আর গোপনীয়তা? রুজভেল্ট মারা যাবার পর হ্যারি ট্রুম্যান যখন এসে বসলেন তার শূন্য সিংহাসনে-চোদ্দই এপ্রিল 1945-এ-তখন তিনিও জানতেন না এতবড় মানহাটান প্রজেক্টের কথা। চেয়ারে বসার পরে তিনি সেটা শুনেছিলেন। তার চেয়েও মজার কথা হচ্ছে সেনেটের হ্যারি ট্রুম্যান 1940 সালে একটি কমিটির চেয়ারম্যানরূপে নির্বাচিত হন– ”কমিটি টু ইনভেস্টিগেট দ্য ন্যাশনাল ডিফেন্স প্রোগ্রাম”। যুদ্ধপ্রচেষ্টায় যে সরকারি অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে তার যাথার্থ্য নির্ণয় করে সেনেটকে জানানোর দায়িত্ব এই অনুসন্ধান কমিটির। তার চেয়ারম্যানরূপে কাজ করতে গিয়ে ট্রুম্যান জানতে পারলেন–কী একটা মানহাটান প্রজেক্টে কোটি কোটি ডলার ব্যয়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পে দৈনিক নাকি এক লক্ষ লোক খাটছে-ট্রেনে আর লরিতে লক্ষ লক্ষ টন কাঁচামাল ওই কারখানায় ঢুকছে, অথচ এ পর্যন্ত একটা ছোট্ট প্যাকেটও ‘ফিনিশড গুড় হিসাবে বার হয়ে আসেনি। ট্রুম্যান একটা প্রকাণ্ড কেলেঙ্কারী হাতেনাতে ধরবেন বলে ওই প্রকল্প সরেজমিনে দেখবার জন্য প্রস্তুত হলেন। খবর পেয়ে যুদ্ধসচিব বৃদ্ধ স্টিমসন সেনেটর হ্যারি ট্রুম্যানকে ফোন করলেন, বললেন, সেনেটর, আপনাকে একটি ব্যক্তিগত অনুরোধ জানাতে এসেছি। আপনি মানহাটান প্রজেক্ট সম্বন্ধে কোনো অনুসন্ধান করতে যাবেন না।
বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন সেনেটর হ্যারি ট্রুম্যান। বলেছিলেন, কেন মিস্টার সেক্রেটারি?
-কেন, তাও আমি বলতে পারব না। শুধু জানতে পারি, পৃথিবীর ইতিহাসে মানহাটান-প্রজেক্ট সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে গোপন প্রকল্প। এর পাই-পয়সা খরচের জন্য আমি যুদ্ধশেষে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকব। আপনার অনুসন্ধান কার্য আমাদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দেবে।
প্রবীণ রাজনীতিক ওই সেক্রেটারি অফ ওয়ার-এর প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ছিল সেনেটর ট্রুম্যানের। তিনি তৎক্ষণাৎ অনুসন্ধানের আদেশ প্রত্যাহার করেছিলেন। তার পাঁচ বছর পরে ট্রুম্যান আমেরিকার প্রেসিডেন্টরূপে নির্বাচিত হন এবং তৎক্ষণাৎ তাকে আদ্যন্ত ব্যাপারটা খুলে বলেছিলেন যুগ্মসচিব হেনরি স্টিমসন! তার আগে নয়!
***
আর ব্যাপকতা? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে আট-দশটি বিভিন্ন কেন্দ্রে একযোগে চলছিল গবেষণা কার্য। কয়েক হাজার বৈজ্ঞানিক তাতে নিযুক্ত। 1942 সাল-ত বিজ্ঞানীরা পাঁচ-পাঁচটি বিকল্প পথে সমাধানের পথ খুঁজতে শুরু করেছেন। পাঁচটি পথের কোন্ পথ শেষ লক্ষ্যে পৌঁছাবে তা কেউ বলতে পারে না। তার ভিতর তিনটি পথ হচ্ছে ইউরেনিয়াম-বোমা তৈরি করবার প্রচেষ্টা, দুটি প্লুটোনিয়াম-বোমার।
বৈজ্ঞানিকেরা বলেছেন, ইউরেনিয়াম-বোমা তৈরির তিনটি বিকল্প পথ আছে। প্রথমত ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক উপায়ে। তার জন্য ভোলা হল দেশের দুই প্রান্তে দুই কেন্দ্র- বার্কলেতে এবং ওক-রিজে। দ্বিতীয় পথ–গ্যাসীয় ডিফুশন-মেথড। সে পরীক্ষাকার্য চালানো হল নিউইয়র্ক এবং ডেট্রয়েট-এ। তৃতীয় পথ হল–সেন্ট্রিফুজ-পদ্ধতি।
অনুরূপভাবে, প্লুটোনিয়াম-বোমা তৈরি হতে পারে দুটি পদ্ধতিতে-গ্রাফাইট রিয়্যাকটারে অথবা ভারী জল দিয়ে।
বস্তুত পাঁচটি অন্ধ গলিতেই তখন পথ হাড়াচ্ছেন বিশ্ববিশ্রুত বৈজ্ঞানিকরা। পাঁচটি বিকল্প-পদ্ধতিতেই কোটি কোটি ডলার খরচ হচ্ছিল! কোনো পথই ওঁরা ত্যাগ করতে পারছিলেন না। কোটি অন্ধ গলি এবং কোন্ পথে লক্ষ্যে পৌঁছানেনা যাবে কেউ তা জানে না!
এই ফাঁকে বলে রাখি–আমাদের কাহিনির বিশ্বাসঘাতক ডেক্সটারের কল্যাণে রাশিয়া ওই পাঁচমাথার মোড়ে বিব্রত হয়নি–সোজা এক পথে এগিয়ে গিয়েছিল। তাতে কোটি কোটি রুল বেঁচে গিয়েছিল রাশিয়ার।
***
ম্যানহাটান-প্রকল্পের এক-এক প্রান্তে যারা কাজ করেন, তারা অপর প্রান্তের খবর জানেন না। গোপনীয়তার প্রয়োজনে নিজ ল্যাবরেটারির বাইরের খবর কেউ পান না। শুধু তাই নয়–প্রত্যেকে শুধু নিজ নিজ পরীক্ষার ফলাফলটুকুই জানতে পারেন, তার বেশি নয়। এ ব্যবস্থায় গোপনীয়তা রক্ষা হয় বটে কিন্তু কাজ দ্রুত এগোয় না। যে পরীক্ষার ফল চূড়ান্তভাবে জেনে ফেলেছেন ওক-রিজের বিজ্ঞানীরা সেগুলিই হয়তো কষে বার করছেন বার্কলের অধ্যাপকেরা। কর্তৃপক্ষ স্থির করলেন–এভাবে চলবে না। সমগ্র ম্যানহাটান-প্রকল্পের একজন সর্বময় কর্তা চাই। নিঃসন্দেহে তিনি হবেন একজন সামরিক অফিসার। শুধু তাই নয়–চাই একজন প্রথম শ্রেণির অল্পবয়সী পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি প্রতিটি কেন্দ্রের সংবাদ সংগ্রহ করে ওই সর্বময় কর্তাকে জানাবেন। এক কেন্দ্রের খবর অপর কেন্দ্রের প্রয়োজনবোধে জানাবেন।
যুদ্ধসচিবের নিজের কাজ অফুরন্তযুদ্ধের কাজ। সারা পৃথিবীতে মার্কিন সৈন্য তখন যুদ্ধ করছে। তাই এই মানহাটান প্রকল্পের জন্য তিনি একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সেট-আপ তৈরি করে দিলেন। তৈরি হল একটি উপদেষ্টা পরিষদ। তার চারজন সভ্য। যুদ্ধসচিবের পক্ষে রইলেন চিফ-অফ স্টাফ জেনারেল জর্জ মার্শাল। এঁদের পরামর্শ অনুসারে কাজ করবেন ওই সর্বময় কর্তা জেনারেল লেসলি গ্রোভ। তার মিলিটারি সহকারী রইলেন কর্নেল মার্শাল ও কর্নেল নিক। ছক তৈরি হল।
এই দশটি কেন্দ্রে যেসব বিজ্ঞানী কাজ করে গেছেন তাদের মধ্যে মুষ্টিমেয়ই সব কয়টি কেন্দ্রের খবর রাখতেন। কিন্তু মূল ভূমিকা ছিল দুজনের সামরিক কর্তা জেনারেল গ্রোভসস্ এবং বেসামরিক ডক্টর ওপেনহাইমারের। এঁদের দুজনকে আর একটু কাছ থেকে দেখতে হবে আমাদের।
