***
1942 সালের সতেরোই সেপ্টেম্বর লেসলি গ্রোভসের জীবনে একটি স্মরণীয় দিন। সেদিনই সে বদলির অর্ডার পেলো। সাগরপারে যেতে হবে তাকে, আমেরিকার বাইরে। এই স্বপ্ন সে দেখে এসেছে আকৈশোর। গ্রোভস মিলিটারি স্কুল থেকে পাশ করে বের হয় 1918-তে। ঠিক সে বছরই যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেবার সৌভাগ্য হয়নি বেচারার। তারপর এই দীর্ঘ চব্বিশ বছর ধরে একটাও যুদ্ধ করার সুযোগ সে পায়নি। অথচ ধাপে ধাপে ধীরে ধীরে উঠেছে ওপরে–এখন সে কর্নেল। এবারকার বিশ্বযুদ্ধে তার দায়িত্ব ছিল ‘মিলিটারি এঞ্জিনিয়ার যোদ্ধা!’ এতদিন পরে কর্নেল গ্রোভস বদলির অর্ডার পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বন্ধুদের দেখালো অর্ডারটা–এবার সে সাগরপারে সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছে।

[চিত্র]
ধড়াচূড়া সেঁটে গ্রোভস এসে হাজির হল তার বড়কর্তার ঘরে। মেজর-জেনারেল সমারডেল ওকে সমাদর করে বসালেন। বললেন, অর্ডার পেয়েছ?
পেয়েছি জেনারেল, ধন্যবাদ। কখন আমি আমার বর্তমান কাজের দায়িত্ব। বুঝিয়ে দেব?
–এখনই। তোমার সাবস্টিট্যুট তৈরি আছে।
একটু ইতস্তত করে গ্রোভস বলে, কোন্ রণাঙ্গনে যেতে হবে আমাকে?
রণাঙ্গন? না না যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হবে না তোমাকে আদৌ! তোমার কাজ এই ওয়াশিংটনেই!
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ে গ্রোভস। নীরবে তার বদলির অর্ডারখানা বাড়িয়ে ধরে। সেটা ‘ওভারসিজ অ্যাসাইনমেন্ট’–সাগরপারে যাবার নির্দেশবহ।
-হ্যাঁ, হ্যাঁ জানি। আমরা চেয়েছিলাম, তোমার সহকর্মীরা ভুল খবরই পাক। মানে, তুমি যেন বিদেশ যাচ্ছ। আসলে তোমাকে আমরা নিয়োগ করছি মানহাটান প্রকল্পের সর্বময় কর্তারূপে। কাজটা তোমার মতো এঞ্জিনিয়ার-যোদ্ধার উপযুক্ত।
ধরা গলায় গ্রোভস বলে, জেনারেল। আমি কোনো এঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করিনি। এই ‘এঞ্জিনিয়ার যোদ্ধার’ খেতাব থেকে এবার আমি মুক্তি পেতে চাই। আপনি দয়া করে
জেনারেল ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলেন, কর্নেল, যে কাজটা তোমাকে দেওয়া হচ্ছে সেটা এ বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আইসেনহাওয়ার, প্যাটন অথবা মন্টির ওপর যতটা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তার চেয়ে একচুলও কম নয়। দ্বিতীয়ত, এজন্য তোমাকে নির্বাচন করেছেন যুদ্ধসচিব হেনরি স্টিমসন নিজে–অন্তত দশজন সম্ভাব্য ক্যান্ডিডেটের ভিতর থেকে বেছে নিয়ে। শেষ কথা, প্রেসিডেন্ট স্বয়ং তোমার নিয়োগপত্রে সই দিয়েছেন। কিছু বলবে?
বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইল লেসলি গ্রোভস।
***
মানহাটান প্রকল্পের সর্বময় কর্তৃত্ব নিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের মতো সব কয়টি কেন্দ্র একবার করে ঘুরে এল গ্রোভস। সব কয়টি কেন্দ্র সরেজমিনে দেখল। প্রতিটি কেন্দ্রের উচ্চপদস্থ বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গে আলাপ হল, পরিচয় হল। অবাক হয়ে গেল সে।
সর্বপ্রথমেই সে এল নিউইয়র্কে, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা কাঁটাতারে ঘেরা অংশ। এখানে নাকি গ্যাসীয়-ডিফিউশন পদ্ধতিতে ইউরেনিয়ামকে পৃথককরণ করার প্রচেষ্টা হচ্ছে। ইউরেনিয়াম-ওর’ থেকে ইউ-235 নিষ্কাশনের প্রচেষ্টা। বাইরে সাইনবোর্ড টাঙানো আছে, ‘এস. এ. এম.’ অর্থাৎ Substitute Alloy Materials। লোকচক্ষুকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এ অদ্ভুত নাম। ল্যাবরেটারির কর্ণধার ডক্টর হারল্ড ইউরে(1893-1981)–নোবেল লরিয়েট রসায়নবিজ্ঞানী। কিন্তু দৈনিক কাজকর্ম দেখাশোনা করেন ড. ড্যানিং, পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের উৎসাহী বৈজ্ঞানিক। ওঁরা দুজনে গ্রোকে নিয়ে গ্যাসীয় ডিফিউশন পদ্ধতি দেখাবার জন্য বার হলেন। কিন্তু গ্রোভস বাধা দিয়ে বললে, ডক্টর ইউরে, ল্যাবরেটারি পরিদর্শনের আগে দয়া করে আমাকে বুঝিয়ে দিন গ্যাসীয় ডিফিউশন পদ্ধতিটাই বা কী, আর কেন ওটা করতে চাইছেন।
ডক্টর ইউরে বলেন, তার আগে আপনি বলুন–পারমাণবিক-বোমা জিনিসটা কীভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে সেটা কি আপনি বুঝেছেন? জানেন?
-ভালোভাবে নয়। মূল তত্ত্বটা আমাকে দয়া করে বলুন।
ডক্টর ইউরে যা বললেন তার সংক্ষিপ্তসার এইরকম—
ইটালিতে ফের্মি এবং জার্মানিতে অটো হান ইতিপূর্বেই ইউরেনিয়াম পরমাণুর অন্তর বিদীর্ণ করেছেন। তাতে ইউরেনিয়াম পরমাণু দু-টুকরো হয়ে রূপান্তরিত হয়েছে ক্রিপটন আর বেরিয়ামে। পারমাণবিক শক্তিও জন্ম নিয়েছে–কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য। তা হোক, ওই সঙ্গে আমরা দেখেছি নূতন দু-তিনটি নিউট্রন বিমুক্ত হয়েছে। সেই দু-তিনটি নিউট্রন তীব্রবেগে ছুটে গেছে এবং অন্যান্য পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে শেষ পর্যন্ত থেমে গেছে। এখন যদি এমন ব্যবস্থা করা যায় যে, ওই দু-তিনটি নবলব্ধ নিউট্রন আর দু-একটি পরমাণুর অন্তর বিদীর্ণ করবে তবে আমরা আবার কিছু শক্তি পাব এবং পাব দুই-দুগুণে চারটে নতুন নিউট্রন। সে দুটি আবার চার-দুগুণে আটটা, তা থেকে আট-দুগুণে ষোলোটা নিউট্রন মুক্ত হতে পারে। এইভাবে বিশ-ধাপ চললেই লক্ষ লক্ষ নিউট্রন মুক্ত হবে, পঁচিশ ধাপে কোটি কোটি পরমাণু বিদীর্ণ হয়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটাবে! ব্যাপারটার চিত্রকল্প হবে এই রকম (চিত্র 7)। লক্ষণীয়, চিত্র 6-তে আমরা দেখিয়েছি, ইউরেনিয়াম পরমাণু বিদীর্ণ হওয়ায় তিনটি নিউট্রন ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল। চিত্র 7-এ তার যে-কোনো দুটির চেন-রিয়্যাকশন দেখানো হয়েছে। তিনটিই যদি কার্যকরী হয় তাহলে অঙ্কশাস্ত্র মতে 3-9-27-81….এভাবেও চেন রিয়্যাকশন হতে পারে।]
[চিত্র 7. অ্যাটম-বোমা তৈরির পঞ্চম ধাপ—চেন-রিয়্যাকশন]