“আমি ফিরে এলাম হোটেলে। স্নান করলাম। ঘড়িতে দেখলাম সাড়ে ছটা। হোয়াইট হাউসে টেলিফোন করলাম। ওঁর সেক্রেটারি জানালো ব্রেকফাস্ট টেবিলে প্রেসিডেন্ট আমার জন্যে সকাল সাতটায় অপেক্ষা করবেন। তৎক্ষণাৎ রওনা হয়ে। পড়লাম আমি।
“খানাকামরায় একাই বসেছিলেন প্রেসিডেন্ট। তার চাকা-দেওয়া চেয়ারে। আমাকে দেখেই বলেন, বসুন! ব্রেকফাস্ট এমনিতেই বেশি খাওয়া হয়েছে–তার ওপর আপনার গুরুপাক বক্তৃতাটা হজম হবে তো?
“উনি আমার সঙ্গে এমন রসিকতা করতেন মাঝে মাঝে। আমার মন কিন্তু সেদিন রসিকতার জন্য প্রস্তুত ছিল না! জবাবে আমি গম্ভীরভাবে বললাম, আমি আপনার বেশি সময় নেব না। যা বলবার তা প্রফেসর আইনস্টাইন বলেছেন। তার অনুষঙ্গ হিসাবে প্রায় দেড়শো বছর আগেকার (1805) একটা ছোটো গল্প আমার মনে পড়ে গিয়েছিল-গল্প নয়, সত্য ঘটনা। আমার মনে হল, সেটা আপনাকে বলে রাখা ভালো।
“প্রেসিডেন্ট পুনরায় ঠাট্টা করে ওঠেন, ও! বক্তৃতা নয়, গপ্পো! বলুন, বলুন, আমার প্রচুর সময় হাতে আছে।”
“আমি বলে চলি–নেপোলিয় বোনাপার্ট তখন গোটা ইউরোপের মালিক। বাকি আছে শুধু ইংল্যান্ড। ট্রাফালগার যুদ্ধের ঠিক আগের কথা। রবার্ট ফুলটন নামে একজন মার্কিন বৈজ্ঞানিক এসে দেখা করল বিশ্বজয়ী নেপোলিয়র সঙ্গে। নেপোলিয় তখন অত্যন্ত ব্যস্ত। ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে ইংল্যান্ড আক্রমণের যাবতীয় ব্যবস্থা করতে হচ্ছে তাকে। ওই বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। আড়াই মাস চেষ্টা করে শেষমেশ বৈজ্ঞানিক মাত্র কয়েক মিনিটের সময় পেলেন সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের। তার ভিতরে তিনি কোনোক্রমে বললেন, তিনি এমন এক ধরনের জাহাজ প্রস্তুত করতে পারেন, যা নাকি পালের হাওয়ায় চলে না, চলে বাষ্পের শক্তিতে! নেপোলিয় ওঁর কথা শুনে মনে মনে হেসেছিলেন। পাল-ছাড়া শুধু বাষ্পে জাহাজ চলতে পারে এমন আষাঢ়ে গল্পটা তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি। তবু সৌজন্যবোধে বলেছিলেন, আপনার পরিকল্পনাটা বেশ ইন্টারেস্টিং। আচ্ছা, ভেবে দেখব আমি!
“আমি গল্প শেষ করলাম। দেখি প্রেসিডেন্টের মুখটা থমথম করছে।”
“পুনরায় বলি, সেদিন যদি নেপোলিয় আর একটু দূরদর্শিতার পরিচয় দিতেন, আর একটু সম্মান দেখাতেন বৈজ্ঞানিকটিকে তাহলে পৃথিবীর ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হত!
“আরও তিন-চার মিনিট নির্বাক বসে রইলেন রুজভেল্ট। প্রস্তরমূর্তির মতো। গভীর চিন্তায় মগ্ন। তারপর তিনি একটি কাগজে কী লিখে খানা-কামরার আর্দালির হাতে দিলেন। লোকটা ভিতরে গেল এবং ফিরে এল একটি মদের বোতল নিয়ে। নেপোলিয়ঁর সমসাময়িক ফরাসি কনিয়াক। দীর্ঘদিন সেটা রাখা ছিল রুজভেল্টের সেলারে। কী জানি কেন হঠাৎ এই মুহূর্তটিকে ‘সেলিব্রেট করতে চাইলেন প্রেসিডেন্ট। দুশো বছরের পুরাতন মদ নিজে হাতে ঢাললেন দুটি পাত্রে। একটি বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে, অপরটি তুলে আমাকে ইঙ্গিত করলেন। আমার স্বাস্থ্যপান করে, পুরো পাঁচ মিনিট পরে নীরবতা ভেঙে রুজভেল্ট বললেন, ‘অ্যালেক্স? তুমি মোদ্দা যে কথাটা বলতে চাও তা তো এই : নাৎসিরা পরমাণুবোমায় আমাদের যেন উড়িয়ে না দেয়। কেমন তো?
“ঠিক তাই!”
“তৎক্ষণাৎ বেল বাজালেন প্রেসিডেন্ট। ডেকে পাঠালেন তার মিলিটারি অ্যাটাশে জেনারেল ‘পা’ ওয়াটসনকে। পরমুহূর্তে এসে উপস্থিত হলেন জেনারেল। সসম্মানে দাঁড়ালেন আদেশের অপেক্ষায়। আইনস্টাইনের কাছ থেকে পাওয়া চিঠির গোছা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে প্রেসিডেন্ট শুধু বললেন একটি বাক্য :
“–পা! দিস রিকোয়্যার্স অ্যাকশন!”
৪. কী ৫-৯
০৬.
পা! দিস রিকোয়্যার্স অ্যাকশন!
ব্যাস। আর কিছু নয়। ইমিডিয়েট নয়, এমার্জেন্সি নয়, টপ-প্রায়োরিটি নয়, এমনকি টপ-সিক্রেটও নয়। কোনো বিশেষণের ভার নেই আদেশটায়। সাদামাটা হুকুম : পা! এটার ব্যবস্থা হওয়া দরকার।
তা হল। ব্যবস্থা হল। বিশেষণ-বিমুক্ত সেই আদেশের ‘অ্যাকশন’টার জাত নির্ণয় করব আমরা। তার অর্থনৈতিক মূল্য, গোপনীয়তা এবং ব্যাপকতা। প্রথমটায় কাজ শুরু হল ছোটো করেই। সারা মার্কিন মুলুকে দশটি রিসার্চ গ্রুপ এ নিয়ে গোপন গবেষণা শুরু করলেন। প্রথম বছরে অর্থ বরাদ্দ করা হল মাত্র তিন লক্ষ ডলার। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেটা ব্যাপক আকার ধারণ করল। এক সময়ে বৈজ্ঞানিকের দল জানালেন, তামার চেয়ে রুপোর তারের বিদ্যুৎবাহী ক্ষমতা বেশি। তাদের কিছু রুপো চাই। টাকশালের আন্ডার-সেক্রেটারি ড্যানিয়েল বেল বললেন, বেশ, দেব। বলুন কতটা রুপো চাই?
মানহাটান প্রডাকশানের চিফ বললেন, ধরুন আপাতত পনেরো হাজার টন।
ড্যানিয়েল বেল আঁৎকে উঠে বলেন, টন! কী বলছেন মশাই। রুপোর ওজন কখনও টনে হয়? হয় আউন্সে!
মানহাটান চিফ লেসলি গ্রোভস্ জবাবে কিছু বলবার আগেই তার সহকারী বৈজ্ঞানিকটি বলেন, ঠিক আছে। তাই বলছি–ফাইভ পয়েন্ট ফোর ইন্টু টেন দু দ্য পাওয়ার এইট!’
ড্যানিয়েল বেল-এর মুখের নিম্নাংশ ঝুলে পড়ে। বলেন, তার মানে?
-পনেরো হাজার টন ইজুকালটু 5.4 x 10^8 আউন্স। আপনি আউন্সে জানতে চাইছিলেন তো? তাই বলছিলাম আর কি!
বেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, থাক স্যার, আর বিদ্যে জাহির করতে হবে না, ওই পনেরো হাজার টন রুপোই পাঠিয়ে দিচ্ছি।
