আর একটা উদাহরণ দে!
ধর ঐ ক্যালেণ্ডারের ছবিটা! শিল্পী বাস্তবতাকে অস্বীকার করে ওটাতে কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। যা দেখেছেন তাই যদি আঁকতেন তাহলে মেয়েটির কপালে সিঁদুরের টিপ থাকার কথা নয়। ও সদ্যঃস্নাতা। মেয়েটি ভিজে কাপড় ছাড়েনি, ফলে স্নানের পরে ও প্রসাধন করেনি। তাহলে ওর কপালে সিঁদুরের টিপ থাকতে পারে না। তবু শিল্পী টিপটা এঁকেছেন, এবং সেটা তথাকথিতভাবে অবাস্তব হলেও সার্থক। কারণ, শিল্পীর কল্পনায় অবগাহন-স্নানান্তে ঐ পূজারিণীর মালিন্যটুকুই ধুয়ে গেছে, মাঙ্গলিক চিহ্নটুকু ধুয়ে যায়নি!
গগন নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে দেখতে থাকে দোকানের ও-প্রান্তে টাঙানো একখানা ক্যালেণ্ডার। অনেকদিন পরে ছবিটা দেখল আবার। বটুকেশ্বর দেবনাথের পূজারিণী যে ক্যালেণ্ডাররূপে রাঁচির অখ্যাত চায়ের দোকানে স্থান পেতে পারে এটা তার বিশ্বাস। হচ্ছিল না। গগন ঐ সদ্যঃস্নাতা বিকশিত-যৌবনার মূর্তির ভিতর সুলেখাকে খোঁজবার চেষ্টা করে। মুখখানা বটুক অন্যরকম করে এঁকেছিল–তাই সুলেখাকে চেনা যাচ্ছে না।
কি হল? কথা বলছিস না যে? ভিন্সেন্ট তাগাদা দেয়।
গগন বলে, ছবিটা কার আঁকা জানিস?
না। তুই জানিস?
–হ্যাঁ। ওটা বটুকেশ্বরের আঁকা। ছবিটা বটুকের বউয়ের।
এবার ভিন্সেন্ট এগিয়ে যায়। ছবিটাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখে। ফিরে এসে বেঞ্চিতে বসে বলে, একটু ফটোগ্রাফিক হয়েছে, তা হোক। মেয়েটির চরিত্রটা ঠিকমত ফুটিয়েছে বটুক।
গগন ব্যঙ্গভরা একচিলতে হাসে। বলে, -মেয়েটির চরিত্রের কোন দিক?
–ছবিটা দেখলেই মনে হয় মেয়েটির মন নরম, সে সুখী, সে খাঁটি হিন্দুর মেয়ে, পূজা-আর্চা ভালবাসে।
গগন বলে, –তবেই দেখ! আমি যা বলতে চাইছি তাই প্রতিপন্ন হল! এখানে শিল্পী তাঁর পূর্বনির্ধারিত একটি ফর্মুলায় মেয়েটিকে বেঁধে ফেলেছেন। মেয়েটির আসল চরিত্র মোটেই উদ্ঘাটন করতে পারেননি নিজের কল্পনার বোঝ ওর ঘাড়ে চাপিয়ে ওর চরিত্রটাকেই বিকৃত করে দিয়েছেন। আমার মতে তাই এ ছবি–অশ্লীল!
আর একটু বুঝিয়ে বলবি?
বলব। ঐ মেয়েটি, মানে বটুকের বউয়ের মন আদৌ নরম নয়, সে মোটেই সুখী ছিল না, হিন্দুর দেবদেবীতে তার তিলমাত্র বিশ্বাস ছিল না। অতৃপ্ত কামনা বাসনা নিয়ে সে নিজের অন্তর্জালায় গুমরে মরছিল। কিন্তু যেহেতু শিল্পী একটি ভজন গাইতে বসেছেন তাই সেই বাস্তবতাকে উনি অস্বীকার করেছেনউঠপাখির মত বালিতে মুখ লুকিয়েছেন!
বাধা দিয়ে ভিন্সেন্ট বলে, –তুই এত কথা কি করে জানলি?
-যেহেতু ঐ বৌটির সঙ্গে আমি দীর্ঘদিন রাত্রিবাস করেছি।
ভিন্সেন্ট স্তম্ভিত।
বিশ্বাস হল না? তাহলে বলি শোন
গগন তারপর বটুক সুলেখার উপাখ্যান শোনাতে থাকে।
আদ্যন্ত কাহিনীটা শুনে ভিন্সেন্ট বললে, তুই একটা স্কাউড্রেল। পাষণ্ড!
গগন হে-হে হাসি হাসে।
ফেরার পথে ভিন্সেন্ট একটা কথাও বলে না। তার মাথার মধ্যে কেমন যেন একটা যন্ত্রণাবোধ হচ্ছে। বটুকেশ্বরকে সে স্কুলজীবনের পর আর দেখেনি; তার স্ত্রী সুলেখা দেবনাথকে সে চেনে না–তবু গগন যে-ভাবে ওর বন্ধুর সুখের সংসারটা ছারখার করে দিয়ে এল তাতে গগনের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়বে মনে হচ্ছে। আচ্ছা, এসব কথা দীপু তো ঘুণাক্ষরেও বলেনি! গগন বা বটুকের কথাও উঠেছে কথা প্রসঙ্গে দীপু এড়িয়ে গেছে। কেন?
গগন পাশে পাশে চলছিল। বললে, তুই আমার ওপর রাগ করেছিস না রে?
ভিন্সেন্ট জবাব দেয় না।
গগন আবার হেসে ওঠে। বলে, আরে ঝট দে! ঘাবড়াচ্ছিস কেন? তোর তো আর বউ নেই? ঊর্মিলাচ্যারা বাতাসীরা কেউ এখানে থাকলে না হয়–
–প্লীজ গগন! চুপ কর!
গগনকে যেন আর সহ্য করা যাচ্ছে না। সত্যিই যদি ভিন্সেন্ট এখানে সস্ত্রীক বসবাস করত তাহলে কি গগন তার সংসারেও আগুন ধরিয়ে দিত? ঊর্মিলা কিংবা চিত্রলেখা–
মাথার মধ্যে ঝিম ঝিম করে ওঠে ওর।
এর পর দুদিন ভিন্সেন্ট আর গগনের সঙ্গে বেড়াতে যায়নি। অনেকিদন পরে রঙ তুলি বার করে সে আঁকতে বার হল। স্থির করল, গগনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাটা কমিয়ে দিতে হবে। গগন একলা থাকতে ভালবাসে। তাই থাকুক। গগনও আপত্তি করল না। ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে সেও ছবি আঁকতে বসল।
ভিন্সেন্ট বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে একদিন আঁকতে বসেছে। সামনে ঢালু উপত্যকা। ও-পাশে নীলচে-সবুজ পাহাড়ের রেখা। একটা সপ্তপর্ণী গাছের ছায়ায় সে ঈজেলটাকে বসিয়ে একমনে আঁকছে। পাশ দিয়ে রাঙা মাটির একটা রাস্তা চলে গেছে। সাচির দিকে। তাতে সারি সারি গো-গাড়ি চলেছে। তৈল-তৃষিত গো-যান চক্রের আর্তনাদ আর কয়েকটি ঘুঘুর ঝিমন্ত কৃজন ছাড়া চরাচর স্তব্ধ। হঠাৎ একটি হুড-খোলা মোটরগাড়ি ওর থেকে কিছুটা দূরে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল। ভিন্সেন্টের একাগ্রতা নষ্ট হয়ে গেল সে-শব্দে। ঘাড় ঘুরিয়ে ও দেখে একটি মেমসাহেব বসে আছেন গাড়িতে। তিনিই চালাচ্ছিলেন। তাঁর পাশে একজন সাহেব। পিছনের আসনে দুটি বাচ্চা। সাহেব নেমে আসেন গাড়ি থেকে। বলেন, হ্যালো মিস্টার গর্গ! কেমন আছেন? কী আঁকছেন দেখি?
এগিয়ে আসেন তিনি।
ভিন্সেন্ট প্রত্যভিবাদন করতে ভুলে যায়। সে স্তব্ধ-বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছিল মেমসাহেবটিকে। টক্টকে ফর্সা রঙ-মেমসাহেবদের যেমন হয়। মাথায় নীল রঙের টুপি, ফিতে দিয়ে চিবুকের সঙ্গে আটকানো। সোনালী চুলের গুচ্ছ কপালের উপর জটলা করছে। দু চোখে কৌতুক উপছে পড়ছে। বয়স প্রায় ভিন্সেন্টের মতই। তবু চিনতে অসুবিধা হল না তার।
