বিষয় : জুলিয়াস রবার্ট ওপেনহাইমার
প্রাপক : দ্য ডিস্ট্রিক্ট এঞ্জিনিয়ার, মানহাটান ডিস্ট্রিক্ট
স্টেশন ‘এফ’, নিউ ইয়র্ক।
পনেরই জুলাই তারিখে প্রদত্ত আমার মৌখিক নির্দেশের পরিপূরক হিসাবে এতদ্বারা অনুরোধ জানানো যাইতেছে যে, উপরুল্লিখিত ব্যক্তিকে অবিলম্বে প্রস্তাবিত পদে নিযুক্ত করা হউক। ইহাও উল্লেখ থাকে যে, তাহার বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ ইতিপূর্বে আপনি আমাকে জানাইয়াছেন তাহা পাঠান্তে সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে বিশেষ ক্ষমতাবলে আমি এই আদেশ জারি করিতেছি। উল্লিখিত ব্যক্তি এই প্রকল্পের পক্ষে অনিবার্য।
— এল, আর. গ্রোভস
ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল, সি, ই,
তরোয়ালের এক কোপে সব রকম বাধাবিঘু সরিয়ে দিলেন সামরিক অফিসারটি।
ওপি হলেন লস-অ্যালামসের অফিশিয়াল কর্ণধার!
***
লস অ্যালামসে একে একে এসে জুটলেন বিজ্ঞানীরা। মূল-নিয়ামক ওপি। পৃথিবীর ইতিহাসে এতগুলি প্রথমশ্রেণির বৈজ্ঞানিক কখনও একত্র হয়ে একযোগে কাজ করেননি। এলেন–ৎজিলাৰ্ড, গ্যামো, টেলার, উইগনার, ফের্মি, হান্স বেথে,–ফন নয়মান, ক্রিস্টিয়াকৌস্কি, রোবিনোভিচ, ওয়াইস্কফ, পার্লস, অটো ফ্রিশ, উইলিয়াম পেনি, ক্লাউস ফুকস, কেনেডি, স্মিথ, পার্সন ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। সাতটি বিভাগ, তার সাতজন কর্ণধার–প্রত্যেকের অধীনে পাঁচ-সাতটি শাখা। থিওরিটিক্যাল বিভাগের এনরিকো ফের্মি–প্রভৃতি প্রভৃতি এবং প্রভৃতি। সকলের পরিচয় দিতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। দু-চার জনের কথা বলি–
হান্স বেথে নোবেল-লরিয়েট জার্মান। নাৎসি শাসনে উত্যক্ত হয়ে 1935-এ পালিয়ে আসেন আমেরিকায়। তাঁর জীবনের এক কৌতুককর অভিজ্ঞতার কথা বলি–যা থেকে বোঝা যাবে, বিজ্ঞানীরা রাজনীতিকদের পাল্লায় পড়ে কী জাতীয় নাকাল হতেন। পারির পতনের সময়ে (1940) আমেরিকায় উদ্বাস্তু হ্যান্স বেথে একটি সমর-সম্বন্ধীয় আবিষ্কার করে বসলেন। কামানের গোলায় সাঁজোয়া গাড়ির প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থার বিষয়ে একটি আবিষ্কার। কাগজপত্র নিয়ে তিনি দেখা করলেন মার্কিন সামরিক বড়কর্তার সঙ্গে। সামরিক বড়কর্তা সেটা পড়ে অভিভূত হয়ে বললেন, প্রফেসর, আপনার এ আবিষ্কার প্রভূতভাবে আমাদের কাজে লাগবে। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ!
হান্স বেথে গদগদ হয়ে বলেন, কিছু না, কিছু না–আমার পরীক্ষা কার্যটা শেষ হয়নি। আরও উন্নত ধরনের সাঁজোয়া গাড়ির চাদর তৈরি করব আমি। রিসার্চের কাগজগুলো দিন–অসমাপ্ত কাজটা শেষ করি–
বড়কর্তা বললেন, আমি অত্যন্ত দুঃখিত প্রফেসর, রিপোর্টটা আর আপনাকে ফেরত দেওয়া যাবে না। আমাদের চোখে আপনি হচ্ছেন শত্রুপক্ষের লোক, জার্মান ন্যাশনাল!
–সে কি! আবিষ্কারটা যে আমারই! আর ওটা যে অসম্পূর্ণ!
–আয়াম সরি, প্রফেসর!
—দুত্তোর ‘সরি’! ওর কপিও যে নেই আমার কাছে –
আয়াম সরি এগেন, হের প্রফেসর!
পাঠকের হয়তো মনে হচ্ছে আমি বানিয়ে বলছি! বিশ্বাস করুন-এতে একবিন্দু অতিরঞ্জন নেই। সেই হান্স বেথে বর্তমানে লস অ্যালামসের থিওরিটিক্যাল ডিভিশনের ডিরেক্টর।
***
এক্সপ্লোসিভ বিভাগের ডিরেক্টার জর্জ ক্রিস্টিয়াকৌস্কি-সংক্ষেপে ‘কিস্টি। খাস রাশিয়ান। বয়স তেতাল্লিশ। জন্ম কিয়েভ-এ। বলশেভিকদের বিরুদ্ধে শ্বেত রাশিয়ান বাহিনির হয়ে কৈশোরে লড়াই করেছিলেন। তুরস্কের ভিতর দিয়ে পালিয়ে শেষ পর্যন্ত কপর্দকহীন উদ্বাস্তু হিসাবে এসে পৌঁছান বার্লিনে। সেখানে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেন; 1925-এ চলে আসেন মার্কিন-মুলুকে। প্রিন্সটনে অধ্যাপনা করছিলেন-ওপি তাকে ধরে এনেছে লস অ্যালামসে। দুর্ধর্ষ বেপরোয়া এই কিস্টি। একবার তিনি তার সহকর্মীদের বলেছিলেন, তোমরা বোমার এই বিস্ফোরকগুলোকে খামকা ভয় পাও। ডিনামাইট নয় এই প্যাকেটগুলো–নাড়াচাড়ায় ফেটে যাবে না। অত পুতুপুতু কর কেন?
ওঁর সহকর্মীরা সৌজন্যবোধে মাথা নাড়ে। বেশ বোঝা যায়, তারা মেনে নেয় না ওঁর কথা।
প্র্যাকটিক্যাল কিস্টি বুঝতে পারেন–ওরা বিশ্বাস করছে না। তৎক্ষণাৎ আদেশ দিলেন বিস্ফোরক-ভর্তি প্যাকিং কেসগুলো ওঁর গাড়িতে তুলে দিতে। আট-দশটা প্যাকিং-কেস গাড়ির সিটে চড়িয়ে কিস্টি বিস্মিত সহকর্মীদের চোখের সামনে দিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। কোথায় গেলেন উনি?–ভাবছে সবাই। কোথাও যাননি কিস্টি। সামনের উবড়ো-বড়ো মাঠের মাঝখানে খানিকটা বেপরোয়া ড্রাইভ করে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ফিরে এলেন এক্সপ্লোসিভ বিভাগের ডিরেক্টার। চোখ বড় বড় করে দাঁড়িয়ে আছে সহকর্মীরা। কিস্টি গাড়ি থেকে নেমে এসে বললেন, দেখলে? ফাটলো? নাও, এবার গাড়ি থেকে ওগুলো নামাও!
আর এক রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক হচ্ছেন গ্যামো–জর্জ গ্যামো। যাঁর “One? Two? Three… Infinity” বইটি বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রেরই অবশ্যপাঠ্য। চুটকি রসিকতায়, গল্প বলায়, ধাঁধা বানানোতে অদ্ভুত পারদর্শিতা ছিল তাঁর। জন্ম রাশিয়ায় শিক্ষা গোটিনজেন-এ। হেইসেনবের্গ, ওপি, টেলার ইত্যাদির সহপাঠী। গ্যামো কীভাবে রাশিয়া থেকে পালিয়ে আসেন তার গল্প শুনিয়েছেন উনি। স্কুলের গণ্ডী তখন সবে পার হয়েছেন গ্যামো। ছুটিতে উনি জার্মানি বেড়াতে যাবার সংকল্প করলেন-বাসনা, স্বচক্ষে দেখে আসবেন সেই অদ্ভুত মানুষটিকে–আলবার্ট আইনস্টাইন যাঁর নাম। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় গ্যামো অঙ্কে রেকর্ড মার্ক পেয়েছেন–ওইটাই তার প্রাইজ হিসাবে দাবি করলেন। বাবা রাজি হলেন খরচ দিতে–রাজি হলেন না রাশিয়ান গভর্নমেন্ট। সেইদিন থেকেই গ্যামোর স্বপ্ন ছিল রাশিয়া থেকে পালানো। আফগান-সীমান্ত দিয়ে প্রথমবার পালাবার চেষ্টা ব্যর্থ হল। সীমান্তরক্ষীরা ধরে ফেলল কিশোরবয়স্ক পলাতককে; কিন্তু গ্যামো তাদের বুঝিয়ে দিলেন, তিনি ছুটিতে বেড়াতে এসেছেন। ওই পাহাড়ের মাথায় চড়বার বাসনা নিয়ে বাড়ি থেকে বার হয়ে পথ হারিয়েছেন। যাই হোক, তাকে ফিরে আসতে হল। এরপর অল্পবয়সেই গ্যামো বিবাহ করেন। সদ্যবিবাহিতা বধূকে খুলে বললেন মনের কথা। অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধে কিশোরী মেয়েটি রাজি হয়ে যায়। একটা নৌকা নিয়ে দুজনে বার হয়ে পড়েন একদিন কৃষ্ণসাগরের বুকে। ওপারে রাশিয়ান এলাকা নয়। এই দুঃসাহসিক অভিযানটিও ব্যর্থ হল। ঝড়ের মধ্যে পড়ে এই দুলর্ভ প্রতিভার সলিল-সমাধি হতে বসেছিল। উদ্ধার করল আবার সেই সীমান্তরক্ষীর দল। রাশিয়ান বর্ডার-পুলিস। এবারও তার আসল উদ্দেশ্য তারা বুঝতে পারেনি। কিন্তু ‘ওয়ান, টু, থ্রি.ইনফিনিটি’ গ্রন্থ যিনি ভবিষ্যতে লিখবেন তিনি কি প্রথম আর দ্বিতীয়বার ব্যর্থ হয়েই থামতে পারেন? ইনফিনিটি পর্যন্ত যেতে হয়নি, তৃতীয় প্রচেষ্টাতেই সাফল্যমণ্ডিত হন। এসে পৌঁছালেন বার্লিনে। দেখলেন সেই মানুষটিকে, বিংশ শতাব্দীর বিস্ময়–আলবার্ট আইনস্টাইনকে!
