হো হো করে হেসে ওঠে সবাই। ৎজিলাৰ্ড বলেন : এবার ক্লাউস ফুকস-এর নামে একটা হোক। ওই তোমার ভুলটা ধরিয়ে দিয়েছে।
ফাইনম্যানের জাপানি-তাংকা মুখে মুখে প্রস্তুত :
Fuchs ফুকসহেব তো ধর্মের এক ষণ্ড।
Looks একাই পারেন করতে গাজন পণ্ড।
An ascetic. সৌম্যদর্শন সন্ন্যাসী এক ভণ্ড।
Theoretic!
অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে সবাই। অর্থাৎ প্রফেসর বোহর হচ্ছেন সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক আর ক্লাউস ফুকস্ হচ্ছে ভেকধারী। দেখলে মনে হয় সন্ন্যাসী, আসলে পাজির পা-ঝাড়া।
***
ফাইনম্যানের কীর্তিকাহিনি সবিস্তারে বলতে গেলে আলাদা একখানা বই লিখতে হয়। তবু আরও দু-চারটে কথা বলি। কারণ এই চরিত্রটিকে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেনি কর্নেল প্যাশ–এ কাহিনির গোয়েন্দা। তার বারে বারে মনে হয়েছিল সমস্ত প্রক্রিয়াটা মাইক্রোফিলমে রূপান্তরিত করে রাশিয়ান গুপ্তচরকে হস্তান্তরিত করার হিম্মৎ ছিল ওই ছেলেমানুষিতে-ভরা ফাইনম্যানের!
লস অ্যালামসের ইতিহাসের রচয়িতা ‘মানহাটান প্রজেক্ট’ গ্রন্থে লিখেছেন
“It also afforded Feynman great amusement to work-out the combination numbers of the steel safes in which the most secert and important data of research were kept. In one case he actually succeeded, after weeks of study, in opening the main file-cupboard at the records centre in Los Alamos, while the officer-in-charge of it was absent for a few minutes. Feynmann contented himself, in the brief period during which he had all the atomic secrets at his disposal, with placing in the safe a scrap of paper on which he had written : Guess Who?”
বুঝুন কাণ্ড! কী বলবেন এমন লোককে? খেয়ালী? পাগল? ছেলেমানুষ? না কি ধূর্তস্য ধূর্ত ক্রিমিনাল? যে সিন্দুকে গোপনতম তথ্য রাখা থাকে তা ওই লোকটা কোন্ কায়দায় খুলে ফেলল মাত্র কয়েক মিনিট সুযোগে? আর কেন খুলল? কী উদ্দেশ্য তার? শুধুই সবাইকে চমকে দিতে? ‘বলতো কে?’–লেখা একটা কাগজ ওই আলমারির খোপে রেখে আসবার ছেলেমানুষিতে?
অদ্ভুত প্রতিভা ছিল এই ফাইনম্যানের। প্রফেসর বোহর শিকাগোতে বসে কেমন করে তার নাম জানলেন সেটাও আন্দাজ করতে পারি Grauff-এর লেখা ‘মানহাটান প্রজেক্ট’ গ্রন্থ থেকে। উনি লিখেছেন
“ফাইনম্যানকে শিকাগোতে প্রতিটি গ্রুপের কাজ দেখতে যেতে হত। সেখানে প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীরা-কম্পটন, উইগনার, টেলার অথবা ফের্মি তাকে নানা উপদেশ দিতেন। একবার হঠাৎ ওঁর কানে গেল–কী একটা অঙ্ক শিকাগো-গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে কষতে পারছেন না। কৌতূহলী ফাইনম্যান জানতে চাইলেন, অঙ্কটা কী? শুনে, মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে সেটা কষে দিলেন তিনি। ফিরে এসে উনি ওর বন্ধুকে বলেছিলেন–বড়কর্তারা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছেন তো, তাই একটু গুরুদক্ষিণা দিয়ে এলাম।”
খবরটা জানতে পেরেছিলেন নীলস বোহর।
আর একবার। গভর্নিং বোর্ডের মিটিংয়ে একজন বৈজ্ঞানিক বললেন, IBM কোম্পানি একরকম নতুন কম্পুটার-বার করেছে যাতে অত্যন্ত দ্রুত যান্ত্রিক পদ্ধতিতে অঙ্ক কষা যায়। কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি এগুলি বসানো হয়েছে। অনেক আলোচনার পর ওই যন্ত্র কেনা ঠিক হল। তখনও ইলেকট্রনিক কম্পুটার চালু হয়নি কোথাও। অর্ডার গেল আই. বি. এম. কোম্পানির কাছে। যন্ত্রটা নতুন, তার ব্যবহার কেউ জানে না–তাই কোম্পানিকে লেখা হল যারা যন্ত্রটা বসাতে আসবে তাদের সঙ্গে যেন মেশিনম্যানও পাঠানো হয়। মানহাটান প্রকল্পে তারা থেকে যাবে। যন্ত্রগুলো চালাবে।
যা হয়। কোম্পানি পত্রপাঠ যন্ত্রগুলো পাঠিয়ে দিল। তারপর শুরু করল চিঠি-চাপাটি। যারা মেশিন চালাবে তাদের কী হারে মাইনে দেওয়া হবে, তাদের চাকরির নিরাপত্তা কতদূর, থাকবার কী ব্যবস্থা হবে ইত্যাদি। বড় বড় প্যাকিং কেস পড়ে রইল গুদামে আর কোম্পানি শুরু করল দরকষাকষি! যাই হোক, দিন পনেরো পর এল কোম্পানির লোক–কিন্তু কোথায় গেল সেই প্যাকিং কেসগুলো? সেগুলো তো গুদামে নেই। ফাইনম্যান হচ্ছেন বিভাগীয় কর্তা। বড়কর্তা তাকে প্রশ্ন করেন, সেই প্রকাণ্ড প্যাকিং কেসগুলো কোন্ গুদামে আছে? লোক এসে গেছে যে! ফাইনম্যান বলেন, কোগুলো স্যার? সেই আই. বি. এম. কম্পুটারগুলো? লোক আসতে দেরি হচ্ছিল দেখে আমি নিজেই যন্ত্রটা বসিয়ে নিয়েছি। হ্যাঁ, খুব ভালো যন্ত্র। ব্যবহার করছি তো আজ দিন সাতেক। চমৎকার জিনিস!
কোম্পানির লোক এবং ডিরেক্টার স্তম্ভিত। স্বচক্ষে দেখতে এলেন তারা। হ্যাঁ, কাজ হচ্ছে। পুরোদমে কাজ হচ্ছে মেশিনে!
বিস্মিত হয়ে ডিরেক্টার বলেন, কী আশ্চর্য! এ যন্ত্রটা তো সদ্য-আবিষ্কৃত। কেমন করে বসালে হে! এমন কমপ্লিকেটেড ইলেকট্রনিক কম্পুটার।
–ছেলেবেলায় আমি যে মেকানো বানাতাম স্যার-ফাইনম্যানের সাফ জবাব।
-তাই বলে এত লক্ষ ডলার দামের যন্ত্র কাউকে কিছু না বলে তুমি খুলে ফেললে?
–কী যে বলেন স্যার ‘পাগলের মতো’! সাতদিন এগিয়ে গেল না আমাদের কাজ?
কোম্পানি-প্রেরিত লোকগুলো অবশ্য চাকরি পেল। দিন দশেক পরে মসকুইটো বোট আবার এসে হানা দিলেন ব্যাটলশিপের ঘরে। বললেন, ওই লোকগুলো কাজে উৎসাহ পাচ্ছে না। দৈনিক আটঘণ্টা ডিউটি দিচ্ছে–কিন্তু কাজে প্রাণ নেই যেন।
