হেইসেনবের্গ সেইখানেই গ্রেপ্তার হন–আরও পরে।
সেদিন কিন্তু ওঁরা হেইসেনবের্গের সাক্ষাৎ পাননি। তার ল্যাবরেটারির চিহ্নিত ঘরটি তন্নতন্ন করে খোঁজা হল। এখানে একটি জিনিস উদ্ধার করেছিলেন কর্নেল প্যাশ–একটি ফটো! ঘরের টেবিলে ফটো-স্ট্যান্ডে রাখা ছিল। দুটি যুবক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে–কনভোকেশন গাউন পরে। সদ্য ডক্টরেট হয়েছেন তারা। একজন ওয়ার্নার হেইসেনবের্গ আর একজন স্যামুয়েল গাউডসমিট। পলাতক ও পশ্চাদ্ধাবনকারী।
গাউডসমিটের অনুসন্ধানকার্যের মর্মান্তিক উপসংহারের প্রসঙ্গে এবার আসি। খুঁজতে খুঁজতে এবং ঘুরতে ঘুরতে গাউডসমিট এসে পৌঁছলেন হল্যান্ডে-দ্য হেগে। হেগ-এর ন্যাশনাল ইন্সটিটুটে অনুসন্ধান শেষ করে গাউডসমিট তার সহকারীকে বললেন, কর্নেল, একবেলার জন্য ছুটি চাইছি। ওবেলা আমি আসব না।
-কেন? কী করবেন ওবেলায়?
–দ্য হেগ হচ্ছে আমার পিতৃভূমি। শহরের ওপ্রান্তে ছিল আমাদের বাড়িটা। তিন বছর আগেও সেখান থেকে বাবা-মায়ের চিঠি পেয়েছি। বাবার সত্তরতম জন্মদিনে একটা কেও করেছিলাম। জানি না, সেটা পেয়েছিলেন কিনা।
–আয়াম সরি। যান, গিয়ে খোঁজ করে দেখুন।
পনেরো বছর পরে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরছে। রীতিমতো কৃতী সন্তান–বংশের গৌরব। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল উনিশ বছর বয়সে-জার্মানি, ডেনমার্ক, ইংল্যান্ড ঘুরে পোঁচেছে আমেরিকায়। সদ্য স্কুল থেকে পাশ ছেলে আজ ডক্টরেট পাওয়া প্রৌঢ়। যুদ্ধ বাধার আগে গাউডসমিট আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন বুড়ো-বুড়ির ইমিগ্রেশান পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে মার্কিন মুলুকে নিয়ে যাওয়ার। নানান বাধা বিপত্তিতে সেটা শেষ পর্যন্ত ঘটে উঠেনি। গত তিন বছর কোনো খবরই পাননি।
গাউডসমিটের এই প্রত্যাবর্তনের কাহিনিটা আমি নিজের ভাষায় বলব না; তার রচনার অনুবাদ করে যাব। ভাবানুবাদ নয়, তাতে আমার ভাবালুতা হয়তো অজান্তে মিশে যাবে–আক্ষরিক অনুবাদ :
“জিপটাকে আমাদের বাড়ি থেকে কিছু দূরে রেখে হেঁটেই এগিয়ে গেলাম। বাড়িটা তখনও খাড়া আছে, কিন্তু কাছে এসে দেখলাম, সব কটা জানলাই অদৃশ্য। দরজা বন্ধ ছিল। জানলা দিয়ে লাফ মেরে ভিতরে ঢুকলাম। জনমানব নেই।…এ ঘরটা ছেলেবেলায় ছিল আমার নার্সারি; পরে পড়ার ঘর। চারিদিকে কাগজপত্র ছড়ানো–তার মধ্যে আমার স্কুল-ছাড়ার সার্টিফিকেটখানি। চকিতে মনে পড়ল, এটা বরাবর বাবার ড্রয়ারে সযত্নে রাখা থাকত। দু-চোখ বুজে আমি বিশ-ত্রিশ বছর পিছিয়ে গেলাম। ওইখানে ছিল আমার অন্ধ মায়ের টেবিলটা; এইখানে আমার বুককেসটা। আমার সেই অত অত বই সব কোথায় গেল?…পিছনে মায়ের সখের বাগানটা আগাছায় ভরে গেছে। শুধু লাইলাক গাছটা নীরবে সাক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। সেই ভগ্নস্তূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনে হল আমি চরম অপরাধ করেছি।…হয়তো ওঁদের আমি বাঁচাতে পারতাম। আমেরিকান ভিসা পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছিল–বাবার এবং মায়ের; যদি আর একটু বেশি ছুটোছুটি করতাম, যদি ইমিগ্রেশন অফিসে আরও বেশি করে ধর্না দিতাম, নিশ্চয়ই ওই নৃশংস নাৎসিদের হাত থেকে ওঁদের আমি রক্ষা করতে পারতাম। কী হয়েছিল তাদের? এখানেই মারা গেছেন? পাড়ার লোক কিছু বলতে পারবে? কিন্তু গোটা পাড়াটাই যে ফাঁকা। চেনা মুখ একটাও দেখছি না…”।
এর মাসখানেক পরে একটি কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে অনুসন্ধান করবার সময় ওই প্রশ্নটির সমাধান হঠাৎ উনি খুঁজে পেয়েছিলেন। গ্যাস-চেম্বারে যাদের পাঠানো হচ্ছে তাদের নাম-ধাম লেখা থাকত একটা রেজিস্টারে। তাতেই উদ্ধার করলেন দুটি নাম। বাবার এবং অন্ধ মায়ের।
গাউডসমিট লিখছেন–
“And that is why, I know the precise date my father and blind mother were put to death in the gas chamber. It was my father’s seventieth birthday”.
“তাই আমি জানি, ঠিক কোনদিন আমার বাবা এবং অন্ধ মা গ্যাস চেম্বারে শেষ দূষিত নিশ্বাস নেন। তারিখটা ছিল আমার বাবার সত্তরতম জন্মদিন।”
***
জার্মানিতে অ্যাটম-বোমা সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত না হওয়ার চারটি প্রধান হেতু। তার প্রথম তিনটির ওপরেই বেশি জোর দিয়েছেন মার্কিন আর ইংরেজ সাংবাদিক এবং ঐতিহাসিকের দল। কিন্তু D. Irving-এর লেখা “The German Atomic Bomb–the History of Nuclear Research in Nazi Germany” szlo পড়ে আমার মনে হয়েছে প্রথম এবং চতুর্থ কারণটাই সর্বপ্রধান।
চারটি হেতু নিম্নোক্তরূপ–
প্রথমত-অনার্য এবং ইহুদি, এই অজুহাতে হিটলার নেতৃস্থানীয় পদার্থবিজ্ঞানীদের বিতাড়ন করেছিলেন। দ্বিতীয়ত–যাঁরা অবশিষ্ট ছিলেন তাঁদের নাৎসি যুদ্ধবাজদের অধীনে এমন দৈহিক ও মানসিক অবস্থার মধ্যে রাখা হয়েছিল যা গবেষণার পরিপন্থী। তৃতীয়ত-যন্ত্রপাতি বা গবেষণার জন্য উপযুক্ত অর্থের ব্যবস্থা করা হয়নি এবং চতুর্থত-বৈজ্ঞানিকদের সাফল্যের বিষয়ে অনীহা, এমনকি অনিচ্ছা!
শেষ যুক্তিটারই বিস্তার করব বিশেষভাবে।
1939-এর ছাব্বিশে সেপ্টেম্বর-অর্থাৎ আলেকজান্ডার সাস্ যেদিন আইনস্টাইনের চিঠি নিয়ে রুজভেল্টের সঙ্গে দেখা করেন তার পনেরো দিন আগে– বার্লিনে জন্ম নেয় ইউরেনিয়াম প্রজেক্ট। নয়জন পদার্থবিজ্ঞানী এতে অংশ নেন–তার ভিতর উপস্থিত ছিলেন না অটো হান, ফন লে, ওয়াইৎসেকার বা হেইসেনবের্গ। এঁরা কেউ আমন্ত্রিত হননি। ওই নয়জনও উঁচুদরের পদার্থ বিজ্ঞানী–কিন্তু তাদের নির্বাচনের আসল হেতু নাৎসিবাদের প্রতি তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন। মাসখানেকের ভিতরেই বোধহয় কর্তৃপক্ষের টনক নড়ল–ডাক পড়ল ওয়াইৎসেকার এবং হেইসেনবের্গের। প্রকল্পের কর্ণধার হলেন দুবাই, তার অধীনে রইলেন হেইসেনবের্গ, যদিও পাণ্ডিত্যে হেইসেনবের্গ-এর স্থান অনেক উচ্চে। অটো হানকেও ডাকা হয়েছিল পরে–কিন্তু হান সর্বসমক্ষে বলে ওঠেন, ‘হিটলারের হাতে অ্যাটম-বোমা তুলে দেওয়ার আগে আমি আত্মহত্যা করব।’
