***
গাউডসমিট-এর তালিকায় ছিল চারটি নাম। চারজনের পক্ষেই পরমাণু-বোমার হৃদয় বিদীর্ণ করা সম্ভব। তারা হচ্ছেন–অটো হান, ফন লে, ওয়াইৎসেকার আর হেইসেনবের্গ। বিধ্বস্ত জার্মানির এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে তিনি খুঁজে ফিরেছেন ওই চারজনকে। খবর পেয়েছিলেন, স্ট্রাসবের্গ-এ ছিল ওঁদের মূল কেন্দ্র। স্ট্রাসবের্গ তখনও নাৎসি ফৌজের দখলে। অবশেষে 1944-এ পনেরই নভেম্বর জেনারেল প্যাটন-এর বিজয়ী বাহিনী প্রবেশ করল স্ট্রাসবের্গ-এ। কর্নেল প্যাশ একটি সাঁজোয়া গাড়িতে গাউডসমিটকে নিয়ে মেশিনগানের গুলিবর্ষণের ভিতরেই প্রবেশ করলেন স্ট্রাসবের্গে। গবেষণাগারের অবস্থান দেখানো ম্যাপ সঙ্গে ছিল। খুঁজে পেতে দেরি হল না। সৈন্যদের নিয়ে ওঁরা ঢুকে পড়লেন ল্যাবরেটারির ধ্বংসস্তূপে। না, চারজনের একজনেরও সন্ধান পেলেন না। তবে যারা বন্দী হলেন তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি পাওয়া গেল–কিছুদিন আগেও ওঁরা এখানে ছিলেন। শহরের পতন আসন্ন বুঝতে পেরে জার্মান-বিজ্ঞানের চার মধ্যমণি পালিয়েছেন কাইজার উইলহেম ইন্সটিটুটে। বিজ্ঞানীদের ধরা গেল না, উদ্ধার করা গেল কিছু গোপন নথি। সাঙ্কেতিক ভাষায় লেখা।
ক্রিমিনোলজি ছিল গাউডসমিটের বিলাস। সারারাত মোমবাতির আলোয় গবেষণা করে তিনি ওই সাঙ্কেতিক-ভাষা ডি-কোড করলেন। পাঠোদ্ধারের পর বোঝা গেল রিপোর্টটা তৈরি করছেন স্বয়ং ওয়াইৎসেকার, স্বহস্তে। মাত্র দু-মাস পূর্বের রচনা। তা থেকে নিঃসন্দেহে বোঝা গেল, জার্মান-বৈজ্ঞানিকেরা ইউরেনিয়াম অথবা প্লুটোনিয়ামের পরমাণুকে ক্রমাগত বিদীর্ণ করতে তখনও কোনো ‘চেইন-রিয়্যাকশন’ বার করতে পারেননি। ইউ-238 থেকে ইউ 235-এর বিচ্ছিন্নকরণও সম্ভব হয়নি। তৎক্ষণাৎ বিস্তারিত রিপোর্ট লিখে ডক্টর গাউডসমিট পাঠিয়ে দিলেন আমেরিকায়। স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল তার।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ কিন্তু এ তথ্য আদৌ বিশ্বাস করতে পারলেন না। জবাবে তারা জানালেন, “আমাদের সন্দেহ, সহজে ভাঙা যায় এমন সাঙ্কেতিক ভাষায় লিখে ওয়াইৎসেকার ইচ্ছা করেই ওই রিপোর্ট ল্যাবরেটারিতে রেখে গেছেন, আমাদের চোখে ধুলো দিতে। দ্বিতীয় কথা, আপনার ধারণা ভ্রান্তও হতে পারে। অটো হান, ফন লে, ওয়াইৎসেকার অথবা হাইসেনবের্গ ছাড়াও অখ্যাত অজ্ঞাত কোনো বৈজ্ঞানিক হয়তো নির্জন সাধনায় ওই আবিষ্কার করে বসেছেন, যার কথা আপনি কল্পনাও করতে পারছেন না।”
এ-কথার জবাবে ওই মিলিটারি বড়কর্তাকে অভিমানী নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট যে-কথা লিখেছিলেন তার আর অনুবাদ হয় না! যুদ্ধকালে সামরিক কর্তা এবং ডিপ্লোম্যাটেরা বরাবরই বৈজ্ঞানিকদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন। প্রফেসর বোহর, ম্যাক্স বর্ন অথবা জেমস ফ্রাঙ্কের মতো বিশ্ববরেণ্য বৈজ্ঞানিকদের নির্বিচারে আদেশ পালন করতে বাধ্য করেছেন ওই সব সামরিক কর্তা আর রাজনীতির পণ্ডিতম্মন্যের দল। গাউডসমিট-এর এই চাবুকের মতো জবাবটি যেন সেই অপমানের প্রতিশোধ! গাউডসমিট মার্কিন সমরনায়ককে লিখেছিলেন :
“A paper-hanger may perhaps imagine that he has turned into a military genius overnight, and a trader in champagne may be able to disguise himself as a diplomat. But laymen of that sort could never have acquired sufficient scientific knowledge, in so short a time, to be able to construct an atom bomb.
[কোনো রংমিস্ত্রি হয়তো মনে করতে পারে রাতারাতি সে একজন সামরিক ধুরন্ধর হয়ে উঠেছে অথবা কোনো ভাঁটিখানার শুঁড়ি রাত-পোহালে বিখ্যাত রাজনীতিকের ছদ্মবেশ হয়তো ধারণ করতে পারে–কিন্তু একজন রাস্তার লোক এত অল্পসময়ে এতটা বৈজ্ঞানিক-জ্ঞান লাভ কিছুতেই করতে পারে না যাতে সে পরমাণু-বোমার নির্মাতা হয়ে পড়বে।]
দুঃখের বিষয় পত্রের প্রাপকটি সামরিক জীবনের পূর্বাশ্রমে রঙের-মিস্ত্রি অথবা মদের কারবারী ছিলেন কিনা এ তথ্যটার সন্ধান পাইনি।
***
আরও পরে মিত্রপক্ষের বিজয়ী বাহিনী অধিকার করল কাইজার উইলহেম ইন্সটিটুট। এবারও সৈন্যদলের সঙ্গে ছিলেন কর্নেল প্যাশ এবং গাউডসমিট! একজন সংবাদবহ এসে খবর দিল, ইন্সটিটুটের ল্যাবরেটারিতে কয়েকজন বৈজ্ঞানিককে তারা গ্রেপ্তার করেছে–চিনতে পারছে না। গাউডসমিট তৎক্ষণাৎ উঠে পড়েন। বলেন, চল এখনই গিয়ে দেখব।
গাড়ি চালিয়ে নিয়ে এলেন কর্নেল প্যাশ নিজে। প্রশ্ন করেন তিনি, ডক্টর, এবার যদি জালে আপনার প্রাইজ গেম ধরা পড়ে থাকে তবে আপনি তাদের চিনতে পারবেন তো?
ম্লান হাসলেন ডক্টর গাউডসমিট। বলেন, কর্নেল, ওঁদের মধ্যে কেউ আমার অধ্যাপক, কেউ আমার সহপাঠী! আমি চিনব না?
চিনতে কোনো অসুবিধা হল না সত্যই। বন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন যাঁরা, তাঁরা জার্মানির শ্রেষ্ঠ মনীষা–নোবেল লরিয়েট অটো হান, ফন লে এবং ওয়াইৎসেকার সমেত আরও পাঁচজন প্রধান নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট।
-হাউ ডু য়ু ডু প্রফেসর?–প্রশ্ন করেন গাউডসমিট লজ্জায় লাল হয়ে।
-য়ু নিডন্ট ব্লাশ, মাই বয়!-জবাব দিলেন বৃদ্ধ অটো হান। ইউরেনিয়াম পরমাণুর হৃদয় যিনি সর্বপ্রথম বিদীর্ণ করেছিলেন।
ধরা পড়লেন না শুধু হেইসেনবের্গ। রাত তিনটের সময় একটা সাইকেলে চেপে কাইজার ইন্সটিটুট ছেড়ে তিনি নাকি উত্তর ব্যাভেরিয়ার দিকে রওনা হয়ে গেছেন। সেখানে ছিলেন হেইসেনবের্গের স্ত্রী-পুত্র-পরিবার। শেষ মুহূর্ত কয়টি তিনি তাদের সঙ্গে কাটাতে চেয়েছিলেন। পঁচিশ বছর বয়েসে যিনি নোবেল-প্রাইজ পাওয়ার মতো আবিষ্কার করতে পারেন, কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার পদ প্রত্যাখ্যান করে পরাজয়ের হলাহল আকণ্ঠ পান করে নীলকণ্ঠ হতে যাঁরা কুণ্ঠা নেই, সেই হেইসেনবের্গ রাতারাতি প্রায় একশ কিলোমিটার সাইকেলে পাড়ি দিয়ে চলে গেছেন উত্তর ব্যাভেরিয়ায়।
