অর্থাৎ নেহাত মামুলি কেরিয়ার। বড়জোর বলতে পারা যায়, গড়পড়তা ছাত্রদের চেয়ে কিছু ওপরে। মন্দ নয়-এর ওপর–চলনসই। ওর সমবয়সী এবং সহাধ্যায়ী ছাত্ররা ইতিমধ্যে অনেক-অনেক বেশি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মৌলিক কাজ করেছে, নোবেল পুরস্কার পেয়েছে–যেমন হেইসেনবের্গ, ফের্মি, ডিরাক, জোলিও-কুরি ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ ওপেনহাইমার
জেনারেল মার্শাল শেষ পর্যন্ত ডেকে পাঠালেন গ্রোভসকে। বললেন, আমি দুঃখিত জেনারেল, আপনার সঙ্গে একমত হতে পারছি না। এই ওপেনহাইমার ছোকরাকে দিয়ে আমাদের কাজ চলবে না।
-কেন জেনারেল?
–কী দেখে নির্বাচন করলেন ওকে? এতগুলো নোবেল-লরিয়েটকে
বাধা দিয়ে গ্রোভস্ বলেন, নোবেল-লরিয়েটদের চালাতে হলে নোবেলতর-লরিয়েট চাই এ ধারণা হল কেন আপনার? আমি তো সাধারণ পি. এইচ. ডি.-ও নই, তবু তো বেশ চলছে আমার।
–আপনার কথা আলাদা। আচ্ছা সত্যি করে বলুন তো–কী দেখেছেন আপনি ওই ছোকরার ভিতর?
সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে জেনারেল গ্রোভসস বলেন, আমি ওর চোখে আগুন জ্বলতে দেখেছি জেনারেল!
মার্শাল সামরিক অফিসার, প্র্যাকটিক্যাল মানুষ। প্রাগম্যাটিক! এমন ভাবালুতা কখনও লক্ষ্য করেননি ইতিপূর্বে। আর কোনো প্রশ্ন করেন না উনি। বলেন, ইফ য়ু মাস্ট-ওয়েল, হ্যাভ হিম। প্রোভাইডেড…….
হ্যাঁ, ‘প্রোভাইডেড’! যদি এফ. বি. আই. ওকে ক্লিয়ারেন্স দেয়। এতবড় দায়িত্বপূর্ণ কাজে নিয়োগ করার আগে রাষ্ট্রের গুপ্তচর বাহিনিকে সুযোগ দিতে হবে। তারা চিরে-চিরে ফালাফালা করে দেখবে ওপেনহাইমারের অতীত ইতিহাস। লোকটাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় কিনা। তাতে অবশ্য গ্রোভস্ রাজি। রাজি হতেই হবে। এই হচ্ছে আইন। স্থির হল, ওপেনহাইমারকে সাময়িকভাবে কাজে বহাল করা হবে। প্রভিশানালি। এফ. বি. আই-য়ের ক্লিয়ারেন্স পেলে তাকে দেওয়া হবে পাকা নিয়োগপত্র।
***
ওপেনহাইমার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দীর্ঘ দিনের ছুটি নিয়ে এসে যোগ দিল জেনারেল গ্রোভসস-এর দপ্তরে। ছায়ার মতো ঘুরতে লাগল সে বড়সাহেবের সঙ্গে। অচিরে মুগ্ধ হয়ে গেলেন গ্রোভ। ওপির কর্মক্ষমতায়, দৈহিক ও মানসিক সহ্য ক্ষমতায়, উৎসাহে, অধ্যবসায়ে। স্থির করলেন যেমন করেই হোক ওকে কাজে আটকাতে হবে।
গ্রোভস-এর সঙ্গে সব কয়টি কেন্দ্র ঘুরে এসে ওপি বললে, স্যার, দুটো কথা আমার বলার আছে।
-বল?
প্রথমত, আপনি নৌ-বিভাগ এবং বিমানদপ্তরকে এবার ব্যাপারটা জানান। তাদের প্রস্তুত হতে সময় লাগবে। যে পাইলট প্লেনটা উড়িয়ে নিয়ে যাবে, যে বোমাটা ফেলবে তারা ইতিমধ্যে ডামি নিয়ে অভ্যাস শুরু করুক। কোটি-কোটি ডলার খরচ করে যে বোমা তৈরি হবে, ছোঁড়ার দোষে সেটা যেন ব্যর্থ না হয়।
–দ্বিতীয়ত?
–দ্বিতীয়ত, বোমা তৈরির কারখানাটা এবার বানাতে শুরু করা উচিত। পাঁচটি বিভিন্ন পদ্ধতিতে পারমাণবিক বোমা বানানোর চেষ্টা হচ্ছে–হচ্ছে দশটি কেন্দ্রে। কিন্তু ওঁরা পদ্ধতিটা থিওরেটিক্যালি’ বলবেন। সেটা বাস্তবে রূপায়িত করতে হলে একটা প্রকাণ্ড তৈরি-কারখানা চাই–
–কিন্তু সে তো দেশের যে কোনো কারখানাতেই হতে পারে ডক্টর?
পারে না স্যার। সেটা হতে হবে জনমানবের বসতি থেকে বহু দূরে, লোকচক্ষুর আড়ালে। বোমার ফর্মুলা যদি আমরা আজ থেকে এক বছর পরে পাই, তবে এই এক বছরের ভিতর আমাদের ফ্যাক্টরি, স্টাফ-কোয়াটার্স, জল-বিদ্যুৎ সরবরাহ ইত্যাদি সব কিছু শেষ করে তৈরি হয়ে থাকতে হবে। নয় কি?
গ্রোভস খুশি হলেন। অত্যন্ত খুশি হলেন। বলেন, সত্যি কথা বলতে কি এটা আমিও ভেবেছি। ইতিমধ্যে তিন চারটে সম্ভাব্য ‘সাইট’ ঠিক করেও রেখেছি। চল, আমরা দুজনে সেগুলি দেখে আসি।
সম্ভাব্য স্থানগুলির তালিকা দেখে ওপেনহাইমার বললে, আমি নিশ্চিত–আপনি শেষ পর্যন্ত এই লস অ্যালামসকেই নির্বাচন করবেন।
-কেমন করে জানলে? তুমি গিয়েছ ওখানে?
-ওখানে আমার বাড়ি। ছেলেবেলায় ওখানকার স্কুলে পড়েছি–নিউ মেক্সিকোর রাঞ্চে আমার কৈশোর কেটেছে। জায়গাটা হবে এ কাজের জন্য আইডিয়াল সাইট।
নিউ-মেক্সিকোর এক জনমানবহীন প্রান্তরে অস্তেবাসী জনপদ সান্তা-ফে। সেখানে থেকে একটা উদাসী সড়ক চলে গেছে পাহাড়ের ওপর। ওই পাকদণ্ডী পথের প্রান্তে আছে একটা ছোট্ট স্কুল। 1918 সালে ওই লস অ্যালামস রাঞ্চ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত অফিসার–আলফ্রেড জে কর্নেল। এখন তিনি অশীতিপর বৃদ্ধ। সংসারে কেউ নেই। ওই স্কুলটা তার প্রাণ। ওপেনহাইমার ঠিক তার ছাত্র নয়, তবু দুজনেই দুজনকে চেনেন। সমুদ্র সমতল থেকে সাত হাজার ফুট ওপরে ভারি সুন্দর পরিবেশে এই স্কুলটি অবস্থিত। মাঝে মাঝে শিকারীরা আসে বন্দুক নিয়ে–ওখানকার পার্বত্য অরণ্যে এখনও প্রচুর হরিণ পাওয়া যায়; আর পাওয়া যায় গেম বার্ডস। শান্ত পরিবেশ বন্দুকের মুহুর্মুহু গর্জনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সেদিন বৃদ্ধ কর্নেল বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়েন। তারপর শিকারীরা আবার চলে যায়, স্কুলের ছাত্রদের নিয়ে খেলায়, পড়ায় মেতে ওঠেন বৃদ্ধ।
একদিন ওই স্কুলের সামনে এসে থামল একটা জিপ। নেমে এলেন তিনজন ভদ্রলোক। বেসামরিক লোক। তার মধ্যে ‘ওপি’কে চিনতে পারলেন বৃদ্ধ কর্নেল। বলেন, আরে এস এস। তুমি কী মনে করে? কই বন্দুক আনোনি তো?
