মজা হচ্ছে এই যে, এটা তখনই সম্ভব যখন মুক্ত নিউট্রনের আশেপাশে যথেষ্ট পরিমাণ ইউ-235 পরমাণু থাকবে। দুর্ভাগ্যক্রমে আকরিক ইউরেনিয়ামে প্রতিটি ইউ-235-এর জায়গায় দেড়শটি ইউ-238 থাকে। ফলে অধিকাংশ নিউট্রনই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। চিত্র 8-এ ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে। কালো কালো বলগুলি ইউ-235 সাদাগুলি ইউ-238। বাঁ-দিক থেকে আমরা তিনটি নিউট্রন বুলেট ছেড়েছি। ধরা যাক দু-নম্বর বুলেট ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি ইউ-235 চিত্র 8. নিউট্রন-বুলেট পরমাণুকে বিদ্ধও করল, তা থেকে দুটি নূতন নিউট্রনও বিমুক্ত হল। কিন্তু চেন-রিয়্যাকশান হওয়ার সম্ভাবনা কোথায়? চতুর্দিকেই যে ইউ-238।
[চিত্র 8. নিউট্রন-বুলেট]
ইউরে বললেন, সেজন্য আমরা এখানে আকরিক ইউরেনিয়াম থেকে ইউ-235–কে পৃথককরণ করছি। এমন অবস্থা করতে চাই যাতে নিউট্রন-বুলেটকে যে ভীড়ের দিকে ছোঁড়া হবে সেখানে শুধুমাত্র ইউ-235ই থাকবে। তাহলে চিত্র 7-এর মতো চেন-রিয়্যাকশান, অর্থাৎ চক্রবর্তন-পদ্ধতি, চালু হয়ে যাবে–দুই, চার, আট, ষোললা, বত্রিশ, চৌষট্টি ইত্যাদি-ইত্যাদি। অর্থাৎ পঁচিশ-তিরিশ ধাপ পরে কোটি কোটি পরমাণুর বিস্ফোরণ।
কীভাবে সেটা করতে চান?
–ইউরেনিয়াম থেকে উৎপন্ন ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড গ্যাসকে উত্তপ্ত করে একটা ফিলটার টিউব-এর ভেতর দিয়ে পাঠাতে হবে। ওই ফিলটার টিউবে থাকবে অসংখ্য অতিক্ষুদ্র ছিদ্র। তাহলে হালকা ইউ-235 পরমাণুগুলো ভারী ইউ-238 পরমাণু থেকে পৃথক হয়ে যাবে।
-বুঝলাম।
-আজ্ঞে না, বোঝেননি। প্রথমত ইউরেনিয়াম হচ্ছে সবচেয়ে ভারী ধাতু। তাকে তরল এবং শেষমেশ গ্যাসে রূপান্তরিত করাই এক ঝকমারি ব্যাপার। প্রচণ্ড উত্তাপ লাগে। দ্বিতীয়ত, গ্যাসীয় ইউরেনিয়াম অত্যন্ত করোসিভ; পাইপগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, ওই যে আমি বললাম, ‘অসংখ্য ছোটো ছোটো ছিদ্র’ ওটা তো অবৈজ্ঞানিক উক্তি। অসংখ্য’ শব্দটার অর্থ হচ্ছে কয়েক শত কোটি! এবং ছোটো ছোটো’ শব্দটার ব্যাখ্যা হচ্ছে প্রতিটি ছিদ্রের ব্যাস এক মিলিমিটারের দশ হাজার ভাগের একভাগ!
গ্রোভস, রুমাল দিয়ে মুখটা মুছলেন।
–আমার বক্তব্যটা শেষ হয়নি জেনারেল। ইউরেনিয়াম 238 অত্যন্ত দুর্লভ ও দুর্মূল্য পদার্থ। আর তা থেকে আমরা পরমাণু বোমা বানানোর উপযুক্ত ইউরেনিয়াম 235 পাচ্ছি 0.7 শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় দেড়শ গ্রামে এক গ্রাম।
গ্রোভস ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় হলেন।
***
পরবর্তী পরিদর্শন শিকাগোতে। এখানে ইউরেনিয়াম নয়, প্লুটোনিয়াম নিয়ে পরীক্ষা হচ্ছে। সর্বময় কর্তা আর্থার কম্পটন (1892-1962)। তিনি ছাড়া আরও দুজন নোবেল-লরিয়েট করমর্দন করলেন গ্রোদ্রে সঙ্গে। তারা হচ্ছেন ইটালিয়ন ফের্মি এবং জার্মান ফ্রাঙ্ক। দুজনেই ফ্যাসিস্ট আর নাৎসি রাজ্যের প্রাক্তন বাসিন্দা। ফের্মি এসেছেন পালিয়ে, ফ্রাঙ্ক বিতাড়িত হয়ে। গোটিনজেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এছাড়াও ওঁর সঙ্গে মিলিত হলেন উইগনার আর ৎজিলাৰ্ড–যাঁরা গিয়েছিলেন আইনস্টাইনের পত্র আহরণে।
এর ভিতর ইউজিন উইগনার (1902-1995) একটি অদ্ভুত চরিত্র। এঁর কথা আগে বিস্তারিত বলা হয়নি। এই প্রতিভাশালী হাঙ্গেরীয় পদার্থবিজ্ঞানীর সৌজন্য আর ভদ্রতা-জ্ঞান ছিল প্রবাদের মতো। মেজাজ খারাপ করা জিনিসটা যে কী, তা তিনি জানতেনই না। ৎজিলাৰ্ড তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন, উইগনারের সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠভাবে দীর্ঘদিন মিশেছি। এমন অমায়িক ভদ্র মানুষ আর হয় না। কখনও তাকে রাগতে দেখিনি, কখনও কাউকে গালাগাল করতে শুনিনি। না! ভুল বললাম। জীবনে একবার তাকে রাগতে দেখেছিলাম। সেবারে উনি আমাকে গাড়ি করে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছিলেন। উনি বসেছেন স্টিয়ারিঙে, আমি ওঁর পাশে। কোথাও কিছু নেই ‘ট্রাফিক-রুলস’ শিকেয় তুলে ওপাশ থেকে একটা গাড়ি হুড়মুড় করে এসে পড়ল আমাদের সামনে। উইগনার কোনক্রমে ব্রেক কষে দুর্ঘটনা এড়িয়ে ফেলেন। দুটো গাড়িই দাঁড়িয়ে পড়েছে। লক্ষ্য করে দেখি, ওপাশের গাড়িটার চালক মদে চুর হয়ে আছে। সেই একদিন উইগনারকে ক্ষেপে যেতে দেখেছিলাম। হঠাৎ চীৎকার করে উইগনার বললেন : “গো টু হেল–” পরমুহূর্তেই স্বভাববিনয়ী স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ছোট্ট করে যোগ করলেন “প্লিজ!”
শিকাগো গ্রুপের কর্তা ছিলেন কম্পটন; কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র হচ্ছেন এনরিকো ফের্মি। উনি কম কথার মানুষ। সব আলোচনাতেই দেখা যেত তিনি তার অভিমত জানাতেন সবার শেষে। আর অনিবার্যভাবে প্রমাণ হত–ফের্মির বক্তব্যই নির্ভুল। অথচ অত্যন্ত নিরভিমানী ব্যক্তি। আত্মপ্রশংসা যে তিনি করতেন না তা নয় কিন্তু তার ক্ষেত্র বিজ্ঞান নয়। নিজে যে একজন মস্ত সাঁতারু, মস্ত পর্বতারোহী অথবা গোয়েন্দা গল্পের আসল অপরাধীকে সবার আগে ধরে ফেলার পারদর্শিতা তার আছে একথা সাড়ম্বরে বলতেন। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ উঠলেই উনি সঙ্কুচিত হয়ে পড়তেন। বলতেন–এত সব জ্ঞানীগুণীরা আছেন, ওঁদের জিজ্ঞাসা করুন। ফের্মির একটি বিলাস ছিল কম্পুটারের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া। ওঁর ছোট্ট স্লাইড-রুল হাতে উনি কম্পুটারের সঙ্গে লড়াই করতেন। কখনও উনি জিততেন, কখনও কম্পুটার। মানসাঙ্কে এমনই অদ্ভুত প্রতিভা ছিল তার।
