সেনসরের কথাই যখন উঠল তখন বলি শুনুন। সেনসরের বড় কর্তা ম্যাককিলভির সঙ্গে একবার খুব বেধে গিয়েছিল ফাইনম্যানের। ম্যাককিলভি বলে, সাঙ্কেতিক ভাষা ডি-কোড করা অপরাধ-বিজ্ঞানের একটা বিশেষ শাখা। ও-বিষয়ে যে গবেষণা করেনি তার পক্ষে এ ধাঁধার সমাধান সম্ভবপর নয়। ফাইনম্যান বলেছিলেন, লুক হিয়ার ম্যাক্, অপরাধ-বিজ্ঞানী কোনোদিনই অঙ্কশাস্ত্রের মামুলি কোনো ছোট্ট ফর্মুলাও বুঝতে পারবে না, যেমন ধরুন অতি ছোট্ট একটি ফর্মুলা : E = mc^2! কিছু বুঝলেন? অথচ দুরূহতম ক্রিমিনোলজির সমস্যা নিয়ে আসুন আমার কাছে, এক সেকেন্ডে তা ‘ফুস’–
হাতের তুড়ি বাজিয়ে ‘ফুসটা’ যে কতটা অকিঞ্চিৎকর তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
ম্যাককিলভি সে অপমান ভোলেনি। দুদিন পরেই সে এসে হাজির হল একখানা চিঠি হাতে। বললে, এক্সকিউজ মি স্যার। এ চিঠি পাস হবে না!
ফাইনম্যান দেখলেন তার স্ত্রীকে লেখা প্রেমপত্রখানা খামখোলা অবস্থায় নিয়ে এসেছে ম্যাককিলভি।
কী ব্যাপার? দেখা গেল–ফাইনম্যান স্ত্রীকে লিখেছিলেন, ‘সাত হাজার ফুট উঁচুতে থাকায় নিউ মেক্সিকোর গরমটা আমরা টের পাচ্ছি না।
ম্যাককিলভি এক গাল হেসে বলে, E = mc ফর্মূলা না বুঝলেও এটুকু বুঝি, এইভাবে আপনি মিসেসকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, আপনি বর্তমানে অছেন নিউ মেক্সিকোতে। একটা রিলিফ-ম্যাপ খুলে মিসেস্ সহজেই বুঝবেন সাত হাজার ফুট উঁচুতে কোথায় আছেন আপনি! ওই লাইনটা কেটে দিতে হবে।
দুরন্ত ক্রোধে ওর হাত থেকে চিঠিখানা ছিনিয়ে নিয়ে ফাইনম্যান কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলে দিলেন। হাসতে হাসতে ফিরে গেল ম্যাককিলভি।
কিন্তু আবার তাকে আসতে হল। এবারও তার হাতে ফাইনম্যানের স্ত্রীকে লেখা চিঠি। এবার ফাইনম্যান স্ত্রীকে লিখেছেন “RETEP” কেমন আছে? SBM OBMOTA এ বছর এসে পৌঁছতে পারবেন বলে মনে হয় না।” পড়ে মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারেনি ম্যাককিলভি। Retep অথবা Sbm. Obmota কারও নাম হয় নাকি? চিঠিখানা নিয়ে তাই সে আবার এসেছে ওঁর দপ্তরে। বললে, মাপ করবেন প্রফেসর ফাইনম্যান, এমন অদ্ভুত নাম আমি জীবনে শুনিনি…
প্রচণ্ড ধমক দিয়ে ওঠেন ফাইনম্যান, একজ্যাক্টলি। আমিও তো তাই বলতে চাই! এমন অদ্ভুত নাম আমি জীবনে শুনিনি! প্রফেসর ফাইনম্যান। কে তিনি? আমার নাম মিস্টার হেইলি!
থতমত খেয়ে ম্যাককিলভি বলে, না…ইয়ে…এখানে তো বাইরের লোক কেউ নেই…
–বাইরের লোক নেই এই অজুহাতে আপনি আমাকে ‘প্রফেসর ফাইনম্যান’ বলে ডাকবেন? If you call me such ‘names’ I’ll report against you!
একেবারে মিইয়ে যায় বেচারি। বলে, আমি দুঃখিত। আচ্ছা আচ্ছা মিস্টার হেইলি! কিন্তু আপনার চিঠির অর্থ যে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
ফাইনম্যান গম্ভীরভাবে বলেন, প্রেমপত্রটি আপনার উদ্দেশ্যে আমি লিখিনি মশাই। আপনি না বুঝলেও চলবে।
ম্যাককিলভি তবু অনুনয়ের সুরে বলে, তবু স্যার না বুঝে কেমন করে চিঠি। পাস করি বলুন? এই দুটো কথা–Retep এবং Sbm. Obmota-এর অর্থ কি?
এতক্ষণে রাগ পড়ে গেছে ফাইনম্যানের। বললেন, অক্ষরগুলো উল্টোপাল্টা করে সাজানো আছে। আমার স্ত্রী অনায়াসেই বুঝবেন। Retep হচ্ছে পিটার, আমার ছেলে। আর Sbm. Obmota হচ্ছেন Mrs. Mobota আমার পুত্রের গর্ভনেস; কিউবান মহিলা একজন। ছুটি নিয়ে দেশে গেছেন; এ বছর আর ফিরবেন বলে মনে হয় না।
ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল ম্যাককিলভির। অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় হল সে।
ঘটনাটা জানাজানি হয়ে যায়। সিকিউরিটি অফিসার ম্যাককিলভির নাকে ফাইনম্যান ঝামা ঘষে দিয়েছেন–এ খবরে সবাই খুশি। এরপর থেকে অনেকেই ওঁর পরামর্শ নিতে আসে–কেমন করে সেনসরকে এড়িয়ে বাড়িতে কোনো বিশেষ খবর জানানো যায়।
ম্যাককিলভির নাকে ফাইনম্যান কী পরিমাণ ঝামা ঘষেছিলেন তা অবশ্য সঠিক জানতে পারেনি কেউ। ঘটনাটা নিম্নেক্তরূপ–
দিনতিনেক পরে ম্যাককিলভি ডাকে একখানা টাইপ করা চিঠি পায়। ছোট্ট চিঠি। তাতে লেখা ছিল; “প্রিয় ইডিয়ট,
তোমাকে চারটে খবর জানাচ্ছি। এই চিঠিখানা পড়েই ছিঁড়ে ফেল। আর খবর চারটে বেমালুম গিলে ফেল। হজম করে ফেল। জানাজানি হলেই তোমার চাকরি নট। বুঝলে হাঁদারাম?
এক নম্বর খবর :প্রফেসর ফাইনম্যানের পিটার নামে কোনো পুত্রসন্তান নেই।
দুই নম্বর : পিটার একজন রাশান-এজেন্টের ছদ্মনাম।
তিন নম্বর : মিসেস মোবোটো নামে কোনো চাকরানী ওঁর নিউ ইয়র্কের ডেরায় কোনোদিন ছিল না।
চার নম্বর : চিঠিতে অক্ষরগুলো আদৌ উল্টোপাল্টা করে সাজানো ছিল না। ছিল, স্রেফ উল্টো করে সাজানো। Retep উল্টো করলে হয় Peter; কেমন তো? এবার SBMOB MOTA কথাটি উল্টে নিয়ে বুঝবার চেষ্টা করত মূর্খ-সম্রাট-কথাটা জানাজানি হলে তোমার চাকরি থাকবে কিনা!
Guess Who!”
“বলতো কে?”-র নির্দেশ আধাআধি পালন করেছিল ম্যাককিলভি। চিঠিখানা ছিঁড়ে ফেলে; কাউকে জানায়নি, কিন্তু খোঁজ নিয়ে জেনেছিল, ওই অজ্ঞাত পত্রলেখকের প্রথম ও তৃতীয় সংবাদ নিছক সত্য!
এ কাহিনি-বর্ণিত বিশ্বাসঘাতক যতদিন না গ্রেপ্তার হয় ততদিন–দীর্ঘ তিনটি বছর ম্যাককিলভি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেনি। তার হিতৈষী ওই পত্ৰলেখককে খুঁজে বার করবার চেষ্টাই করেনি সে। অনুশোচনায় আর অন্তর্দ্বন্দ্বে কাটা হয়ে ছিল। পাক্কা তিনটি বছর।
