***
লস অ্যালামসে নীলস বোহর-এর প্রথম আবির্ভাব প্রসঙ্গেও ফাইনম্যানের নামটা লিপিবদ্ধ রয়েছে দেখছি। প্রফেসর বোহর কী একটা নূতন তথ্য আবিষ্কার করেছেন। লস অ্যালামসের বিজ্ঞানীদের তিনি সেটা জানাবার জন্য এসে হাজির হলেন, লেকচারের নির্ধারিত দিনের আগের দিন। পরদিন প্রফেসর বোহর একটা নূতন কিছু বলবেন, তাই একটা চাঞ্চল্য স্বতই দেখা গিয়েছিল লস অ্যালামসে। সেইদিনই সন্ধ্যাবেলা ফাইনম্যানের ঘরে টেলিফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। ফাইনম্যান কোনো ধাঁধা কষছিলেন কিনা জানি না, টেলিফোনটা তুলে নিয়ে বলেন, হ্যালো!
–আমি জিম বেকার বলছি। আমরা এইমাত্র এসে পৌঁছেছি। বাবা আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চান। আপনি একবার গেস্ট-হাউসে আসবেন?
ফাইনম্যান অবাক হয়ে বলেন, জিম বেকার। আমি ঠিক আপনাকে তো–
–আবার বাবার নাম নিকোলাস বেকার!
চমকে উঠেন ফাইনম্যান! মনে পড়ে যায় সব কথা। নীলস্ বোহরের পুত্র অ্যাগী বোহরও যে এসেছে আমেরিকায়, একথা স্মরণ হয়। নিশ্চয়ই তার ছদ্মনাম–জিম।
অবাক হয়ে ফাইনম্যান বলেন, আপনি ভুল করছেন না তো? আমাকে আপনার বাবা কেন খুঁজবেন? আমার নামই জানেন না তিনি।
–জানেন। আপনি মিস্টার হেইলি তো?
–হ্যাঁ, তাই বটে। আচ্ছা আমি এখনই আসছি।
ওভারকোটটা গায়ে চাপিয়ে হাজির হলেন গেস্ট-হাউসে। প্রফেসর বোহর ওঁকে দেখেই বললেন, তোমার নামই তো ফাইনম্যান?
-ইয়েস, প্রফেসর।
–ঠিক আছে। বস। এই দেখ আমার রিপোর্ট।
রিপোর্ট দেখবেন কি? ফাইনম্যান তখনও ভাবছেন, লস অ্যালামসে এত এত পণ্ডিত থাকতে হঠাৎ তাকে পাকড়াও করলেন কেন প্রফেসর বোহর। পরদিন যে রিপোর্ট সকলকে পড়ে শোনাবেন, হঠাৎ তা এই ভ্রমণ-ক্লান্ত দিবাশেষে ওঁকে শোনাতে বসলেন কেন বিশ্ববিশ্রুত বৈজ্ঞানিক? কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যেই বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে গেল তার। আকণ্ঠ ডুবে গেলেন অঙ্ক-সমুদ্রে। তারপরেই হঠাৎ চীৎকার করে ওঠেন, কী লিখেছেন মশাই পাগলের মতো! এ কী হয়? আটটা ‘আন্-নোন’ আর সাতটা ইকোয়েশন’-এ তো কোনোদিনই সমাধান করা যাবে না।
পাশে দাঁড়িয়েছিল জিম বেকার। কর্ণমূল লাল হয়ে ওঠে তার। কোনো মরমানুষ তার পিতৃদেবকে ‘পাগল’ বলছে এমনটা সে শোনেনি জীবনে। প্রফেসর বোহর কিন্তু নির্বিকার। বলেন, কারেক্ট। কিন্তু এই অষ্টম ইকোয়েশনটাও তো আমাদের হাতে আছে!
শীতালী পাখির মতো ‘ফাই-থিটা-এপসাইলনের একটা ঝাক নেমে এল ব্ল্যাকবোর্ডে।
ফাইনম্যান বলেন, আই সি। আসুন তাহলে কষে ফেলা যাক।
রাত তিনটে নাগাদ শেষ হল অঙ্কটা!
ভোররাত নাগাদ প্রফেসর বোরকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এলেন উনি ঘর ছেড়ে। জিম বেকার এগিয়ে এল ওঁকে গাড়িতে উঠিয়ে দিতে। গাড়িতে উঠে হঠ। ফাইনম্যান প্রশ্ন করেন, একটা কথা, জিম। তোমার বাবা এত লোক থাকতে আমাকেই বা ডেকে পাঠালেন কেন?
–আপনার কথা বাবা শুনেছিলেন শিকাগো থাকতেই!
–কিন্তু এখানে তো ধুরন্ধর বৈজ্ঞানিক আরও অনেক আছেন–ফের্মি, হান্স বেথে, ৎজিলাৰ্ড, ফন নয়ম্যান…
-জানি। তাদের কেউ আমার বাবাকে ‘পাগল’ বলবার সাহস রাখেন না—
–পাগল! পাগল কে বললে?
–আপনি বলছেন।
–হুঁ! মি? ইম্পসিবল। আমি, ডিক ফাইনম্যান প্রফেসর নীলস বোহরকে..এ সব কী বকছ পাগলের মতো?
–বাবা বলেছিলেন–আর সকলেই তার থিয়োরিটা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেবেন। তার প্রতি শ্রদ্ধায়, সৌজন্যে, প্রতিবাদ করবেন না-ভুলগুলো তাদের নজরে পড়বে না। পারলে আপনিই–
–তাই বলে আমি প্রফেসর বোহরকে ‘পাগল’ বলব?
–বলব নয় স্যার, বলেছেন। আমি নিজের কানে শুনেছি।
গাড়ি থেকে নেমে আসেন ফাইনম্যান। বলেন, তাহলে চল ক্ষমা চেয়ে আসি।
–প্লিজ প্রফেসর! বাবা শুয়ে পড়েছেন। রাত সাড়ে তিনটে বাজে!
মন ভার করে ফাইনম্যান ফিরে এলেন নিজের ঘরে। না না, এ অসম্ভব। তিনি কখনও বিংশ শতাব্দীর বিস্ময় প্রফেসর নীলস বোহরকে ‘পাগল’ বলতে পারে? তিনি? ডিক ফাইনম্যান! জিম বেকার বৃথাই বকছে পাগলের মতো!
***
ফাইনম্যানের আর এক বাতিক ছিল মুখে মুখে চুটকি কবিতা রচনার। স্রেফ পা-টানা। প্রফেসর নীলস বোহরকে রুদ্ধদ্বার কক্ষে মধ্যরাত্রে যে তিনি ‘পাগল’ বলেছেন এটা জিম বেকার কাউকে বলেনি। পরদিন বোহর বক্তৃতা দিলেন। তার প্রস্থানের পর অন্যান্য সহ-বিজ্ঞানীরা ফাইনম্যানকে বললেন, কেমন লাগল প্রফেসর বোহরকে?
ফাইনম্যান তৎক্ষণাৎ মুখে মুখে জবাব দিলেন :
Professor Bohr প্রফেসর বোহর
Knows no whore! মোর মনচোর!
Drinks no liquor কামিনীকাঞ্চনত্যাগী
Is no bore. সন্ন্যাসী ঘোর!
স্থিতপ্রজ্ঞ ড্যানিশ অধ্যাপকের অনেক জীবনীকার দীর্ঘ রচনায় তার দেবতুল্য চরিত্র সম্বন্ধে লিখে গেছেন, কিন্তু মাত্র চারটি ছত্রে ফাইনম্যান যে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছিলেন, তা বোধহয় অনবদ্য। কবিতাটি শুনেই ক্লাউস ফুকস্ বলে ওঠেন : আরে আরে! আপনি করছেন কি, প্রফেসর! বোহর আবার কে? শুনলেন না, ওঁর নাম নিকোলাস বেকার?
ফাইনম্যান বলেন, আই বেগ য়োর পাৰ্ডন। সে ক্ষেত্রে আমি বলব :
Nicholas Baker, নিকোলাস বেকার-যুগান্তকারী।
Epoch-maker. অ্যাটমের শিরে যিনি–হানেন বাড়ি।
Atom-breaker! এহ বাহ্য! তিনি–খাননা তাড়ি!!
Yet he is not A liquor-taker!!
চরমতম অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স! যেন যুগান্তকারী আবিষ্কার করা অথবা পরমাণুর অন্তর বিদীর্ণ করাও কিছু নয়! তার চেয়েও বড় বিস্ময় : লোকটা মদ খায় না।
