ওঁর এক ছাত্র সৌজন্যের বালাই না মেনে ছুটে এসে মুখ চেপে ধরেছিল শ্রদ্ধেয় অধ্যাপকের।
মোট কথা, দ্বিতীয় শ্রেণির বৈজ্ঞানিকদলের অধীনে শেষ পর্যন্ত ওই চারজনকেই গবেষণার কাজে নিযুক্ত হতে হল। প্রথমে ওঁরা স্থির করেছিলেন প্রতিবাদ করে শহীদ হবেন; কিন্তু মূলত হেইসেনবের্গের বুদ্ধিতেই ওঁরা অন্য পথ ধরেন। ওঁরা ভাব দেখান যেন আপ্রাণ প্রচেষ্টাতেও কিছু করতে পারছেন না। এই প্রসঙ্গে স্বয়ং হেইসেনবের্গ যুদ্ধান্তে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন–
“ডিক্টেটারশিপে তারাই সক্রিয়ভাবে বাধার সৃষ্টি করতে পারে, যারা ভান করে যায় শাসনযন্ত্রের সঙ্গে সবরকম সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত। প্রতিবাদের অর্থ বন্দীশিবিরে আবদ্ধ হওয়া। সেখানে শহীদ হয়েও লাভ নেই–কেউ তার নাম বা মতাদর্শের কথা জানতে পারবে না। তার নামোচ্চারণই নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। বিশে জুলাই যারা নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করে প্রাণ দিল–তাদের মধ্যে আমার কিছু বন্ধুও আছে–তাদের কথা মনে করে আমার আত্মানুশোচনা হয়। আবার ভাবি–ওরাই কি প্রমাণ করে দিয়ে গেল না, ওই শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার–তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার, একমাত্র পথ হচ্ছে সহযোগিতার ভান করে যাওয়া?”
এর পর জার্মান বৈজ্ঞানিকের দল পরমাণু বোমা বানানোর প্রতিযোগিতায় কেন ব্যর্থ হয়েছিলেন সেকথা বিস্তারিত আলোচনার অপেক্ষা রাখে না।
***
আর একটি ঘটনার উল্লেখ করে এ পরিচ্ছেদের যবনিকা টানব। যুদ্ধ চলাকালে হাইসেনবের্গের সঙ্গে প্রফেসর নীলস বোহর-এর সাক্ষাৎ। তখনও প্রফেসর বোহর ডেনমার্ক ছেড়ে পালিয়ে আসেননি। ডেনমার্ক তখন নাৎসি অধিকারে। বোহর তার ইহুদি এবং অনার্য সহকারী বন্ধুদের সকলেই ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় পাচার করেছেন–শূন্য ল্যাবরেটরি আঁকড়ে তিনি একা পড়ে আছেন শুধু এই বিশ্বাসটুকু নিয়ে যে, হিটলার অন্তত তাকে কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে পাঠাবে না। ভয়ে সবাই কাটা হয়ে আছে।
এই সময় অটো হান, হেইসেনবের্গ প্রভৃতি স্থির করলেন প্রফেসর বোহর-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা নিতান্ত প্রয়োজন। আমেরিকা যেমন জার্মান পরমাণু-বোমার ভয়ে ভীত–এইসব বৈজ্ঞানিকও অনুরূপভাবে ভাবছিলেন, মার্কিন পরমাণু-বোমায় তাদের সাধের জার্মানি ধ্বংসপুরীতে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে। তাদের দুঃখটা আরও বেশি–কারণ অতলান্তিকের ওপারে যারা বোমা বানাচ্ছেন, তাঁরা অনেকেই জার্মান-ফ্রাঙ্ক, ম্যাক্স বর্ন, ৎজিলাৰ্ড, ফুস্, হান্স বেথে–সবাই ওঁদের ঘরের লোক। ওইসব মার্কিন-প্রবাসী মধ্যযুরোপিয়দের একটা খবর দেওয়া দরকার যে, জার্মান পরমাণু-বোমা একটি কাগুজে-বাঘ। তার ভয়ে আগেভাগেই তোমরা এ-দেশটাকে শ্মশানে পরিণত করো না। এ খবর পশ্চিমখণ্ডে পৌঁছে দেওয়ার মতো উপযুক্ত লোক একমাত্র ডেনিশ বৈজ্ঞানিক নীলস বোহর। তার কথা এমন কেউ অবিশ্বাস করবে না যে ফিজিক্স বইয়ের প্রথম পাতাটা উল্টেছে। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টাটা কে বাঁধে? ওঁরা এই দৌত্যকার্যে পাঠালেন স্বয়ং হেইসেনবের্গকে। হেইসেনবের্গ ‘ইউরেনিয়াম-প্রকল্পের ডেপুটি ডাইরেকটার, তার একটা পদমর্যাদা আছে। তার চেয়েও বড় কথা, হেইসেনবের্গ হচ্ছেন নী বোহরের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র।
গুরুশিষ্যের সাক্ষাৎকারটা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক!
তার একটা কাকতালীয় হেতু আছে। হেইসেনবের্গ তার থিয়োরি অনুসারে দু-নৌকায় পা দিয়ে চলছিলেন। বাহ্যত জার্মান-সরকারকে মদত দিতে হচ্ছিল তাঁকে, যাতে তার সহকর্মী বৈজ্ঞানিকদের ওপর নাৎসি অত্যাচার না হয়। এজন্য জার্মানি যখন পোলান্ড অভিযান করে তখন এক সম্বর্ধনা সভায় হেইসেনবের্গ। হিটলারকে প্রশংসা করে একটি বক্তৃতাও দিয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে সেটা নজরে পড়েছিল তার অধ্যাপক নীলস বোহর-এর। তাই বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিকের ধারণা হয়েছিল তার প্রিয় ছাত্র হেইসেনবের্গ নাৎসি শাসকদের অন্ধ ভক্ত। ওই ‘বাইরে-এক ভিতরে-আর’ নীতি কল্পনাই করতে পারেন না সহজ সরল সোজাপথের পথিক নীলস বোহর। তাই হেইসেনবের্গ যখন কোপেনহেগেন-এ এসে তার অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করলেন তখন অত্যন্ত গম্ভীর এবং উদাসীনভাবে তাকে গ্রহণ করলেন প্রফেসর বোহর। অনেকক্ষণ কথা বলেছিলেন দু-জনে, জনান্তিকেই কিন্তু কেউই মন খুলে প্রাণের কথা বলতে পারেননি। দুজনেই দুজনকে ভয় পাচ্ছিলেন। হেইসেনবের্গ শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করে বসলেন, আপনি কি মনে করেন অনতিবিলম্বে পরমাণু-বোমা তৈরি হতে পারে?
নীলস বোহর জবাবে বলেছিলেন, আমি তা মনে করি না।
–কিন্তু আমি করি স্যার। আমার দৃঢ় ধারণা, চেষ্টা করলে আমরা অনতিবিলম্বে ওই রকম বোমা তৈরি করতে পারি।
উদাসীনভাবে বোহর বলেন, হতে পারে। নাৎসি জার্মানির ভিতরে তোমরা কতদূর কী করেছ তা জানব কেমন করে?
হিতে বিপরীত হচ্ছে বুঝতে পেরে হেইসেনবের্গ বলেন, সে-কথা বলছি না। স্যার। আচ্ছা, আপনি কি মনে করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওরা অনেকটা এগিয়েছে?
আবার উদাসীনভাবে বোহর বললেন, আমার মনে করায় কী এসে যায়?
মোটকথা হতাশ হয়ে হেইসেনবের্গ ফিরে গেলেন। আসল কথা খুলে বলার মতো পরিবেশই খুঁজে পেলেন না তিনি। বস্তুত এই সাক্ষাৎকারে ভালোর চেয়ে মন্দই হল বেশি। নীলস্ বোহরের ধারণা হল নাৎসি বৈজ্ঞানিকরা অনতিবিলম্বে পরমাণু বোমা তৈরি করে ফেলবে। না হলে ওকথা বলল কেন হেইসেনবের্গ?
