ভিন্সেন্ট জবাবে বলে, –তা আমি জানি না। তোমরা দেখে বল, কে ভাল আঁকে।
একদিন ওর ছবি আঁকা বন্ধ রইল। জনে জনে সে শুনিয়ে এল গগন পালের আসন্ন। আগমনবার্তা। রঘুবীর, ভগলু, এক্কাওয়ালা মকবুল আলি, চায়ের দোকানদার ভীমাকে। প্রতিবেশীরাও ওর মত অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করতে থাকে কখন এসে পড়ে দুনম্বর তসবিরবাবু।
অবশেষে গগন এসে উপস্থিত হল। সে তো আগমন নয়, সে যে আবির্ভাব। ভিন্সেন্ট মালিকে দিয়ে ও-ঘর থেকে একটা চৌকি এ-ঘরে আনিয়ে রেখেছিল। মালির হেপাজতে বিছানা বালিশ চাদর সবই আছে, পরিপাটি করে ভিন্সেন্ট একটি বিছানা পেতে রাখল। বাগান থেকে ফুল তুলে এনে কসার গ্লাসে সাজিয়ে রাখল গগনের বিছানার । পাশে। নিজের ছবিগুলি টাঙিয়ে রাখল ঘরের চারদিকের দেওয়ালে। সিঙারণ নদীর সাঁকো, জোড়-জাঙালের গির্জা, আলুর ভোজ, বাতাসীর ন্যুড-স্টাডি, রঘুবীরপ্রসাদের সাম্প্রতিক আঁকা পোর্ট্রেট। বন্ধুবরণের সব আয়োজন সেরে স্টেশনে গেল বন্ধুকে আনতে।
স্টেশন প্লাটফর্মে দুই শিল্পী বন্ধুর মিলনদৃশ্যটা মনে রাখবার মত। ভিন্সেন্ট ওকে মাথায় তুলে নিয়ে নাচতে বাকি রাখল। গগনের তোরঙ্গ, আর প্যাকিংকেসে বাঁধা ছবির বাণ্ডিল কুলির মাথায় দিয়ে প্লাটফর্মের বাইরে এল। টাঙায় করে বন্ধুকে নিয়ে এল বাসায়।
গগন কিন্তু ভিন্সেন্টের ব্যবস্থাপনায় খুশি হল না। বললে, অতগুলো ঘর তালা বন্ধ রেখে এমন গুঁতোগুতি করে থাকার কী দরকার বাওয়া? শুধু মুধু আত্মাকে কষ্ট দেওয়া!
ভিন্সেন্ট বলে, দুজনে একঘরে থাকলে গল্পগুজব করা যাবে– বাধা দিয়ে গগন বলে, ঝাঁট দে ওসব ছেঁদো কথা! তামাম রাত তোর বক্কানি কে শুনবে? মেয়েছেলে না হলে একঘরে কারও সঙ্গে শুতে পারি না আমি!
বোঝা গেল গগন ফাঁকা থাকতেই ভালবাসে। কিন্তু একটু মর্মাহত হয় ভিন্সেন্ট; কথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলে, -এক হিসাবে কথাটা অবশ্য ঠিক। এ-ঘরের দেওয়াল তো আমার ছবিতেই ভরে গেছে। তোর ছবি টাঙানোর জন্য আরও ওয়ালস্পেস চাই।
গগন বলে, –সেজন্য নয়। আমি দেওয়ালে আদৌ ছবি টাঙাব না। আসলে একটু নিরালা না হলে আমি ঠিক জুত পাই না।
অগত্যা মালী আর ভিন্সেন্ট ধরাধরি করে বিছানাটা ও-ঘরে নিয়ে যায়।
গগন যে ওর আঁকা ছবিগুলো দেখতে মোটেই কৌতূহলী হয়নি এটা নজর এড়ায়নি ভিন্সেন্টের। কিন্তু এ নিয়ে সে কিছু বলে না। রাতে খেতে বসে গগন বললে, বাঁধে কে? তুই?
না, মালিক বউদি।
কই, তাকে তো দেখলাম না?
–আছে কোথাও। তুই নতুন লোক বলে লজ্জা পাচ্ছে হয় তো!
–ও বাবা! লজ্জাবতী লতা নাকি? তোর ঘরে একটা ন্যুড স্টাডি দেখলাম। সেটা
কি ঐ মালির বৌদির?
–দূর! তোর মাথা খারাপ! অমন ছবি কি কারও বউ কখনও আঁকাতে পারে?
–পারে না বুঝি? তবে কার?
ও অন্য একটা মেয়ে। নাম বাতাসী।
সাঁওতাল মেয়ে?
–হ্যাঁ। ওর কথা বলব তোকে।
ভিন্সেন্টের হাতের কাজের দিকে কৌতূহল না থাকলেও তার অতীত জীবনের বিষয়ে খুব আগ্রহ দেখালো গগন। ভিন্সেন্ট স্কুল ছাড়ার পর তার জীবনের সমস্ত ঘটনা বলে যায়। গগন ধৈর্য ধরে শোনে। কাহিনী শেষ হতে হো-হো করে হেসে ওঠে সে।
-কি হল রে? অমন করে হাসছিস কেন?
গগন হাত দুটি জোড় করে বলে, ফাদার চন্দ্রভান! তুমি হয় ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি, নয় হিজড়ে, আর নয় ফাদারদা, নয় ফাদার বৌঠান! কোষ্টা তুমি?
ভিন্সেন্ট হাসতে হাসতে বলে, –এ কথার মানে?
–শালা, তোর জীবনে তিন-তিনটে ডবকা হুঁড়ি এল। আর আজ ছত্রিশ বছর বয়েসেও তুই ভার্জিন! তুই শালা নমস্য ব্যক্তি। পায়ের ধুলো দাও বৌঠান!
সত্যিই ওর পায়ের ধুলো নিতে যায়। ভিন্সেন্ট হাসতে থাকে।
কিন্তু এই রসিকতাই ওর কাল হল!
ওরা দুজনেই শিল্পী; একই পথের পথিক। কিন্তু দুজনের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমান-জমিন ফারাক। যে-কোন বিষয়বস্তু নিয়েই ওরা আলোচনা শুরু করুক, শেষ-মেশ এসে থামে চিত্রশিল্পে। আর তখনই হয় মতান্তর। মতান্তর থেকে মনান্তর। রীতিমত বচসা শুরু হয়ে যায়। আর মজা হচ্ছে এই, গগন তখনই নৈর্ব্যক্তিক আর্টবচার থেকে নেমে আসে ভিন্সেন্টের ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গে। ঠাট্টা-তামাসা শুরু করে দেয়। ওকে ক্ষেপায়। ভিন্সেন্ট যখন আগুন হয়ে আস্তিন গোটায় গগন হেসে ওঠে। বলে, থাক বৌঠান! আমি হার মানছি!
উত্তেজনায় ভিন্সেন্টের মুখটা থমথম করে। ভূ দুটি কুঁচকে ওঠে। বলে, –বৌঠান মানে?
–তুমি তো পুরুষমানুষ নও বাবা চন্দ্রভান! ঊর্মিলাকে তুমি কাব্যে উপোসী করে রাখলে, চ্যারা দিদিমণি মাঝরাতে তোমার ঘরে জ্বালা জুড়াতে এল, তুমি তাকে বাসিমুখে তাড়িয়ে দিলে; মায় বাতাসী পাক্কা দু বছর তোমার বিছানায়
তুই পাষণ্ড! তোর মুখ অত্যন্ত অশ্লীল!
গগন হাসতে হাসতে বলে, হ্যাঁ বৌঠান! আমার মুখটাই অশ্লীল কিন্তু ছবিগুলো তোমার মত অশ্লীল নয়!
–আমার ছবি অশ্লীল! কোন্ ছবি?
সবগুলোই। আলুর ভোজ একখানা অশ্লীল ছবি! মানুষগুলো বাঁদরের মত– গোগ্রাসে খাচ্ছে বেবুনের মত। ও কি একটা আঁকবার মত বিষয়বস্তু? সর্ডিড অ্যাণ্ড ভালগার!
-তুই কিছুই বুঝিস না! তোকে দেখানোই ভুল হয়েছে আমার—
গগন সেকথায় কর্ণপাত না করে একনাগাড়ে বলে যায়, বাতাসীর ন্যুড-স্টাডি আর একখানা অশ্লীল ছবি! জয়টাকের মত অতবড় পেট যার, তার ন্যুড-স্টাডি ভদ্দরলোকে আঁকে–
