–বন্দুক! বন্দুক কী হবে স্যার?
–ও! শিকার করতে আসনি তাহলে? বাল্যভূমি দেখতে এসেছ? তা ভালো। কিন্তু এঁরা?
মিস্টার গ্রোভস, মিস্টার নিকলস্-আমার বন্ধু।
বৃদ্ধ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তার স্কুলটা দেখালেন। ছেলেদের দেখালেন। খুশিয়াল হয়ে উঠলেন তিনি। ওপেনহাইমারের মনের ভিতর তখন কী হচ্ছিল তা কেউ খেয়াল করেনি।
সমস্ত এলাকাটা পরিদর্শন শেষ করে সিভিলিয়ানবেশী তিনজন আবার ফিরে এলেন নিউইয়র্কে। হ্যাঁ, জায়গাটা পছন্দ হয়েছে গ্রোভূ-এর।
সাতদিন পরে আলফ্রেড কর্নেল একটি মর্মান্তিক আদেশ পেলেন। যুদ্ধের প্রয়োজনে তার স্কুল এবং তৎসংলগ্ন সমস্ত জমি, মায় গোটা পাহাড়টা সরকার জবরদখল করছেন। না, ঠিক জবরদখল নয়, খেসারত বাবদ একটা চেকও যুক্ত ছিল পত্রের সঙ্গে। মাথায় হাত দিয়ে বসলেন বৃদ্ধ। এ কী হল? কেমন করে হল? কাকে ধরবেন? কার কাছে দরবার করবেন? আচ্ছা ‘ওপি’কে চিঠি লিখলে কেমন হয়? সে তো এখন মস্ত অধ্যাপক। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার প্রফেসর!
কিছুতেই কিছু হল না। সব ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে হল। ছাত্ররা ফিরে গেল যে যার বাড়ি। লাইব্রেরির বইগুলো বিলিয়ে দিলেন। চেকটা ক্যাশ করতে পাঠালেন ব্যাঙ্কে।
চেক-এর অঙ্কটা বড় জাতেরই ছিল। বৃদ্ধের বাকি জীবনের খোরপোশ চলে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তার প্রয়োজন হয়নি। চেক ক্যাশ হয়ে আসার আগেই ভগ্নহৃদয়ে আলফ্রেড কর্নেল মারা গেলেন। ঈশ্বরকে ওপেনহাইমার ধন্যবাদ দিয়েছিল কি সেজন্য? বৃদ্ধের মুখোমুখি তাকে দ্বিতীয়বার দাঁড়াতে হল না বলে?
গ্রোভস-এর প্রথমে ধারণা ছিল এখানে শতখানেক বৈজ্ঞানিক এসে হয়তো কাজ করবেন। প্রাথমিক ব্যবস্থা সেই মতোই হয়েছিল। কিন্তু বছর শেষ না হতে ওখানে এলেন সাড়ে তিনহাজার কর্মী, পরের বছর সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়াল ছয় হাজারে।
বিজন প্রান্তরে এমন একটা কারখানা কেন গড়ে উঠছে–কী তৈরি হবে ওখানে, একথা সততই জিজ্ঞাসা করে সকলে। জবাব পায় না। বুঝতে পারে না তারা। ওখানে যারা আসে, থাকে, তারা মিলিটারি পোশাকের নোক নয়, সবই সিভিলিয়ান।
***
চূড়ান্ত গোপনীয়তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল লস-অ্যালামস-এ। প্রতিটি বৈজ্ঞানিকের একটা করে নামকরণ করা হল। সেই নতুন নামে তাদের চিঠিপত্র আসত। আসত একই ঠিকানায়—’ইউনাইটেড স্টেট আর্মি, পোস্ট অফিস বক্স নং 1663’-এই ঠিকানায়। লস অ্যালামস তো দূরের কথা, খামের ওপর নিউ-মেক্সিকো পর্যন্ত লেখা হত না। প্রতিটি বৈজ্ঞানিকের ব্যক্তিগত চিঠি আসা এবং যাওয়ার পথে সেনসর করা হত। কোনো গোপন খবর যেন কোনোভাবে বাইরে পাচার হয়ে যায়। অধিকাংশ বিজ্ঞানী স্ত্রী-পুত্র পরিজনদের ছেড়ে এসেছেন। তারা শুধু জানতেন স্বামী যুদ্ধের গোপন-কাজে নিযুক্ত। কী কাজ, কোথায় কাজ তা জানতেন না। বিজ্ঞানীদের কড়া হুকুম দেওয়া হয়েছিল পরস্পরকে যেন ‘ডক্টর’ বা ‘প্রফেসর’ জাতীয় সম্বোধন না করেন। এতে সন্দেহের উদ্রেক করবে। তাহলে রাম-শ্যাম-যদু ভাবতে বসবে–এতগুলি পি. এইচ. ডি. অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এই বিজন প্রান্তরে কেন জমায়েত হয়েছেন? হয়তো গোটা পরিকল্পনাটাই তাতে বানচাল হয়ে যাবে! সম্বোধন করতে হবে শুধু ‘মিস্টার’ বলে। অনেকের সেটা ভুল হয়ে যেত। অধ্যাপকসুলভ অন্যমনস্কতায় ভুল সম্বোধন করেই মনে মনে জিব কাটতেন! একবার এডওয়ার্ড টেলর সান্তা-ফেতে একটি মর্মর মূর্তি দেখিয়ে তার বন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন–ওটা কার মূর্তি?
বন্ধু অ্যালিসনও পদার্থবিজ্ঞানী। রসিক ব্যক্তি। তিনি টেলরের কানে কানে বললেন, মূর্তিটা আর্চবিশপ লামির। কিন্তু খবরদার–তোমাকে যদি কেউ এ প্রশ্ন করে তবে বলবে ‘মিস্টার’ লামির। ভুলেও আর্চবিশপ’ বোলো না যেন!
সরল প্রকৃতির টেলর অবাক হয়ে বলেন, কেন? পাথরের মূর্তিতে আবার গোপনীয়তা কিসের?
অ্যালিসন বিজ্ঞের হাসি হেসে বলেন, আছে, ব্রাদার, আছে! বুঝলে না? নাহলে রাম-শ্যাম-যদু ভাবতে বসবে, এতগুলি কাক কেন প্রত্যহ ওঁর মাথায় ‘ইয়ে’ ত্যাগ করে। খ্রিস্টধর্মটাই হয়তো বানচাল হয়ে যাবে!
বিশ্ববিশ্রুত বৈজ্ঞানিক নীলস বোহর-এর নতুন নাম দেওয়া হল ‘নিকোলাস বেকার। বাঘা বাঘা ফমূলা ওঁর কণ্ঠস্থ অথচ এই নামটা তার মনে থাকত না। মিটিং-এর ভিতর কেউ হয়তো প্রশ্ন করে ওঠে–মিস্টার বেকার এ বিষয়ে কী বলেন?
বোহর নির্বিকারভাবে ব্যোম মেরে বসে থাকেন। ওঁর কোনো ছাত্র তখন হয়তো ওঁর কানে কানে বলে, স্যার, আপনাকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে–
প্রফেসর আঁৎকে উঠতেন, হু? মি? গুড হেভেন্স! আমার মনেই থাকে না যে আমার নাম বোহর নয়, বেকার!
অতঃপর মিটিং-এ উপস্থিত আর কারও জানতে বাকি থাকে না ‘নিকোলাস বেকার’ কার ছদ্মনাম!
***
আর একবার। সেটা নিউ ইয়র্কে। প্রফেসর বোহর একটা অত্যন্ত জরুরি ও গোপনীয় মিটিং-এ যোগদান করতে যাচ্ছেন। অন্যমনস্ক অধ্যাপকটির জন্য সদা-সর্বদা একজন দেহরক্ষীর ব্যবস্থা ছিল। সিকিউরিটি-ম্যান। গন্তব্যস্থলে ও পৌঁছে দিয়ে লোকটা বিদায় নিল। মিটিং-এ বেচারি যেতে পারবে না। লিফ-এ মুখে ওঁকে রেখে শেষবারের মতো ফিসফিস করে মনে করিয়ে দেয়; প্লি প্রফেসর, মনে রাখবেন আপনার নাম নীলস বোহর নয়, নিকোলাস বেকার। কেমন?
