গ্রোভস্ কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করেন, অ্যালবামটা নিয়ে এসেছেন তো এখানে?
ফ্রাই ফ্রাঙ্ক উঁকি মেরে দেখলেন, প্রফেসর ফ্রাঙ্ক প্যান্ট্রিতে কয়েকপাত্র মার্টিনি বানাতে ব্যস্ত। চুপি চুপি বলেন, প্রফেসর অবসর পেলেই সেটার পাতা ওল্টান। ওই অ্যালবামটাই ওঁর প্রাণ। উনি গোটিনজেনকে যতটা ভালোবেসেছিলেন ততটা আমাকেও বাসেননি। গোটিনজেন ছিল আমার সতীন।
দুজনেই হেসে ওঠেন।
শ্ৰীমতী ফ্রাঙ্ক বলেন, অথচ মজা কী জানেন জেনারেল? প্রফেসর এই অ্যালবামটা নিয়ে এলেন তার পোর্টম্যান্টোতে–রেখে এলেন নোবেল প্রাইজের সোনার মেডেলটা!
-সে কী! ওটার আর কতটুকু ওজন?
-না, ওজনের জন্য নয়। ওঁর যুক্তি অন্য রকম। বললেন, মেডেলটা তো একা জেমস ফ্রাঙ্ক পায়নি–পেয়েছে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়! ওটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটারিতেই থাকবে। ল্যাবরেটারিতেই রেখে এসেছেন সেটাকে!
গ্রোভস্ চমকে ওঠেন। বলেন, সর্বনাশ! গেস্টাপো সেটা খুঁজে পেলে গলিয়ে ফেলবে! সোনাটা ওয়্যার-ফান্ডে জমা দেবে!
ততক্ষণে ফিরে এসেছেন প্রফেসর ফ্রাঙ্ক কয়েকপাত্র পানীয় ট্রেতে করে নিয়ে। বলেন, আপনি ব্যস্ত হবেন না জেনারেল। ওরা সেটা খুঁজে পাবে না।
-মাটির নীচে পুঁতে রেখে এসেছেন?
–না। কারণ তাহলে ওরা খুঁজে পেত। আমি সেটা ফেলে রেখে এসেছি একটা নাইট্রিক অ্যাসিডের বোতলে! যুদ্ধের পরে ঠিক সেটা খুঁজে পাওয়া যাবে, দেখবেন আপনি।* [* প্রফেসর ফ্রাঙ্কের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল। ফ্রাঙ্কই একমাত্র নোবেল-লরিয়েট যিনি এক নোবেল প্রাইজ দুবার পেয়েছেন। যুদ্ধান্তে নাইট্রিক-অ্যাসিডের বোতলের তলদেশ থেকে যখন সোনার মেডেলটি উদ্ধার করা গেলো তখন দেখা গেল তার লেখা কিছু কিছু ক্ষয়ে গেছে। খবরটা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। তাতে সুইডেনের আকাঁদেমি ফ্রাঙ্কের কাছ থেকে মেডেলটি ফেরত নেয়-নূতন করে ছাপ দিয়ে পরের বছর উৎসবের সময় সেই মেডেলটি ফ্রাঙ্ককে দ্বিতীয়বার উপহার দেওয়া হয়।]
গ্রোভস বলেন, সে যাই হোক, আপনি জার্মানি থেকে বিদায়পর্বের গল্প বলেছিলেন–
শ্ৰীমতী ফ্রাঙ্ক তার গল্পের সূত্র তুলে নেন–
ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিল কয়েকজন। অনাড়ম্বর বিদায়পর্ব। গোটিনজেন-এর মধ্যমণি চিরদিনের মতো বিদায় নিচ্ছেন। তাকে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছেন মাত্র জনা-পাঁচেক সহকর্মী ও ছাত্র। প্রফেসর হিলবার্ট, হেইসেনবের্গ, ক্যারিও প্রভৃতি। ফ্রাঙ্ক সস্ত্রীক গাড়িতে উঠে বসলেন। গার্ড হুইসিল দিল। সবুজ পতাকা নাড়াল। কিন্তু কী-এক যান্ত্রিক গণ্ডগোলে ইঞ্জিনটা চালু হল না। ঠিক সেই মুহূর্তেই স্টেশনের একজন কুলি এমন একটা কথা বলে বসল যা ফ্রাই ফ্রাঙ্ক জীবনে ভুলবেন না। লোকটি এগিয়ে এসে অধ্যাপক ফ্রাঙ্ককে বললে, হের প্রফেসর! একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? হিটলারের ওই মাথামোটা অফিসারগুলো যে সহজ হিসাবটা বুঝল না, সেটা ওই জড় ইঞ্জিনটাও বুঝে ফেলেছে! সে প্রতিবাদ জানাচ্ছে! আপনাকে নিয়ে যেতে সে রাজি নয়!
গল্পগুজবে কথাবার্তায় প্রায় মধ্যরাত্রি হয়ে গেল। গ্রোভস মনে মনে ভাবছিলেন অন্য একটি কথা। অধ্যাপক কেন তখন বললেন–তাঁর সাফল্যের পথে প্রধান বাধা হচ্ছেন ফ্রাই ফ্রাঙ্ক। এমন অমায়িক সুন্দরী সপ্রতিভ স্ত্রীর বিরুদ্ধে কী তার অভিযোগ? বুঝে উঠতে পারলেন না সেটা। যাই হোক, মধ্যরাত্রে গ্রোভস্ বিদায় নিয়ে উঠে পড়েন। ওঁরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন অতিথিকে গাড়িতে তুলে দিতে। বিদায় বেলায় গ্রোভস্ গৃহস্বামীকে বললেন, আপনাদের আতিথেয়তার কথা জীবনে ভুলব না আমি!
কোথাও কিছু নেই ধক্ করে জ্বলে উঠল শ্রীযুক্তা ফ্রাঙ্কের নীল চোখ দুটো। যেন অপমানকর কোনো উক্তি করেছেন গ্রোভস। মুহূর্তে বদলে গেলেন তিনি। বললেন, কী বললেন? কোনোদিন ভুলবেন না? কোনো দিন নয়?
গ্রোভস স্তম্ভিত! কী হল হঠাৎ! এমন বদলে গেলেন কেন উনি?
অধ্যাপক ফ্রাঙ্ক অত্যন্ত সঙ্কুচিত হয়ে বললেন, প্লিজ ডার্লিং! জেনারেল আমাদের অতিথি!
ঘুরে দাঁড়ালেন মহিলা। স্বামীর মুখোমুখি। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, সো হোয়াট? অতিথি-সৎকার তো আমি চুটিয়ে করেছি জেম। ত্রুটি রাখিনি কিছু। এবার আমাকে ব্যাপারটা সমঝিয়ে নিতে দাও।
হতাশ হয়ে শ্রাগ করলেন অধ্যাপক।
গৃহস্বামিনী আবার ঘুরে দাঁড়ালেন গ্রোভস-এর দিকে। মুখোমুখি। অসমাপ্ত বাক্যটার জের টেনে পুনরায় বলেন, কী বলছিলেন? কোনো দিন ভুলবেন না? আমার শ্বশুরবাড়ি হ্যান্সবুর্গ অথবা আমার বাপের বাড়ি ব্যাভেরিয়ায় যেদিন ওই অ্যাটম-বোমটি নিক্ষেপ করার আদেশ জারি করবেন সেদিনও নয়? আমার স্বামী সাফল্যমণ্ডিত হওয়া মাত্রই তো সে আদেশ জারি করবেন আপনি, হের জেনারেল। তাই নয়?
গ্রোভস-এর মাথা নীচু হয়ে গেল। মাটিতে একেবারে মিশে যেতে ইচ্ছে হল তার। ভুল। মারাত্মক ভ্রান্তি। এতক্ষণ ওঁর খেয়াল হয়নি–ওঁরা দুজন জার্মান। জার্মানিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার ব্রত নিয়েই তিনি আজ মানহাটান প্রকল্পের সর্বময় কর্তা। নোবেল-লরিয়েট জেমস্ ফ্রাঙ্ক মাতৃভূমিকে শ্মশানে রূপান্তরিত করবার সংকল্প নিয়েই প্রাণপাত করছেন। তাই তার সাফল্যের পথে আজ সবচেয়ে বড় বাধা–ফ্রাই ফ্রাঙ্ক!
হে ঈশ্বর! প্রথম পরমাণু-বোমার বিস্ফোরণ যেন অন্তত ওই ব্যাভেরিয়াতে না হয়!
