শেভেলিয়ার এবং ওপির। কিছুদিন আগে লস অ্যালামস থেকে ওপেনহাইমার সস্ত্রীক ক্যালিফোর্নিয়াতে এসেছিলেন। পুরাতন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন শেভেলিয়ার সস্ত্রীক। সন্ধ্যাবেলা। দুটি মহিলা বসে ড্রইংরুমে গল্প করছেন–ওপেনহাইমার উঠে গেলেন প্যানট্রিতে, ককটেইল বানিয়ে আনতে। গল্প করতে করতে শেভেলিয়ারও উঠে এলেন। ওপি ডিক্যানটারে ড্রাই মার্টিনী ঢালছেন, হঠাৎ শেভেলিয়ার বললেন, এলটেন্টনকে মনে আছে তোমার?
মুখ না ঘুরিয়েই ওপেনহাইমার বললেন, বিলক্ষণ। কেন?
কদিন আগে সে এসেছিল আমার কাছে। তোমার খোঁজ করছিল।
–কেন? কোনো প্রয়োজনে?
–না, ঠিক প্রয়োজনে নয়। বলছিল, রাশিয়া এবং আমেরিকা যদিও এ যুদ্ধে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে লড়াই করছে, তবু দু-দেশের বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান হচ্ছে না।
অন্যমনস্কের মতো ওপেনহাইমার বলেন, তাই নাকি?
–নয়? তুমি কি মনে কর না–তোমরা যেসব আবিষ্কার করছ রাশিয়ান বৈজ্ঞানিকদের তা জানা উচিত এবং তারা যা বার করছে তা তোমাদের জানা উচিত?
এইবার ওপি তাকিয়ে দেখল বন্ধুর দিকে। হেসে বললে, তুমি কি চাও আমি পরমাণু বোমার ফর্মুলা ওদের দিয়ে দিই?
–আমি চাই, একথা বলছি না। তবে এলটেন্টন নিশ্চয় তাই চায়। রাশিয়াতে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি কতটা হয়েছে তাও সে জানাতে চায়।
এর জবাবে ওপেনহাইমার বাস্তবে কী বলেছিলেন তা নির্ধারিত হয়নি। শেভেলিয়ারের মতে–”আমার যতদূর মনে পড়ে, ওপি বলেছিল–ওভাবে খবর আদানপ্রদান করা ঠিক নয়।“ ওপেনহাইমারের মতে, আমি দৃঢ়স্বরে বলেছিলাম—“সেটা তো বিশ্বাসঘাতকতা!”
মোটকথা এখানেই কথোপকথনের সমাপ্তি। ওঁরা ড্রইংরুমে ফিরে আসেন এবং পরস্পরের স্বাস্থ্যপান করেন।
মজা হচ্ছে এই যে, ওপেনহাইমার সন্দেহাতীতরূপে জানতেন যে, দার্শনিক প্রকৃতির হাকন শেভেলিয়ার আদৌ গুপ্তচরের বৃত্তি নিয়ে ও প্রসঙ্গ তোলেননি’ নিছক কথার কথা হিসাবে ‘অ্যাকাডেমিক আলোচনা করেছিলেন বন্ধুর সঙ্গে। ওপেনহাইমার যদি উৎসাহিত হতেন তবে হয়তো তিনি বলতেন–তাহলে তোমরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ কর। রাশিয়ার তথ্য সংগ্রহ কর, তোমাদের তথ্য ওদের জানাও!
ওপেনহাইমারের এই স্বীকারোক্তির ফলাফল শেভেলিয়ারের জীবনে মারাত্মকভাবে প্রতিফলিত হয়। তৎক্ষণাৎ তাকে বরখাস্ত করা হল অজ্ঞাত কারণে–এবং প্রথম শ্রেণির ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কোনো অজ্ঞাত কারণে তিনি কোথাও চাকরি জোগাড় করতে পারেননি বাকি জীবনে! প্রাইভেট টুইশানি করে জীবন কাটিয়েছেন। দীর্ঘ দশ বছর ধরে শেভেলিয়ার জানতে পারেননি তার কারণ। এ দশ বছরে বন্ধু ওপেনহাইমারের সঙ্গে দেখাও হয়েছে বেকার দুর্দশাগ্রস্ত শেভেলিয়ারের। ওপেনহাইমার শুধু মৌখিক সহানুভূতি জানিয়েছেন।
দীর্ঘ দশ বছর পরে আসল ব্যাপারটা জানতে পেরেছিলেন (ভেলিয়ার দম্পতি। যুদ্ধ শেষে যখন ওপেনহাইমারকে উঠে দাঁড়াতে হয়েছিল আসামির কাঠগড়ায়, রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে ফ্রান্স বসে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় বেকার মানুষটা পড়েছিলেন আমেরিকায় ও গনহ, ইমারের বিচার কাহিনি। জবানবন্দিতে নিজ নামটা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। স্ত্রীকে কে বলে উঠেছিলেন, ওগো শুনছ! এই দেখ, কেন আমার করি। গিয়েছিল।
বন্ধুর সঙ্গে শেভেলিয়ারের আর কোনোদিন সাক্ষাৎ বা পত্রালাপ হয়নি।
জেনারেল গ্রোভসস্ মিস্ ট্যাটলকের প্রসঙ্গ আদৌ তোলেননি। কে ওপেনহাইমার ঐ মহিলাটির সঙ্গে রাত কাটিয়েছিলেন সৌজন্যবোধে তিনি তা জানতে চাননি। তবে দশ বছর পরে কর্নেল প্যাশ যখন বিচারকের সামনে তার যাবতীয় নথিপত্র দাখিল করেন তখন ওপেনহাইমারকে সব কথা স্বীকার করতে হয়।
.
১১.
বারোই এপ্রিল 1945। সকাল সাতটা বেজে নয় মিনিট।
ঘটনাটা বর্ণনা করবার আগে তার পটভূমিটা একবার ঐতিহাসিক মূল্যায়নে ঝালিয়ে নেওয়া ভাল। জার্মানির অবস্থা সঙ্গীন। বার্লিনের পতন হতে বাকি আছে মাত্র আঠারোটি দিন। ওদিক থেকে রাশিয়ান রেড আর্মি, আর এদিক থেকে জেনারেল প্যাটনের থার্ড আর্মি বার্লিনের টুটি টিপে ধরেছে। যে কোনোদিন যুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে পারে-’ভি-ডে’ পালনের আদেশ এসে যেতে পারে। জাপানেরও নাভিশ্বাস উঠেছে পৃথিবীর অপর প্রান্তে। তিল তিল করে জাপানের মূল ভূখণ্ডের দিকে এগিয়ে চলেছে মার্কিন বাহিনী।
