-কেন প্রাণ নেই?
-কেমন করে থাকবে? কিসের অঙ্ক কষছে তাই যে ওরা জানে না! ওদের বলে দেওয়া উচিত ওরা কিজন্য এই মেশিন চালাচ্ছে। তাহলেই ও বা উৎসাহ পাবে।
ফাইনম্যানের বাঁধা-লবজটাই বলে বসলেন ডিরেক্টার-পাগলের মতো কথা বলো না! ওদের ওসব কথা জানানোর আইন নেই!
—আমি ডক্টর ওপেনহাইমারকে বলে দেখব?
–দেখতে পায়। সে রাজি হবে না।
কিন্তু ফাইনম্যান নাছোড়বান্দা; পাগলটাকে রোখা যাবে না জেনে শেষ পর্ষ ওপেনহাইমার রাজি হলেন। ফাইনম্যান ওই মেশিনম্যান ছোকরাদের ব্যাপারট। একদিন ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন। বললেন, তোমরা আসলে তৈরি করছ অ্যাটম-বোমা। তোমরা তার এক-একটা নাট বল্ট! বুঝলে?
আশ্চর্য! সাতদিনের মাথায় ফাইনম্যান এসে দাখিল করলেন তার পরিসংখ্যান। মেশিনের আউটপুট হান্ড্রেড-পার্সেন্ট বেড়ে গেছে। বলেন, দেখলেন স্যার? আপনারা শুধু আপত্তিই করছিলেন পাগলের মতো।
.
০৯.
‘কাগুজে-বাঘ’ কথাটা আজকাল প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায়। আমার তো মনে হয়েছে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় কাগুজে-বাঘ হচ্ছে জার্মান অ্যাটম-বোমা! এই বাঘের ভয়েই একদিন রুজভেল্ট বলেছিলেন, ‘পা। এটার ব্যবস্থা হওয়া দরকার। এই বাঘের ভয়ে কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে মার্কিন-সরকার মানহাটান-প্রকল্পে হাত দিয়েছেন। জার্মান-বৈজ্ঞানিকদের আগেই আমেরিকায় অ্যাটম-বোমা তৈরি করে ফেলতে হবে।
যুদ্ধের শেষাশেষি এক গবেষকদল জার্মানিতে গিয়ে অনুসন্ধান করে দেখেছিলেন, জার্মানিতে পরমাণু-বোমা সম্বন্ধে কতদূর কী করা হয়েছিল। সে অনুসন্ধানের ফলশ্রুতি–জার্মান-বৈজ্ঞানিকরা অ্যাটম-বোমা থেকে অনেক অনেক দূরে ছিলেন। এটা প্রথমটা অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। অটো হান, হেইসেনবের্গ, ওয়াইৎসেকার বা ফন লে-র মতো অসীম প্রতিভাধরদের এ অসাফল্যের কারণ কী? সে কথাই বলব এবার।
জার্মান যুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে একটি মার্কিন মিশন এল যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানিতে–এল গবেষণা করে দেখতে, জার্মানি অ্যাটম-বোমা বানানোর চেষ্টায় কতদূর কী করতে পেরেছিল। তার একটা বিশেষ কারণও ছিল। 1942-এর ডিসেম্বরে মার্কিন গুপ্তচর-বাহিনী খবর পেল বড়দিনের দিন হিটলারের বিমানবহর অতলান্তিক পাড়ি দিয়ে নাকি মার্কিন ভূখণ্ডে বোমাবর্ষণ করতে আসছে। সাধারণ বোমা নয়, পরমাণু বোমা। ওদের লক্ষ্যস্থল নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন অথবা শিকাগো। খবরটা এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিল যে, বড়কর্তারা নানান অজুহাতে স্ত্রী-পুত্র পরিবারকে বড়দিনের আনন্দ উৎসব থেকে বঞ্চিত করে গ্রামাঞ্চলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বড়দিন পার হয়ে গেলো। বোমা পড়ল না। পরের বছর জানুয়ারিতে তৈরি করা হয় এই মিশন অ্যালসস্। তার কর্ণধার কর্নেল প্যাশ। যাঁকে এ কাহিনির প্রথম অধ্যায়ে আমরা চিনেছি।
কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারলেন প্যাশ-এর মতো ‘অ-পদার্থ-বিদ’কে দিয়ে কাজ হবে না। তাই ওঁরা খোঁজ করতে শুরু করেন এমন একজনকে যিনি পদার্থবিদ্যাতে পারদর্শী এবং অপরাধ-বিজ্ঞানেও। পাওয়া গেল তেমন সব্যসাচী। স্যামুয়েল গাউডসমিট। ওলন্দাজ বৈজ্ঞানিক। গোটিনজেন-এর প্রাক্তন-ছাত্র– হেইসেনবের্গের সহাধ্যায়ী অথচ ক্রিমিনোলজি হচ্ছে তার প্যাশন। বৃদ্ধ বাবা-মা হল্যান্ডেই আছেন। যুদ্ধের আগেই উনি ডেনমার্কে পালিয়ে যান, প্রফেসর বোহর-এর অধীনে ডক্টরেট লাভ করে পাড়ি জমান মার্কিন মুলুকে। বর্তমানে ম্যাসাচুটেস-এ রেডার-প্রকল্পে নিযুক্ত।
মনের মতো কাজ পেলেন গাউডসমিট। প্রথমত, গোয়েন্দা কাহিনির নায়ক হলেন; দু-নম্বর, বৃদ্ধ পিতামাতার সঙ্গে সাক্ষাতের একটা সম্ভাবনা দেখা দিল। গত তিন বছর তাদের কোনো চিঠিপত্র পাননি। হল্যান্ড এতদিন ছিল নাৎসিবাহিনীর দখলে!
গাউডসমিট-এর এই অনুসন্ধানকার্য আর একটা পৃথক গোয়েন্দা বিষয়বস্তু হতে পারে। স্থানাভাবে আমাকে দু-একটা ইঙ্গিত দিয়েই শেষ করতে হল। কৌতূহলী পাঠক গাউডসমিট-এর স্মৃতিচারণ Alsos’ পড়ে দেখতে পারেন।
তার গ্রন্থ পড়ে জানতে পারছি, নোবেল-লরিয়েট বৈজ্ঞানিক জোলিও-কুরি অধিকৃত-পারিতে বন্দুক হাতে রাস্তার লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন! বর্ণনা দিয়েছেন–কীভাবে ফরাসি পদার্থবিদ জর্জেস ব্রুহাট মৃত্যুবরণ করেন। প্রফেসর ব্রুহাট-এর ছাত্র রাউসেল পারির মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। গেস্টাপো অপরিসীম যন্ত্রণা দিয়েও প্রফেসার ব্রুহাট-এর কাছ থেকে তার ছাত্রের ঠিকানা জানতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তারা বৃদ্ধ প্রফেসরকে পাঠিয়ে দেয় একটা কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। অধ্যাপক নির্বিচারে মেনে নিলেন এই বন্দীজীবন। সেখানে তিনি বন্দীদের নিয়ে গণিত-জ্যোতিষ চর্চা করতেন–আকাশের তারা চেনাতেন। অনাহারে শেষ পর্যন্ত প্রফেসর ব্রুহাট মারা যান।
বলেছেন, হলওয়েক-এর কথাও। হলওয়েক একটা নতুন ধরনের মেশিনগান আবিষ্কার করে উপহার দিয়েছিলেন পারির মুক্তি ফৌজকে। এ কথা জানতে পেরেছিল গেস্টাপো। হলওয়েক ধরা পরার পর জার্মান গুপ্তচরেরা বৈজ্ঞানিককে ওই আবিষ্কারের সূত্রটা তাদের জানিয়ে দেবার জন্য নিপীড়ন শুরু করে। তিল তিল করে মৃত্যু বরণ করেছিলেন হলওয়েক–তার অতিপ্রিয় মুক্তি ফৌজের বিরুদ্ধে তার আবিষ্কারকে ব্যবহৃত হতে দেননি।
