ফ্রাঙ্কের কথা আগেই বলেছি। সহকর্মীদের অপমানে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে দেশত্যাগী হয়েছিলেন ফ্রাঙ্ক। আভিজাত্য ছিল তার রক্তে।
বাকি রইল শিকাগো-গ্রুপের কর্তা আর্থার কম্পটনের পরিচয়। ওঁর সহকর্মীরা ঠাট্টা করে বলত, কম্পটন শিকাগো-গ্রুপের প্রকৃত লিডার নন,-ডেপুটি লিডার। মূল নিয়ামক হচ্ছেন তার গিন্নিবেটি কম্পটন। নোবেল-লরিয়েট প্রৌঢ় কম্পটন হাসতেন সেকথা শুনে। কারণ ছিল! তাকে যখন শিকাগো-গ্রুপের কর্তৃত্ব দেবার প্রস্তাব হল কম্পটন সরাসরি বড়কর্তাদের বলেছিলেন, আমি এক শর্তে এ পদ গ্রহণ করতে রাজি আছি।
-কী শর্ত বলুন?
–আমার স্ত্রীকেও ক্লিয়ারেন্স দিতে হবে। পদাধিকারবলে আমি যেসব গুপ্ত কথা জানব তা আমার স্ত্রীকেও জানাতে পারি আমি। পদাধিকারবলে আমি যেসব গোপন স্থানে যাব, আমার স্ত্রীরও সেখানে যাবার অধিকার থাকবে।
এ অদ্ভূত অনুরোধে অবাক হয়েছিলেন কর্তৃপক্ষ। তবু মেনে নিয়েছিলেন তারা। বেটি কম্পটন শিকাগো ল্যাবরেটারির নানান কাজ করতেন। সবাই তার আদেশ মেনে চলত। সর্বজনশ্রদ্ধেয়া কর্ত্রীই ছিলেন তিনি শিকাগো বীক্ষণাগারে।
***
গ্রোভস পরিদর্শনে আসায় ওঁরা তাঁকে নিয়ে বসালেন লেকচার হলে। গ্রোভস প্রশ্ন করলেন, একটা পরমাণু বোমার জন্য কতটা প্লুটোনিয়াম দরকার?
ফ্রাঙ্ক বললেন, সেটা নির্ভর করছে আপনি কত বড় বোমা চান তার ওপর।
–ধরুন দশ হাজার টন TNT-বোমার বিস্ফোরণের উপযুক্ত পারমাণবিক বোমা।
তৎক্ষণাৎ শুরু হয়ে গেল যোগ-বিয়োগ-ইনটিগ্র্যাল ক্যালকুলাসের অঙ্ক। ব্ল্যাকবোর্ডে পড়তে শুরু করল হিজিবিজি লেখা। হাতির শুড়ের মতো চিহ্ন সব। আলফা-বিটা-থিটা-এপসাইলনের বন্যায় ভেসে গেলো কালো বোর্ড। সবাই তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে। একমাত্র ব্যতিক্রম এনরিকো ফের্মি। তিনি আপন মনে স্লাইড রুল ঘষছেন। হঠাৎ গ্রোভস-এর নজর হল পঞ্চম ধাপ থেকে ষষ্ঠ ধাপে আসবার সময় একটা ভুল হয়েছে। বুঝতে পারলেন না ব্যাপারটা। তিন-তিনজন নোবেল-লরিয়েট বিজ্ঞানী উপস্থিত রয়েছেন! আছেন ৎজিলাৰ্ড, উইগনারের মতো বিচক্ষণ বিজ্ঞানী। ওঁর মনে হল এটা কি ওঁরা ইচ্ছা করে কাঁদ। পেতেছেন? মানহাটান প্রকল্পের সর্বময় কর্তা কতটা অঙ্ক বোঝেন তাই কি বুঝে নিতে চান তারা। তা সে যাই হোক, হঠাৎ উঠে দাঁড়ান তিনি। বলেন, মাপ করবেন, ওই ষষ্ঠ ধাপটা আমি বুঝতে পারছি না। ওর আগের ধাপের 10^5 পরের ধাপে হঠাৎ 10^6 হল কেমন করে?
গণিতজ্ঞ তৎক্ষণাৎ বলেন, ধন্যবাদ। ওটা নিছক ভুলই।
ভুলটা সংশোধন করেন তিনি। গ্রোভস আত্মবিশ্বাস ফিরে পান।
শেষ ফলাফলটা যখন বলা হয় তখন গ্রোভস জানতে চাইলেন–আপনাদের এই সংখ্যা কত পার্সেন্ট শুদ্ধ? অর্থাৎ কতটা এদিক-ওদিক হতে পারে?
কম্পটন তৎক্ষণাৎ বলেন, ধরুন দশ পার্সেন্ট শুদ্ধ!
এমন আজব কথা জীবনে শোনেনি গ্রোভ! বললেন মাত্র দশ পার্সেন্ট! বলেন কি?
-হ্যাঁ। বর্তমানে এর চেয়ে নির্ভুল উত্তর অঙ্কশাস্ত্র মতে আর পাওয়া যাচ্ছে না।
গ্রোভস তখন ভাবছিলেন একটা নিমন্ত্রণ বাড়ির কথা। ক্যাটারারকে উনি বলছেন, আজ আমার বাড়ি কিছু লোক খাবে। খাবারের যোগাড় দিতে হবে আপনাকে। দেখবেন, খাবারে কম না পড়ে যেন। আর অপচয়ও না হয়।
ক্যাটারার জানতে চাইল, কতজন লোক খাবে স্যার?
–এই ধরুন জনা দশেক অথবা হাজারখানেক!
শতকরা দশভাগ নির্ভুল উত্তর। কারণ ‘দশ’ হচ্ছে একশর দশ-শতাংশ। নির্ভুল উত্তর, আবার ‘হাজার’-এর দশ-শতাংশ। নির্ভুল উত্তর হচ্ছে ‘একশ’! করো এবার আহারের আয়োজন!
***
শিকাগো ল্যাবরেটারি পরিদর্শন সেরে ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল গ্রোভসস আসছিলেন ফ্রাঙ্কের অ্যাপার্টমেন্টে। সেখানেই তার নৈশ-আহারের ব্যবস্থা। ফ্রাঙ্ক নৈশাহারে নিমন্ত্রণ করেছেন পরিদর্শককে। শহরের অপর প্রান্তে একটা নয়তলা বাড়ির একটি অ্যাপার্টমেন্টে তখন বাস করতেন সস্ত্রীক জে ফ্রাঙ্ক। গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ফ্রাঙ্ক নিজে, পাশে বসে আছেন গ্রোভস। কথাপ্রসঙ্গে ফ্রাঙ্ক বললেন, আমি বুঝতে পারছি আপনার অবস্থাটা! টেন পার্সেন্ট কারেক্ট উত্তর দিয়ে আপনি কী করবেন? কতটা প্লুটোনিয়াম লাগবে, কতটা ফিশনের মেটিরিয়াল লাগবে কিছুই বুঝতে পারছেন না। কিন্তু কী করা যাবে বলুন? আর কিছুদিন গবেষণা না করলে আমরা ওর চেয়ে কিছু কম-ভুল ফিগার দিতে পারছি না।
গ্রোভস সহানুভূতি দেখিয়ে বলেন, বুঝেছি। তবু হতাশ হবার কিছু নেই। আপনাদের সামনে কী পরিমাণ বাধা তা বুঝতে পারছি আমি।
ফ্রাঙ্ক হেসে বলেন, না! পারছেন না। আমার সাফল্যের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা কী জানেন?
–কী?
–ফ্রাউ ফ্রাঙ্ক।
অবাক হয়ে যান গ্রোভস। কী বলবেন ভেবে পান না। দাম্পত্য জীবনে ফ্রাঙ্ক কি অসুখী? তবু সে কথা এমন সদ্যপরিচিত লোকের কাছেই বা উনি বলবেন কেন? ফ্রাঙ্ক অভিজাত পরিবারের মানুষ, আত্মমর্যাদাজ্ঞান তার প্রখর। এমন বেমক্কা একটা পারিবারিক রহস্য কেন উঘাটিত করে বসলেন তিনি?
ডিনার টেবিলে সৌজন্য বজায় রেখে মামুলি প্রশ্ন করেন গ্রোভস। শ্রীযুক্তা ফ্রাঙ্ক অতি অমায়িক মহিলা। দেখলে বোঝা যায়, এককালে খুবই সুন্দরী ছিলেন। মার্জিত, অভিজাত এবং সদাহাস্যময়ী আদর্শ হোস্টেস। অতিথির আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি থাকল না। আলাপ হল নানা বিষয়ে পানাহারের ফাঁকে ফাঁকে। ফ্রাই ফ্রাঙ্ক তার ছেলেবেলায় গল্প শোনালেন। ব্যাভেরিয়ায় তার বাড়ি। ব্যাভেরিয়ার রাজপ্রাসাদে, সেখানকার চিত্রশালা, বিয়ার-পার্ক, চার্চ–কত স্মৃতিকথা। মার্কিন জীবনযাত্রার সঙ্গে জার্মান জীবনের তুলনা করলেন। ওঁদের জার্মানি থেকে চলে আসার প্রসঙ্গ উঠল। হিটলারের ইহুদি নির্যাতনের প্রতিবাদে প্রফেসর ফ্রাঙ্ক পদত্যাগ করে। দেশত্যাগী হলেন। কোনো সভাসমিতির আয়োজন নিষিদ্ধ ছিল। ওঁর এক জার্মান সহকারী এবং শিষ্য ক্যারিও খবর পেয়ে গোপনে দেখা করতে এল। অধ্যাপকের হাতে তুলে দিল একটা প্রকাণ্ড অ্যালবাম। ফটোগ্রাফির সখ ছিল ক্যারিওর। গোটিনজেন-এর অসংখ্য ছবি তুলেছে সে। সাজিয়েছিল ওই অ্যালবামে। প্রফেসর ফ্রাঙ্ক ইতস্তত করে বলেছিলেন, তোমার এত সাধের সংকলনটা আমাকে দিয়ে দেবে? অরুদ্ধ কণ্ঠে ক্যারিও বলেছিল, প্রফেসর, আমি যে খাঁটি আর্য! গোটা গোটিনজেনটাই তো রইল আমার ভাগ। তার ছায়াটুকুই তো শুধু আপনাকে দিচ্ছি।
