-তোর মাথায় গোর পোরা! ও ছবির মর্ম তুই কি বুঝবি? তুই একটা ক্যাডাভেরাস!
–দেখ চন্দ্রভান! গালাগাল দিয়ে লাভ নেই! সত্যি করে বল্ তো, তুই কোন্ প্রেরণায় ঐ ছবিখানা এঁকেছিলি? ঐ ন্যুডখানা?
–সে তুই বুঝবি না। ফিমেল ফিগার বলতে তোদের ধারণা সেই কালিদাসের মধ্যে ক্ষমা চকিত-হরিণী প্রেক্ষণা। রিয়ালিমকে তোরা সহ্য করতে পারিস না। মাতৃত্বের ভারে স্ত্রীলোকের জীবনে এমন পর্যায় আসে যখন মধ্যে ক্ষামা থাকা তার পক্ষে সম্ভবপর নয়; আর সেটাই তার জীবনের সার্থকতা! সেই মাতৃত্বের পরিপূর্ণ নগ্ন স্বরূপ কেউ কখনও আঁকতে সাহস পায়নি। আমি এঁকেছি! এ ছবির সৌন্দর্য দেখবার অন্য চোখ চাই
গগন বলে, –আমরা দৈনিক যা আহার করি, তার একটা বিরাট অংশ দেহকে ত্যাগ করতে হয়। সেটাও জীবনের একটা আবশ্যিক পর্যায়। যেহেতু সেটা, সত্য, তাই সে দৃশ্যও আর্টের বিষয়বস্তু হবে বোধকরি, তোর ধারণায়?
না, হবে না! কেন হবে না, তা বুঝতে হলে আর্ট কি তাই জানতে হবে। ধর একগুচ্ছ আঙুর—
–ধরব না। একগুচ্ছ আঙুর কেউ ধরতে বললে আমি সেটা মুখে পুরব প্রথমেই।
জানি! সেজন্যই বলি তুই শিল্পী নস–তুই পাষণ্ড!
-আমিও জানি। তুই ঐ আঙুরগুচ্ছের স্বাদ জিহ্বায় নিতে সাহস পাবি না। দূর থেকে সেটার স্টিল-লাইফ স্টাডি করবি। কিন্তু কিছুই হবে না। আঙুরের স্বাদ যে পায়নি, সে কোনদিন আঙুরের ঢলঢল তলিত আভা–যাকে বলে আঙুরের লাবণ্যযোজনা তা আঁকতে পারবে না!
আমি মানি না! চটকে ঘেঁতো না করলে আঙুরগুচ্ছের ছবি আঁকা যায় না, এ কোন কাজের কথাই নয়!
–তোমার কাছে আঙুর ফল টকই থেকে যাবে বৌঠান। ও তোর ছবিতে ফুটবে না। আবার বৌঠান! এই ডাকটাই ভিন্সেন্টের মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয়।
ভিন্সেন্টের ছবি আঁকা বন্ধ হয়ে গেল। মন দিতে পারে না। দিবারাত্র শুধু তর্কই করে চলে। গগনকে কোনও দিক থেকে আক্রমণ করতে পারে না। গগন তার প্যাকিং-কেস খোলেনি। তার আঁকা ছবি দেখায়নি ভিন্সেন্টকে। বন্ধুর সনির্বন্ধ অনুরোধ বারে বারে উপেক্ষা করে বলেছে-তার ছবি সে কাউকে দেখাবে না। গগনের ছবি বুঝবার মত মানুষ নাকি এখনও এ দুনিয়ায় জন্মায়নি। তার ছবি দেখানো হবে পঞ্চাশ বছর পরে। ততদিনে মানুষ ক্রমোন্নতি করে শিল্পীর সমতলে আসতে শিখবে! ভিন্সেন্ট রাগে ফুঁসতে থাকে। গগনের ছবি দেখে কোন সমালোচনা করবার অধিকারই পেল না ভিন্সেন্ট। তাছাড়া নিজের অতীত জীবন সম্বন্ধেও গগন অদ্ভুতভাবে নীরব। এতদিন কোথায় ছিল, কি করেছে কিছুই সে বন্ধুকে জানায়নি। সেদিক থেকে পাল্টা আক্রমণের সুযোগ ভিন্সেন্ট পেল না!
মোটকথা ভিন্সেন্টের স্বপ্ন সার্থক হল না। দু বন্ধু একসঙ্গে ছবি আঁকতে বসল না একদিনও। তারা একসঙ্গে বেড়ায়, ঘোরে, খায়-দায় আর দিবারাত্র তর্ক করে।..
শেষে একদিন ঘটনাচক্রে গগন একটু মুখ খুলল। অতীত জীবনের কিছুটা আভাস দিয়ে ফেলল অসতর্কভাবে। কাহিনীটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল চন্দ্রভান। ঘটনাটা ঘটল একটা চায়ের দোকানে। দু বন্ধু সন্ধ্যার দিকে রোজই বেড়াতে যায়। সেদিনও গিয়েছিল স্টেশনের দিকে। হঠাৎ কি খেয়াল হল দুজনে ঢুকল একটা চায়ের দোকানে। দু পেয়ালা চায়ের অর্ডার দিয়ে জমিয়ে বসল কাঠের বেঞ্চিতে এবং তৎক্ষণাৎ অসমাপ্ত তর্কের বিষয়বস্তুতে ডুবে গেল। ভিন্সেন্ট বলে, রিয়ালিস্ম্ বলতে তুই যা বুঝছিস আমি তা বুঝছি না। রিয়ালিস্ম্ শিল্পীর সামনে একটা জগদ্দল পাহাড় নয়! রিয়ালিস মানে এ নয় যে, দুনিয়ার বাস্তবে যা আছে বা যা দেখছি তাই এঁকে যাওয়া। অনেক সময় এমন হয় যে, যা দেখছি তা অস্বাভাবিক, মানে আমার আর্টের বিষয়বস্তুর পক্ষে সেটা অবাস্তব, অবাঞ্ছনীয়! শিল্পীর অধিকার আছে সেটা অস্বীকার করার! বদলে দেবার!
–যেমন? একটা উদাহরণ দে?
ধর তুই একটা সুন্দর সূর্যোদয়ের ল্যাণ্ডস্কেপ আঁকছিস। তোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে অরুণোদয়ে পৃথিবী কেমন করে অন্ধকারের বুক থেকে জেগে উঠছে তাই ফুটিয়ে তোলা। তোর রঙ আর রেখা রামকেলী অথবা ভৈরোঁয় বাঁধা। এখন বাস্তবে তোর চোখে পড়ল সামনে দিয়ে চারজন শববাহী একটা মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যেহেতু ঐ খণ্ডদৃশ্যটা তোর বিষয়বস্তুর সঙ্গে একসুরে বাঁধা নয়–তুই অনায়াসে ঐ মৃতদেহবাহীদের অস্বীকার করতে পারিস। শিল্পী হিসাবে তোর অধিকার আছে ওটাকে উপেক্ষা করে ল্যাণ্ডস্কেপ আঁকার।
গগন দৃঢ় প্রতিবাদ করে। বলে, ঝাঁট দে ওসব ছেঁদো কথা! তাহলে ওটাকে ল্যাণ্ডস্কেপ বলা যাবে না আদৌ! তোরা মনে করিস চিত্রের জগৎ বুঝি সঙ্গীতের রাগ রাগিণীর ফর্মুলায় বাঁধা! সকালবেলা দরবারী কানাড়া অচল, মধ্যরাত্রে ভৈরো ধরলে ওস্তাদকে পিটিয়ে ছাতু করতে হবে! এ দুনিয়াটা অমন মনুসংহিতার বিধান মেনে চলে না। এখানে: ঊষালগ্নেও মানুষ মরে–সেটা বাস্তব! আর ঐ বাস্তবকে অস্বীকার করা মানে তুই একটা কল্পিত ইউটোপিয়ায় উটপাখির মত মুখ লুকোতে চাইছিস!
–তুই আমার কথাটা বুঝতে পারছিস না। দুনিয়া যে মিশ্ররাগিণীতে বাঁধা এ তো আমি অস্বীকার করছি না; কিন্তু আর্টিস্ট হিসাবে আমি তো একটা কিছু বলতে চাই। যা বলতে চাই তার সঙ্গে সুর না মিললে আমি বাস্তবকে অতিক্রম করতে পারব না কেন? ধর আমার আলুর ভোজ! সেদিন তুই বললি–মালকাটার দল বেবুনের মত গোগ্রাসে খাচ্ছে! ওদের প্রচণ্ড ক্ষুধার দৃশ্যই আমি আঁকতে চেয়েছি–তাই ওদের বাস্তবতাকে আমি অস্বীকার করিনি; কিন্তু আমার ছবির সুরের সঙ্গে যদি বাস্তব না মেলে–তাহলে আলবৎ আমি কল্পনার আশ্রয় নেব। আমার কল্পনাই সে ক্ষেত্রে হবে বাস্তব!
