***
লস-অ্যালামসের আর একটি অদ্ভুত চরিত্র ডক্টর ক্লাউস ফুকস্ (1912-1988)। জার্মান, কিন্তু ইহুদি নন। তবু বিতাড়িত হয়েছিলেন নাৎসি জার্মানি থেকে। কপর্দকহীন অবস্থায় এসে পৌঁছান ইংল্যান্ডে (1933)। বাবা ছিলেন শান্তিকামী প্রটেস্টান্ট ধর্মযাজক–সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। স্পষ্টবক্তা এবং নির্ভীক। তিনি ছিলেন বিশ্বভ্রাতৃত্বের পূজারী, ক্রিশ্চিয়ান কোয়েকার্স-সম্প্রদায়ের একজন কর্মকর্তা! একটি কোয়েকার্স-পরিবারেই আশ্রয় পান ক্লাউস, ইংল্যান্ডে। সাতে-পাঁচে থাকতেন না, রাজনীতি থেকে শত হস্ত দূরে থেকে পড়াশুনা শেষ করলেন ইংল্যান্ডে এসে। দুর্দান্ত ভালো রেজাল্ট হল শেষ পরীক্ষায়। ম্যাক্স বর্ন ওই সময়ে ইংল্যান্ডে–তিনি ক্লাউসকে দেখে আকৃষ্ট হলেন। জুটিয়ে দিলেন এক রিসার্চ স্কলারশিপ। সেখানেও সুনাম হল। পরে জেমস্ চ্যাডউইকের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড থেকে যে বৈজ্ঞানিক দল অ্যাটম-বোমা প্রকল্পে আমেরিকায় আসে তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে অটো ফ্রিশ (শ্রীমতী মাইটনারের সেই বোনপো, যিনি নীলস বোহর-এর ঘুষি খেয়েছিলেন), উইলিয়াম পেনি, পার্লস প্রভৃতির সঙ্গে এখানে আসেন। প্রথমে ছিলেন ওক-রিজ-এর গ্যাসীয় ডিফুশন প্রকল্পে। পরে চলে আসেন লস-অ্যালামসে। প্রচণ্ড স্মোকার, মদ্যপানও করেন প্রচুর, তবে মাতাল হন না। ব্যাচিলার, সুদর্শন–মেয়েমহলে খুবই জনপ্রিয়।
মেয়ে-মহলের কথাই যখন উঠল তখন বলি–ডক্টর ফুকস সম্বন্ধে লস-অ্যালামসে একটা গুজব বেশ চালু ছিল। তার সঙ্গে নাকি মিসেস্ অটো কার্ল-এর একটু বিশেষ জাতের সদ্ভাব ছিল। এমন গুজব তো রটতেই পারে। প্রথম কথা, ডক্টর ফুকস্ সুদর্শন, ব্যাচিলার এবং প্রফেসর অটো কার্ল বৃদ্ধ অথচ তাঁর দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রী রোনাটা কার্ল ডাকসাইটে সুন্দরী এবং যুবতী। কর্তা-গিন্নিতে না-হোক বিশ-বাইশ বছরের ফারাক! ডক্টর ফুকস্ এবং রোনাটা কার্ল দুজনেই স্বীকার করতেন ওঁরা দুজনে বাল্যবন্ধু। কিশোরী বয়স থেকেই রোনাটা চিনতো ফুকসকে। বস্তুত জার্মানি থেকে পালিয়ে এসে ফুস্ ওই রোনাটাদের পরিবারেই আশ্রয় পায়। আলাপটা সেই আমলের, কিন্তু দুষ্টু লোকের মন তাতে মানে না। তারা ভাবে–এর পিছনে বুঝি গভীরতর এক গোপন ইতিহাস আছে–যার রেশ আজও মেটেনি।
লস-অ্যালামসে–বস্তুত গোটা মানহাটান প্রকল্পে–ডক্টর ফু-এর একটা প্রকাণ্ড দান আছে–উনিই পরমাণু বোমার ক্রিটিক্যাল-সাইজটা অঙ্ক কষে বার করেন। সেই ‘ক্রিটিক্যাল সাইজ’-এর হিসাব এখনও ছাপা হয়নি। সেটা আজও চরমতম গোপন নথি।
***
কিন্তু ক্রিটিক্যাল সাইজটা কী?
ধরা যাক একটা ছোট্ট ইউ-235-এর টুকরোয় কোনো নিউট্রন আঘাত করে একটি পরমাণু বিদীর্ণ করল। তা থেকে নূতন দু-তিনটি নিউট্রন জন্মলাভ করবে এবং দু-তিন দিকে যাবে। ইউ-235-এর টুকরোটা আকারে ছোটো হলে নব-বিমুক্ত নিউট্রন দুটি হয়তো কিছুদূর গিয়েই থেমে যাবে, অর্থাৎ নূতন পরমাণু-অন্তর বিদীর্ণ করার আগেই তার যাত্রা শেষ করবে। এখন যদি আর একটু বড় মাপের টুকরো নিই তাহলে হয়তো একটা থেকে দুটো, দুটো থেকে চারটে নিউট্রন পাব। হয়তো শেষে ওই চারটে নিউট্রনও মাঝপথে বিলুপ্ত হবে। এমনিভাবে বাড়তে বাড়তে আমরা এমন একটা নির্দিষ্ট আকারে পৌঁছাব যখন ওই চেন-রিয়্যাকশান বা ‘চক্রাবর্তন-পদ্ধতি’ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে। সেই নির্দিষ্ট মাপকাঠিকেই বলে ‘ক্রিটিক্যাল-সাইজ। লস-অ্যালামসের বিজ্ঞানীরা চাইছিলেন ক্রিটিক্যাল-সাইজের চেয়ে একটু ছোট মাপের দুটি ইউরেনিয়াম টুকরোকে একটা বাধাদানকারী পদার্থের দু-পাশে রাখতে। যদি এমন হয় যে, আকাশ থেকে বোমা পড়তে পড়তে পর্দাটা গলে যাবে, তাহলে ভূপৃষ্ঠে পোঁছবার আগেই দুটি ‘সাব-ক্রিটিক্যাল’ টুকরো পরস্পরের সংস্পর্শে এসে ‘সুপার-ক্রিটিক্যাল’ হয়ে যাবে। যার অর্থ প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। এই ব্যাপারটা চিত্র 9-এ বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে।

[চিত্র 9. অ্যাটম-বোমা তৈরির অন্তিম ধাপ- ‘ক্রিটিকাল সাইজ’]
***
কিন্তু লস-অ্যালামসে সবচেয়ে অদ্ভুত চরিত্র হচ্ছেন রিচার্ড ফাইনম্যান (1918 – 1988)। ডাক নাম ‘ডিক’। সব রিচার্ড-এরই ডাকনাম হয় ডিক, যেমন সব কানাইলালের ডাক নাম কানু। ফাইনম্যানের আর এক ডাক নাম চালু হয়েছিল লস-অ্যালামসে–মসকুইটো বোট। ডিরেক্টার নোবেল-লরিয়েট হান্স বেথে সেই সুবাদে হচ্ছেন ‘ব্যাটলশিপ’! মানসাঙ্কে ফাইনম্যান ছিলেন ফের্মির মতো ধুরন্ধর। কাউকে কেয়ার করতেন না। নোবেল-প্রাইজপ্রাপ্ত বেথে, ফ্রাঙ্ক, লরেন্স ইত্যাদিকে মুখের ওপর বলতেন-‘কী বকছেন স্যার পাগলের মতো!’–’পাগলের মতো’ কথাটা ছিল তার প্রতিবাদের বাঁধা লবজ, মুদ্রাদোষ!
অদ্ভুত ফুর্তিবাজ। দুষ্টমিতে ভরা। একেবারে ছেলেমানুষ। এদিকে ধাঁধায় পাকা মাথা। ফাইনম্যানের স্ত্রী থাকতেন নিউইয়র্ক। যেমন স্বামী তেমন স্ত্রী। ভদ্রমহিলারও মাথা খেলত ধাঁধার সমাধানে। স্বামী-স্ত্রী নানান ধরনের ধাঁধা নিয়ে সময় কাটাতেন। এখন দুজনে আছেন দেশের দুই প্রান্তে–তাই দুজনে চিঠিপত্র লিখতেন সাঙ্কেতিক ভাষায়। অথবা চিঠি লিখে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে পাঠাতেন। ‘জিগস’ ধাঁধার মতো টুকরা কাগজগুলি সাজিয়ে প্রাপককে পাঠোদ্ধার করতে হত। শোনা যায়, এ কাজের উদ্দেশ্য হল সেনসারকে নাকাল করা। ব্যাটারা কেন খুলে পড়বে ওঁদের প্রেমপত্র?