.
০৭.
তৃতীয় পরিদর্শন যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে পশ্চিমপ্রান্তে। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানকার সর্বময় কর্তা ই. ও. লরেন্স (1901-1958)। তিনিও নোবেল-লরিয়েট (1939)। দীর্ঘদেহী, প্ল্যাটিনাম-ব্লন্ড চুল, অথচ মুখখানা ছেলেমানুষের মতো অপাপবিদ্ধ। প্রফেসর লরেন্স গাড়ি নিয়ে নিজেই এসেছিলেন সানফ্রান্সিস্কো এয়ারোড্রামে। গ্রোভস আত্মপরিচয় দিতে সহৃদয় করমর্দন করে বললেন, জেনারেল, আমি শুনেছি ইতিমধ্যে আপনি কলোম্বিয়া আর শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে এসেছেন। এখানে আমরা অনেকটা এগিয়ে আছি। চলুন, আমরা সরাসরি রেডিয়েশান হিল-এ যাব–মানে আমাদের ল্যাবরেটারিতে।
দীর্ঘ পথশ্রমে গ্রোভস্ ছিলেন ক্লান্ত। কিন্তু তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন তিনি। শিকাগো এবং নিউ ইয়র্কের অবস্থা দেখে হতাশ হয়েছেন–এখানে লরেন্স বলছেন, কাজ অনেকটা এগিয়ে আছে। বেশ, দেখাই যাক।
লরেন্স নিজেই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন ওঁকে। গ্রোভস তার যুদ্ধ পরবর্তী স্মৃতিচারণে বলেছেন, “যুদ্ধ চলাকালে আমার জীবনে সবচেয়ে লোমহর্ষক কটি মুহূর্ত ছিল সানফ্রান্সিস্কো থেকে রেডিয়েশান হিল-এ আসা। মনে হল, আমি বুঝি মোটর রেসিং-এর প্রতিযোগী। নক্ষত্ৰবেগে গাড়ি চালালেন লরেন্স, কোনো ট্রাফিক-রু না মেনে। স্থানীয় লোকেরা বোধহয় গাড়িটাকে চেনে, পুলিস-পুঙ্গবেরাও এই পাগলা নোবেল-লরিয়েট ড্রাইভারের গাড়ির নম্বর-প্লেটের সঙ্গে পরিচিত। না হলে এই দশ মিনিট ড্রাইভিং-এ দশটা নোটবুকে ওঁর গাড়ির নম্বর উঠে যাবার কথা।
“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ–আমরা আধঘণ্টার পথ দশমিনিটে পাড়ি দিয়ে অক্ষত শরীরে এসে উপস্থিত হলাম গন্তব্যস্থলে। প্রফেসর লরেন্স সুইচ-অফ করে বলেন, আসুন।
“আমি বলি, একটু অপেক্ষা করুন প্রফেসর। নোটবইতে একটা কথা লিখে রাখি।
“গাড়ি থেকে নামবার আগেই নোটবইতে লিখে রাখলাম–আর্নেস্ট লরেন্স-এর গাড়ির জন্য একটি সরকারি ড্রাইভার নিযুক্ত করতে হবে। লরেন্সকে স্টিয়ারিঙে বসতে দেওয়া হবে না। হেড-কোয়াটার্সে পোঁছে এটাই হবে আমার প্রথম ডিটেশান। সামরিক আদেশ।”
লরেন্স ওঁকে বিচিত্রদর্শন একটি যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এটা তার নিজস্ব আবিষ্কার। সদ্য আবিষ্কৃত। নাম হচ্ছে ক্যালুট্রন। ক্যালু” হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার স্মৃতিবাহী, আর “ট্রন” সাইক্লোট্রন যন্ত্রের শেষাংশ। গ্রোভস সবিস্ময়ে প্রশ্ন করেন, এতে কী হয়?
এক গাল হাসলেন লরেন্স। সে হাসিতেই যেন জবাব-অপুত্রের পুত্র হয়, নির্ধনের ধন! ইহলোকে সুখি, অন্তে গোলোকে গমন!
-বলছি শুনুন। আপনি জানেন–আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইউ-238 থেকে ইউ-235কে বিচ্ছিন্ন করা। কলোম্বিয়াতে ওঁরা সেটা করতে চাইছেন ছ্যাঁদাওয়ালা টিউবের মধ্য দিয়ে গ্যাসীয় অবস্থায় ইউরেনিয়ামকে পাঠিয়ে। আমার এটা হচ্ছে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পদ্ধতি। এই ক্যালুট্রন যন্ত্রে আছে একটা প্রচণ্ড শক্তিশালী ম্যাগনেটিক ফিল্ড। গ্যাসীয় অবস্থায় ইউরেনিয়াম যখন এই যন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাবে তখন চৌম্বক-আকর্ষণে হালকা ইউ-235 অপেক্ষাকৃত ভারী ইউ-238 থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ব্যাপারটা কেমন জানেন? মনে করুন একই ফোর্সে দুটি পাথরকে ছোঁড়া হল–একটা ভারী একটা হালকা। তাহলে কী হবে? হালকা পাথরটা এগিয়ে যাবে, নয় কি?
সহজ ব্যাখ্যা। গ্রোভস্ প্রশ্ন করেন, কতক্ষণ চালানো হবে যন্ত্রটা?
–অন্তত চব্বিশ ঘন্টা।
–চালিয়ে দেখেছেন? কত পার্সেন্ট সেপারেশন হচ্ছে?
–না জেনারেল। যন্ত্রটা মিনিট পনেরোর বেশি চালানো যাচ্ছে না বর্তমানে। যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিচ্ছে তার মধ্যে। গরম হয়ে যাচ্ছে।
-বলেন কী? তাহলে এতদিনে কতটুকু ইউ-235 পেয়েছেন?
-না, না, এখনও আমরা একটুও ইউ-235 পাইনি। তবে পাব, শীঘ্রই পাব। কী বলেন?
***
সব কয়টি কেন্দ্র ঘুরে গ্রোভস্ এসে দেখা করলেন যুদ্ধসচিবের সঙ্গে।
বললেন, স্যার, একজন বৈজ্ঞানিক সহকারী আমার চাই। পদার্থবিজ্ঞানী। বে-সামরিক সহকারী।
বৃদ্ধ স্টিমসন বলেন, নিশ্চয়। আপনি তাকে নির্বাচন করুন। তেমন কোনো লোক জানা আছে আপনার?
–আছে স্যার। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক রবার্ট জে. ওপেনহাইমার।
–তাকে বাজিয়ে দেখুন। যাচাই করুন। ক্লিয়ারেন্সের ব্যবস্থা করুন।
ধন্যবাদ স্যার।
***
যুদ্ধ-সচিব যেমন এককথায় মেনে নিয়েছিলেন, তার অধীনস্থ চিফ অফ স্টাফ জেনারেল মার্শাল কিন্তু তেমনিভাবে এ নির্বাচন মেনে নিলেন না। কে এই রবার্ট জে. ওপেনহাইমার, যাকে জেনারেল গ্রোভসস্ এতবড় সম্মানজনক পদে বসাতে চাইছেন? সে কি নোবেল-লরিয়েট? সে কি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোনো অসামান্য দানের অধিকারী? বয়সে, পদমর্যাদায় সে কি ওই এক ডজন নোবেল-প্রাইজ-পাওয়া ধুরন্ধর বৈজ্ঞানিককে নিয়ে কারবার করতে পারবে? ওই অজ্ঞাতনামা ওপেনহাইমারের বায়োডাটার’ ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে এইসব প্রশ্নের জবাব খুঁজেছিলেন জেনারেল মার্শাল। দুর্ভাগ্যবশত প্রতিটি প্রশ্নের জবাবই হচ্ছিল নেতিবাচক! বায়োডাটা অনুযায়ী।
উনিশ শ চার সালে নিউ ইয়র্কে জন্ম। পিতা জার্মানি থেকে এসেছিলেন সতেরো বছর বয়সে। একজন সাফল্যমণ্ডিত বিজনেসম্যান। মায়ের জন্ম বালটিমোরে। বিবাহের আগে ছিলেন আর্টিস্ট এবং আর্ট-শিক্ষিকা। ওপেনহাইমার 1922-এ হাভার্ড কলেজে ভর্তি হয়, তিন বছর পরে ডিগ্রি পায়। চলে যায় কেমব্রিজে। পরে জার্মানির গোটিনজেন-এ। 1927-এ ডকটরেট পায় সেখান থেকে। তারপর হাভার্ড-এ বছরখানেক ফেলোশিপ পায়, পরে লিডেন ও জুরিখে চাকরি করে। এর পরে ফিরে আসে আমেরিকায়। গত বারো-তেরো বছর সে বার্কলেতে অধ্যাপনায় নিযুক্ত আছে।
