-ঠিক আছে। ঠিক আছে! আমি অত অন্যমনস্ক নই! আমি ভুলিনি!
লিফট এসে দাঁড়াল। ওঁর সঙ্গে একই লিফট-এ উঠেছেন একটি মহিলা : স্বয়ংক্রিয় লিস্ট। চালক নেই। তৃতীয় যাত্রীও নেই। রুদ্ধদ্বারকক্ষে একটি মহিলা সহযাত্রী দেখে অত্যন্ত সঙ্কুচিত হয়ে কোণ নিলেন অধ্যাপকমশাই। মহিলাটি এঁকে আদৌ নজর করেননি। একমনে একটা খবরের কাগজ দেখছেন তিনি। হঠাৎ প্রফেসর বোহর-এর মনে হল মহিলাটি তার অত্যন্ত পরিচিত। আরে! এ যে হালবানের স্ত্রী। হালবান ছিলেন ডেনমার্কে ওঁর সহকর্মী। প্রফেসর সবিনয়ে প্রশ্ন করেন :
–মাপ করবেন, আপনি কি ফ্রাই ফন হালবান নন?
নীলস বোহর জানতেন না, তার বন্ধু হালবানের সঙ্গে স্ত্রীর বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে গেছে এবং মহিলাটি মিস্টার প্লাজেককে ইতিমধ্যে বিবাহ করেছেন। ভদ্রমহিলা কাগজ থেকে মুখ না তুলে বললেন, আজ্ঞে না! আপনার ভুল হচ্ছে স্যার আমার নাম মিসেস প্লাজেক।
–আয়াম সরি!
লিফট ওপরে উঠছে। হঠাৎ কাগজ থেকে মুখ তুলে মহিলাটি তার সহযাত্রীর দিকে চোখ তুলে চাইলেন। একেবারে লাফিয়ে ওঠেন তিনি। বলেন, কী আশ্চর্য! আপনি! প্রফেসর বোহর!
প্রফেসর বোহর গম্ভীরভাবে বললেন, আপনার ভুল হয়েছে মাদাম–আমার নাম নিকোলাস বেকার!
লিফট পৌঁছে গেল! গটগট করে এগিয়ে গেলেন নিকোলাস বেকার। স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলেন মিসেস প্লাজেক! ঋষিপ্রতিম প্রফেসর বোহর এমন বেমক্কা মিথ্যা কথা বললেন কেন?
.
০৮.
অশান্তভাবে নিজের ঘরে পদচারণা করছিলেন জেনারেল গ্রোভসস। ওপিকে ডেকে পাঠিয়েছেন অনেকক্ষণ। এখনও আসছে না কেন সে? কিন্তু এলে তিনি কী বলবেন? কেমন করে জেনে নেবেন প্রকৃত সত্যটা? ওপি, ওপেনহাইমারকে তার চাই,–নিতান্তই অপরিহার্য সে। এই কয়েকমাসে সে মন্ত্রের মতো সমস্ত প্রকল্পটাতে যেন প্রাণ সঞ্চার করেছে। তার অধ্যবসায়ে, কর্মপদ্ধতিতে, তার উৎসাহে অভিভূত হয়ে পড়েছেন গ্রোভস, এখন তাকে কোনক্রমেই ছাড়া যায় না। অথচ
হ্যাঁ। এফ. বি. আই. থেকে রিপোর্ট এসেছে ইতিমধ্যে। গুপ্তচর দপ্তর স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট জে ওপেনহাইমারকে সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স দেওয়া যাবে না। তিন-তিনটি ছিদ্র তারা বার করেছে ওপির পূর্ব-ইতিহাস হাড়ে। এক নম্বর, সে দীর্ঘদিন ধরে কম্যুনিস্ট চিন্তাধারা প্রচার করত। দু নম্বর, ওর ভ্রাতৃবধূ ‘জ্যাকি’ একজন কম্যুনিস্ট ছিল। আর তিন নম্বর, ওর স্ত্রীর প্রথমপক্ষের স্বামী ছিল একজন উৎসাহী কম্যুনিস্ট কর্মকর্তা।
গ্রোভস্ টেবিলের ওপর থেকে একখানি পত্রিকা তুলে পাতা উল্টাতে থাকেন। ‘পিপলস ওয়ার্ল্ডের’ বর্তমান সংখ্যা। পত্রিকাটির নামই শোনা ছিল না। রিপোর্টখানা পড়ে কৌতূহলের বশে আজ একখানা কিনে ফেলেছেন। পাতা উল্টে দেখছিলেন, কই তেমন কোনো মারাত্মক রচনা তো নজরে পড়ল না?
–গুড মর্নিং স্যার!–ওপি এসেছে।
–এস, বস বস।
ভিজিটার্স চেয়ারে বসতে বসতে ওপেনহাইমার বলে, এ কি স্যার? আপনার হাতে পিপল্স ওয়ার্ল্ড!
-কেন? এটা কি নিষিদ্ধ কোনো পত্রিকা?
–না। নিষিদ্ধ ঠিক নয়, তবে ওরা তো ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাস করে না—
–তাই নাকি? আমি পড়ে দেখিনি। তুমি পড়েছ?
–এ সংখ্যাটা পড়িনি। বস্তুতপক্ষে গত তিন-চার বছর পড়িনি। তবে এককালে আমি ওই পত্রিকার সভ্য ছিলাম।
-তাই নাকি?
–শুধু তাই নয় স্যার, ছদ্মনামে এককালে আমি ওতে প্রবন্ধও ছাপিয়েছি! স্তম্ভিত হয়ে গেলেন গ্রোভস্। এ খবরটা তো এফ. বি. আই.ও পায়নি। অথচ ও কেমন সরল বিশ্বাসে বলে গেল! পুনরায় প্রশ্ন করেন, সে সময় তোমার বুঝি ক্যমুনিজম-এ বিশ্বাস ছিল?
–তা ছিল। কিছুটা আমার ভাইয়ের প্রভাব—
ভাই! ভাই কে?
–আমার ভাই ফ্রাঙ্ক ছিল ঘোর কম্যুনিস্ট। তার স্ত্রী জ্যাকলিনও তাই। এখন অবশ্য তাদের মত বদলে গেছে। যাই হোক, আমাকে ডেকেছিলেন কেন?
মনের মেঘ অনেকখানি সরে গেছে ইতিমধ্যে। গ্রোভস্ শেষ প্রশ্নটা এড়িয়ে বলেন, কিছু মনে কর না ওপি, তোমাকে একটি পারিবারিক প্রশ্ন করছি। তোমার স্ত্রীর প্রাক্তন স্বামীও কি একজন কম্যুনিস্ট ছিলেন?
–ছিলেন। তাঁর নাম জো ড্যালবর। তিনি ছিলেন স্পেনের একজন নেতৃস্থানীয় কম্যুনিস্ট পার্টি অফিশিয়াল। স্পেনের গৃহযুদ্ধে তিনি মারা যান।
–তার মানে তোমার স্ত্রীও কিছুটা
–কিছুটা কেন? এককালে তিনিও ঘোর কম্যুনিস্ট ছিলেন।
একটু ঘুরিয়ে গ্রোভস বললেন, আমি ভাবছি–এসব কথা আবার এফ. বি. আই. খুঁচিয়ে বের করবে না তো? তুমি তো জানই, এফ. বি. আই.-এর ক্লিয়ারেন্স ছাড়া
–হ্যাঁ, জানি বই কী! কিন্তু খুঁচিয়ে বার করার কী আছে? আমাকে প্রশ্ন করলেই আমি অকপটে সব বলব। এককালে কম্যুনিস্ট ডকট্রিন আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল একথা স্বীকার করতে আমার দ্বিধা নেই। কিন্তু বর্তমানে আমি ডেমোেক্রাসির পূজারী। শুধু আমি নই–আমরা সবাই। আমি, আমার স্ত্রী, আমার ভাই, তার স্ত্রী!
সে যাই হোক আমাকে ডেকেছিলেন কেন?
‘কেন ডেকেছিলেন’ তার কৈফিয়ৎ গ্রোভস কী দিয়েছিলেন, আদৌ দিয়েছিলেন কিনা তার কোনো প্রমাণ নেই। যা আছে তা হচ্ছে সমর বিভাগের একটি গোপন নথি। ওই জুলাই-এর বিশ তারিখে লেখা। চিঠিখানা হুবহু অনুবাদ করে দিলাম–
গোপনতম পত্র
যুদ্ধবিভাগ
চিফ ইঞ্জিনিয়ার দপ্তর
ওয়াশিংটন, জুলাই 20, 1943
