এই সাক্ষাৎকারের পরেই বোহর-এর এক বন্ধু গোপনে এসে খবর দিলেন তাকে গ্রেপ্তার করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বোহর সুইডেনে পালিয়ে গেলেন। সেখান থেকে প্লেনে করে ইংল্যান্ডে। পরে আমেরিকায়। নীলস বোহর বহু সম্মান পেয়েছেন জীবনে–তার ভিতর একটি তার প্লেনে করে ইংল্যান্ডে আসার সময়। ব্রিটিশ এয়ারচিফ এই মূল্যবান কমডিটিটিকে নিরাপদে সুইডেন থেকে ইংল্যান্ডে আনবার ব্যবস্থায় এতই সাবধানতা অবলম্বন করেছিলেন যে, তাকে একটি বোমারু বিমানে করে নিয়ে আসা হয়। বৃদ্ধকে বসতে বলা হল প্যারাসুট এবং লাইফ-বেল্ট সেঁটে, বোমার গর্তটায়। বিস্মিত বোহর প্রশ্ন করলেন–এ কি! ওইখানে বসব কেন? গর্তের ভিতর?
পাইলট সবিনয়ে বললে, সেই রকমই নির্দেশ আছে স্যার! আমার প্লেন আক্রান্ত হলে আমি আপনাকে জীবন্ত বোমার মতো সমুদ্রে ফেলে দেব। আদেশ আছে, প্লেনটা ভেঙে গেলেও আপনাকে বাঁচাতে হবে। পিছন-পিছন আসছে একটা সি-প্লেন, সে আপনাকে উদ্ধার করবে!
ইংল্যান্ডে পৌঁছে জার্মান ইউরেনিয়াম-প্রোজেক্ট সম্বন্ধে প্রফেসর বোহর যা বললেন, তাতে ইংল্যান্ড এবং আমেরিকা নূতন করে শুনল হুঙ্কার–কাগুজে বাঘ-এর!
৫. কী ১০-১৩
১০.
বারোই জুন 1943। লস অ্যালামস থেকে দুদিনের জন্য ছুটি নিয়ে ওপেনহাইমার এসেছে সানফ্রানসিস্কোয়। উঠেছে একটা হোটেলে। ওর স্ত্রী রয়েছে লস-অ্যালামস-এ। হঠাৎ কেন ওকে সানফ্রানসিস্কো আসতে হল? তা কেউ জানে না। এমনকি মিসেস ওপেনহাইমারও নয়। হোটেল থেকে রাত আটটা নাগাদ বের হল ওপেনহাইমার। একটা ট্যাক্সি নিল। ড্রাইভারকে বলল, চল-টেলিগ্রাফ হিল।
রবার্ট জে ওপেনহাইমার স্বপ্নেও ভাবেনি, ও ট্যাক্সি ডাকার সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয়ে উঠল রাস্তার ওপাশে একটা গাড়ির চালক। লোকটা তাকে ছায়ার মত অনুসরণ করে চলেছে আজ চার মাস। লস অ্যালামস থেকে একই ট্রেনে সে এসেছে সানফ্রানসিস্কোয়। লোকটার নাম ডি-সি। একজন এফ. বি. আই. এজেন্ট। কর্নেল প্যাশ নিযুক্ত।
এফ. বি. আই.-য়ের সুপারিশ অগ্রাহ্য করে বিশেষ ক্ষমতাবলে জেনারেল গ্রোভসস্ ওপেনহাইমারকে চাকরি দিয়েছেন। এ কাজের অধিকার তার ছিল। কিন্তু তাই বলে এফ বি. আই.-চিফ, তার কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হননি। যাকে ক্লিয়ারেন্স দেওয়া যায়নি, জাতির স্বার্থে তার ওপর নজর রাখবার আদেশ দিয়েছেন কর্নেল প্যাশকে। ওপেনহাইমারের প্রতিটি পদক্ষেপের রেকর্ড তৈরি হয়ে যাচ্ছে তার অজান্তে।
ট্যাক্সিটা টেলিগ্রাফ হিল-এর একটা বাংলো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। ভাড়া মিটিয়ে ওপেনহাইমার ঢুকে গেল ভেতরে। ডি-সি সে বাড়ি থেকে একশ মিটার দূরে তার গাড়িটা পার্ক করে চুপচাপ বসে রইল টেলিফটো ক্যামেরা হাতে। রাত বারোটা নাগাদ বাড়ির আলো নিবে গেল। সারা রাত কেউ বার হল না বাড়িটা থেকে। পরদিন ভোরবেলা দরজা খুলে বার হয়ে এল ওপনেহাইমার এবং একটি বছর-বত্রিশের মহিলা। মেয়েটি গ্যারেজ থেকে গাড়ি বার করল –ওপেনহাইমারকে নিয়ে চলে গেল এয়ারপোর্ট-এর দিকে। প্লেন ধরে ওপেনহাইমার চলে গেল পূর্বমুখে।
পরদিন বিস্তারিত রিপোর্ট পৌঁছে গেল কর্নেল প্যাশ-এর টেবিলে, খানপাঁচেক ফটো সমেত। মেয়েটিকে সহজেই শনাক্ত করা গেল। ডক্টর মিস্ জীন ট্যাটল। নামকরা কম্যুনিস্ট।
29 শে জুন জি-টু ডিভিসনের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ কর্নেল প্যাশ একটি বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠিয়ে দিলেন নিউ ইয়র্কে তার বড়কর্তা কর্নেল ল্যান্সডেলের কাছে।
***
ঠিক দু-মাস পরে একদিন রবার্ট ওপেনহাইমারকে দেখা গেল সানফ্রানসিস্কোতে জি-টু ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টার্সে লায়াল জনসনের কামরায়। জনসন ডি- সিলভার ওপরওয়ালা এবং কর্নেল প্যাশ-এর অধীনে নিযুক্ত। বারোই জুন রাত্রের রিপোর্টখানা ডি-সি এর মাধ্যমে ওপরে পাঠিয়েছিলেন, ফলে মিস ট্যাটল-সংক্রান্ত সংবাদ জানতে বাকি ছিল না লায়াল জনসনের। আপ্যায়ন করে বসালো সে লস অ্যালামসের ডিরেক্টারকে।
শোনা গেল, ওপেনহাইমারের আগমনের হেতু হচ্ছে রোজি লোমানিটজ। ছোকরার পিছনে লেগেছে এফ.বি.আই.। লোমানিটজ ছিল বার্কলেতে ওপির ছাত্র, বর্তমানে লস অ্যালামসে। তাকে নাকি এফ. বি. আই. থেকে ধরে এনেছে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। তাই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টার স্বয়ং এসেছেন পুলিস হেডকোয়াটার্সে তত্ত্ব-তালাশ নিতে।
জনসন কম্যুনিস্ট-প্রভাবের কথা আলোচনা করল, বললে লোমানিজকে আপাতত নাকি ছাড়া যাচ্ছে না। আরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে তাকে। জনসনের ধারণা রীতিমত একটা গুপ্তচরবাহিনী ম্যানহাটান ডিস্ট্রিক্ট-এ গোপনে কাজ করে যাচ্ছে। তারা ডলারে মাইনে পায় না, পায়, রুবলস-এ।
ওপেনহাইমার গম্ভীর হয়ে বললে, আমি তোমার সঙ্গে একমত ক্যাপ্টেন। এমন ইঙ্গিত আমিও পেয়েছি।
–আপনি? কী ব্যাপার?
–জর্জ এলটেন্টনের নাম শুনেছ?
-বলেন কী! তার ফাইলটা আমি সপ্তাহে তিনবার ওল্টাই। নামকরা রাশান-এজেন্ট।
–সেই এলটেন্টন একজন দালালকে পাঠিয়েছিল লস অ্যালামসে। কার্যোদ্ধার হয়নি, কিন্তু সে তিন-তিনটে দরজায় ধাক্কা দিয়েছিল।
-বলেন কী! একটু বিস্তারিত করে বলবেন?
–বলতেই তো এসেছি–
আদ্যোপান্ত ঘটনাটা শুনে জনসন বললে, প্রফেসর এটা এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, আমার বস কর্নেল প্যাশ আপনার মুখ থেকে সরাসরি শুনতে চাইবেন।
