–আমার আপত্তি নেই আবার বলতে। কর্নেল প্যাশ তার চেম্বার আছেন?
-না, ডক্টর। উনি একটা জরুরি কাজে বেরিয়েছেন। আপনি কাল সকালে একবার আসতে পারবেন?
–পারব। আটটার সময়। বিকালের প্লেনে আমি ফিরে যাব।
কর্নেল প্যাশ তার ঘরেই ছিলেন। কিন্তু ইচ্ছে করে কিছুটা সময় নিল তীক্ষ্ণধী জনসন। সে মনে মনে ছক কষে ফেলেছে। ওপেনহাইমার ফিরে যেতেই সে কর্নেল প্যাশ-এর ঘরে ঢুকল। বিস্তারিত বলল সব কথা খুলে। কর্নেল প্যাশ বললে, এখনই ওকে ডেকে নিয়ে এলে না কেন?
–কিছু ইলেকট্রিক্যাল গ্যাজেট লাগাতে হবে স্যার। ডক্টর ওপেনহাইমারের স্টেটমেন্টটা টেপ-রেকর্ড করে রাখতে চাই।
প্যাশ খুশি হল তার অধীনস্থ কর্মচারীর দূরদর্শিতায়।
পরদিন ওপেনহাইমার যখন কর্নেল প্যাশ-এর ঘরে ঢুকল তখন সে জানত না, রুদ্ধদ্বার কক্ষে সে যা বলছে তা গোপনে টেপ-রেকর্ড হয়ে রইল এফ. বি. আইয়ের দপ্তরে। কর্নেল প্যাশ আন্দাজ করেছিল, কোনো কাউন্টার-এসপায়োনেজের সূত্রে ওপেনহাইমার জানতে পেরেছিল, তাকে সন্দেহ করছে এফ. বি. আই.। তাই সে নিজে থেকেই ভালমানুষি দেখাতে এসেছিল জি-টু সদর দপ্তরে। আসলে লোমানিটজ-এর বিষয়ে তত্ত্বতালাস নিতে সে আদৌ আসেনি এবার সানফ্রানসিস্কোতে। এসেছিল পুলিসের সঙ্গে দহরম-মহরম করতে।
ওপেনহাইমারের গল্পটা ছিল এইরকম–এটেন্টনের দালাল লস অ্যালামসে। তিন-তিনজন বৈজ্ঞানিককে পর্যায়ক্রমে যাচাই করে। তিনজনই তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। ঐ তিনজন বৈজ্ঞানিকের নাম, অন্তত দালালটির নাম, জানবার জন্য প্যাশ খুব পীড়াপীড়ি করে; কিন্তু কিছুতেই সেকথা বলতে রাজি হলেন না ওপেনহাইমার। তার যুক্তি-দালালটি আসলে নিতান্ত ভালামানুষ–ব্যাপারটার গুরুত্ব না বুঝেই সে এমন কাজ করেছে। তার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না–আর বৈজ্ঞানিক তিনজন তো প্রত্যাখ্যানই করেছেন। ফলে তাঁদের আর মিছে কেন জড়ানো?
পরদিনই কথোকথনের টেপ-এর একটা কপি সমেত দীর্ঘ রিপোর্ট পাঠিয়ে দিল প্যাশ তার উপরওয়ালা কর্নেল ল্যান্সডেল-এর কাছে–নিউইয়র্কে। তার রিপোর্টের উপসংহারে প্যাশ লিখেছিল
“ This office is still of the opinion that Oppenheimer is not to be fully trusted and that his loyalty to the nation is divided. It is believed that the only undivided loyalty that he can give is to Sci ence and it is strongly felt that if in his position the Soviet Gov ernment could offer more for the advancement of his scientific cause, he would select that Government as the one to which he could express his loyalty.”
অর্থাৎ: ওপেনহাইমারকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায় না। জাতির প্রতি তার অকুণ্ঠ আনুগত্য নেই। তার একমাত্র লক্ষ্য : বিজ্ঞান। আজ যদি সোভিয়েট গভর্নমেন্ট তাকে বিজ্ঞানচর্চায় বেশি সুযোগ দেবার লোভ দেখায়, তবে সে অনায়াসে ও-পক্ষে যোগ দেবে!
অনতিবিলম্বে ল্যান্সডেল ডেকে পাঠালেন ওপেনহাইমারকে। পুনরায় জেরা। নানাভাবে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। ওপেনহাইমার দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করল, ঐ তিনজন বৈজ্ঞানিক অথবা ঐ দালালটির নাম প্রকাশ করে দিতে। বলল, আপনাদের সঙ্গে সব রকম সহযোগিতা করতে আমি প্রস্তুত–এজন্য স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ কথা বলতে এসেছিঃ কিন্তু তাই বলে যাঁরা অপরাধী নন তাদের নাম আমি কিছুতেই বলব না।
ল্যান্সডেল বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে। না বলতে চাইলে আর কী করব আমরা? এটা তো নাৎসি জার্মানি অথবা স্তালিনের রাশিয়া নয়। আপনাকে কোনোভাবেই বিব্রত করব না আমরা। খুশি হয়ে ওপেনহাইমার ফিরে গেল লস অ্যালামসে। মিস্ ট্যাটলকের প্রসঙ্গ আদৌ উঠল না।
***
ওখানেই কিন্তু মিটল না ব্যাপারটা। সমস্ত কাগজপত্র এফ. বি. আই. পাঠিয়ে দিল জেনারেল গ্রোভসকেটেপ রেকর্ড, মিস্ ট্যাটলকের ফটো সমেত। লিখল, আমাদের আপত্তি সত্ত্বেও আপনি ব্যক্তিগত দায়িত্বে ওপেনহাইমারকে নিযুক্ত করেছিলেন। আমরা আবার সুপারিশ করছি–তাকে অবিলম্বে বরখাস্ত করুন। এছাড়া আমাদের আরও তিনটি দাবি; প্রথমত-মিস্ ট্যাটলকের সঙ্গে কেন ওপনেহাইমার রাত কাটালেন? দ্বিতীয়ত-ঐ তিনজন বৈজ্ঞানিক কে? তৃতীয়ত–ঐ দালালটি কে? এ তিনটি প্রশ্নের জবাব আপনার অধীনস্থ কর্মচারীর কাছ থেকে জেনে আমাদের জানান। ব্যাপারটার গুরুত্ব যথেষ্ট। আপনার রিপোর্ট পেলে আমরা যুদ্ধসচিবের কাছে আমাদের রিপোর্ট পাঠাব।
জেনারেল গ্রোভসস-এর মানসিক অবস্থা সহজেই অনুমেয়। ম্যানহাটান ততদিন প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শিকাগোতে ফের্মি ‘চেন-রিয়্যাকশন’ সাফল্যমণ্ডিত করেছেন। ইউ-238 থেকে ইউ-235 পরমাণু পৃথকরণও করা গেছে। প্লুটোনিয়াম পরমাণু বিদীর্ণ করার ফর্মুলাও আবিষ্কৃত। এইসব তাত্ত্বিক সূত্রের সাহায্যে লস অ্যালামসে হাতে-কলমে বোমা প্রস্তুত হচ্ছে। সে কাজ যে তত্ত্বাবধান করছে, সে লোকটা রবার্ট জে. ওপেনহাইমার। ক্লাউস ফুকস্ ইতিমধ্যে হিসাব কষে বার করেছেন বোমার আকার, ওজন ও আকৃতি অর্থাৎ ‘ক্রিটিক্যাল সাইজ। ওপেনহাইমার বিভিন্ন বিভাগে তার অংশ তৈরি করেছেন। এ অবস্থায় ওপেনহাইমার সম্পূর্ণ অনিবার্য। অথচ
গ্রোভস্ ডেকে পাঠালেন ওপিকে। খোলাখুলি বললেন, তোমার বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ আছে। আমাকে সব কথা খুলে বলতেই হবে। বল, কে ঐ দালাল, কোন্ তিনজন বৈজ্ঞানিককে যাচাই করেছিল সে।
