১. অনেকে আমাকে সাংবাদিক বলে চেনে

প্রকাশক : ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ
প্রথম ইত্যাদি সংস্করণ : ফেব্রুয়ারি ২০১২

উৎসর্গ

বাবা
সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

মা
লাবণ্যপ্রভা সেনগুপ্ত

.

[আমার জবানবন্দী। এটি নির্মল সেনের আত্মজীবনী নয়। তবে তার লেখার মধ্যে আত্মজীবনীর একটি ছায়া পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে পুরো পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্র এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের তথা বিশ্বরাজনীতির একটি চলমান চিত্র বা ঘটনাপুঞ্জি। একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক রাজনীতিকের চোখে সেই সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। আমাদের মাঝে যে বাস্তবতায় মুক্তিযুদ্ধ এসেছিল তার নানামাত্রিক ব্যাখ্যা এবং কঠোর কঠিন এক বাস্তবতার কথা নিজস্ব চিন্তায় তুলে ধরেছেন লেখক।

পাকিস্তান আমলের সামরিকতন্ত্র আর মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা তিনি যেভাবে দেখেছেন তা বোধকরি এভাবে এর আগে কেউ ব্যাখ্যা করার সাহস দেখাননি। সময় এবং ঘটনা তিনি যেভাবে অকাট্য যুক্তি, অকপট স্বীকারোক্তি এবং কঠিন বাস্তবতাকে একজন রাজনীতিকে চোখে ব্যাখ্যা করেছেন তা কেবল তার পক্ষেই সম্ভব। স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তিনি যেভবে সাহস করে তার কলমে তুলে ধরেছেন তা দ্বিতীয় কেউ পারেননি। তার এ লেখা এককথায় বিগত শতাব্দীর উপমহাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ও তার ইতিহাস এবং বাস্তবতার এক অখণ্ড দলিল; যেখানে প্রকাশ পেয়েছে জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রতি আজন্ম দায়বদ্ধ থাকা একজন রাজনীতিকের তীব্র হাহাকার।]

.

মুখবন্ধ

প্রায় এক দশক ধরে আমি অসুস্থ। এখন আমি আমার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় থাকি। শুনতে পারি, বুঝতে পারি, কিন্তু লিখতে পারি না। চোখে দেখি না। আমার কথা আমার একান্ত কাছের স্বজনেরা ছাড়া কেউ বুঝতে পারে না। এ অবস্থার মধ্যেও নানাজন তাগিদ দেয় কিছু একটা লিখবার। এ কাজে আমাকে এখন সহযোগিতা করে আমার ভাইয়ের ছেলে কংকন সেন ও আমার পড়শি স্থানীয় সাংবাদিক মিজানুর রহমান বুলু। অসুস্থ হওয়ার আগে ঢাকায় থাকতে এ কাজে সহযোগিতা করতে সাংবাদিক হোসেন শহীদ মজনু এবং প্রশান্ত অধিকারী।

আমার জবানবন্দি বই আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলাম ২০০০ সালে। তারও আগে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে এই বইয়ের কিছু লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল সাংবাদিক দীপঙ্কর গৌতমের সহযোগিতায়। সর্বশেষ কাজটি যখন করছিলাম তখন আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। তাই কাজটি আর এগোয়নি। ফলে যেভাবে পাণ্ডুলিপিটি ছিল সেভাবেই তরফদার প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মাহবুব আলম বইটি প্রকাশ করে। সেখানে নানা ভুলত্রুটি ছিল। পরবর্তীতে আমার এক সময়ের সার্বক্ষণিক সহযোগী প্রশান্ত অধিকারীর সহযোগিতায় ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ-এর স্বত্তাধিকারী জহিরুল আবেদীন জুয়েল ও আদিত্য অন্তর বইটি প্রকাশের আগ্রহ দেখায়। তারা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছে বইটি নির্ভুলভাবে প্রকাশের। আমি তাদের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।

অনুসন্ধিৎসু পাঠক যদি বইটি পড়ে সেকালের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারেন এবং জানতে পারেন সে সময়ের ইতিহাস সে লক্ষ্যেই আমার এ প্রয়াস। এ লেখায় আমার অনেক রাজনৈতিক ও সাংবাদিক বন্ধুদের কথা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে উল্লেখ করেছি। অনেকে মনে করতে পারেন আমি তাদের সমালোচনা করেছি। আসলে তা নয়। এটা একান্তই আমার রাজনৈতিক চিন্তা ও অভিজ্ঞতাপ্রসূত মতামতের বহিপ্রকাশ। আশা করি এ নিয়ে আমার বন্ধুরা ভুল বুঝবেন না।

নির্মল সেন
দিঘীরপাড়, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ
৩১ জানুয়ারি ২০১২

.

আজকে অনেকে আমাকে সাংবাদিক বলে চেনে। অথচ সাংবাদিক হবার কোনোই কথা ছিল না। ভবিষ্যতে কী হব সে নিয়ে এমন কোনো চিন্তা-ভাবনা শৈশবে ছিল না। বাবার এক খুড়তুতো ভাই ড. ধীরেন্দ্রনাথ সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ছিলেন, এক সময় হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড-এর সম্পাদক ছিলেন। সেই সূত্রে সাংবাদিকতা সম্পর্কে কৌতূহল ছিল স্কুল জীবন থেকে। কাকা বাড়ি এলে অসংখ্য পত্রিকা আসত। আমরাও কখনো কখনো হাতে লিখে কাগজ বের করতাম। তবে সে পটভূমিও আমাকে সাংবাদিক বানায়নি।

আমাদের গ্রামে মোটামুটি একটি ভালো লাইব্রেরি ছিল। যেখানে শীতিনেক ভালো ভালো বই ছিল। ঐ লাইব্রেরি চালাতে গিয়ে ব্রিটিশ শাসকদের কোপানলে পড়লেন আমার এক কাকা। আমার এক বোনকে পুলিশ ডেকে নিয়ে গেল রবীন্দ্রনাথের নটির পূজা ও রক্তকরবী পড়ার জন্যে। তখন থেকেই কিছুটা ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব জন্ম নেয়। তবে তাও খুব একটা উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।

নানা কারণে আমার বাড়িতে থেকে পড়ালেখা হয়নি। পাঠশালায় পড়া শেষ করে আমি ভর্তি হয়েছিলাম গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। এই স্কুলটি আজকের টুঙ্গিপাড়া থানায় অবস্থিত। কাকারা সেখানে ডাক্তারি করতেন। ঐ স্কুলের শিক্ষকদের কাছে শেখ মুজিবুর রহমানও লেখাপড়া করেছেন। টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতিতে অবস্থান করার জন্যে শেখ সাহেবদের পরিবারের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে সে ছিল একান্তই পারিবারিক আত্মীয়তা, এর সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না।

আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন। বইও লিখতেন। হঠাৎ বই লেখার জন্যে তিনি ১৯৩৯ সালে ঢাকায় আসেন। আমিও ঢাকায় এলাম। তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছিল যুদ্ধ নিয়ে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সাথে মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহেরুর মতৈক্য হচ্ছে না। এ সময় সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েও সভাপতির পদ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করে সুভাষচন্দ্র বসু ঢাকায় আসেন। আমাদের বাসা ছিল তকালীন দয়াগঞ্জ রোডে। ১৩ নম্বর বাড়িতে আমরা থাকতাম। একদিন দেখলাম সুভাষচন্দ্র বসুর মিছিল যাচ্ছে। তিনি যাচ্ছিলেন শক্তি ঔষধালয় দেখতে। আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে তিনি মিছিল করে গেলেন। এর পরে ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণ করে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ঢাকায় তখন যুদ্ধের খবর নিয়ে। প্রতিদিন একটি টেলিগ্রাম বের হতো। টেলিগ্রামটির নাম ছিল ‘অবন্তিকা’।

যুদ্ধের জন্যে আমরা ঢাকা থেকে বাড়ি চলে যাই। বাড়িতে পড়াশোনা হলো না। সেই কাহিনী আমার জীবনের গল্পের মতো। হঠাৎ একদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে ডেকে তুললেন মা। বাড়ির প্রায় সকলে ঘুমিয়ে। মা বললেন, হাত-মুখ ধুয়ে নাও। বিকেলে বরিশালের কলসকাঠি যেতে হবে। বাড়িতে পড়া হবে না। দূরে দেখলাম দাঁড়িয়ে নৌকার মাঝি। মাঝির মাখায় আমার স্যুটকেস।

আমার চোখে জল আসছিল। আগের রাতে বাড়িতে নাটক হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর। আমি অভিনয় করেছি। ভেবেছি ভোরবেলা সকলের সাথে দেখাশুনা হবে। শুনব নিজের অভিনয়ের কথা। না, সব ভেস্তে গেল। মার হাতে নারকেল তেল। মা বললেন, মুখে তোমার নাটকের মেক-আপ আছে। মুখে নারকেল তেল মাখো। তারপর মুখ ধুয়ে ফেলো। আমার চোখে জল। আমি কলের পুতুলের মতো সব করলাম। তারপর রওনা হলাম। বাড়ির সামনে সড়ক। তারপর সুবিস্তীর্ণ মাঠ। মাঠের পরে কচুরিপানা। এখানে নৌকা। নৌকা যাবে স্টিমার স্টেশন পাটগাতি। স্টিমার আসবে খুলনা থেকে। ঐ স্টিমারে আমাকে বরিশাল যেতে হবে।

আমি হাঁটছি আর হাঁটছি। পিছনে তাকাচ্ছি। শ্বেতশুভ্র কাপড়ে আমার মা তাকিয়ে আছেন, এক সময় চোখের কোণ থেকে মা হারিয়ে গেলেন। আমি নৌকায় উঠলাম। সেদিন যেমন করে বাড়ি ছেড়েছিলাম, তেমন করে আর আমার বাড়ি ফেরা হলো না।

চলে গেলাম বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ থানার কলসকাঠিতে। ভর্তি হলাম কলসকাঠি বরদাকান্ত মুক্তাকেশী একাডেমিতে। এই কলসকাঠিতে এসেই হয়তো আমার ভবিষ্যৎ জীবন নির্ধারিত হয়ে গেল। স্কুল জীবন থেকেই ধারণা ছিল বড় একটা কিছু হতে হবে। অনেক সময় ভেবেছি ভালো শিক্ষক হব, গবেষক হব। একটির পর একটি বিষয়ে থিসিস করব এবং ডক্টরেট হব। কাকা ডক্টরেট বলে ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল ডক্টরেট হতেই হবে। সুবোধ বালকের মতো লেখাপড়া করতে হবে এবং শিক্ষাবিদ হিসাবে খ্যাতি লাভ করতে হবে। কিন্তু কলসকাঠিতে এসে সবই যেন পাল্টে গেল।

এই কলসকাঠির একটি ইতিহাস আছে। কলসকাঠিতে এক সময় স্টিমার স্টেশন ছিল। ইংরেজিতে স্টেশনের নাম ছিল কলুষকঠি। তাহলে কি কলসকাঠিতে কলুষিত হবার মতো কোনো ঘটনা ঘটেছিল? কলসকাঠিতে ১৩ ঘর জমিদার ছিল। জমিদারদের বাগানবাড়ি ছিল, ছিল ছোটখাটো চিড়িয়াখানাও। আজ থেকে এক-দেড়শ’ বছর আগে প্রিন্টিং প্রেস ছিল। এই জমিদারদের অনেক ভবনের কক্ষের সংখ্যা কোনোদিনই হিসাব করা যায়নি। অনেক জমিদারের বাড়ির ভেতরে ছোট ছোট পিলার আছে। লোকে বলে প্রজাদের ধরে এনে খুন করে রাতারাতি কবর দিয়ে ঐ পিলার তৈরি করা হয়েছে। তবে এই জমিদারেরা লোক দেখানো জনকল্যাণের জন্যেও কিছু কিছু কাজ করেছে। স্কুল করেছে নিজ খরচে। ডাকঘর দিয়েছে। গ্রামে ইট বিছানো সড়ক করেছে। তবে আমি যখন কলসকাঠিতে গিয়েছি তখন সবকিছুই অতীতের স্মৃতি মাত্র।

কলসকাঠির একটি ঐতিহ্য ছিল। এই ঐতিহ্য হচ্ছে রাজনীতির। কংগ্রেসের প্রথম যুগে গ্রাম গ্রামান্তরে নেতা ছিলেন জমিদার শ্রেণির লোক। এক শ্রেণির জমিদার ও তহশিলদার কংগ্রেসকে সহযোগিতা কত এবং অর্থ যোগাত। জমিদার সন্তানেরা নির্বিরোধ বিলাসী জীবনযাপন করত। রাজনীতি করায় তাদের খুব অসুবিধা ছিল না। এছাড়াও ছিল এ সকল এলাকায় এককালের গুপ্ত বিপ্লবী দলের প্রভাব। তখন কমিউনিস্ট পাটি গঠিত হয়েছে ঐ এলাকায়। কলসকাঠি স্কুলে ভর্তি হয়ে আমার প্রথম দেখা হলো ফরওয়ার্ড ব্লকের ছাত্রদের সাথে। ফরওয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। ওদের সাথে যখন আমার দেখা হলো, তখন সুভাষচন্দ্র বসু এক রহস্যময় পুরুষ। তিনি ভারত থেকে ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে গেছেন। জার্মানিতে। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে নতুন সেনাবাহিনী গড়বেন এবং ভারতকে স্বাধীন করবেন। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই সুভাষচন্দ্র বসু দেশ ত্যাগ করেছিলেন। তিনি যুদ্ধের প্রথম দিকেই ব্রিটিশকে আঘাত করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু গান্ধী ও নেহেরু সে প্রস্তাবে রাজি হননি। অথচ ১৯৪২ সালে ঐ প্রস্তাবেই রাজি হলেন গান্ধী ও নেহেরুর নেতৃত্বের কংগ্রেস। ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট মুম্বাইতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন বসল। ব্রিটিশ সরকারকে আলটিমেটাম দেয়া হলো ভারত ছাড়ার। এই আন্দোলনের নাম হলো ‘কুইট ইন্ডিয়া’ অর্থাৎ ভারত ছাড়ো আন্দোলন। গান্ধীজীর শ্লোগান হলো ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’। গান্ধী, জওহরলাল, মাওলানা আজাদসহ কংগ্রেসের সকল নেতারা ঐ দিনই গ্রেফতার হয়ে গেলেন। এর প্রতিক্রিয়া হলো সারা ভারতবর্ষে। সে ঢেউ কলসকাঠিকেও তছনছ করে দিল। আমার জীবনও পাল্টে গেল।

১৯৪২ সাল এসেছিল আমার কাছে ভিন্নভাবে। কলসকাঠি পড়তে এসে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব আরো তীব্র হয়ে উঠল। শৈশব থেকে আমার অভ্যাস ছিল পত্র-পত্রিকা খুঁটেখুটে পড়া। স্কুল জীবনেই সংবাদপত্রের খবর রাখতাম। কংগ্রেস-এর নাম জানতাম। মুসলিম লীগের নাম জানতাম। কমিউনিস্ট পার্টির কথাও শুনেছি। সুভাষচন্দ্র বসুর জন্যে আবেগও ছিল।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর দেখেছি কংগ্রেসের সাথে ব্রিটিশ সরকারের বনিবনা হচ্ছে না। কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারকে শর্ত দিয়েছে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি না দিলে যুদ্ধে সহযোগিতা করবে না। মুসলিম লীগের অভিমত একটু ভিন্ন ধরনের। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করে। এ প্রস্তাবের মর্মকথা হচ্ছে, ব্রিটিশকে ভারত ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু যাওয়ার আগে ভারত ভাগ করে যেতে হবে। মুসলমানদের জন্যে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টি করতে হবে। অপরদিকে কংগ্রেসের ছিল অখণ্ড ভারতের আন্দোলন। মুসলিম লীগ কংগ্রেস ব্রিটিশবিরোধী প্রতিটি আন্দোলনকেই অখণ্ড ভারতের আন্দোলন বলে মনে করত। তাই কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এ ধরনের পরিস্থিতি তখন ছিল না। অথচ ঐ বয়সে আমি অন্তত এ ধরনের একটি ঐক্যের পক্ষপাতি ছিলাম না। ভাবতাম এমন হলে কেমন হয়। সবসময় মনে হতো হিন্দু-মুসলমান ঐক্যবদ্ধ না হলে ভারতের স্বাধীনতা আসবে না।

আমার এ চিন্তার হয়তো একটি পটভূমি ছিল। আমার বাড়ি আজকের গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া হলেও পাঠশালা ব্যতীত কোটালীপাড়ার কোনো বিদ্যালয়েই আমি পড়িনি। পাঠশালার পরে আমার প্রথম পাঠ শুরু হয় গোপালগঞ্জের গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া এম.ই স্কুলে।

এই এলাকায় শতকরা ৯০ জনই মুসলমানের বসবাস। আমার দুই কাকা এখানে চিকিৎসা পেশায় খ্যাতিলাভ করেছিলেন। এই স্কুলে পড়ার ফলে আমার ভিন্ন মানসিকতার জন্ম হয়। হয়তো সেই মানসিকতাই পরবর্তীকালে আমার জীবনে প্রভাব বিস্তার করে। আমি সপ্তম শ্রেণিতে এসে কলসকাঠিতে ভর্তি হই। তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। কংগ্রেসের সাথে ব্রিটিশের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। মুসলিম লীগ পাকিস্তান প্রশ্নে আপসহীন ভূমিকা নিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার ব্রিটিশ শ্রমিক দলের নেতা স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস-এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল পাঠাল ভারতে। উদ্দেশ্য আপসে কংগ্রেসের সাথে একটি রফা করা। মূল বক্তব্য হচ্ছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দেয়া হবে। তার পূর্বে নয়। তখন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উইনস্টন চার্চিল। এই ভভদ্রলোককে আমি আদৌ পছন্দ করতাম না। তিনি বলেছিলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ভেঙে ভেঙে টুকরো করার জন্যে তিনি ক্ষমতায় আসেননি। তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তিনি ক্ষমতাসীন থাকা পর্যন্ত ভারত স্বাধীন হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস-এর দৌড় ব্যর্থ হয়ে গেল। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে চরমপত্র দেয়া হলো। ১৯৪২ সালের ৮ আগস্টের মধ্যে ভারতকে স্বাধীনতা দেয়া না হলে ৯ আগস্ট থেকে কংগ্রেস ভারত স্বাধীন করার লক্ষ্যে চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু করবে।

ব্রিটিশ সরকার কোনো হুমকিতেই কান দিল না। ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট বোষেতে কংগ্রেসের অধিবেশন থেকে ঘোষণা হলো সংগ্রামের কর্মসূচি। তখন কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। মহাত্মা গান্ধী শ্লোগান দিলেন, করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে-ডু অর ডাই। বোম্বেতে কংগ্রেসের অধিবেশন থেকেই কংগ্রেস নেতাদের গ্রেফতার করা হলো। কংগ্রেস নেতারা সংগ্রামের কৌশল সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা না দিয়েই জেলে চলে গেলেন। সারা ভারতবর্ষে অসংগঠিত বিক্ষুব্ধ জনতা রেল লাইন উপড়ে ফেলল। ডাকঘর এবং সরকারি ভবনে আগুন দেয়া শুরু হলো। সেই সংগ্রামের ঢেউ বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ থানার কলসকাঠিতেও আঘাত হানল। আমরা আন্দোলনে শরিক হলাম। আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। ক্লাসে বয়সের দিক থেকে সর্বকনিষ্ঠ। স্কুলের গেটে শুয়ে ১৬ দিন ধর্মঘট করলাম। এর মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটে গেল।

১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন দুটি দিকে আমার চোখ খুলে দিল। কৈশোরে নিজের চোখে দেখলাম ব্রিটিশের দণ্ডনীতি, বিভেদ নীতি এবং কমিউনিস্ট পার্টির দুঃখজনক আচরণ।

কলসকাঠিতে তেমন কোনো স্বদেশী আন্দোলন ছিল বলে আমি জানতাম না। মাইলখানেক উত্তরে বেবাজ গ্রাম। সে গ্রামে রাজনৈতিক কর্মীদের একটি আশ্রম ছিল। আশ্রমের নাম ‘গান্ধী আশ্রম’। সে আশ্রমের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল না। কলসকাঠি স্কুলের কাছে কোয়ার্টারে থাকতাম। স্কুলের দক্ষিণে ডাকঘরের সামনে ছোট একটি মাঠ ছিল। সেই মাঠেই একদিন সভা জমে উঠল। সভায় বক্তারা তীব্র ভাষায় ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা করল। গান্ধী, নেহেরু ও মওলানা আজাদের মুক্তির দাবি হলো। পত্রিকায় খবর আসছিল সারা ভারতে বিক্ষোভের। বিক্ষুব্ধ জনতা ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলছে। ডাকঘর ও স্টেশনে স্টেশনে আগুন দিচ্ছে। আগুন দিচ্ছে সরকারি বাসভবনে। কলসকাঠিতে তেমন সরকারি ভবন ছিল না। তারও একটি ইতিহাস আছে।

কলসকাঠি উন্নত গ্রাম। তের ঘর জমিদারের বসবাস। তাদের একটি ডাকঘর চাই। টেলিগ্রাফ অফিস চাই। কিন্তু সেকালে থানা সদরের বাইরে টেলিগ্রাফ অফিস দেয়া হতো না। সরকারের শর্ত ছিল প্রয়োজনীয় সংখ্যক টেলিগ্রাফ না হলে টেলিগ্রাফ অফিস দেয়া যাবে না। কলসকাঠির জমিদারেরা এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তারা প্রতিদিন সকালে ও বিকালে বরিশাল থেকে কলসকাঠিতে টেলিগ্রাফে খবর পাঠানো রু করলেন। ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে কলসকাঠি বাজারে টেলিগ্রাফ অফিস চালু করল।

সেই টেলিগ্রাফ অফিস আক্রান্ত হলো ১৯৪২ সালে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে। স্টিমার অফিসও পুড়িয়ে দেয়া হলো। আমরা তখন উৎসাহী দর্শক। কলসকাঠি বাকেরগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত। মাঝখানে নদী। নদীর ওপারে থানা। সেখানে স্পিডবোট ছিল না। পুলিশকে নৌকায় যাতায়াত করতে হতো। জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে পুলিশ লঞ্চ ব্যবহার করত। কলসকাঠি থানা সদর থেকে দূরে হওয়ায় সেদিনই পুলিশের আবির্ভাব ঘটল না। পুলিশ এল পরের দিন। নেতৃস্থানীয় চারজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। প্রথমদিনে আর কাউকে গ্রেফতার করতে পারল না।

সে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। পুলিশ নেতাদের গ্রেফতার করে বাকেরগঞ্জ থানায় নিয়ে যাচ্ছে। পরদিন তাদের পাঠানো হবে স্টিমারে বরিশাল। আমরা তাদের বিদায় দেবার জন্যে বাকেরগঞ্জ থানায় গেলাম। স্টিমার স্টেশনের নাম রঙ্গশ্রী। দুপুরের দিকে পটুয়াখালী থেকে বরিশালগামী স্টিমার আসত। স্টেশনে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমত। মেয়েরা গান গাইত। বন্দিদের গলায় মালা দিত। পুলিশ তেমন কিছু বলত না।

রঙ্গশ্রীর কথা মনে হলে এখনও আমার চঞ্চলাদির কথা মনে পড়ে। কলসকাঠিতে আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতেন চঞ্চলাদির আত্মীয়রা। চঞ্চলাদির বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের শ্যামসিদ্ধি, থানা শ্রীনগর। স্বামী বাকেরগঞ্জে চাকরি করতেন। কী চাকরি করতেন তা আর এখন মনে নেই। চঞ্চলাদি বড্ড ফর্সা ছিলেন। ফর্সা ছিল তার চোখের তারা। সেই চঞ্চলাদিকেও দেখতাম বন্দিদের বিদায় দেয়ার জন্যে স্টিমার স্টেশনে আসতেন। চঞ্চলাদি আদর্শ গৃহবধূ। সাত চড়ে কথা বলেন না। তিনি কী করে স্টিমার স্টেশনে আসতেন বা কেন আসতেন তা আমিও বুঝতে পারিনি।

ঐ চঞ্চলাদিদের বাকেরগঞ্জের রঙ্গশ্রী ছেড়ে সন্ধ্যার দিকে আমরা কলসকাঠি ফিরতাম। ইতোমধ্যে আমাদের কর্মসূচি নির্ধারণ হয়ে গেছে। আমাদের একমাত্র কাজ নেতাদের খবর দেয়া এবং নেয়া। পুলিশের পক্ষ থেকে অসংখ্য লোকের নামে ইতোমধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। নেতারা আত্মগোপন করেছেন। প্রতিদিন রাতে পুলিশ ঘেরাও করছে বাড়ি। আমরা কয়েকটা ঘন্টার ব্যবস্থা করেছি। পুলিশের খবর পেলেই ঘন্টা পিটানো হতো। নেতারা পালিয়ে যেতেন। দিনের পর দিন পুলিশ এসে ফিরে যেত। সেকালের এক জমাদারের কথা এখনও মনে পড়ে। পুরো নাম কখনো শুনিনি। নাম ছিল গাঙ্গুলী জমাদার। গাঙ্গুলী খুব ধুরন্ধর। কোনো নেতাকে খুঁজে না পেয়ে তিনি আমাদের খোঁজ করতেন। কাছে এসে নানা কথা জিজ্ঞাসা করতেন। কিন্তু কোনো দিনই কোনো কথা বের করতে পারেননি। কিন্তু আমাদের সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করেননি।

তখন প্রতিদিন বিকালে মিছিল হতো। একদিন মিছিলে কয়েকজন কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের দেখলাম। দেখলাম তারা আমাদের মিছিলে যোগ দিয়েছে। কিছুটা অবাক হলাম। শুনেছিলাম কমিউনিস্ট পার্টি ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন সমর্থন করে না। তারা সে মুহূর্তে ব্রিটিশকে বিব্রত করতে চায় না। তাই তাদের দেখে প্রথমে খুব ভালো লাগল। ভাবলাম কমিউনিস্ট পার্টি বোধ হয় আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। আমাদের মধ্যে যাদের বয়স কম ছিল সবাই ভাবতাম আন্দোলনে সকলের আসা উচিত। একদিন মিছিল করতে করতে শুনলাম, মুসলিম লীগ সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও নাকি গ্রেফতার হয়েছেন। এ খবরে মিছিলটা যেন অগ্নিগর্ভ হয়ে গেল। ভাবলাম এবার ব্রিটিশের রক্ষা নেই। এবার ব্রিটিশকে যেতেই হবে।

কিন্তু খবরটা সত্যি ছিল না। বাসায় ফিরে পিসেমশাইয়ের কাছে শুনলাম খবরটা সত্যি নয়। পিসেমশাই কলসকাঠি স্কুলের গণিতের নামজাদা শিক্ষক ছিলেন। পিসেমশাইর সুবাদেই আমার কলসকাঠি যাওয়া। তাঁর বাসায় থেকেই স্কুলে পড়তাম। সেদিন পিসেমশাইর কাছে খবর শুনে যেমন বিমর্ষ হয়েছিলাম তেমনি আবার কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের দেখে উফুল্লও হয়েছিলাম।

কলসকাঠির পাশের গ্রাম গাডুরিয়া। গাডুরিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির কিছু লোক আছে জানতাম। তারাই সেদিন এসেছিলেন মিছিলে। শেষ পর্যন্ত তাঁদের কথায় আমার চমক ভাঙল। কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা আমাদের কয়েকজন ছাত্রকে ডেকে মিছিল থেকে দূরে নিয়ে গেলেন। মাথায় হাত বুলালেন, আমাদের খুব প্রশংসা করলেন। তারপর এক সময় বললেন, তোমরা ভুল করছ। এভাবে স্বাধীনতা আসবে না। কংগ্রেস নেতারা জার্মানি ও জাপানের দালাল। সুভাষচন্দ্র বসু বিশ্বাসঘাতক। ওরা ভারতবর্ষকে জাপানের হাতে তুলে দিতে চায়। এ যুদ্ধ হচ্ছে জনযুদ্ধ। জার্মান সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করেছে। জার্মান আগে আক্রমণ করেছে ব্রিটেনকে। আক্রান্ত ব্রিটেন এবং আক্রান্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন বন্ধু। সমাজতন্ত্র বাঁচাতে হলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাঁচাতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাঁচাতে হলে সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র ব্রিটেনকে এখন বিব্রত করা চলবে না। সুতরাং এখন ব্রিটিশকে বিব্রত করলে ফ্যাসিবাদী জার্মান ও জাপান জিতে যাবে। তাই এখন যারা ব্রিটিশকে বিব্রত করতে চায় তারা বিশ্বাসঘাতক এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির মিত্র। সুভাষ বসু এই ষড়যন্ত্র করার জন্যে জার্মান গেছেন। বার্লিন বেতার থেকে ভাষণ দিয়েছেন। তিনিও ফ্যাসিস্টদের দালাল। তাই কংগ্রেস ও সুভাষচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সমাজতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে, জাপানের হাত থেকে ভারতকে রক্ষা করতে হলে ব্রিটেনের সাথে সহযোগিতা করতে হবে। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করতে হবে। তখন আমি নবম শ্রেণির ছাত্র। রাজনীতিতত্ত্ব তেমন বুঝতাম না। অবাক বিস্ময়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের কথা শুনলাম। তাদের সাথে বিতর্ক করার মতো বুদ্ধি আমার ছিল না। শুধুমাত্র সুভাষচন্দ্র বসুকে গালি দেয়ায় মনটা খারাপ হয়ে গেল। মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে তেমন দুর্বলতা আমার সে বয়সেও ছিল না। গালভরা আবুল কালাম আজাদ নামটি বলতে গেলে তা ভালো লাগত।

কংগ্রেসের সভাপতি না বলে আমরা বলতাম রাষ্ট্রপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। তাকে মুসলিম লীগের ছেলেরা গালাগালি করত। কমিউনিস্ট পার্টির নেতারাও তাঁকে সমালোচনা করল। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এরপর থেকে তাদের এড়িয়ে চলতাম। কলসকাঠি থাকাকালীন এরপর কোনোদিন তাদের সাথে ভালোভাবে কথাও বলিনি। এর মাঝখানে আর একটি ঘটনা ঘটে গেল। একদিন ভোরের দিকে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল লঞ্চের বাঁশিতে। ছুটে স্কুলের পাশে খালপাড়ে এলাম। এসে দেখি লঞ্চ ভর্তি পুলিশ আর গুর্খা সৈন্য। প্রায় সব নেতাই গ্রেফতার হয়ে গেছেন। সবাইকে লঞ্চে তোলা হচ্ছে। আমাকে দেখে গাঙ্গুলী জমাদার কাছে এলেন। বললেন তোমাদের ঘন্টার কী হলো? আজ ঘণ্টা বাজল না! বুঝলাম, কেউ টের পাইনি। কাউকে খবর দিতেও পারিনি। চারদিকে তখন ভয় আর ভয়। পুলিশ কাকে গ্রেফতার করবে তা কেউ বলতে পারে না। তখন কেউ গ্রেফতার হলে আমরা রঙ্গী যাই না। বন্দিদের বিদায় দিতে কেউ স্টিমার ঘাটে যায় না। গ্রামে গ্রামে পুলিশ নেমেছে। নেমেছে পুলিশের কেউ। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। আর এমন সময় ব্রিটিশ সরকার নামল নতুন দণ্ডনীতি নিয়ে। দশ হাজার টাকা পাইকারি জরিমানা ঘোষণা করা হলো। বলা হলো, যে সম্প্রদায়ের লোক গ্রেফতার হবে বা গ্রেফতারের তালিকায় যাদের নাম থাকবে সেই সম্প্রদায়ের লোককেই এই জরিমানা দিতে হবে। এই ঘোষণার সাথে সাথে এক শ্রেণির মানুষ জরিমানা না দেয়ার ফিকিরে নামলেন। দালালির খাতায় নাম লেখালেন অনেকে। সকলেরই চেষ্টা নিজের সম্প্রদায়কে বাঁচাবার। এ আন্দোলনে মুসলমান সম্প্রদায়ের কাউকে জরিমানা দিতে হলো না। ভাগ করা হলো হিন্দুদের মধ্যেও। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, কামার-কুমার, কুলি বা শাঁখারীর ভিত্তিতে। যাদের সম্প্রদায়ের লোক অভিযুক্ত নয় তাদের জরিমানা নেই।

কলসকাঠির স্কুলের কাছে আমি থাকতাম। ঐ স্কুলেই সরকারি কর্মকর্তারা এলেন। সারাদিন ভরে জরিমানা আদায় করলেন। আমরা দূর থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম। প্রতিবাদ করার কেউ ছিল না। বরিশাল জেলায় শুধুমাত্র কলসকাঠি ও রহমতপুরে ভারত ছাড়ো আন্দোলন তীব্র হয়েছিল। আর কোথাও আন্দোলন তেমন ছড়িয়ে পড়েনি। গান্ধীবাদী কংগ্রেস এই আন্দোলনে এসেছিল নেহায়েত বাধ্য হয়ে। কমিউনিস্ট পার্টি আন্দোলনে আসেনি। বরিশালে সুভাষচন্দ্র বসুর ফরোয়ার্ড ব্লক কোনোদিনও গঠিত হয়নি। মোটামুটিভাবে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল আরএসপি বরিশালে সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতিনিধিত্ব করত। আরএসপিও তখন তেমনভাবে সংগঠিত হয়নি। এককালের অনুশীলন সমিতির অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা জেলখানায় মার্কসবাদ গ্রহণ করেন। কিন্তু লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা তাঁরা সঠিক বলে মনে করেননি। ১৯৪০ সালের ১৯ মার্চ তাঁরা আরএসপি গঠন করেন এবং ঘোষণা করেন যে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিণত করতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুযোগে ব্রিটিশকে হটাতে হবে। এ ঘোষণা দিয়ে এরা কেউই বেশিদিন বাইরে থাকতে পারেননি। দীর্ঘদিন কারাবাসের পর ১৯৩৮ সালে তারা মুক্তি পেয়েছিলেন। দল গঠনের ছয় মাসের মধ্যে প্রথম শ্রেণির সকল নেতাই আবার গ্রেফতার হয়ে গেলেন। তবুও তাঁদের নেতৃত্বেই রহমতপুরে আন্দোলন হয়েছিল। কলসকাঠিতে মুখ্যত আন্দোলন ছিল গান্ধীবাদীদের হাতে।

১৯৪৪ সালে আমি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হলাম। ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে এককালীন অনুশীলন সমিতির প্রবীণ বিপ্লবীদের সাথে আমার পরিচয় হয়। এ পরিচয় আমাকে কৌতূহলী করে। এ বিপ্লবীরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ গ্রহণ করেছেন। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করতে চান। অথচ কমিউনিস্ট পার্টি করেন না। এঁদের সুস্পষ্ট বক্তব্য, লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভুল পথ অনুসরণ করেছে। ফলে বিশ্ববিপ্লব হয়নি এবং এই মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের দ্বারা কোনো দেশেই বিপ্লব হবে না।

তাহলে লেনিনের পথটা কী? কোন পথ থেকে স্ট্যালিন বিচ্যুত হয়েছেন? প্রবীণ বিপ্লবীদের কথায় এ বিতর্ক বিশ্বসমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নিয়ে। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে রক্ষা নিয়ে এ প্রশ্নে বিপ্লবের তিন নেতা-লেনিন, ট্রটস্কি এবং স্ট্যালিন একমত হলেন না। প্রথমদিকে স্ট্যালিন লেনিনের মতই পোষণ করতেন। দু’জনেরই বক্তব্য হচ্ছে–একটি দেশের সমাজতন্ত্রের বিজয় সম্ভব হলেও পূর্ণ বিজয় আদৌ সম্ভব নয়। তাঁদের অভিমত বুর্জোয়া দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠন শুরু করা যায়নি। কিন্তু একাধিক উন্নত ধনবাদী দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন না হলে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র রক্ষা করা সম্ভব নয়। সমাজতন্ত্রের পূর্ণ বিজয়ও সম্ভব নয়।

ট্রটস্কির বক্তব্য ছিল পুঁজিবাদী বেষ্টনের পরিবেশে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণও শুরু করা যাবে না। তাঁর কথায় এক দেশে সমাজতন্ত্রের বিজয়ও সম্ভব নয়। অর্থাৎ এক দেশে সমাজতন্ত্রের বিজয়ের প্রশ্নে একদিকে লেনিন ও স্ট্যালিন অপরদিকে ট্রটস্কি অবস্থান নিলেন। এ চিত্রের পরিবর্তন ঘটল ১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর। ১৯২৫ সালে স্ট্যালিন বললেন, অপর কোনো দেশে বিপ্লব ছাড়াই সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রের পূর্ণ বিজয় সম্ভব। তাঁর কথা হচ্ছে বিপ্লবের পরিবর্তে অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের সহযোগিতা ও সাহায্যের উপর নির্ভর করে পূর্ণ বিজয় সম্ভব।

কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিল এ সহযোগিতা ও সাহায্যের সংজ্ঞা নিয়ে। বিপ্লব ব্যতীত অপর দেশের শ্রমিকশ্রেণি কীভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করবে, তার ব্যাখ্যা নিয়ে। স্ট্যালিনের বক্তব্য হলো, অপর দেশের শ্রমিকশ্রেণি তার নিজ দেশের সরকার সম্পর্কে নীতি নির্ধারণ করবে সেই দেশের সরকারের সোভিয়েত ইউনিয়ন সংক্রান্ত নীতির ওপর ভিত্তি করে। কোনো দেশের সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে হলে সে দেশের কমিউনিস্ট পার্টি সে দেশের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করবে। একইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে কোনো দেশের সরকারের সম্পর্ক ভালো থাকলে কমিউনিস্ট পার্টি সে দেশের সরকারের সাথে সহযোগিতা করবে।

প্রবীণ বিপ্লবীদের ভাষায়–এ হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে অন্ধ অনুকরণের নীতি। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পর এ নীতি অনুসরণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি। প্রথমে এরা জার্মানির বিরুদ্ধে টু শব্দটি করেনি। কারণ জার্মানির সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের অনাক্রমণ চুক্তি ছিল। জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করার পরই তারা জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এবার তারা বলেছেন-জার্মানি, সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করেছে। সুতরাং জার্মানি আমাদের শত্রু। জার্মানি ব্রিটেনকে আক্রমণ করেছে-সুতরাং আক্রান্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ব্রিটেন পরস্পরের মিত্র। ব্রিটিশ সোসাভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র হওয়ায় ব্রিটিশ ভারতেরও মিত্র। সুতরাং যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় ব্রিটিশকে বিপর্যস্ত করা যাবে না। এতে ভারতের স্বাধীনতা বিলম্বিত হলেও করার কিছু নেই। সোভিয়েত সমাজতন্ত্র রক্ষার জন্য সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশকে সহযোগিতা করারই একমাত্র কাজ।

অনুশীলন সমিতির প্রবীণ বিপ্লবীরা এ তত্ত্ব মেনে নেননি। তাই তাঁরা লেনিনের পথকে অনুসরণ করে গড়ে তুলেছিলেন বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল। সেই অর্থে বলা যায়, বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল আরএসপি ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে গঠিত কমিউনিস্ট পার্টির বিকল্প বিপ্লবী দল। এ দুটি দলের তাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল তীক্ষ্ণ এবং তীব্র। ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে এই বিপ্লবীদের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। এ দলের নেতারা তখনও জেল থেকে মুক্তি পাননি। এক নাগাড়ে প্রায় চৌদ্দ-পনের বছর এদের জেলে থাকতে হয়েছে।

১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় এদের গ্রেফতার করা হয়। ১৯৩৮ সালে এঁদের মুক্তি দেয়া হয়। আবার ১৯৪০ সালে আরএসপি গঠনের ছ’মাসের মধ্যে সকলেই গ্রেফতার হয়ে যান। তবে সকলেই ছাড়া পান ১৯৪৬ সালে সাধারণ নির্বাচনের পর। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হয়ে সকল বন্দিদের মুক্তি দেন।

এই প্রবীণ বিপ্লবীদের সাথে আলোচনার ফলে আমাদের দীর্ঘদিনের সংশয় কেটে যায়। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় কমিউনিস্ট পার্টির আচরণ আমাকে বেদনার্ত করেছিল। আরএসপির বিপ্লবীদের সংস্পর্শে এসে আমি সেদিনের কমিউনিস্ট পার্টির আচরণের একটি ব্যাখ্যা খুঁজে পেলাম। এই ব্যাখ্যাই আমাকে বলে দিল–কমিউনিস্ট পার্টিতে অনেক সংগ্রামী এবং বিশ্বস্ত নেতা কর্মী থাকলেও অন্ধ অনুকরণ তাদের বিপর্যস্ত করবে। অন্ধ অনুসরণ ও অনুকরণের নীতির ফলে ভারতের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হবে সুদূর পরাহত। কারণ ‘আমি চাই বা না চাই কমিউনিস্ট পার্টিই তখন সমাজতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে বড় শক্তি বলে পরিগণিত’-এই পটভূমিতেই আমার আরএসপির সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

তবে সে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৪৬ সালে সকল নেতাই মুক্তিলাভ করেন। ১৯৪৬ সালেই সারা ভারতবর্ষে ভয়াবহ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়। আর এর পূর্বে ঘটে যায় কয়েকটি যুগান্তকারী ঘটনা। প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৪৫ সালে ২১ নভেম্বর। কলকাতার ছাত্ররা আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতাদের যুক্তির দাবিতে মিছিল করছিল। আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। লক্ষ্য ছিল নিজের শক্তিতে সশস্ত্র অভিযানের মাধ্যমে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করা। জাপান সরকার আজাদ হিন্দ ফৌজকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ ইলের কোহিমা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়েছিল ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে। সেই সময় পেছন থেকে জাপান বিশ্বাসঘাতকতা করল। সর্বশেষে জাপান বুঝতে পেরেছিল যে, সুভাষচন্দ্র বসু তাদের ওপর নির্ভর করবেন না। তাদের কথা শুনবেন না। সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের বিরোধের সুযোগ নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্বে ভারতবাসীরাই ভারতবর্ষ স্বাধীন করবে। এ পরিস্থিতি জাপানের কাছে কাম্য ছিল না। তারা ভেবেছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের কাঁধে সওয়ার হয়ে ভারতবর্ষ দখল করবে। সে স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় তারা আজাদ হিন্দ ফৌজকে সকল সাহায্য ও সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। পর্যদস্ত আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃবৃন্দ ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে বন্দি হলেন। ইতোপূর্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের দুই প্রতিনিধি হরিদাস মিত্র ও পবিত্র রায় বিশেষ বার্তা নিয়ে সাবমেরিনে উড়িষ্যার উপকূলে পৌঁছলে গ্রেফতার হয়ে যান। বিচারে তাদের প্রাণদণ্ড হয়। গান্ধীজীর হস্তক্ষেপে প্রাণদণ্ড স্থগিত হয়ে যায়।

আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচারের খবরে সারাদেশ তখন অগ্নিগর্ভ। এর মধ্যে খবর এল যে, তাইপেতে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজী সুভাষ বসু মারা গেছেন। তিনি তাইপে থেকে বিমানে ব্যাংকক যাচ্ছিলেন। তাঁর এই মৃত্যুর খবর কেউ বিশ্বাস করল না। সন্দেহ আরো গম্ভীর হলো। এ সময় ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিল আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দি সেনানায়কদের বিচারের। বিচার হবে নয়াদিল্লির লালকেল্লায়। অভিযুক্ত নেতৃবৃন্দ হলেন কর্নেল শাহনেওয়াজ, ধীলন, সায়গল, রশিদ আলী, ঝাঁসির লক্ষ্মী বাই প্রমুখ। সারা ভারতবর্ষ ভেঙে পড়ল। উকিলের পোশাক পরলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু থেকে শুরু করে কংগ্রেসের সকল ডাকসাইটে নেতবৃন্দ। উল্লেখ্য যে, এঁরা ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় এ পেশা ত্যাগ ছিল।

আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃবৃন্দের বিচার বসবে নয়াদিল্লির লালকেল্লায়। সারা ভারতের মানুষের মুখে তখন আজাদ হিন্দ ফৌজের নাম। ঘরে ঘরে সুভাষচন্দ্র বসু, কর্নেল শাহনেওয়াজ, ধীলন, সায়গল, রশীদ আলী, লক্ষ্মী বাঈ-এর ছবি।

এই বিচারের বিরুদ্ধে ১৯৪৫ সালের ২১ নভেম্বর কলকাতায় মিছিল হলো। মিছিলে পুলিশের গুলিতে মার গেলেন রামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। ঢাকায় বাড়ি। কলকাতার ছাত্র। ঢাকার বাসা হাটখোলা রোডে ঢাকেশ্বরী কটন মিলের কেন্দ্রীয় দফতরের কাছে। তাঁর কাকা সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। এককালীন অনুশীলন সমিতি ও পরবর্তীকালের আরএসপি নেতা। দ্বিতীয় ঘটনা ঘটল ফেব্রুয়ারি মাসে। আমি তখন আইএসসি পরীক্ষার্থী। আজাদ হিন্দ ফৌজের অন্যতম সদস্য রশিদ আলীর মুক্তির দাবিতে মিছিল নেমেছে কলকাতায়। মিছিলে গুলি হলো। নিহত হলেন আবদুস সামাদ। মুসলিম লীগ আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিকে নিজস্ব দাবি হিসেবে সাম্প্রদায়িক রং দেবার চেষ্টা করেও সফল হলো না। ব্রিটিশ সরকারের গুলি আবার সকলকে ঐক্যবদ্ধ করল।

আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতাদের মুক্তির দাবিতে সারা ভারতে আন্দোলন কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ নেতাদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিল। এককালে কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহেরু নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে ফ্যাসিস্টদের সহযোগী বলে অভিহিত করেছিলেন। সেই নেহেরুকে উকিল কোর্ট পরতে হয়েছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবির তীব্রতায়।

অপরদিকে মুসলিম লীগ দেখল–এ আন্দোলন সফল হলে ভারত স্বাধীন হবে, পাকিস্তান হবে না। তাই তারা আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃবৃন্দের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সীমারেখা টানবার চেষ্টা করল। কর্নেল রশীদ আলীকে মুসলিম লীগের লোক বলে অভিহিত করে রশীদ আলী দিবস পালনের ডাক দিলেন। তাঁরা শাহনেওয়াজ, সায়গল বা লক্ষ্মী বাঈয়ের কথা বললেন না। কিন্তু কাজ হলো না। রশীদ আলীর মুক্তি আন্দোলনও সর্বজনীন রূপ পেল। ব্রিটিশের পুলিশ কাউকে ক্ষমা করল না মুসলমান বলে। আন্দোলন আরো তীব্র হলো। তৃতীর ঘটনা হলো–নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীতে বিদ্রোহ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সারা ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন তীব্র হয়। সামরিক বাহিনীতে তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে থাকে। এখানে বলে রাখা ভালো যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বামপন্থীরা পরিকল্পনামাফিক কিছু রাজনৈতিক কর্মীকে সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়েছিল। এরাই পরবর্তীকালে এ বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলব।

এ পরিস্থিতিতে রাওয়ালপিন্ডিতে বিমানবাহিনীর সদস্যরা বিদ্রোহ করল। প্রকাশ্যে নৌবাহিনীর সদস্যরা বিদ্রোহ করুল বোম্বেতে। বোরে বিদ্রোহে শঙ্কিত হলো ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু এ বিদ্রোহ থামানো যাবে কিভাবে। বিদ্রোহীরা জাহাজে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও কমিউনিস্টদের লালঝাণ্ডা উড়িয়েছে। বোম্বেতে কার্ফু জারি করা হয়েছে। বিদ্রোহ দমন করা গেল না।

ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারলো কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ নেতাদের সহযোগিতা ব্যতীত এ বিদ্রোহ দমন করা যাবে না। তখন মুসলিম লীগ সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কলকাতা সফর করছিলেন। তাকে জরুরি ভিত্তিতে বম্বে আনা হলো। কংগ্রেসের দু’নম্বর জাঁদরেল নেতা বল্লভভাই প্যাটেল বম্বেতে ছিলেন। জিন্নাহ ও বল্লভভাই প্যাটেলকে বম্বের সমুদ্রতীরে কার্ফুর ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। তাঁরা মাইকে বিদ্রোহী নৌবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। বললেন, শান্ত হও। দেশ স্বাধীন হবে।

কী অভিনব দৃশ্য! একজন ভারত ভাগ করে পাকিস্তান করতে চান–অপরজন অখণ্ড ভারত চান। এঁরা এক হলেন ব্রিটিশ সরকারের অনুরোধে বিদ্রোহ থামাতে। অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের মতোই এঁরা কেউই চাইতেন না যে, ভারতবর্ষ সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন হোক। কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ আসে স্বাধীনতা চেয়েছে। আপসে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চেয়েছে ব্রিটিশ সরকার। ভারতবর্ষে তার কোটি কোটি টাকার পুঁজি খাটছে। ভারতের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। সেই ভারতবর্ষ সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন হলে সবকিছু হারাতে হবে ব্রিটিশকে। সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা এলে মুসলিম লীগের পাকিস্তান হবে না। ক্ষমতা আসবে না কংগ্রেসের হাতে। তাই বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশ, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ তিনপক্ষই একমত এবং ঐক্যবদ্ধ।

চতুর্থ ঘটনা ঘটলো ২৯ জুলাই। ডাক ও তার কর্মচারীদের সমর্থনে সারা ভারতে হল। বক্ষের বিদ্রোহ থামানো কংগ্রেস, মুসলিম লীগ নেতাদের পক্ষে সম্ভব হলেও ২৯ জুলাইয়ের ঘটনায় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হলো। ভারতের রাজনীতিতে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক সমাজের নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শঙ্কিত করে তুলল। দীর্ঘদিন ধরে সারা ভারতে ডাক ও তার কর্মচারীরা ধর্মঘট করে আসছিল। তাদের সমর্থনে সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলো প্রথমবারের মতো সারা ভারতে হরতাল আহ্বান করে। ২৯ জুলাই সারা ভারতে হরতাল পালিত হলো। এবার শঙ্কিত হলো ব্রিটিশ, কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ। পাকিস্তানের দাবিতে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম আহ্বান করলো মুসলিম লীগ। ইংরেজিতে বলা হলো ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে। কিন্তু এই প্রত্যক্ষ সংগ্রাম কার বিরুদ্ধে? জিন্নাহ সাহেব বা মুসলিম লীগ এ প্রশ্নের জবাব দিলেন না। ২৯ জুলাইয়ের ১৬ দিন পর ১৬ আগস্ট এলো। প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের পরিণতি কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দেশে-বিদেশে প্রচারিত হলো গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং বলে। প্রমাণিত হলো ২৯ জুলাইয়ের শ্রমিক-জনতার ঐক্য ঠুনকো ঐক্য। ১৬ আগস্ট প্রমাণিত হলো হিন্দু-মুসলমান এক নয়। তারা পৃথক জাতি। তাদের পৃথকভাবে বসবাস করতে হবে। তাই মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র বাসভূমি চাই। সংখ্যালঘু মুসলমানদের বাঁচতে হবে মান-সম্মান, ইজ্জত এবং মর্যাদা নিয়ে। সুতরাং পাকিস্তান চাই।

আমি বরিশাল বিএম কলেজের ছাত্র। সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে প্রায় জড়িয়ে গেছি। নিয়মিত আরএসপি অফিসে যাই। প্রবীণ নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়। এদের গোটা জীবনের ইতিহাস কারাবরণের ইতিহাস। বরিশালে বিশেষ করে ছাত্রদের মধ্যে এদের প্রভাব প্রতিপত্তি প্রবল। ঐ চরম সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিনেও এদের ছাত্র ফ্রন্টের প্রথম সারিতে মরহুম মোজাম্মেল হক, আবুল কালাম শামসুদ্দীন (পরবর্তীকালে শামসুদ্দীন আবুল কালাম), আব্দুল খালেক খান (পরবর্তীকালে সাংবাদিক), জাহিদ হোসেন জাহাঙ্গীর প্রমুখ। তখন দেখা হয়েছিল প্রণব ঘোষের সাথে। সদ্য জেলখানা থেকে এসেছেন। বিএ ক্লাসের ছাত্র। সরকারি নির্দেশে গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত। কলেজে আসতে পারতেন। তবে ক্লাসে ঢুকবার অনুমতি ছিল না। ক্লাসে ঢুকবার দুয়ারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনতেন।

তখন আমরা ছাত্র ফেডারেশন (১৮ মির্জাপুর স্ট্রিট)-এর সদস্য। এই ছাত্র সংগঠনের ইতিহাসও বিচিত্র। ত্রিশের দশকে নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশন গঠিত হয়। এই ছাত্র ফেডারেশনের ভাঙন আসে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। তখন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এন এফ) নামে কাজ করত। ১৯৪১ সালের জুন মাসে জার্মানি রাশিয়া আক্রমণ করলে কমিউনিস্ট পার্টি যুদ্ধকে জনযুদ্ধ বলে ঘোষণা করে। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির তখন কোনো প্রকাশ্য সংগঠন না থাকায় ছাত্র ফেডারেশনের মঞ্চ থেকে তারা যুদ্ধকে জনযুদ্ধ ঘোষণা দেয়। এতে তীব্র আপত্তি করে কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ব্লক, জয়প্রকাশ নারায়ণের কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টি ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল (আরএসপি)। এর পরিণতিতে নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশন দুভাগ হয়। নিখিল ভারত ছাত্র কংগ্রেস গঠিত হয়।

তবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে নিখিল ভারত ছাত্র কংগ্রেস গঠিত হলেও বাংলাদেশে তার ভিন্ন রূপ ছিল। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশন ভেঙে গেলেও বাংলাদেশে আরএসপি’র নাম পাল্টাল না। কমিউনিস্ট প্রভাবিত ছাত্র সংগঠনটির নাম থাকল ছাত্র ফেডারেশন (১৮ মির্জাপুর স্ট্রিট)। কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের নাম হলো বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র কংগ্রেস। আর সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মুসলিম লীগের ছাত্র প্রতিষ্ঠানের নাম নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন হলেও বাংলাদেশে তাদের ছাত্র সংগঠনের নাম হলো মুসলিম ছাত্রলীগ।

একদিন বরিশালে অশ্বিনীকুমার টাউন হলে গেলাম হিন্দু মহাসভার জনসভা শুনতে। ভাষণ দিচ্ছিলেন প্রখ্যাত ব্যারিস্টার নির্মল চ্যাটার্জি। তিনি খুব ঔদ্ধত্যপূর্ণ সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিচ্ছিলেন। আমি উত্তেজিত হয়ে গেলাম। খেয়াল হলো আমার কাছে দাঁড়ানো আমার এক প্রাক্তন শিক্ষক। তার নাম রমেশ চ্যাটার্জি। কলসকাঠি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি আমাকে থামাতে চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন, তুমি কি জান নোয়াখালীতে মুসলমানেরা হিন্দু মেয়েদের স্তন কেটে নিয়েছে? আমি বললাম, আমি এও জানি যে বিহারের হিন্দুরাও মুসলমান মেয়েদের স্তন কেটে নিয়েছে। মাস্টারমশায় আমার দিকে গভীরভাবে তাকালেন। আমি চলে এলাম। ঠিক বুঝতে পারলাম না শিক্ষকের মুখে জবাব দেয়া ঠিক হয়েছে কি না। সেকালে ছোটবেলা থেকে আমাদের শেখানো হতো গুরুজনদের কথায় জবাব দিতে নেই।

তবে এ ধরনের কথাবার্তা আমি কোনোদিনই মানিনি। তারও একটা পটভূমি ছিল। ১৯৪৪ সালে আমি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হই। আমাদের বয়স তখন কম ছিল। আমরা জনাত্রিশ ছাত্র হাফপ্যান্ট পরে কলেজে আসতাম। সামনের বেঞ্চে বসতাম। লেখাপড়ায় খুব ভালো না হলেও সকলের ধারণা ছিল ছাত্র হিসেবে আমরা মন্দ নয়। পেছনের বেঞ্চের ছাত্ররা আমাদের এড়িয়ে যেত। তাই কথা বলায় আমাদের একটা অহমিকা ছিল। এই অহমিকা প্রকাশ পেত বিতর্ক শুরু হলে। দাঙ্গা আর সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে তর্ক শুরু হলে প্রায় একঘরে হয়ে যেতাম। কারো সাথে একমত হতে পারতাম না। কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম সাম্প্রদায়িক মনোভাব লক্ষ্য করতাম।

ঠিক এ সময় পার্টির সিদ্ধান্ত হলো গ্রামে যাবার। দাঙ্গার ভয়ে গ্রামের মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত। গ্রামে যেতে হবে। দাঙ্গার পরিবেশ ঠেকাতে হবে। পার্টির নেতা অনিল দাশ চৌধুরী। আমাকে তার সাথে যেতে হবে ভোলা মহকুমায়। সপ্তাহখানেক ভোলায় কাটালাম। তখনই চিনেছিলাম দৌলতখান, গুপ্তেরবন্দর, রাধাবল্লভ, বোরহানউদ্দিন, লালমোহন।

ভোলা থেকে ফিরে মন আরো খারাপ হয়ে গেল। দেখলাম সর্বত্র একটা দুঃখজনক অবিশ্বাস বিরাজ করছে। শতাব্দী ধরে যারা পাশাপাশি বাস করছিল তারা বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। আমার কাছে মনে হচ্ছিল ভারতবর্ষ বিভক্ত হলে কোনো চিন্তাভাবনা না করে হিন্দুরা এ দেশ ছেড়ে চলে যাবে।

কিন্তু আমরা কী করবো। বায়োজ্যেষ্ঠ অনিল দাশ চৌধুরী। মোজাম্মেল হক এমপ্লয়মেন্ট এক্সপ্রেসে চাকরি করেন। শামসুদ্দীনদা বিএ পাস করে কলকাতা চলে গেছেন। খালেকদা আছেন। এর পরে আমরা সবাই বয়সের দিক থেকে সমান।

নয়াদিল্লিতে তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হয়েছে। এ সরকার হয়েছে সর্বদলীয়। এ সরকারের প্রেসিডেন্ট বড় লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার বল্লভভাই প্যাটেল। আর অর্থমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। ঠিক এ বছরই নয়াদিল্লিতে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল আরএসপির প্রথম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। সম্মেলনে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয় যে, ভারতবর্ষ বিভক্ত হলে এই উপমহাদেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত হবে। আর এই ঘাটি ব্যবহৃত হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে।

তবে আমাদের কাছে মুখ্য প্রশ্ন হলো সে মুহূর্তে আমাদের ভূমিকা কী হবে? আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করব ভারতের অন্তবর্তীকালীন সরকারকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের ছাত্র ফ্রন্টের কাছে নির্দেশ এল ছাত্রদের নিজস্ব দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন শুরু করার। আমার এখন মনে পড়ে আমরা শিক্ষামন্ত্রীকে একটি স্মারকলিপি পাঠিয়েছিলাম এই নির্দেশ পাবার পর। তখন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন সাফায়েত আহম্মদ খান।

আমরা তখন নিখিল বঙ্গ ছাত্র কংগ্রেসের সদস্য। আমাদের ছাত্র ফেডারেশনের নাম পাল্টাতে হয়েছে নিখিল ভারত কংগ্রেসের নির্দেশে। এ নির্দেশ মানতে মানতে উপমহাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসে যায়।

ভারত বিভাগ তখন অবশ্যম্ভাবী। এবার দাবি উঠেছে পাঞ্জাব ও বাংলা বিভাগের জন্য। মনে হচ্ছে সারা ভারতবর্ষে ভারতবাসী বলে কেউ নেই। সকলেই হিন্দু বা মুসলমান। তাই দাবি উঠছে হিন্দু এলাকাগুলো ভারতের অন্তর্ভুক্ত হোক। মুসলিম এলাকাগুলো থাক পাকিস্তানে। এক সময় যারা বাংলা বিভাগকে মায়ের অঙ্গচ্ছেদ বলে মনে করত তারাই বাংলা বিভাগের দাবি করল সবচেয়ে আগে।

তখনকার একটি ঘটনা আমার চোখের সামনে ভাসে। নয়াদিল্লিতে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির মিটিং বসেছে। এ বৈঠকে ভারত বিভাগ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হবে। এই বৈঠকে ভারত বিভাগের বিরুদ্ধে মাত্র দু’জন বক্তাই কথা বলছেন। একজন জয় প্রকাশের সমাজতান্ত্রিক দলের অরুণা আসফ আলী। অপরজন বাংলাদেশের রংপুরের অধিবাসী বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল আরএসপি’র সদস্য কমরেড সুনীল দেব।

কংগ্রেসের সভায় ভারত বিভাগ প্রস্তাব পাস হয়ে গেল। কংগ্রেসের অধিবেশন শেষ হলে সাংবাদিকরা এল অরুণা আসফ আলীর কাছে। সাংবাদিকরা বললেন বামপন্থীরা হেরে গেছে। বিক্ষুব্ধ অরুণা আসফ আলী বললেন, না দক্ষিণপন্থীরা জিতে গেছে। এটাই ছিল অরুণা আসফ আলীর কথা বলার ধরন। অরুণা আসফ আলীর জন্ম বরিশাল শহরে। নাম অরুণা গাঙ্গুলি। গ্রামের বাড়ি বরিশালের গৌরনদী। বিয়ে করেছিলেন কংগ্রেস নেতা আসফ আলীকে। খ্যাতি লাভ করেছিলেন ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়। আত্মগোপন করে আন্দোলন করেছিলেন। আবার একদিন ঘোষণা দিয়ে ব্রিটিশের চোখের সামনে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন কলকাতার এক জনসভায়।

কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ দেশ বিভাগ মেনে নেবার পর বাংলা বিভাগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার চেষ্টা হয়েছিল বাংলাদেশে। দাবি করা হয়েছিল সার্বভৌম বাংলার। এ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসু, শহীদ সোহরাওয়াদী, অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগ সম্পাদক জনাব আবুল হাশিম, বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল আরএসপি ও ফরোয়ার্ড ব্লক। কিন্তু সে আন্দোলন তেমন কাজে আসেনি। সিন্ধু, গঙ্গা ও যমুনায় তখন অনেক জল গড়িয়েছে। আমাদের তখন ঘর গোছাবার পালা।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট গভীর রাতে দেশ ভাগ হয়ে গেল। গ্রামের পর গ্রাম থেকে হিন্দুরা চলে যেতে থাকল। ওপার থেকে এল পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মুসলমানরা। ১৯৪৭ সালে পূজায় বাড়ি গেলাম। দেশের প্রায় সকলেই শঙ্কিত। সকলেই শেষ সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। সকলেরই ধারণা এদেশে থাকা যাবে না। এদিকে আবার আরেক ঘটনা ঘটিয়েছে আমার আর এক কাকা। তিনি কংগ্রেস করতেন। ব্রিটিশ আমলে গহে অন্তরীণ ছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট বাড়িতে পাকিস্তানের পতাকা উড়ালেন না। উড়ালেন কংগ্রেসের দলীয় পতাকা। যদিও কংগ্রেসের দলীয় পতাকা এবং ভারতের জাতীয় পতাকা এক নয়। তবুও এই দুই পতাকার অনেকটা মিল আছে। ভুল বুঝবার অবকাশ আছে। অনেকেই কাকার কংগ্রেসের পতাকা ওড়ানোকে ভারতের পতাকা বলে মনে করল। কাকার যুক্তি হচ্ছে যে কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠানে আমার দলীয় পতাকা ওড়াবার অধিকার আছে। পাকিস্তান কংগ্রেস অবলুপ্ত হচ্ছে না। পাকিস্তানে কংগ্রেস থাকবে তাই তার পতাকাও থাকবে। তাই পতাকা ওড়াবার অধিকারও থাকবে।

পূজার সময় আমার সাংবাদিক ও অধ্যাপক কাকা ড. ধীরেন্দ্রনাথ সেন বাড়ি এলেন। সেটাই তাঁর শেষবারের মতো বাড়ি আসা। তিনি একটা অদ্ভুত কথা বললেন। তিনি বললেন, তোমরা কেউ দেশ ছেড়ে চলে যেও না। তোমরা দেশ ছেড়ে গেলে এসকল গ্রামে অবাঙালিদের পুনর্বাসিত করা হবে। পাকিস্তান হবে দুই অর্থনীতির দেশ। অর্থনৈতিক কারণেই পাকিস্তান টিকবে না। টিকতে পারে না।

সেই আমার কাকার সাথে শেষ দেখা। কাকা বাড়ি থেকে চলে যাবার পর আমাদের বাড়িতে পুলিশের হামলা হলো। হঠাৎ পুলিশ এসে দালানের সিঁড়ির নিচ থেকে একটি অকেজো বন্দুক আবিষ্কার করল। ঘন্টার পর ঘন্টা মেয়েদের আটকে রাখল। সারা বাড়ি জুড়ে এক তোগলকি কাণ্ড। পুলিশের নেতৃত্ব দিলেন বর্ডার মিলিশিয়ার নর্টর জোন্স। আমার সেই কংগ্রেসি কাকাকে গ্রেফতার করা হলো। আমাদের বাড়িতে হামলা চালাবার আগে বেছে বেছে ১৬ জন তফশিলি নেতাকে গ্রেফতার করা হলো। গোপালগঞ্জে তখনও হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তফশিলি নেতারা খুবই প্রভাবশালী। আমাদের বাড়িতে হামলার প্রতিক্রিয়া হলো তীব্র। গ্রামের পর গ্রাম শূন্য হতে থাকল। শতকরা ৯৫ জন মধ্যবিত্ত হিন্দু দেশ ছেড়ে চলে গেল। আমি তখন বরিশালে। চতুর্থ বর্ষ বিএসসির ছাত্র। বিএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আসছে। পড়াশোনার খোঁজ নেই। অনার্স পড়া ছেড়েছি বছরখানেক আগে। রাজনীতি করে অনার্স পড়া হয় না। দল থেকে বলা হয়েছে অনার্স পড়া চলবে না। নিয়মিত বিএসসি পরীক্ষা দেবে কিনা তাও ভেবে দেখতে হবে। তোমরা বিএসসি পরীক্ষা দিয়ে চলে গেলে নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা দেবে। এ পরিস্থিতিতে বিএসসি টেস্ট পরীক্ষা এগিয়ে এল। আমি তখন বরিশাল শহরের কালিবাড়ি রোড বাণীপীঠ স্কুলের একটি কক্ষে থাকি। সে স্কুলটি এখন নেই। বরিশাল বিএম স্কুলের পশ্চিমে সেই এলাকায় এখন পরিবার পরিকল্পনার বিরাট দালান। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর বাণীপীঠ স্কুলের প্রধান শিক্ষক স্নেহাংশু সেনগুপ্তকে গ্রেফতার করা হয়। স্কুলটি উঠে যায়। সেই স্কুলের জমিতে পরবর্তীকালে ধান চাষ করতে দেখেছি। পরে উঠেছে পরিবার পরিকল্পনার দালান।

সেই বাণীপীঠ স্কুলের কক্ষে মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষার পড়া পড়ছিলাম। পরের দিন টেস্ট পরীক্ষা। সন্ধ্যার পরে অনিলদা এলেন। অনিলদা অর্থাৎ দলের নেতা অনিল দাশ চৌধুরী এসে বললেন, তোমার কাল পরীক্ষা দেয়া হবে না। কলকাতা থেকে কৃষ্ণ সেন এসেছেন। বাড়ি খলিশাকোঠা। কৃষ্ণ সেন কৃষক ফ্রন্টে কাজ করছেন। আমাদের কৃষক ফ্রন্টে কিছু কাজ আছে গৌরনদীর মেদাকূলে। তোমাকে কৃষ্ণ সেনের সঙ্গে মোকূল যেতে হবে।

সুবোধ বালকের মতো ব্যাগে জামা কাপড় গোছালাম। মোমবাতি নেভালাম। ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বুঝলাম এবার বিএসসি পরীক্ষা দেয়া আমার হবে না। তখন জানতাম না, আর এক ঘটনা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

চারদিন পরে বরিশাল ফিরলাম। এসে দেখলাম আমার রুম খোলা। কাপড় জামা বই বিছানা কিছুই নেই। পার্টি অফিসে ছুটলাম। অনিলদা বললেন, তোমার সব কিছু নিয়ে গেছে পিনাকী বোস। তুমি পিনাকীর খুড়তুতো বোনদের গালি দিয়েছিলে। তুমি নাকি বলেছিলে এ বয়সের মেয়েদের ড্যাং ড্যাং করে রাস্তায় বের হওয়া ঠিক নয়। পার্টির কাজ থাকলে তাদের বাড়িতে খবর দেয়া হবে। পিনাকীর কাকীমা একথা শুনে ক্ষেপে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শাসন করতে হলে ঐ ছেলে যেন আমাদের বাড়িতে এসে শাসন করে। রাস্তায় আমাদের মেয়েদের শাসন করা যাবে না। তাই তোমার অনুপস্থিতিতে ওরা তালা খুলে সবকিছু নিয়ে গেছে। ঘটনাটি এমন দাঁড়াবে তা আমি কোনোদিন ভাবিনি। সেকালে রাজনীতির মেয়েদের নিয়ে অনেক কথা হতো। এ ব্যাপারে কমিউনিস্ট পার্টির দুর্নাম ছিল সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির অসংখ্য কমরেড নিজেরা নিজেরা বিয়ে করে ফেলেছেন। অনেকে কৌতুক করে কমিউনিস্ট পার্টির অফিসকে প্রজাপতির অফিস বলত। তাই পরিস্থিতি হয়ে দাঁড়াচ্ছিল ভিন্নতর।

আমাদের দলে অনেক মেয়ে ছিল। আমরা আবার অনুশীলন সমিতির উত্তরাধিকার। অনুশীলন সমিতির অধিকাংশ নেতা অকৃতদার, সংযমী, উদার এবং আদর্শ চরিত্রের অধিকারী। তাই মেয়েদের রাজনীতি নিয়ে আমাদের অফিসেও আলোচনা হতো। একদিন ছাত্র বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিল আমাদের অফিসে এমন ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল আমাকে। তাই যা ঘটবার তাই ঘটেছে। পিনাকীর বোন শান্তি, তার কাকার মেয়ে সাধনা ও বাসনা প্রায় প্রতিদিন আমাদের অফিসে আসত। আমি তাদের একদিন ধমকে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, কাজ না থাকলে অফিসে না আসতে। যার পরিণতিতে পিনাকীদের বাসায় আমার যেতে হলো। তবে সেখানেও আমার বেশি দিন থাকা হয়নি। তারাও এদেশে থাকেনি। ১৯৪৮ সালের ২৯ মার্চ ওদের আমি পৌঁছে দিয়েছিলাম শিয়ালদহ। শিয়ালদহ স্টেশনে পিনাকীর কাকিমা বলেছিলেন আমি কলকাতায় বাড়ি করব। তোমার জন্য একটি কক্ষ থাকবে সেই বাড়িতে। যদি কোনোদিন ভারতে আস তাহলে আমার খোঁজ কোরো।

তারপর ৪৮ বছর কেটে গেছে। ১৯৭১ সাল থেকে ভারতে যাতায়াত করছি। কোনোদিনই কাকীমাকে খোঁজ করা হয়নি। খোঁজ করিনি সাধনা, বাসনা বা শান্তির। আর এতদিন নিশ্চিয়ই কাকিমা বেঁচে নেই। আর সবচেয়ে মর্মান্তিক হচ্ছে বেঁচে নেই আরএসপির এককালের একনিষ্ঠ কর্মী পিনাকী বোস। গৌরনদী থানার চাঁদসী বোস বাড়ির ছেলে পিনাকী বোস। আত্মীয় স্বজন সব চলে গেলেও পিনাকী বোস পাকিস্তান ছাড়েনি। তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে ‘৭১ সালে। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী পিনাকী বোসকে খুন করেছে। আমার কাকীমার কাছে যাবার যোগাসূত্র ছিন্ন হয়ে গেছে। শুধু পিনাকী বোসের কাকীমা-বরিশালের চাঁদসীর সতীশ বোসের স্ত্রী নন, এমন অনেক মা-বোনের কথা আজ মনে পড়ে। ১৯৪৭ সালের জুন মাস। রাজনীতির কারণে গিয়েছিলাম বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠি, কামারখালী, জলাবাড়ি ও সমুদয়কাঠি। স্বরূপকাঠিতে খালের পাড়ে এক ক্লাবঘরে সভা করছিলাম। সভায় বাদল দত্ত নামে একটি ছেলে এল। স্কুলের ছাত্র। বলল, মা আপনাকে ডেকেছে। আমি বললাম, তোমার মা। তিনি আমাকে দেখলেন কী করে? বাদল বলল, আপনি যখন খালপাড় দিয়ে আসছিলেন মা আপনাকে দেখেছেন।

সভা শেষে বাদলদের বাড়ি গেলাম। বাদলের মা বললেন, তুমি বসো। তুমি দুপুরে এখানে খাবে, ঘুমাবে। বিকালে তোমাকে নৌকা করে দেব। তুমি যেখানে খুশি যাবে। আমি বললাম, আমি খেয়ে এসেছি। বাদলের মা হেসে ফেললেন। বললেন, তুমি লক্ষ করনি যে যাবার সময় তোমাকে আমি দেখেছি। বুঝেছিলাম তুমি কিছুই খাওনি ভোর থেকে। আমার রান্না হয়ে গেছে। তুমি খেয়ে যাবে।

বাদলের মা’র কথা অসত্য ছিল না। আগের দিন বরিশাল থেকে বানারীপাড়ায় পৌঁছেছিলাম। থাকার জায়গা ছিল না। উঠেছিলাম নরত্তোমপুরের রামকৃষ্ণ মিশনে। মিশনে বড় বড় পাথরের বাটি, জল, নিরামিশ আর বড় বড় লাল চালের ভাত। রাতে তেমন খাওয়া হয়নি। ভোরে সেখানে খাবার প্রত্যাশাও ছিল না। ভোরে রওনা হয়ে এসেছি স্বরূপকাঠি।

সেকালে ভাটা ও জোয়ারের উপর নির্ভর করে নৌকা চলাচল করত। বানারীপাড়া থেকে ভাটিতে স্বরূপকাঠি জলবাড়ি, কাউখালী হয়ে পিরোজপুর যাওয়া যেত। জোয়ারের সময় আবার ফেরা যেত একই পথে নৌকায়। পয়সা অনেক কম লাগত। সেদিনও সূর্য পশ্চিমে হেলে যেতে থাকলে বাদলের বাড়ি স্বরূপকাঠি থেকে হুলারহাট যাবার নৌকায় উঠেছিলাম। নেমেছিলাম সমুদয়কাঠি। গন্তব্যস্থান উপেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি। উপেন্দ্রনাথ দত্ত পিরোজপুরের হিন্দু স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁর ছেলে সরোজ আমাদের সাথে রাজনীতি করত। সে অনেক কাল আগের কথা। অনেক ঘটনার এক ঘটনা। কোনোদিন মনে করিনি বাদল আর বাদলের মা’কে। যিনি বলেছিলেন, তুমি কার ছেলে জানি না। আমার বাড়ি থেকে না খেয়ে যেতে পারবে না। তুমি খেয়ে ঘুমাও। বিকালে আমি নৌকা ঠিক করে দেব।

তবে টেস্ট পরীক্ষা না দিলেও পরীক্ষার জন্য এলাউ হতে আমার তেমন কষ্ট হয়নি। কলেজের অধ্যাপকরা আমাকে বড্ড ভালবাসতেন। বিশেষ করে ভালোবাসতেন পদার্থবিদ্যার শিক্ষক বিমলাপ্রসন্ন রায়। তিনি কলেজের সব কিছু নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। লেখাপড়া থেকে খেলাধুলা সবই তাঁর নেতৃত্বে হতো। শিক্ষক হিসেবে তিনি তেমন নাম করতে পারেননি। কিন্তু নাম করেছিলেন পরোপকারে। বিমলাপ্রসন্ন রায় সব ছাত্রদের বন্ধু।

টেস্ট পরীক্ষার পর কলেজে ঢোকামাত্র তিনি চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, কোথায় ছিলে? পরীক্ষা দাওনি কেন? আমি বললাম, আমি এবার পরীক্ষা দেব না। আমার প্রস্তুতি নেই, টাকাও নেই। বিমলা বাবু বললেন, কোনো চিন্তা নেই, সবই হবে। তুমি টেস্টে অ্যালাউ হবে। তোমার টাকাও জোগাড় করা হবে। তিনি আমাকে সঙ্গে করে অধ্যক্ষ সুরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের কাছে নিয়ে গেলেন। আমি পরীক্ষায় অ্যালাউ হলাম। আমার ৫ মাসের মাইনে মাফ করা হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক অবস্থায় পরীক্ষা দিতে পারলাম না।

১৯৪৮ সালের ২৮ আগস্ট আমার বিএসসি পরীক্ষা শুরু। গ্রেফতার হয়ে গেলাম ২০ আগস্ট। অদ্ভুত এক স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলো। কোথায় মানুষ উল্লাস করবে, উৎসব করবে! সেই উৎসব এল খণ্ডিত রূপে। পাকিস্তানে হিন্দু, শিখ সম্প্রদায় এবং ভারতে মুসলমানরা ভয়ে ভয়ে থাকল। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ ব্যতীত কংগ্রেসসহ সকল রাজনৈতিক দলের মনে হলো কখন জেলে যেতে হবে। বিশেষ করে শঙ্কিত হলো কমিউনিস্ট পার্টি ও আরএসপি। এরা মার্কসবাদে বিশ্বাস করে। এরা সমাজতন্ত্রী। নাস্তিক। পাকিস্তান ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। পাকিস্তানে কোরান-সুন্নার অনুসরণে সংবিধান হবে। এ রাষ্ট্রে এই বামপন্থীদের স্থান কোথায়!

বিশেষ করে ভয় দেখা দিল আরএসপি’র। কমিউনিস্ট পার্টি ভারত বিভাগ সমর্থন করেছে। কমিউনিস্ট পার্টির জ্যোতি বসু ও রতন লাল ব্রাহ্মণ, রূপনারায়ণ রায় আইনসভায় বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। দেশ বিভাগের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু আরএসপি আন্দোলন করেছে সার্বভৌম বাংলার জন্য।

এছাড়া বরিশালে আছে আর এক বিপদ। বরিশালের মুসলিম লীগে নাজিমুদ্দিন গ্রুপের মুসলিম ছাত্রলীগের প্রভাব বেশি। তাদের সাথে এক হয়ে আরএসপি’র ছাত্র কংগ্রেস গান্ধী নিহত হবার পর বরিশালে মিছিল ও আন্দোলন করেছে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে নাজিমুদ্দিন গ্রুপ মুসলিম ছাত্রলীগের সাথে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে হরতাল করেছে। ক্ষমতাসীন মহলে এ নিয়ে উমা আছে। আছে উদ্বেগ। ইতোমধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছে কলকাতায়। সাবেক সম্পাদক পিসি যোশীকে সরে যেতে হয়েছে। সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন বিটি রনদিতে। কমিউনিস্ট পার্টি জঙ্গি লাইন নিয়েছে। ঘোষণা করেছে, ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হায়, লাখ ইনসান ভুখা হ্যায়’। সুতরাং এবার আন্দোলন।

কংগ্রেসের পর কমিউনিস্ট পার্টিও আন্দোলনে নেমেছে। দেয়ালে পোস্টার পড়েছে। গ্রেফতার হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা। তাদের ওপর চরম নির্যাতন নেমে আসছে। একদিনে বরিশাল সদর রোডে আমাদের পার্টি অফিসের কাছাকাছি গিয়ে শুনলাম, পুলিশ অফিস ঘেরাও করেছে। গ্রেফতার হয়েছে তিনজন কর্মী। পার্টি অফিসে নাকি বোমা পাওয়া গিয়েছে। একেবারে তাজা বোমা।

এ বোমা রেখেছিলেন আমাদের মুসলিম ছাত্রলীগের এক বন্ধু পুলিশের সহযোগিতায়। এখানেও শেষ রক্ষা হলো না। কমিউনিস্ট পার্টি মে দিবস পালনের অনুমতি চাইল। জেলা কর্তৃপক্ষ রাজি হলো না। বলা হলো রাশিয়ার কোনো দিবস পাকিস্তানে পালিত হবে না। অন্ধ কমিউনিস্ট বিদ্বেষ তাদের বিচার-বুদ্ধিকেও লুপ্ত করেছিল।

২১ এপ্রিল ইকবাল দিবস। আমাদের ছাত্র প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ছাত্র এসোসিয়েশন (পিএসএ) ইকবাল দিবস পালনের অনুমতি চেয়েছিল। অনুমতি দেয়া হলো না। উপরন্তু ইকবাল দিবস পালনের পোস্টারটিও বাজেয়াপ্ত করা হলো।

উল্লেখ্য, পাকিস্তান সৃষ্টির পর আমরা ছাত্র কংগ্রেস নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে বাঁচিয়ে রাখলেও, মূল ছাত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি পাকিস্তান ছাত্র এসোসিয়েশন নামে। আরএসপি এ সিদ্ধান্ত নেয় ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে ময়মনসিংহ শহরে। এ সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মৃণাল দত্ত ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র রুহুল আমিন কায়সার।

১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের শেষে কাকীমাকে দিতে যাই কলকাতায়। টেলিগ্রাম এল তাড়াতাড়ি চলে এসো। মা, ভাইবোন সকলে কলকাতা চলে গেছে। সকলকে বোঝাতে হলো, বিএসসি পাস করেই চলে আসব। বরিশালে ফিরে দেখি সব গোলমাল হয়ে গেছে। বোমার মামলার পর জুন মাসে আমাদের এক পোস্টার নিয়ে মামলা হলো। পোস্টারে লেখা হয়েছিল খাদ্য সমস্যা নিয়ে। আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল–আবারও কি পঞ্চাশ সালের মতো দুর্ভিক্ষ আসছে! এবার গ্রেফতার হয়ে গেলেন দলের নেতা অনিল দাশ চৌধুরী, মোজাম্মেল হক, আব্দুল খালেক খান ও ছাত্রনেতা নারায়ণ দাশ শর্মা। নারায়ণ আমার সাথে বিএসসি পরীক্ষার্থী।

রাজনীতিকদের কাছে বরিশাল তখন এক বিপন্ন শহর। হাঁটতে গেলে লোক পিছু লাগে। উকিল-মোক্তার মামলা নিতে চায় না। কারো কাছে গেলে ভয় পায়। আমাদের পক্ষে দেন দরবার করার লোকও বিরল। হিন্দুদের মনে আশঙ্কা। জড়িয়ে পড়ে বিপদ ডেকে আনব নাকি।

আমার একমাত্র কাজ আইবি অফিসে যাওয়া। থানায় যাওয়া। আদালতে জামিনের জন্য চেষ্টা করা। আমার সুবিধে হচ্ছে দেশভাগের আগে আমার কাকা বরিশাল সদর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ছিলেন। আমি সকলের চেনা।

কিন্তু তদ্বিরে তেমন কাজ হলো না। বোমা মামলায় জামিন পাওয়া গেলো। পোস্টারের মামলায় জামিন মিলল না। ইতোমধ্যে এগিয়ে এসেছে নারায়ণের পরীক্ষা। পরীক্ষার আগে তার জামিন প্রয়োজন। ২৮ আগস্ট আমারও পরীক্ষা। নারায়ণ জামিনে মুক্তি পেল ১৮ আগস্ট। আমাকে গ্রেফতার করা হলো ২০ আগস্ট। মনে হলো এবার পরীক্ষা আর দেয়া হবে না। গ্রেফতার হয়ে বরিশালে রাজনীতির এক পর্ব শেষ হলো।

তবে পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছিলেন জেল কর্তৃপক্ষ। বরিশাল জেলখানা থেকে জনাদশেক পুলিশ আমার হাতে হাতকড়া দিয়ে মিছিল করে হেঁটে যেত বিএম কলেজে। রাস্তায় লোকের ভিড় হতো। পরীক্ষার হলে যেতাম। পড়ার বই ছিল না। তবুও পরীক্ষার নাম করে হলে যেতাম। বন্ধুদের চিঠি লিখতাম। দলের খবর আদান-প্রদান করতাম। দূর থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমার প্রিয় শিক্ষকেরা দেখতেন। সকলেই বিষণ্ণ। কারণ কারো কিছু করার নেই বা ছিল না। এমনি করে পরীক্ষার ভান করতে করতে জেলে ফিরে দেখি নারায়ণ আবার গ্রেফতার হয়ে এসেছে। কারণ তার লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বিজ্ঞানের ছাত্র। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা বাকি। তাই তাকে আর বাইরে রাখা ঠিক নয়। আমরা বাইরে থাকলে পাকিস্তান কি টিকবে!

এবার দুজনেই প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা দেবার জন্য কলেজে গেলাম। আজ দীর্ঘদিন পরে সেকালের শিক্ষক আর ল্যাবরেটরির পিওনদের জন্য দুঃখ বেদনায় মন ভারাক্রান্ত হয়। ওরা প্রত্যেকে প্রাকটিক্যাল পরীক্ষায় আমাকে সাহায্য করেছিল সব দিক থেকে। কেউ জানত না আমি পরীক্ষা দিচ্ছি না। প্রতিদিন ভান করছি পরীক্ষার নামে।

আমি জেলে যাব এ কথা আমি আদৌ ভাবিনি। ভেবেছিলাম সবাই গ্রেফতার হলে আমি বেঁচে যাব। দেশ ভাগের আগে আমার কাকা বরিশালের পুলিশ বিভাগে ছিলেন। পারিবারিক সূত্রে পুলিশ বিভাগের বড় বড় কর্মকর্তাদের সাথে আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তখন আমার একমাত্র কাজ ছিল সকল দলের বন্দিদের জন্য তদবির করা। প্রতিদিন আমাকে থানায় যেতে হতো। আইবি অফিসে যেতে হতো। আদালতে যেতে হতো। তখন আমি বিএম কলেজের বিএসসি শেষ বর্ষের ছাত্র। আমাদের পার্টি অফিস সদর রোডের আর্ট ভিলার দোতলায়। নিচতলায় বাড়ির মালিক অনিল ঘোষ। অনিল দা আমাদের দলের সমর্থক ছিলেন। অনিল দার কাকা প্রবীণ বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ। অনিলদার ওখানে বসতাম। এক কাপ চা খেতাম। অনিলদা বলতেন–এবার তুমি চলে যাও। তোমার পাহারাদার এসে গেছে। আমি উঠবার সাথে সাথে ৪ বার আমার পিছু নিত। প্রায় সারা দিন এ চারজনের পাহারায় আমাকে ঘুরতে হতো। মাঝে মাঝে কেমন যেন মনে। হতো। আমি হাফ প্যান্ট ও হাফ শার্ট পরা এক তরুণ। আমার পেছনে চার জন লোক প্রকাশ্য দিবালোকে ঘুরছে। আমাকে পাহারা না দিলে নাকি পাকিস্তান টিকবে না। সেই পাহারা দেবার পালা শেষ হলে ২০ আগস্ট। আমি বিকালে আর্টভিলার কাছে এসে দাঁড়িয়েছি। সাদা পোশাকের দুই ভভদ্রলোক এসে বললেন-আমরা পুলিশের লোক। আপনাকে থানায় ওসি সাহেব ডেকেছেন। আমি বললাম, আমার যাবার সময় নেই। আমার সাথে ছিল আমার বন্ধু নারায়ণ দাশ শর্মা। নারায়ণ জামিনে মুক্তি পেয়েছে ১৮ আগস্ট। নারায়ণ বলল, তুই থানায় গিয়ে দেখে আয় তোকে কেন ডেকেছে। আমি বাসায় যাচ্ছি।

থানায় যাবার সাথে সাথে ওসি সাহেব বললেন, আপনার বাসায় যেতে হবে। আমি বললাম, কেন? আর বাসায় যেতে হলে আমি হেঁটে যেতে পারব না, রিকশায় যেতে হবে। আমার বাসার চারপাশে জল। আমি আর পিনাকী বোস কাকীমার বাসা পাহারা দিতাম। আমাদের এক কাজের মেয়ে ছিল। আর ছিল তার স্বামী। সেদিন পিনাকী বরিশালে ছিল না। কাজের মেয়েটির স্বামীও বাড়ি গিয়েছিল। ইতোমধ্যে কলেরা হয়ে কাজের মেয়েটি মারা গেল। আমি তখন একেবারে একা। কোনোমতে সকালের দিকে ওর সকারের ব্যবস্থা করে বাইরে বেরিয়েছি। এমন সময় পুলিশ এল বাসায়। আমাকে সাথে করে নিয়ে আমার বাসায় পৌঁছাল সন্ধ্যার পর।

এবার শুরু হলো তল্লাশি। আমার বাসায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পত্র-পত্রিকা ছিল। প্রতিটি পত্রিকা পেয়েই পুলিশ চমকে যাচ্ছিল। হঠাৎ এক পুলিশ বলল–একটি রিভলবার পাওয়া গেছে। রিভলবারের কথা শুনে আমিও চমকে উঠলাম। দেখলাম একটি খেলনা রিভলবার। যাদের ফেলে যাওয়া বাড়িতে আমি ছিলাম এ খেলনা রিভলবার তাদের বাচ্চাদের। কিন্তু পুলিশকে কিছু বিশ্বাস করানো যায় না।

তারা বলছিল অনুশীলন সমিতির কথা। বলছিল, আপনার রাজনীতির হাতেখড়ি অনুশীলন সমিতির কাছে। অনুশীলন সমিতির নেতারা এই খেলনা রিভলবার দিয়েই ডাকাতি করত। সুতরাং এই রিভলবার আপনার নামেই থানায় জমা হবে।

থানায় ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা হয়ে গেল। ওসি সাহেব খুব ভদ্র ব্যবহার করলেন। কাগজে লিখলেন নির্মল সেনের বাড়ি তল্লাশি করা হয়েছে এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে…। এ কথা লিখতেই আমি বললাম, লিখুন, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বিশেষ ক্ষমতা আইনের সাতের তিন ধারায়। ওসি সাহেব বললেন, না আপনাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৮ ধারায়।

আমি একদম চুপসে গেলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। ১৮ ধারার অর্থ হচ্ছে বিনা বিচারে আটক। বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দি রাখা। আমি কোনো আদালতে যেতে পারব না। মামলা করতে পারব না। সরকারের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী যতদিন ইচ্ছে আমাকে জেলে রাখা যাবে। মাত্র ৮ দিন পর আমার বিএসসি পরীক্ষা। ভেবে পাচ্ছিলাম না কী করব।

তবে থানা কর্তৃপক্ষ খুবই ভালো ব্যবহার করেছিলেন আমার সাথে। ওসি সাহেব তাঁর বাসা থেকে বিছানা দিয়েছিলেন। খাবার দিয়েছিলেন। পরের দিন ভোরে এসে বললেন–আপনাকে তাড়াতাড়ি জেলে পাঠাতে হবে। আমি গোয়েন্দা বিভাগের লোকদের ডাকছি। আপনার সাথে ওরা কথা বলতে পারে। ওদের হেফাজতে আপনাকে দেব না, তাহলে ওরা মারপিট করবে। আপনার আগে কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের ওপর বেদম অত্যাচার করা হয়েছে। আমি আপনাকে আগেই জেলে পাঠিয়ে দেব।

ওসি সাহেবের কথামতো গোয়েন্দা বিভাগ থেকে একজন লোক এল। আমার সাথে ঘন্টা দুয়েক কথাবার্তা হলো এবং কথাবার্তার শেষে আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো জেলখানায়। সে হচ্ছে আমার জেলজীবনের শুরু। দু’দিন বাদে গ্রাম থেকে কাকা এলেন আমার সাথে দেখা করতে। তিনি বাড়িতে খবর পেয়েছেন পুলিশের কাছ থেকে। পুলিশের বড় কর্মকর্তারা বাড়িতে চিঠি লিখেছেন, আপনাদের ছেলেকে বরিশাল থেকে নিয়ে যান। নইলে গ্রেফতার হতে পারে যে কোনোদিন। সে চিঠি বাড়ি পৌঁছেছিল আমি গ্রেফতার হয়ে যাবার পর।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে তখন এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ শুধুমাত্র ইসলামের কথা বলে পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিলেন। পাকিস্তানের কোনো রূপরেখা তাদের সামনে ছিল না। সমস্যা দেখা দিল পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে। পাকিস্তান সৃষ্টি হলো মুসলমানদের স্বতন্ত্র বাসভূমির দাবিতে। বলা হলো–হিন্দু, মুসলমান দুই জাতি। তাদের সংস্কৃতি এবং কৃষ্টি আলাদা। তাদের একই সাথে বসবাস করা সম্ভব নয়। তাই এই দুই জাতির জন্য দুটি রাষ্ট্রের প্রয়োজন। কিন্তু পাকিস্তান প্রস্তাবে দুই রাষ্ট্রের হিন্দু ও মুসলমান জনগোষ্ঠী বিনিময়ের কোনো প্রস্তাব ছিল না। পাকিস্তান প্রস্তাব মতে, ভারত ভেঙে দুটি রাষ্ট্র হলেও উভয় রাষ্ট্রে হিন্দু এবং মুসলমান উভয় জাতিই থাকবে। লোক বিনিময় হবে না। পাকিস্তান প্রস্তাবের এটাই ছিল সবচেয়ে দুর্বল দিক। মুসলমানদের জন্যে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র চাই। মুসলমানদের জন্যে ভারত ভেঙে পাকিস্তান করতে হবে। অথচ খণ্ডিত ভারতবর্ষের ভারত অংশে ৬ কোটি মুসলমানকে হিন্দুদের সাথেই বসবাস করতে হবে। আবার হিন্দুদের সাথে এক সাথে বসবাস করা যাবে না–এই চুক্তিতে মুসলমানদের জন্যে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র পাকিস্তান হলেও পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গে দেড় কোটি হিন্দু থেকে গেল।

দেশ বিভাগের পূর্বে মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র কাছে এ প্রশ্নটি তুলেছিলেন ভারতীয় মুসলমানরা। তারা বলেছিলেন, হিন্দুদের সাথে থাকা যাবে না, এ চুক্তিতে আমরা পাকিস্তান আন্দোলন করেছি। অথচ আমাদের ভারতেই থেকে যেতে হচ্ছে। তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? হিন্দুরা আমাদের বিশ্বাস করবে কেন? মুসলিম লীগ সভাপতি জিন্নাহ তখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হয়েছেন। এ কথার জবাব তিনি ভারতের মাটিতে দিলেন না। পাকিস্তান পৌঁছে জিন্নাহ বিমানবন্দরে বললেন, রাজনৈতিকভাবে কোনো মুসলমান এখন আর মুসলমান নয়, কোনো হিন্দু আর কোনো হিন্দু নয়, সকলেই পাকিস্তানি। অর্থাৎ ভারতীয় মুসলমানদের ভারতীয় নাগরিক হিসাবেই থাকতে হবে। পাকিস্তান প্রস্তাবকে তিনি জোড়াতালি দিয়ে বাঁচাতে চাইলেন। প্রকৃতপক্ষে এভাবে জোড়াতালি দিয়ে পাকিস্তান প্রস্তাবকে বারবার বাঁচিয়ে ভারতকে ভাগ করা হয়েছিল ১৯৪৭ সালে।

এ প্রশ্ন উঠেছিল ভারত বিভাগ সম্পর্কিত আলোচনায়। আলোচনা হচ্ছিল ভারতের শেষ ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ও মোহাম্মদ আলী জিন্নার মধ্যে। তখন ভারত বিভাগের সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে পাঞ্জাব ও বাংলা বিভাগ নিয়ে। জিন্নাহ প্রথম থেকেই বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের বিরোধিতা করেন।

লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন জিন্নাকে বলেন যে, আপনি নিশ্চয়ই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা চান। সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিরাপত্তার জন্যই আপনি পাকিস্তান চেয়েছেন। যে পরিপ্রেক্ষিতে আশা করা যায় যে, আপনি নিশ্চয়ই হিন্দু শিখ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে অসম্মত হবেন না। কংগ্রেস ও শিখ সম্প্রদায় বাংলা ও পাঞ্জাবের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা চেয়েছে। তাদের প্রস্তাব বাংলা ও পাঞ্জাবের ভারত সংলগ্ন সংখ্যালঘু এলাকা ভারতের সাথে যুক্ত থোক অর্থাৎ পাঞ্জাব ও বাংলাকে ভাগ করা হোক।

মি. জিন্নাহ এ প্রস্তাবে রাজি হলেন না। তিনি বললেন, বাংলার একজন হিন্দু বা মুসলমান প্রথমে বাঙালি, পরে হিন্দু বা মুসলমান। পাঞ্জাবের একজন শিখ, মুসলমান বা হিন্দু প্রথমে পাঞ্জাবি, পরে হিন্দু, মুসলিম বা শিখ। সুতরাং সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বাংলা বা পাঞ্জাবকে ভাগ করা যায় না। লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন বললেন, মি. জিন্নাহ, আপনার কথা মেনে নিতে হলে ভারতও ভাগ করা যায় না। কারণ ভারতের নাগরিকেরা প্রথমে ভারতীয়, পরে হিন্দু, মুসলমান বা শিখ। লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের এই কথার পর জিন্নাহ তেমন কোনো জবাব দেননি এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের প্রস্তাব মেনে নিতে হয়।

এছাড়া লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের সাথে আলোচনায় বিভক্ত ভারতের ভারত ও পাকিস্তান অংশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছিলেন কংগ্রেস নেতা আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেছিলেন, ভারতবর্ষ হিন্দু ও মুসলমানের ভিত্তিতে ভাগ হচ্ছে। অথচ পাকিস্তানে হিন্দুরা থাকছে, ভারতেও থাকছে মুসলমানেরা। তাদের নিরাপত্তা কী হবে? এ প্রশ্নের একটি অদ্ভুত জবাব দিয়েছিলেন লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন। তিনি বলেছিলেন, এই দুই দেশের সংখ্যালঘু একে অপরের জামানত হিসাবে বসবাস করবে। ভারতবর্ষের মুসলমানদের ওপর অত্যাচার হলে, অত্যাচার হবে পাকিস্তানি হিন্দুদের ওপর। আবার পাকিস্তানি হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হলে, অত্যাচার হবে ভারতীয় মুসলমানদের ওপর। মাওলানা আজাদ এ মন্তব্য শুনে বলেছিলেন–এ উক্তি বর্বরের। বর্বরের এ সিদ্ধান্তের সাথে আমি আদৌ একমত নই। এর পরে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আর ভারত বিভাগ সংক্রান্ত আলোচনায় যোগ দেননি।

তবে জিন্নাহর জন্যে শুধু সম্প্রদায়গত সমস্যা না, ভিন্ন সমস্যা ছিল পাকিস্তানে। মুসলিম লীগ কংগ্রেসের মতো সংগঠিত ছিল না। মুসলিম লীগের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ঐতিহ্য ছিল না। এছাড়া উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে কংগ্রেস ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। পাকিস্তান সৃষ্টি হবার পূর্বে নির্বাচনের ও সীমান্ত প্রদেশে সীমান্ত গান্ধী আব্দুল গাফফার খানের নেতৃতে কংগ্রেস জিতেছিল। সিন্ধু এবং পাঞ্জাবেও মুসলিম লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না। সুতরাং পাকিস্তান অর্জনে মুসলিম লীগ নেতৃত্ব দিলেও সমগ্র পাকিস্তানে মুসলিম লীগের নেতৃত্ব ছিল না। মি. জিন্নাহ বুঝেছিলেন, সাম্প্রদায়িক শ্লোগান দিয়ে দেশ শাসন সম্ভব নয়। তাই তিনি লোক দেখানো চাল দিলেন। পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম সভাপতি হলেন তপশীলি সম্প্রদায়ের নেতা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল।

১৯৫০ সালের হিন্দু মুসলমান দাঙ্গার সময় তিনি ঢাকা থেকে ভারতে পালিয়ে যান। উল্লেখ্য, তফশীল ফেডারেশন ভিআর অম্বেদকর ও যোগেন্দ্র নাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেছিল।

কিন্তু জিন্নাহ সাহেবের কোনো কৌশলই কাজে এল না। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে শক্তিশালী না হওয়ায় আমলা এবং সামরিক বাহিনী সক্রিয় এবং শক্তিশালী হয়ে উঠল। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীতে এবং আমলাদের সঙ্গে পাঞ্জাবিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় পাঞ্জাবিরা পাকিস্তানে শক্তিশালী হয়ে উঠল।

বিরোধ দেখা দিল করাচি নিয়ে। অবিভক্ত ভারতে করাচি ছিল সিন্ধু প্রদেশের রাজধানী। করাচি পাকিস্তানের রাজধানী হওয়ায় সিন্ধুর রাজধানী স্থানান্তরিত হলো হায়দারাবাদে। সিন্ধু নেতারা এ সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন না। ইতোমধ্যে জিন্নাহ সাহেব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য পাঠান হলো কোয়েটার জিয়ারতে। সিন্ধুর নেতৃবৃন্দ সেখানে জিন্না সাহেবের সাথে দেখা করে বললেন, তারা করাচিতে সিন্ধুর রাজধানী চান। এই প্রতিনিধি দলের সাথে গভর্নর জেনালের জিন্নাহর কথা কাটাকাটি হলো। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠল।

আমি জেলে গিয়েছিলাম ১৯৪৮ সালের ২১ আগস্ট। তখন পূর্ববঙ্গে কোনো সংবাদপত্র ছিল না। কলকাতা থেকে ইত্তেহাদ, স্টেটসম্যান, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড, আনন্দবাজার, যুগান্তর আসত। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জেলখানায় হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডর একটি সংখ্যা হাতে এল। সে কাগজে একটি খবরে বলা হয়েছে–পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মরতে বসেছেন বা মারা গেছেন জিয়ারতে। তাঁকে দেখার কেউ নেই। তার চিকিৎসা হচ্ছে না। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর এক সময় দেখলাম জেলখানার ভবনে ওড়ানো পাকিস্তানি জাতীয় পতাকা নামানো হচ্ছে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হয়েছে। জিন্নাহ সাহেব মারা গেছেন। কোথায় মারা গেলেন জিন্নাহ সাহেব–জিয়ারতে? জিয়ারত থেকে বিমানে করাচি পৌঁছাবার সময় বিমানে? না করাচিতে তার বাসভবনে? এ প্রশ্নের জবাব আজো মেলেনি।

বরিশাল জেলে তখন নতুন নতুন বন্দি আসছে। প্রায় প্রতিদিনই নিরাপত্তা আইনে রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এদের মধ্যে অধিকাংশ বামপন্থী দলের সদস্য। তবে যারা গ্রেফতার হয়ে আসেন তাঁদের সকলের সাথে আমাদের দেখা হয় না। কারণ অধিকাংশ বন্দিকে তৃতীয় শ্রেণিতে রাখা হয়। রাখা হয় আমাদের চেয়ে দূরে। তাই তাঁদের সাথে দেখা হয় কদাচিৎ।

এর মধ্যে তিনজন বন্দি আমাদের এলাকায় এলেন। এঁরা হচ্ছেন–কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নরেন্দ্রনাথ রায়, হিন্দু ছাত্র ফেডারেশনর প্রশান্ত দাশগুপ্ত এবং অন্যতম নেতা অজিত বসু। শুনেছি নরেন বাবু জীবিত নেই। প্রশান্ত দাশগুপ্ত’র সাথে দেখা হয়েছিল ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বারাসাত স্টেশনে। তিনি বললেন–অনেক নির্যাতন সহ্য করলেও আপনারা জিতে গেলেন। অজিত বসুর কোনো খোঁজ আজো পাইনি। সেকালের পূর্ববাংলার জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁরা সকলেই দেশান্তরী হয়েছিলেন।

এই তিনজনের সাথে একই স্টিমারে বরিশাল থেকে ঢাকা এসেছিলাম ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে। তখন স্টিমার ঘাট বাদামতলীতেই ছিল। ঢাকায় এমন ভিড় ছিল না। পুলিশ প্রহরায় ঢাকা জেলে এলাম ঘোড়ার গাড়িতে। এই ঘোড়ার গাড়ি ও বুড়িগঙ্গা নদীর এক দীর্ঘ স্মৃতি আছে আমার শৈশব জীবনের। বাবা তখন বই লিখতেন ঢাকায়। বিভিন্ন প্রকাশের সাথে চুক্তিতে বই লেখা। মূল লেখক বাবা হলেও বাজারে সেই বই বিক্রি হতো ভিন্ন নামে। আমরা তখন থাকতাম নারিন্দার ১৩ নম্বর দয়াগঞ্জ রোডে। সে সড়কের নতুন নাম শরৎগুপ্ত রোড। ঐ সড়ক থেকে স্বামীবাগের দিকে গেলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কের রেল লাইন। ঐ রেল লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে কখনো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যেতাম। আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, এককালে রমনা কালীবাড়ি এলাকা অর্থাৎ রেসকোর্স ময়দানে এসে ঘোড়ার দৌড় দেখতাম। ফুলবাড়িয়া রেল স্টেশন থেকে ৮ পয়সা অর্থাৎ দু’আনা ঘোড়ার গাড়িতে নারিন্দা যেতাম। বিকালে যেতাম বাবার বই’র এলাকা বাংলাবাজারে। সেখান থেকে বুড়িগঙ্গার তীরে করোনেশন পার্ক। করোনেশন পার্কে রাত ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত বসে থাকতাম। সন্ধ্যার পরে বরিশাল থেকে স্টিমার আসত। আলোতে চিকচিক করতো বুড়িগঙ্গার জল। তবে বুড়িগঙ্গা বরাবরই বড় নিস্তরঙ্গ। বরিশালের স্টিমার বাদামতলীর ঘাটে ভিড়লে বাসায় ফিরতাম। সে ১৯৩৯ সালের কথা।

১৯৪৮ সালের অক্টোবরে বরিশালের স্টিমারে বাদামতলীর ঘাটে এলাম। আবার ঘোড়ার গাড়িতে উঠলাম। এবার নারিন্দার বাসা নয়, একেবারে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো পুরনো হাজতে। ঐ এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়া মুশকিল। আন্দামান থেকে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের ফিরিয়ে এনে পুরনো জেলে রাখা হয়েছিল। সে পুরনো জেল এখন সংস্কার করা হয়েছে।

১৯৪৮ সালের অক্টোবরে ঢাকা জেলে ঢুকে অবাক হলাম। বুঝতে শুরু করলাম পাকিস্তান কাকে বলে এবং কী প্রকার। উত্তরাধিকার সূত্রে পাকিস্তান সরকার অনেক কালাকানুন পেয়েছিল ব্রিটিশের কাছ থেকে। ঐ আইনে কোনো কারণ না দেখিয়ে যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা যায়। আটক রাখা যায় অনির্দিষ্টকালের জন্যে। দেখলাম পাকিস্তান সরকার জন্মলগ্ন থেকেই এ আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার শুরু করেছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নয়, ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য পাকিস্তান সরকার যাকে খুশি গ্রেফতার করছে এবং আটক রাখছে। এর কোনো বাছ-বিছার নেই।

এই আইনে গ্রেফতার করে আটক রাখা হয়েছে নোয়াখালীর রামগঞ্জ থানার খিলপাড়া গ্রামের আবুল কাসেম চৌধুরীকে। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় অনেক খুনের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। সরকারি ভাষ্য হচ্ছে–ঐ আইনে আটক করা না হলে কাসেম চৌধুরীকে খুনের আসামী হতে হয়। তাকে বাঁচাবার জন্যে সরকার তাকে নিরাপত্তাবন্দি করেছিল। অথচ কাসেম চৌধুরীর বক্তব্য ভিন্নরূপ।

ঐ কালো আইনে আটক রাখা হয়েছে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী ও তোফাজ্জল হোসেন পাটোয়ারীকে। একেবারেই তুচ্ছ ঘটনার জন্যেই তাদের আটক করা হয়েছে। পাড়া প্রতিবেশীর বিবাদ এবং থানার সাথে ঝগড়াই এই আটকের কারণ। ছোট ভাই তোফাজ্জল তখন ছাত্র। তাকে দেখতাম মুক্তির জন্যে প্রতিদিন সরকারের কাছে চিঠি লিখত। সে দরখাস্তে লেখা হতো পাকিস্তান আন্দোলনে তাদের ভূমিকার কথা। আন্দোলনে তাদের অংশগ্রহণের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে সিলেটের গণভোটে অংশগ্রহণ। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময় সিলেট ভারত না পাকিস্তানের অংশ হবে, এ প্রশ্নে গণভোট হয়। গণভোটে সিদ্ধান্ত হয় সিলেট পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে।

অদ্ভুত বিশেষ ক্ষমতা আইনে তিনজন ব্যক্তিকে আটক করে আনা হয়েছিল কুমিল্লা থেকে। এদের নাম ফজর আলী, অম্বর আলী ও সেকেন্দার আলী। তখন কুমিল্লা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন আইএ খান। ভারতের প্রথম পাকিস্তান হাইকমিশনার ইসমাইল খানের ছেলে। অপর এক বিখ্যাত আমলা মাদানীর ভাই। ঐ তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা আইএ খানের আর্দালিকে প্রহার করেছিল। এ অভিযোগে তিন ব্যক্তিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে গ্রেফতার করা হলো। কুমিল্লার পুলিশ লিখে পাঠান, এই তিন ব্যক্তি জেলের বাইরে থাকলে পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। সুতরাং তকালীন স্বরাষ্ট্র দফতর সবকিছু অনুধাবন করে নির্দেশ দিলেন, এদের অনির্দিষ্টকালের জন্যে কারাগারে আটক রাখা হোক। এ হচ্ছে সেকালের পাকিস্তান ও পাকিস্তানের শাসকদের চিত্র।

সেকালের কথা মনে হলে আমার কুমিল্লার সেই সেকেন্দার আলীর কথা মনে পড়ে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আর্দালিকে প্রহারের দায়ে অভিযুক্ত সেকেন্দার আলী। ফজর আলীর নেতৃত্বে কাজ করে। দিন আনে দিন খায়। ৬ মাস হয়ে গেছে জেলখানায় এসেছে। প্রতিরাতে চোখের জল ফেলে স্ত্রী-পুত্রের জন্য। স্ত্রীর নাম ছমিরন বিবি। সপ্তাহে সপ্তাহে স্ত্রীকে চিঠি লিখত সেকেন্দার আলী। চিঠির লেখক আমি। সেকেন্দার আলীর বড় ভয়– দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির ফলে স্ত্রী যদি ভিন্ন ঘরে চলে যায়! কী হবে তার উপায়? জেলখানায় সেকেন্দার আলীর সাথে তারপর বেশিদিন দেখা হয়নি। আমরা অনশন করার ফলে আমাদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। শুনেছি মাস ছয়েক পর সেকেন্দার আলীকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। আমার মুক্তি পেতে পেতে বছর পাঁচেক। তারপর অনেকবার জেলে যাওয়া-আসা করেছি। কুমিল্লা গিয়েছি অসংখ্যবার। ফজর আলী, সেকেন্দার আলী ও অম্বর আলীর খোঁজ করা হয়নি।

ঢাকা জেলে প্রথম রাতে ঘুম ভাঙল এক বন্দির ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নায়। উজ্জ্বল এক তরুণ ভারতীয় বিমানবাহিনীর পাইলট। বাড়ি মানিকগঞ্জের জামিয়তা। ঢাকায় আসা-যাওয়া ছিল দীর্ঘদিন ধরে। প্রেমে পড়েছিলেন এক গায়িকার। গায়িকার দু’বোন তখন নজরুল সঙ্গীত গাইতেন ঢাকা বেতারে। এই প্রেমের উপাখ্যান শুরু ভারত বিভাগের পূর্বে।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। গায়িকা দুই বোন ঢাকায় ওয়ারীতে থেকে গেলেন। বিমানবাহিনী পাইলট জামিয়তার শচীন রায় অপসন দিয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীতে যোগ দিলেন। ভারত ভাগের পরেও শচীন রায় দু’একবার ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু বিপত্তি দেখা দিল কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ শুরু হওয়ায়। শচীন রায়ের কাছে শুনেছি সে নাকি ভারতীয় বিমান নিয়ে কাশ্মীর ফ্রন্টে এক দফা যুদ্ধ করেছে। তারপর এসেছিল ঢাকায় বেড়াতে। পাকিস্তান সরকার তাকে গ্রেফতার করেছে। কোনো মামলা দেয়নি। আটক রেখেছে অনির্দিষ্টকালের জন্যে।

শচীন রায় জানে না সে কবে মুক্তি পাবে। কোথায় যাবে? কিভাবে যাবে? যাদের জন্যে ঢাকা এসেছিল তারাও দূরে সরে গেছে। কারণ তখন পাকিস্তানে চলছে ভয়াবহ এক ভয়ের রাজত্ব। কবে কিভাবে শচীন রায় জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়েছে তা জানি না। শুনেছি সে দেশ ছাড়েনি। জামিয়তা ঘর বেঁধেছে। তবে সে খবরও দীর্ঘদিন পূর্বের।

ঢাকা জেলে ঘুম ভাঙার সাথে সাথে ধরণী বাবুর কণ্ঠ শোনা গেল। ঢাকা জেলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ধরণী রায় রেল শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলন করেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে প্রথম থেকে ছিলেন। গেফতার হয়ে এসেছিলেন অনেকের সাথে। প্রথমবার মুক্তি পেলেও দ্বিতীয়বার তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়নি। দেখা হয় রণেশ দাশগুপ্তের সাথে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভভদ্রলোক রণেশ দাশগুপ্ত। উচ্চকণ্ঠে কথা বলেন না। নিজের মত কখনও অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চান না। সকলেই তাঁর বন্ধু। কারণ শত্রু হবার উপায় নেই। দেখা হলো বরিশালের জ্যোতি ব্যানার্জির সাথে। ডাক নাম নুটু ব্যানার্জি। বরিশালের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা। লেখাপড়া করেন। দীর্ঘকাল পাকিস্তানের জেলে ছিলেন। মুক্তি পেয়ে দেশান্তরী হলেন। পরবর্তীকালে শিক্ষকতা করতেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ঢাকা জেলে দেখা হলো হরিগঙ্গা বসাকের সাথে। আদি বাড়ি ঢাকার বনগ্রাম লেনে। রাজনীতি করতেন আগরতলায়। আগতলায় ত্রিপুরা কংগ্রেসের নেতা ছিলেন। তার গ্রেফতার এবং বন্দি জীবন এক আশ্চর্য ঘটনা।

ভারত বিভাগের সময় একটি কাউন্সিল করা হয়েছিল। কাউন্সিলের নাম ডিভিশনাল কাউন্সিল। এই কাউন্সিলে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি থাকত। ত্রিপুরা তখন দেশীয় রাজ্য। ত্রিপুরা কংগ্রেসের নেতা হিসাবে হরিগঙ্গা বসাক এ ডিভিশন কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। তাই তাঁর বিরুদ্ধে রাগ ছিল পাকিস্তান সরকারের। ১৯৪৮ সালে অসুস্থ মাকে দেখার জন্য হরিগঙ্গা বসাক আগরতলা থেকে ঢাকা এসেছিলেন। তখন তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর গ্রেফতারের নির্দেশ তারিখ ছিল ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাইয়ের। অথচ তিনি ঢাকা এসেছিলেন ২৯ জুলাই। এ নিয়ে হরিগঙ্গা বাবু অনেক লেখালেখি করেছিলেন। কিন্তু কোনো কাজে আসেনি। ১৯৫০ সালে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন হরিগঙ্গা বসাক ঢাকা জেলে। যারা আগরতলা গেছেন তারা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন সেই শহরের একটি সড়কের নাম হরিগঙ্গা বসাক সড়ক। তখন জেলখানার রাজনীতির একটি বিশেষ দিক ছিল। ব্রিটিশ আমলে যাঁরা জেলে ছিলেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন কংগ্রেসের নেতা ও কর্মী। কংগ্রেস, আরএসপি, ফরোয়ার্ড ব্লক, কমিউনিস্ট পার্টি ও কংগ্রেস সমাজতান্ত্রিক দল সিএসপির সদস্য থাকলেও সকলেই আবার কংগ্রেসের সদস্য ছিল। জেলখানায় তারা কংগ্রেসি বলে পরিচিত ছিল। অধিকাংশ কংগ্রেস নেতা ও কর্মী ছিলেন হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আসা। ব্রিটিশ সরকার এই সকল রাজবন্দিদেরই ভারত স্বাধীন হবার আগে মুক্তি দিয়েছিল।

কিন্তু পাকিস্তানে সেই মুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই আবার রাজনৈতিক ধরপাকড় শুরু হয়। যারা গ্রেফতার হলেন তাদের অধিকাংশই এককালের কংগ্রেস কর্মী ও নেতা হলেও তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ ছিলেন বামদলের নেতা ও কর্মী। অধিকাংশই হিন্দু মধ্যবিত্ত ঘর থেকে আসা। তাই জেলখানার কর্মচারী ও কয়েদিদের কাছে নতুন রাজবন্দিদের নতুন কোনো পরিচয় হলো না। তাদের কাছে এরা কংগ্রেসি। এরা হিন্দু এবং এককালের পাকিস্তান-বিরোধী। তাদের ধারণা হলো পাকিস্তান-বিরোধী বলেই তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এ জন্যে পাকিস্তান সরকারকে তেমন দোষ দেয়া যায় না।

এই ঐতিহ্য ধরে ঢাকা জেলের কর্মকর্তারা আমাদের সাথে তেমন আচরণ করতেন। ইতোমধ্যে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার হয়ে এলেন কমিউনিস্ট পার্টির ফরিদ খান। জেল কর্তৃপক্ষ কিছুতেই তাঁকে আমাদের ওয়ার্ডে দিলেন না। একদিন তাকে ভিন্ন সেলে রাখা হলো। বলা হলো–আপনি মুসলমান, আপনি হিন্দু বন্দিদের সাথে কেন থাকবেন? আপনার জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা করা হবে। জবাবে ফরিদ খান বললেন, আমি মুসলমান বা হিন্দু নই। আমি কমিউনিস্ট। আমাকে অন্যান্য রাজবন্দিদের সাথেই থাকতে দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত ফরিদ খানকে আমাদের ওয়ার্ডেই পাঠিয়ে দেয়া হয়।

ঢাকা জেলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে দীর্ঘ সময় লাগে। পরবর্তীকালে অসংখ্য মুসলমান কমরেড জেলে আসতে থাকায় এক সময় পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে ১৯৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর।

তবে জেলের সমস্যা আদৌ সাম্প্রদায়িক সমস্যা ছিল না। মুখ্য ছিল রাজনৈতিক সমস্যা। সেকালে রাজবন্দি হিসাবে যারা ছিল তাদের মধ্যে শতকরা ৯০ জনই কমিউনিস্ট পার্টির। এছাড়াও ছিল কংগ্রেস, আরএসপি, ফরোয়ার্ড ব্লক, হিন্দু মহাসভার সদস্য। আমরা সকলেই রাজনীতি করি বলে এই রাজনীতির ছাপ পড়েছিল জেলখানায়। সে রাজনীতির উদ্যোক্তা ছিল মুখ্যত কমিউনিস্ট পার্টি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আন্দোলনের নতুন কৌশল নিয়েছে। ভারত বিভক্ত হলেও কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়নি। তাই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কৌশল প্রয়োগ ছিল পাকিস্তানের জন্যে।

ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য হচ্ছে ব্রিটিশ চলে গেলেও ভারত বা পাকিস্তান প্রকৃতার্থে স্বাধীন হয়নি। তাই ক্ষমতাসীন সরকারকে আঘাতের পর আঘাত করে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। জেলখানায় কৌশল হবে জেলখানার যে কোনো ছুতায় সঙ্কট সৃষ্টি করতে হবে। জেলখানার সঙ্কটে অঘটন ঘটলে বাইরে তার প্রতিক্রিয়া হবে। মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করবে। সরকারকে আঘাত করবে। সরকারের পতন ঘটবে।

কিন্তু জেলখানায় এ কাজটি কী করে করা যাবে? বলা হলো–জেল কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি দাওয়া পেশ করো। দাবি মানা না হলে অনশন ধর্মঘট করো। আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে অনশনকে ভিত্তি করে।

আমাদের দল বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল আরএসপি। আমাদের দলের মূল্যায়ন হলো, কমিউনিস্ট পার্টির এ সিদ্ধান্ত ভুল। হঠকারী কৌশল। দেশ স্বাধীন হলেও সমাজ পরিবর্তন করা না গেলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না–এ বক্তব্য সঠিক। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হবার পরপরই এ তত্ত্ব গ্রহণ করার মতো মানসিক প্রস্তুতি হয়নি। এ ছাড়া এ আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবার মতো শক্তিশালী শ্রেণি সংগঠনের অভাব আছে। আর সমগ্র উপমহাদেশে তখন সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ভয়াবহ। সুতরাং কমিউনিস্ট পার্টির এ তত্ত্ব আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। জেলখানার কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার সদস্যদের এ আন্দোলনে যাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু জেলখানায় রাজবন্দিদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর সর্বকনিষ্ঠ রাজবন্দি হিসেবে জেলে এসেছিল প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা অনিল মুখার্জির ভাইয়ের ছেলে অতীশ মুখার্জি। আমি ঢাকা জেলে আসার পূর্বে সে মুক্তি পায়। আমার সাথে পরবর্তীকালে আরো দু’জন বয়সে কম রাজবন্দি ছিল। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন মুন্সীগঞ্জের শফিউদ্দীন আহমদ যিনি সাংবাদিক হিসাবে পরিচিত। আর একজন খুলনার আনোয়ার হোসেন। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজবন্দি অবস্থায় জেল পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। আমার সিদ্ধান্ত হলো অন্য সবাই অনশন করলে আমার পক্ষে ভাত খাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং আমিও অনশনের সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমাদের অনশনের পূর্বে কয়েকটি ঘটনা ঘটল। আমাদের প্রতিনিধি কমরেড জ্যোতি ব্যানার্জিকে ঢাকা জেল থেকে অন্য জেলে পাঠানো হলো। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর সাথে আমার দেখা হয়নি। আমাদের নতুন প্রতিনিধি হলেন রণেশ দাশগুপ্ত। আমাদের পক্ষ হয়ে তিনি জেল কর্তৃপক্ষের সাথে দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা করতেন।

এর মধ্যে একদিন জেলখানার সবচেয়ে বড় কর্মকর্তা সার্জন জেনারেল কর্নেল টিডি আহমেদ জেলখানায় এলেন। তিনি নাকি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজনস (আইজি) অর্থাৎ কারাগারসমূহের মহাপরিদর্শক। কর্নেল টিডি আহমদ আমাদের ওয়ার্ডে এসে আমার দিকে এগিয়ে এলেন, বললেন–এই বাচ্চা, তুমি এখানে কেন? সুপারিন্টেডেন্টকে বললেন, রেকর্ড নিয়ে এসো। একে রিলিজ করে দাও। একজন ডেপুটি জেলার এগিয়ে এসে বললেন, স্যার উনি রাজবন্দি। এদের বিচার নেই। জামিন নেই। তাই মুক্তি দেয়া যাবে না। কর্নেল টিডি আহমদ বললেন, ইজ ইট পাকিস্তান?

আমাদের অনশনের দিন নির্ধারিত হলো। ১৯৪৯ সালের ১১ মার্চ। ঐ দিন পশ্চিমবাংলা ও পূর্ববাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির রোড ইউনিয়নের ডাকে রেল ধর্মঘট। আমার কাছে এ সিদ্ধান্ত সঠিক মনে হলো না। এমনিতে আমাদের ভারতের দালাল বলা হয়, তারপরে একই দিনে দু’দেশে হরতাল ডাকা আদৌ সঠিক কি!

কমিউনিস্ট পার্টির এক বন্ধুর সাথে আলোচনা করলাম। নাম নরেশ চক্রবর্তী। বাড়ি কুমিল্লা। এক সময় আরএসপি করতেন। পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট পার্টিতে গিয়েছেন। তিনি আমার কথা শুনে হেসে উড়িয়ে দিলেন। বললেন, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ শ্লোগান দিই। আমাদের এত ভয় কেন? আমি শুধু বুঝতে পারলাম না–ঢাকা জেলের অনশনের সাথে কলকাতার রেল শ্রমিকদের আন্দোলনের সম্পর্ক কী। জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়ে নরেশ বাবু কলকাতায় যান। ১৯৭১ সালে শুনেছি নাকতলায় আছেন। সিপিআই(এম) এর সদস্য।

১৯৪৯ সালের ১১ মার্চ ঢাকা জেলে অনশন শুরু হলো। অনশন টিকল না। পূর্ববাংলা সরকারের মৌখিক বিশ্বাসে ১৫ মার্চ অনশন প্রত্যাহার করা হলো। পূর্ব বাংলার রাজবন্দিদের জীবনে এক ভয়াবহ নতুন নির্যাতন নেমে এল।

ব্রিটিশ আমলে জেলখানায় রাজবন্দিদের বছরের পর বছর সংগ্রাম করতে হয়েছিল নিজেদের সম্মান ও মর্যাদার জন্য। শেষ দিকে ব্রিটিশ সরকার তাদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলে। ১৯৪০ সালে প্রণীত হয়েছিল সিকিউরিটি প্রিজনার্স রুল ১৯৪০। এই বিধান বলেই জেলখানায় বিশেষ সুবিধা দেয়া হতো রাজবন্দিদের।

১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের সাথে সাথে পাকিস্তান সরকার বিনা কারণে ধরপাকড় এবং বিনা বিচারে আটক রাখার আইন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল ব্রিটিশের কাছ থেকে। তেমনি ১৯৪০ সালের রাজবন্দিদের জন্য প্রণীত রুলসও পেয়েছিল। ১৯৪৯ সালের মার্চের অনশন ধর্মঘটের পর পূর্ববঙ্গ সরকার রাজবন্দিদের ঐ আইন বাতিল করলেন। মৌখিক আশ্বাসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাজবন্দিদের সুবিধাগুলো কেড়ে নিলেন।

এবার রাজবন্দিরা পরিণত হলো সাধারণ কয়েদীতে। কোনো মর্যাদা নয়। তাদের সাথে আচরণ শুরু হলো চোর-ডাকাতের মতো। এ সকল অপরাধে যারা গ্রেফতার হয় বা যাদের সাজা হয় তাদের তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করে জেলে রাখা হয়। এই শ্রেণির প্রাপ্তি নির্ভর করত সামাজিক-পারিবারিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পেশার ওপর। বিনা বিচারে আটক রাজনীতিকদের প্রশ্নে এ ধরনের কোনো শ্রেণি বিভাগ ছিল না ব্রিটিশ আমলে। এ কাজটি করলেন পাকিস্তান সরকার ১৯৪৯ সালে।

আমাদের হাতে গোনা কয়েকজনকে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেয়া হলো। বাকি সবাইকে পরিণত করা হলো তৃতীয় শ্রেণির কয়েদীতে। অর্থাৎ থালা-বাটি কম্বল জেলখানার সম্বলের অধিকারী বানানো হলো তাদের। অথচ এই অনশনের আগে তাদের সকল সুযোগ-সুবিধা ছিল। খাট, লেপ, তোষক, মশারি, জুতো, জামা, স্যুট, ব্রাশ, সাবান, পেস্ট, কোট, উন্নতমানের খাবার ব্রিটিশ প্রণীত বিধি অনুযায়ী সব কিছুই ছিল। ১৯৪৯ সালের মার্চের প্রথম অনশন ধর্মঘটের পর এদের সামনে এদের খাট-তোষক, লেপ নিয়ে যাওয়া হলো। পাঠানো হলো থালা বাটি কম্বল। আমাদের অন্য ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা পৃথক হলাম। সেই পৃথক হবার পরে অনেকের সাথেই আর আমার আজো দেখা হয়নি। এদের মধ্যে অধিকাংশই পরবর্তীকালে দেশান্তরী। আর এদেশে যারা ছিল তারা লোকান্তরিত বা রাজনীতিতে আদৌ নেই।

সুতরাং শুধুমাত্র কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্ব বা কৌশল নয়। রাজবন্দিদের হৃত অধিকার ফিরিয়ে আনার দাবিতেই আবার আন্দোলনে যেতে হলো। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দ্বিতীয় অনশন শুরু হলো মে মাসে। সে মাসে অনশন ধর্মঘট শুরু হবার পূর্বে ঢাকায় আন্দোলন হচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম বেতনভুক্ত কর্মচারীদের নিয়ে। এপ্রিল মাসে এ আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। এই আন্দোলনে শরিক হবার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২৭ জন ছাত্র-ছাত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ৬ জনকে ৪ বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার, ১৫ জনকে হল থেকে বহিষ্কার। ৫ জনের ১৫ টাকা ও ১ জনের ১০ টাকা জরিমানা করা হয়।

১৫ টাকা যাঁদের জরিমানা হয় তাদের তালিকায় ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হন আব্দুল মতিন, এনায়েত করিম, খালেক নওয়াজ, আজিজুর রহমান, বাহাউদ্দিন চৌধুরী ও নিতাই গাঙ্গুলী। পরবর্তীকালে নিতাই গাঙ্গুলী ব্যতীত সকলকেই মুক্তি দেয়া হয়। ঢাকা জেলা বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল আরএসপি’র সম্পাদক নিতাই গাঙ্গুলী আমাদের সাথেই থেকে গেলেন। তিনি আমাদের সাথে দ্বিতীয় অনশনে অংশ নিলেন।

দ্বিতীয় অনশনের সময় নগ্নরূপ প্রকাশিত হলো মুসলিম লীগ সরকারের। পূর্ববাংলা সরকার একটি প্রেসনোট দিল জেলখানায় অনশন সম্পর্কে। প্রেসনোটের মর্মার্থ হলো–ব্রিটিশ আমলে রাজবন্দিরা দেশপ্রেমিক ছিল তাই তাদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেয়া হতো। এখন আর তারা দেশপ্রেমিক নয়। সুতরাং সে সুবিধা দেয়া যাচ্ছে না।

এ ধরনের প্রেসনোটের অন্যতম কারণ হলো–প্রকৃতপক্ষে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিটিশবিরোধী তেমন কোনো আন্দোলন করেনি। পূর্ববাংলায় যারা সরকারে এসেছিলেন তাদের মধ্যে কেউ কোনোদিন জেল খাটেনি। রাজবন্দিদের সম্মান বা মর্যাদা সম্পর্কে এদের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। একমাত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহারের কিছুটা বাম ঘেঁষা গন্ধ ছিল। আর সকলেই ছিল উকিল-মোক্তার এবং চাকরিজীবী। রাজনীতি এদের মুখ্য পেশা ছিল না। শুধু ছিল অন্ধ কংগ্রেস এবং বাম রাজনীতির বিরোধিতা।

২৪ দিন পর দ্বিতীয় অনশন ধর্মঘট শেষ হলো জেলমন্ত্রী মফিজউদ্দীন, মুসলিম লীগ নেতা ফকির আবদুল মান্নান ও কংগ্রেস নেতা মনোরঞ্জন ধরের সাথে আলোচনার পর। তবে সে আলোচনা কোনো কাজে আসেনি।

আমাদের অনশন ধর্মঘট রাজবন্দিদের দাবি আদায়ের নামে হলেও মুখ্যত ছিল তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির ভুল কর্মপন্থার ফল। ফলে তৃতীয়বারের মতো আবার অনশন শুরু হলো আগস্ট মাসে। এ অনশন স্থায়ী হয় ৪০ দিন। এবারও কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।

আমি কমিউনিস্ট পার্টি করি না। ভিন্ন দলের লোক। তাদের সমর্থনে বার বার অনশন করছি। শরীর ভেঙে গেছে। তাই প্রতিবারই অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহারে সময় আমার সাথে মতানৈক্য হতো। ধর্মঘট প্রত্যাহারের বিরোধী ছিলেন–দিনাজপুরের ঋষিকেশ ভট্টাচার্য, কিশোরগঞ্জের নগেন সরকার, চট্টগ্রামের আব্দুস সাত্তার। আমি এদের পক্ষে থাকতাম।

তৃতীয় অনশন অর্থহীনভাবে প্রত্যাহার হওয়ায় আমাদের মনে ভিন্ন প্রশ্ন দেখা দিল। দেখা গেল কমিউনিস্ট পার্টি নতুন করে অনশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুধু অপেক্ষা করছে একটা অজুহাতের। সে অজুহাত নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে সৃষ্টি করলেন নাদেরা বেগম। শুনলাম নাদেরা বেগম ও দেবপ্রসাদ মুখার্জি নতুন নির্দেশ নিয়ে এসেছে জেলখানায়। অর্থাৎ জেলের আন্দোলন তীব্র করতে হবে। তাই চতুর্থবারের জন্য অনশন শুরু হলো ঢাকা জেলে ১৯৪৯ সালের ২ ডিসেম্বর।

শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরের অনশন ধর্মঘটে আমাদের যাওয়া হয়নি। দলের কঠিন নির্দেশ হলো–কমিউনিস্ট পার্টির অনশনের সিদ্ধান্ত হটকারী। এই কৌশল আদৌ রাজনৈতিক কৌশল নয়। এই অনশন ধর্মঘট আদৌ রাজনৈতিক দিক থেকেও সঠিক নয়। তবুও আমরা প্রথম দিকে এই অনশনে ছিলাম। আমরা অর্থাৎ আরএসপি’র আমি ও নিতাই গাঙ্গুলী। প্রথমে কথা হয়েছিল মহিলা ওয়ার্ডে হামলার জন্য ৭ দিন অনশন করা হবে। দাবি মানা না হলে অনশন ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়া হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কমিউনিস্ট পার্টি তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনশন অব্যাহত রাখে। কারো সাথে আলোচনা না করেই এ অনশন ৫২ দিন চলেছিল এবং এই অনশন শেষ হয় ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে।

১৯৪৯ সালে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল টাঙ্গাইলের উপনির্বাচন। এই আসনে এককালে নির্বাচিত হয়েছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। মাওলানা ভাসানীর নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়, তিনি নির্বাচনের হিসাব দাখিল করেননি বলে। ১৯৪৯ সালে এই আসনে উপনির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী হলেন মোহাম্মদ শামসুল হক। শামসুল হক মুসলিম লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে জয়লাভ করেন। কিন্তু তার জয়লাভও কোনো কাজে আসেনি। তার নির্বাচনও ট্রাইব্যুনাল বাতিল করে দেয়। আমাদের কাছে ছিল এ এক দারুণ খবর। মাসের পর মাস অনশনের মধ্যে এ খবর ছিল আশার খবর। পাকিস্তান সৃষ্টির দু’বছরের মধ্যে পাকিস্তানের উপনির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয় রাজনৈতিক দিক থেকে ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই শামসুল হক আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মলগ্নে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।

১৯৫০ সালের জেল জীবন শুরু হলো এক নতুন প্রেক্ষিতে। মনে হলো ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নীতির পরিবর্তন হচ্ছে। এছাড়া জেলখানায় অনশন করার মতো অবস্থাও কারো ছিল না। দীর্ঘদিন অনশনের ফলে প্রায় সকলেরই স্বাস্থ্য ভেঙ্গে গিয়েছিল। এরমধ্যে একদিন দিনাজপুরে ক্ষেমেশ চ্যাটার্জি পত্রিকা হাতে নিয়ে সোরগোল শুরু করেছেন। ক্ষেমেশ চ্যাটার্জি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির লোক (রিভলুশনারি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-আরসিপিআই)। তাঁর নেতা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিবারের সৌমেন্দ্র নাথ ঠাকুর। সৌমেন্দ্র ঠাকুর লেনিনের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি সপ্তম কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রেসিডিয়ামের সদস্য ছিলেন। স্ট্যালিনের সাথে মতের মিল না হওয়ায় তিনি ভারতে এসে আরসিপিআই গঠন করেন। তারই দলের ক্ষেমেশ চ্যাটার্জি মাত্র কিছুদিন আগে দিনাজপুর থেকে ঢাকা জেলে এসেছিলেন। ক্ষেমেশ বাবু অনশনে অংশগ্রহণ করেননি। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির ঘোরতর বিরোধী।

ক্ষেমেশ বাবুর হাতে স্টেটসম্যান পত্রিকা ছিল। ঐ পত্রিকা পড়েই তিনি চিৎকার করছিলেন। খবরটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি এশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে আপাতত সরকার বিরোধী আন্দোলন স্তিমিত করার নির্দেশ দিয়েছে। ক্ষেমেশ বাবুর ধারণা হচ্ছে-নিশ্চয়ই এশিয়ায় কোনো বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। যে ঘটনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন জড়িয়ে পড়তে পারে।

ক্ষেমেশ বাবু এই মন্তব্য করেছিলেন ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে। তার মন্তব্য সত্যে প্রমাণিত হলো জুন মাসে। জুন মাসে কোরিয়া সীমান্তে সংঘর্ষ শুরু হয়। উত্তর কোরিয়াকে সাহায্য সহযোগিতা করে সোভিয়েন ইউনিয়ন ও চীন। দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে দাঁড়ায় জাতিসংঘের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গ। এ যুদ্ধ তিন বছর স্থায়ী হয়েছিল।

এই ১৯৫০ সালে আরেক ঘটনা ঘটল হাইকোর্টে। আমি ঢাকা হাইকোর্টে আমার আটকাদেশের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলাম। জেলখানা থেকে আমার আবেদনপত্র লিখে দিয়েছিলেন দেবেশ ভট্টাচার্য। দেবেশ বাবু বিশিষ্ট আইনজ্ঞ। ময়মনসিংহে প্র্যাকটিস করতেন। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ময়মনসিংহের আদালতে আন্দোলনে গ্রেফতার ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের পক্ষে মামলা করতেন। এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অপরাধ। তাই বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাকে গ্রেফতার ও আটক রাখা হয়। দেবেশ বাবু পরবর্তীকালে ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি হন।

আমার আবেদপত্র হাইকোর্ট গ্রহণ করে। আমি কলকাতায় আমার আত্মীয়দের কাছে ভালো উকিল নিযুক্ত করার জন্য চিঠি লিখি। ঢাকায় তখন ওকালতি করতেন বর্মা প্রত্যাগত রায় বাহাদুর রমেশ তালুকদার। তাঁকে কলকাতায় ডেকে পাঠিয়ে ব্রিফ করে আমার মামলার জন্য নিয়োগ করা হয়। এ সকল খবর জেলখানায় খুব পাওয়া যেত না। শুধু জানতাম হাইকোর্টে আমার মামলার শুনানি হবে। আমার মামলা ছিল সেকালের পূর্ব বাংলার দ্বিতীয় মামলা। নিরাপত্তা বন্দি হিসাবে প্রথম মামলা হয়েছিল দবিরুল ইসলামের। সে মামলায় উকিল ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

এর মাঝখানে হঠাৎ একদিন জেল অফিসে আমার ডাক পড়ল। দেখলাম এক আইবি অফিসার বসে আছেন। তিনি বললেন, আপনার নাম কি নির্মল সেন? আপনি রাশিয়ার লোক। আপনি কোনোদিন জেল থেকে মুক্তি পাবেন না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? তখন তিনি হাইকোর্টের শুনানির এক অপূর্ব বিবরণ দিলেন। হাইকোর্টে তখন আমার মামলার বিচারপতি ছিলেন জাস্টিস এলিস, জাস্টিস ইস্পাহানি ও জাস্টিস ইব্রাহিম। আমার পক্ষের উকিল অ্যাডভোকেট রায়বাহাদুর রমেশ তালুকদার নাকি বলেছিলেন, মাননীয় বিচারপতি, আমার মক্কেল নির্মল সেনের বয়স খুব কম। সে গান্ধী পরবর্তী যুগের রাজনৈতিক কর্মী এবং সহিংসতায় বিশ্বাস করে না। বিচারপতি এলিস অ্যাডভোকেট তালুকদারকে জিজ্ঞেস করলেন আপনি লেনিনের নাম শুনেছেন? লেনিন সোভিয়েত ইউনিয়নে সহিংস বিপ্লব করেছিল। আপনার মক্কেল নির্মল সেন বরিশালে লেনিন দিবস পালন করেছেন। সুতরাং নির্মল সেন অহিংসায় বিশ্বাস করে, এ তথ্য সঠিক নয়।

গোয়েন্দা বাহিনীর ভভদ্রলোক হাইকোর্টের শুনানির এই অংশটুকু শুনেই জেলখানায় চলে এসেছিলেন এবং তার ধারণা বলেছিলেন আমাকে। তিনি নিঃসংশয় যে আমি রাশিয়ার লোক এবং কোনোদিনই আমার মুক্তি হবে না। তবে এ কথা সত্য যে ঢাকা হাইকোর্ট আমার রিট পিটিশন অগ্রাহ্য করেছিল। একই রায়ে আমার সাথে আরো ২১ জনের রিট পিটিশন অগ্রাহ্য হয়ে গেল।

তবে এ চিত্রের অপর পিঠও আছে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন কারাগারে আটক রাজবন্দিদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করা হয়। আমাদের পক্ষে উকিল ছিলেন হামিদুর রহমান ও বীরেন চৌধুরী। হামিদুর রহমান পরবর্তীকালে হাইকোর্টের বিচারপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছিলেন এবং পাকিস্তানের রাজনীতিতে পরিচিত হয়েছিলেন বিভিন্ন কারণে। তখন অ্যাডভোকেট জেনারেল ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। এবার হাইকোর্টের রায়ে আমাদের মুক্তির আদেশ দেয়া হলো। অ্যাডভোকেট জেনারেল তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীনকে আমাদের মুক্তি দেবার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার অনড়। তারা নতুন অর্ডিন্যান্স জারি করল। ঢাকা জেলের চারপাশে ঘিরে ফেলা হলো পুলিশ ও পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলের লোক দিয়ে। আমাদের জেল গেটে নিয়ে যাওয়া হলো। এক এক করে মুক্ত করে জেলের বাইরে দাঁড় করানো হল। আর সাথে সাথে ভিন্ন পুলিশ অফিসার আমাদের নতুন নির্দেশ হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, আপনাদের এই আইনে গ্রেফতার করা হলো এবং আপনাদের ঢাকা জেলেই আটক রাখা হবে।

সে এক অপূর্ব নাটক। হাইকোর্টের নির্দেশে আমাদের ছেড়ে দেয়া হতে পারে এমন একটা খবর পাওয়া গিয়েছিল আগেই। অনেকে উৎফুল্ল হয়েছিল। ভেবেছিল লৌহ কপাটের বাইরে হয়তো নিজের বাড়ি যাওয়া যাবে। অনেকে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু তেমনটি ঘটল না। সকলকে নতুন আটকাদেশ দিয়ে আবার জেলখানায় ঢুকতে হলো। তখনকার মনের অবস্থা যারা কোনোদিন জেলে যায়নি, তাদের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কিছুদিন পরে আরেকটি ঘটনা ঘটল আমাকে নিয়ে। বিকালের দিকে জেল গেটে আমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো। একটা ক্ষীণ ধারণা হয়েছিল হয়তো আমাকে ছেড়ে দেয়া হবে। কারণ জেলখানায় ৬ মাস পরপর নতুন আটকাদেশ দিতে হয়। একটি অর্ডিন্যান্সের মেয়াদ ৬ মাস হলে নতুন নির্দেশ না দিয়ে ৬ মাসের বেশি আটক রাখা যায় না। আমার সেদিন ছিল ৬ মাস পরে আদেশ দেবার আরেক ৬ মাসের শেষদিন। ৬ মাসের শেষ দিনে জেল গেটে ডাকলে অনেকেরই ধারণা হয়–ঐ রাজবন্দিকে মনে হয় ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। আমার ক্ষেত্রে হলো আরেক নতুন নাটক।

জেল গেটে গিয়ে দেখলাম উচ্চপদস্থ পুলিশের কর্মকর্তারা বসে আছেন। সাথে আমার অ্যাডভোকেট রায়বাহাদুর রমেশ তালুকদার। তাঁরা জানালেন-পূর্ব বাংলার সরকার আমাকে ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে একটি শর্ত আছে। শর্ত হচ্ছে, জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়ে আমার বাড়ি বা অন্য কোথাও যাওয়া চলবে না। পুলিশ আমাকে সাথে করে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে পৌঁছে দিয়ে আসবে। আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে ভারতে।

অ্যাডভোকেট রমেশ তালুকদার অনেক কাকুতি মিনতি করলেন। বললেন-আমার আত্মীয়-স্বজনের সাথে নাকি তাঁর কথা হয়েছে। আমি জেলে আসায় আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। জেলখানায় পড়াশোনা করা সম্ভব নয়। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় প্রাইভেট পরীক্ষা দেয়া সম্ভব নয়। তিনি আরো বললেন, এ ব্যাপারে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের চাচা খান সাহেব মোশাররফ হোসেনের সাথেও কথা বলেছেন। এ ব্যবস্থা নাকি তিনিই করেছেন।

একথা আংশিক হলেও সত্য ছিল। ১৯৪৯ সালের শেষের দিকে খান সাহেব আমার সাথে ঢাকা জেলে দেখা করতে এসেছিলেন। সাথে ছিল আমার ছোট কাকা। আমার নওয়া কাকা ও ছোট কাকা টুঙ্গীপাড়া থানার পাটগাতীতে ডাক্তারি করতেন। ছোট কাকা টুঙ্গীপাড়ার শেখ পরিবারের পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন। আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল গভীর এবং সকল প্রকার জাত-পাত ও সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে। নাইলে খান সাহেব আমার সাথে দেখা করতে আসতেন না। পাকিস্তান আমলে আত্মীয়-স্বজনের পক্ষে রাজবন্দিদের সাথে দেখা করা দুঃসাধ্য ছিল। সেকালে পাকিস্তান সরকারের একমাত্র নীতি ছিল কাউকে বিশ্বাস না করা। এই নীতির ফলে অনেকে আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করতে এসে গ্রেফতার হয়ে গেছে। ঢাকা জেলে সেবারের প্রায় ৫ বছরের জেল জীবনে বাইরের কারো সাথে দেখা করার সুযোগ হয়েছিল আমার মাত্র তিনবার।

সে পরিস্থিতিতে খান সাহেবের পক্ষে আমার সাথে দেখা করা ছিল দুঃসাধ্য কাজ। এ কাজটি তিনি করেছিলেন। গোয়েন্দা বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন ঢাকায়। সাথে ছোট কাকা। তাদের একমাত্র অনুরোধ সরকারের কাছে মুচলেকা দিতে হবে আমি রাজনীতি করব না। এই মুচলেকা দেবার সাথে সাথে আমি মুক্তি পেয়ে যাব। আমি রাজি হলাম না। খান সাহেব ক্ষুব্ধ হলেন। কাকা বিদায় নিলেন চোখের জলে।

সেই ঘটনারই যেন আরেক ধরনের পুনরাবৃত্তি হচ্ছিল ১৯৫০ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটে। অ্যাডভোকেট রমেশ তালুকদারের কথা শুনে আমার মাথা যেন বিগড়ে গেল। আমি বললাম, আমি কোনো শর্তে মুক্তি চাই না। আমার লেখাপড়ার কথা আপনাদের ভাবতে হবে না। আমি কোথায় যাব, কোন দেশে থাকব সে সিদ্ধান্ত আমিই নেব। আর আপনারা আমার কেউ অভিভাবক নন। এ ব্যাপারে আমাকে উপদেশ দেবার চেষ্টা করবেন না। আমার কথা শুনে রমেশ বাবুর মুখ কালো হয়ে গেল। মনে হয় তিনি সরকার পক্ষকে বুঝিয়েছিলেন যে তিনি আমাকে রাজি করাতে পারবেন। আমার কথায় সব কিছু ভেস্তে গেল।

এরপর আর কথা জমল না। পুলিশ অফিসার একটি নতুন নির্দেশ বের করলেন। ঐ নির্দেশে আমার আটকাদেশ আরো ৬ মাস বাড়িয়ে দেয়া হলো। আমি জেলখানায় আমার ওয়ার্ডে ফিরে এলাম। জেলখানার বন্ধুরা অনেক খুশি হলেন। অনেকে ভিন্ন কথা বললেন। তখন একটা ভিন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল ঢাকা জেলে। দীর্ঘদিন অনশনে আমার স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। কোনোকিছুই হজম হচ্ছে না। মাসের পর মাস দু’বেলা বার্লি খেয়ে কাটাতে হচ্ছে। ভিন্ন পরিবেশে ঘটে যায় ৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আমি আর একটি আটকাদেশ নিয়ে ঢাকা জেলে ফিরে এলাম। পাকিস্তান সরকারের প্রস্তাব ছিল–আমাকে মুক্তি দেয়া হবে। শর্ত হচ্ছে–আমাকে পাকিস্তান ছাড়তে হবে। কিন্তু সে প্রস্তাবে আমি রাজি হলাম না। ফলে আটকাদেশ আরো ৬ মাস বৃদ্ধি পেল। তখন প্রায় ২ বছর জেল খাটা হয়ে গেছে।

জেলে তখন ভিন্ন পরিস্থিতি। কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনশন করে সকলেরই শরীর ভেঙে গেছে। চতুর্থ অনশন ধর্মঘটের সময় কুষ্টিয়ার শিবেন রায় মারা গেছেন। সে এক মর্মান্তিক কাহিনী। ঢাকা জেলে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে শিবেন রায়কে রাখা হয়েছিল তৃতীয় শ্রেণির কয়েদীর মতো। শুয়ে থাকতে হতো মেঝেতে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ৬ নম্বর সেলে কখনো সূর্যের আলো পাওয়া যায় না। ব্রিটিশ আমলের নির্জন সেল। কুষ্টিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা শিবেন রায়। ঐ সেলেই তিনি অনশন শুরু করেন। ডাক্তাররা অনশনের ৪ দিন পর অন্য বন্দির মতো তাকেও জোর করে নাক দিয়ে দুধ খাওয়াবার চেষ্টা করেন।

নাক দিয়ে দুধ খাওয়ানোর একটা বিপদ আছে। দুধ খাওয়ার নলটি নাক দিয়ে ঢুকে পাকস্থলিতে না গিয়ে সাংসে চলে যেতে পারে। সাংসে চলে গেলে মৃত্যু অনিবার্য।

শিবেন রায়ের ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল। সেই দুধ খাওয়ানোর পদ্ধতি ছিল বীভৎস। জেলের সিপাইরা জোর করে রাজবন্দিদের মেঝেতে ফেলে দিত। হাত পায়ের ওপর বসত। কখনো বুকের ওপরও বসত। তারপর ডাক্তার নাকে নল ঢুকিয়ে নাড়াচাড়া করত। ফলে দুধের নল সরে যাবার সম্ভাবনা থাকত। শিবেন রায়কে দুধ খাওয়ার সময় নলটি লাংসে চলে যায়। নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়। অন্যান্য সেলে খবর গেলে প্রতিবাদে রাজবন্দিরা শ্লোগান দিতে থাকে। কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ কোনো ক্ৰক্ষেপ করল না। আবার জোর করে একইভাবে তাকে দুধ খাওয়ানো হলো। ফলে মৃত্যু হলো শিবেন রায়ের। এবারের অনশনে রাজবন্দিরা কিছুটা জয়ের মুখ দেখল। রাজবন্দিদের অন্যান্য বন্দিদের চেয়ে পৃথক মর্যাদা দেয়া হলো। রাজবন্দিদের দু’শ্রেণিতে বিভক্ত করা হলো। শিবেন রায়ের মৃত্যু ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন জেলখানার আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার করল।

সঙ্কট দেখা দিল ভিন্ন প্রশ্নে। আমি আগেই উল্লেখ করেছি, পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাইকারি হারে বামপন্থীদের ধরপাকড় শুরু হয়। এদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারের। সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দেশ ভাগ হওয়ায় প্রতিটি পরিবারে শঙ্কা। কোনো পরিবারই স্থির সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি আদৌ তারা পাকিস্তানে থাকবে কিনা। বাড়তি অসুবিধা দেখা দিয়েছে ঘরে ঘরে রাজনৈতিক কর্মী থাকায়। তাদের ধারণা হয়েছে রাজনৈতিক কারণেই হয়তো তাদের দেশান্তরী হতে হবে।

পারিবারিক এই সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যেই গ্রেফতার হয়ে জেলখানায় এসেছে অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা। তারা জেলে আসার পর তাদের ঘরবাড়ি তছনছ হয়েছে। নির্যাতিত হয়েছে আত্মীয়-স্বজন। জেলে থাকাকালে অনেকের পরিবার দেশ ত্যাগ করে চলে গেছে। অর্থাৎ এদের পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবন একান্তভাবেই অনিশ্চিত।

জেলখানায়ও এই অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই স্থির করতে পারেনি মুক্তি পেলে তারা কোথায় যাবে। আদৌ পাকিস্তানে থাকবে কিনা। অনেকে আবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুক্তি পেলেই দেশ ছেড়ে চলে যাবে। এ ব্যাপারে লেখালেখিও করেছে পূর্ববাংলার সরকারের সাথে। এদের মধ্যে অনেকেই কমিউনিস্ট পার্টির বিশিষ্ট নেতা ও কর্মী।

আর এর মাঝখানেই কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সংগ্রামের ডাক এসেছে। জেলখানায় একের পর এক অনশন ধর্মঘট হচ্ছে। সংঘর্ষ হচ্ছে। আর বিপাকে পড়েছে এই রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরা। তাদের সাথীরা জেলখানায় অনশন করছে। সংঘর্ষ করে জীবন দিচ্ছে। অথচ তারা এই সংগ্রামের শরিক হতে পারছে না। সে ছিল এক মর্মান্তিক জ্বালা।

এ পরিস্থিতিতে আমি সরকারি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া হলো। অনেকে সাধুবাদ জানালেন। অনেকে স্পষ্টতই বললেন, সরকারের এ প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত ছিল। কারণ কোন কালে মুক্তি পাওয়া যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পাকিস্তানে কবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন হবে এবং তারপরে আমরা মুক্তি পাব সে কথা সঠিক করে বলা আদৌ সম্ভব নয়। তাই তাদের মতে, এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা আদৌ সঠিক ছিল না।

এর পরপরই এক মর্মান্তিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দুই বাংলার বড় খবর হয়ে উঠল। জেলখানায় কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। একমাত্র পত্রিকা দৈনিক আজাদ আর কলকাতার স্টেটসম্যান। কোনো কাগজ থেকেই প্রথম দিকে দাঙ্গার ভয়াবহতা অনুধাবন করা যায়নি। মাস তিনেক পরে এক খ্রিস্টান যাজক বরিশালের দাঙ্গা সম্পর্কে স্টেসসম্যানে ধারাবাহিক লিখতে শুরু করেন। এই ধর্ম যাজকের নাম এডওয়ার্ড ম্যাক-ই নার্নি। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় তিনি নোয়াখালীর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। সেই সুবাদে আমার সাথে মৈত্রী ও বৈরী সম্পর্ক হয়েছিল তার সাথে বরিশালে। সে কাহিনীতে পরে আসব।

ম্যাক-ই নার্নির রিপোর্ট থেকে বোঝা গেল যে, পূর্ববাংলার অবস্থা আদৌ স্বাভাবিক নয়। বরিশালের বন্দিরা উদগ্রীব হলেন। দীর্ঘদিন যাবত পরিবার পরিজনের কোনো খবর নেই। চারদিকে অনিশ্চয়তা, আশঙ্কা এবং চরম অসহায়ত্ব।

এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে চুক্তি হলো। এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। এ চুক্তি নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি নামে পরিচিত। এ চুক্তিতে বলা হলো–পূর্ববাংলার যে হিন্দুরা পশ্চিম বাংলায় যেতে চান বা পশ্চিম বাংলার যেসব মুসলমান পূর্ব বাংলায় যেতে চান দুই সরকার যৌথভাবে তাঁদের স্থানান্তরের দায়িত্ব নেবে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলকাতা, বরিশাল, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে স্টিমার চলাচল শুরু হলো। লাখ লাখ মানুষ দেশান্তরী হলো।

আমার তখন বারবার জেলখানায় মাওলানা আবুল কালাম আজাদের কথা মনে হলো। দেশ বিভাগের সময় তিনি এ প্রশ্নটি তুলেছিলেন। প্রশ্ন তুলেছিলেন উভয় দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে। সে প্রশ্নের জবাব মিলল ১৯৫০ সালে। প্রমাণিত হলো সাম্প্রদায়িক বিভক্তির ভিত্তিতে স্বাধীনতা সাম্প্রদায়িক সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেয় না। দিতে পারে না।

সে এক অদ্ভুত স্বাধীনতা। ভারতের মুসলমান জানে না সে তার জন্মভূমিতে থাকতে পারবে কিনা। পাকিস্তানের সংখ্যালঘুরা জানে না তারা আদৌ নিরাপদ কিনা। দুটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রনায়কেরা চুক্তি করে নিজের দেশের নাগরিকদের ভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দিল। পৃথিবীতে এর কোনো নজির নেই। তাহলে এ স্বাধীনতা কার? কাদের জন্য এ স্বাধীনতা? হিন্দু মুসলিম যদি দুই জাতিই হয়ে থাকে, যদি এক সাথে তাদের না থাকা হয়, সে জন্য যদি দেশ ত্যাগ করতে হয়, তাহলে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে লোক বিনিময় কেন করা হলো না? কেন জানমালের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা না করে এই উপমহাদেশকে ভাগ করা হলো সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে?

জেলখানায় আমার এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া সম্ভব ছিল না। কাউকেই স্বাভাবিক মনে হতো না। সকলেই মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কারো কোনো ধারণা নেই। ১৯৫০ সালে দাঙ্গার পর পরিস্থিতি এমন হলো, কেউই জানে না এ মুহূর্তে তাকে মুক্তি দেয়া হলে সে কোথায় যাবে, কোথায় গিয়ে উঠবে। কে তাকে আশ্রয় দেবে। আদৌ পূর্ববাংলা নামক জন্মভূমিতে তার জন্য কোনো আশ্রয় আছে কিনা।

একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল ভারত থেকে আসা কমরেডদের নিয়ে। তখন কমিউনিস্ট পার্টি ও আরএসপি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাকিস্তানে মুসলিম কমরেড ও ভারতে হিন্দু কমরেডরা রাজনীতিতে মুখ্য দায়িত্ব পালন করবে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কমিউনিস্ট পার্টির অসংখ্য মুসলিম কমরেড পশ্চিমবাংলা থেকে পূর্ববাংলা চলে আসেন। তারা পূর্ববাংলার বিভিন্ন কারাগারে আমাদের সাথে দিনের পর দিন অনশন ধর্মঘট করেন। অনেকের স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। ১৯৫০ সালের দাঙ্গা ও নেহেরু-লিয়াকত চুক্তির পর তাঁদেরও নতুন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়।

জেলমন্ত্রী চলে যাবার পরেও পরীক্ষা নিয়ে তেমন কোনো সুরাহা হয়নি। দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাকে জানাতে থাকলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় বলে আমাকে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষা দেবার অনুমতি দেয়া যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিন আবেদন নিবেদনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত আমার কাজে এল না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানালেন, এ সিদ্ধান্ত বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য প্রযোজ্য নয়। নিশ্চিত হয়ে গেল যে, জেলে থাকতে আমার আর পড়াশোনা করা সম্ভব নয়।

একদিক থেকে জেলখানায় আমি ছিলাম ভাগ্যবান। ভাগ্য বলে কিছু বিশ্বাস করি কিনা সে প্রশ্ন বিতর্কিত। তবে জেলখানায় যাদের চিঠি আসত তাদের ভাগ্যবান মনে হতো। সে এক অদ্ভুত মানসিকতা। অবরুদ্ধ দেয়ালের জগতে চিঠি হচ্ছে বাইরের খবর। বাইরের সাথে যোগাযোগ। তাই সকলেই প্রতিদিন চিঠির জন্য অপেক্ষা করত। জেল অফিস থেকে কেউ এলে জিজ্ঞাসা করা হতো চিঠি এসেছে কিনা। আর জেলের ঠিকানায় চিঠি এলেই যে আমাদের হাতে পৌঁছাবে তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। জেল অফিসে চিঠি পৌঁছালে সেন্সরের জন্য গোয়েন্দা অফিসে পাঠানো হতো। অনেক চিঠি গোয়েন্দা অফিস বাজেয়াপ্ত করত। আবার কোনো চিঠির কোনো অংশ কেটে দিত। ফলে জেল অফিসে কোনো চিঠি পৌঁছাবার পর সে চিঠি রাজবন্দিদের হাতে পৌঁছাতে দীর্ঘদিন লেগে যেত। আবার অনেক চিঠিই দেয়া হতো না।

তবুও এ চিঠি নিয়ে হৈচৈ ছিল জেলখানায়। একটি চিঠি এলে সে চিঠি বারবার পড়া হতো। প্রতিটি বাক্য বিশ্লেষণ করা হতো। আবিষ্কার করার চেষ্টা হতো ঐ চিঠিতে কোনো গোপন সংকেত আছে কিনা। জেল থেকে মুক্তি পাবার ইঙ্গিত আছে কিনা। তাই যাদের চিঠি আসত না তাদের মন খারাপ হয়ে যেত। আমার সব সময় মনে হয়েছে জেলে যাদের আত্মীয়-স্বজন আছে তাদের উচিৎ ঐ বন্দিকে চিঠি লেখা। সে বন্দি রাজবন্দি হতে পারে, খুনের আসামী হতে পারে। হতে পারে ভিন্ন কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত। আমার অনুরোধ জেলখানার স্বজনদের জন্য চিঠি লিখবেন। সে যেই হোক না কেন। চিঠির অভাব আমার কোনোদিনই হয়নি। আমার চিঠি ছিল সকলের কাছে ঈর্ষার।

এ চিঠি আসা না আসা নিয়ে জেল জীবনে একটি বিরাট অংশ কাটে। আবার জেলে কোনো অপরাধ করলে চিঠি লেখা এবং চিঠি পাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তেমনটি হতে অনশনের সময়। যারা অনশন করত তারা জেলখানার আইনে অপরাধী। তাই তাদের চিঠি বন্ধ করে দেয়া হতো। বন্ধ করা হতো বাইরের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সাক্ষাতকার।

১৯৫০ সালে জেলখানার চতুর্থ অনশন শেষ হবার পর এই অনশন পর্ব শেষ হলো। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি নতুন সিদ্ধান্ত নিল জেলখানার আন্দোলন সম্পর্কে। কমিনফর্ম কমিউনিস্টদের কনফর্মেশন ব্যুরো ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির তীব্র সমালোচনা করে জানাল, তাদের রাজনীতি নিতান্তই ভুল। তাদের সমালোচনায় বলা হলো জেলখানা হচ্ছে শ্রেণি শত্রুর সবলতম ঘাঁটি। সেই ঘাঁটির মধ্যে তারা হচ্ছে সর্বশক্তিমান। সেখানে বিপ্লব করার চেষ্টা অথবা শত্রুর সাথে একটা সরাসরি বোঝাঁপড়ার কর্মসূচি ছিল নিতান্তই ভুল। শত্রুর এই সবলতম ঘাঁটিতে শত্রুকে আঘাত করতে গিয়ে সংগঠনের দিক থেকে পার্টি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কমিনফর্মে এই সমালোচনায় জেলখানায় আমাদের অনশনের বহর কমল। কিন্তু ইতিমধ্যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে রাজবন্দিদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে। রাজশাহীর সাঁওতাল এলাকায় গ্রেফতার করে ইলা মিত্রের ওপর চালানো হয়েছে ইতিহাসের জঘন্যতম অত্যাচার। রাজশাহী জেলে পাখির মতো গুলি করে মারা হয়েছে রাজবন্দিদের। সে পর্ব শেষ হলো কমিনফর্মের নির্দেশে। এ কমিনফর্ম কী? এর নির্দেশ ভারতীয় কমিউনিস্ট পাটির শুনতে হবে কেন?

১৯৫০ সালে জেলখানায় মোটামুটি তেমন কোনো গোলমাল ছিল না। কমিউনিস্ট পার্টির সেকালের কৌশল পরিবর্তন হয়েছে। জেলখানায় আন্দোলন স্তিমিত। তবে জেলখানা থেকে কবে মুক্তি পাওয়া যাবে সে সম্পর্কে কেউই তেমন নিশ্চিত নয়। ১৯৫০ সালে দাঙ্গার পরে কেউই জানে না কার ভবিষ্যৎ কী হবে?

পাকিস্তানের রাজনীতিতেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে তখন। ১৯৪৮ সালে ১১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মারা যান। একক নেতৃত্বে আসেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। লিয়াকত আলী ভারতের উত্তর প্রদেশের অধিবাসী। ভারত ভাগ হওয়ার সময় তিনি পাকিস্তানে আসেন। মুসলিম লীগের সম্পাদক হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খান-ই বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। জিন্নার মৃত্যুতে নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দেয়। পাকিস্তানে গভর্নর জেনারেল কে হবে সেই বিতর্ক উঠতে থাকে। কে মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট হবেন সে প্রশ্নও দেখা দেয়। এ সময় পাকিস্তানের আমলারা ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করেন। গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত একাউন্ট সার্ভিসের গোলাম মোহাম্মদ। তিনি ভারতের হায়দারাবাদের নিজাম সরকারের অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন। পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার প্রথম অর্থমন্ত্রী ছিলেন। গোলাম মোহাম্মদের গভর্নর জেনারেল পদে নিযুক্তির পর পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন খেলা শুরু হয়। মুসলিম লীগের সভাপতি হন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান নিজেই।

তখন মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ছিলেন জমিদার, জোতদার এবং নব্য শিল্পপতিরা। এই জমিদার ও জোতদারের স্বাভাবিক মিত্র ছিল সামরিক ও বেসামরিক আমলারা। জিন্নাহ এবং লিয়াকত আলীর মতো ব্যক্তিত্বের উপস্থিতির জন্য তাঁদের জীবিতকালেই আমলারা রাজনীতিতে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কিন্তু জিন্নার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করার জন্য সামরিক ও বেসামরিক আমলারা তৎপর হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর তখন পৃথিবীতেও ছিল ভিন্ন পরিস্থিতি। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিম শিবির, অপরদিকে সোভিয়েন ইউনিয়ন। পশ্চিম মহলে তখন ভয়, যে কোনো দেশে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসতে পারে। এছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের কাছে চীন। চীনেরও বিপ্লব হয় ১৯৪৯ সালে। সারা পৃথিবীতে তখন চরম কমিউনিস্ট আতঙ্ক। কমিউনিস্টদের ঠেকাবার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৎপর। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিস্ট বিরোধী উদ্যোগ দ্বিধা-বিভক্ত হলো ভারতীয় উপমহাদেশে।

১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান এই সময়ে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু তখন দুটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এক ছিল না। ব্রিটিশ আমলের প্রায় সকল শিল্প কারখানাই ভারতীয় এলাকায় পড়েছিল। ব্রিটিশ আমলেই এক শ্রেণির শিল্পপতি ভারতে জন্ম নিয়েছিল। এই শিল্পপতিরা অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পপতিদের সাথে টক্কর দিতে পারত। তাই ভারত স্বাধীন হবার পর থেকে বিভিন্ন প্রশ্নে ব্রিটিশ-মার্কিনসহ পাশ্চাত্যের সরকারের সাথে ভারতের মতানৈক্য শুরু হয়। কমিউনিস্ট বিরোধিতার নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন একের পর এক চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়। পাকিস্তান এ উদ্যোগের সামিল হলেও ভারত সরকার কোনোদিনই এ ধরনের উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয়নি। পাকিস্তানের কাছে পরিস্থিতি ভিন্নতর। পাকিস্তানে শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন ছিল না। তাকে মূলধন সংগ্রহ করতে হতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেনের কাছ থেকে। আর এই মূলধন পাওয়া কখনোই শর্তহীন ছিল না। তাদের শর্ত ছিল, কমিউনিস্টদের প্রতিরোধ করতে হবে, প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হবে, অন্যথায় সাহায্য মিলবে না। অপরদিকে পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ অর্থাৎ এককালের মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের সাংগঠনিকভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের কোনো ঐতিহ্য ছিল না। ফলে পাকিস্তান জন্মলগ্ন থেকেই পাশ্চাত্যের শিবিরে চলে যায়।

কিন্তু ভারতের কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের একটি দীর্ঘ দিনের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের ঐতিহ্য ছিল। আবার ভারতীয় শিল্পপতিদের তেমন মূলধনের সঙ্কট ছিল না। তাই ভারতের কংগ্রেস নেতারা পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক কোনো শিবিরেই পুরোপুরি যোগ দেননি। তাঁরা দরকষাকষি করে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছেন এবং এ ভিত্তিতে ভারতের পররাষ্ট্র নীতি ছিল গোষ্ঠী নিরপেক্ষ। আর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র নীতি ছিল পাশ্চাত্য ঘেঁষা।

তবে পশ্চিমা ঘেঁষা পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করতেও পাকিস্তানকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছিল–পাকিস্তান কোন পক্ষে যাবে? পাকিস্তান এককালে ব্রিটেনের উপনিবেশ ছিল। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটেন পাকিস্তানকে কজায় রাখতে চেয়েছে। অপরদিকে পাশ্চাত্যের রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে ব্রিটেনকে হটিয়ে নেতৃত্বে এসে যায়। সে পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে ব্রিটেনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। ফলে পাকিস্তানের ব্রিটেন লবিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। তখন পাকিস্তানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন খাজা শাহাবুদ্দীন। তকালীন পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের কনিষ্ঠ ভাই, খাজা পরিবার বরাবরই ব্রিটিশ রাজনীতির পরম সুহৃদ।

শাহাবুদ্দীনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রিত্বের আমলে ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডিতে এক জনসভায় ভাষণ দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান প্রকাশ্য দিবালোকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। লিয়াকত আলীর হত্যাকারী সৈয়দ আকবর একজন জেলমুক্ত আসামী। সে সীমান্তের হাজেরা জেলায় অন্তরীণ ছিল। সে লিয়াকত আলীকে গুলি করার সাথে সাথে অপর একজন পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা তাকে গুলি করে হত্যা করে। অর্থাৎ লিয়াকত আলীর সঙ্গে তার হত্যাকারীকেও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। ফলে লিয়াকত হত্যার ঘটনা আর কোনোদিনই জানবার সুযোগ থাকল না। রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, এটা ছিল পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্রিটিশ ও মার্কিন লবির সঙ্কটের অনিবার্য পরিণতি। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান মিত্রের সন্ধানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীনের উপদল এটা পছন্দ করেনি। তাই নিহত হলেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। হত্যাকারী একজন অন্তরীণ ব্যক্তি। প্রশ্ন দেখা দিল এই অন্তরীণ মানুষটি হাজেরা থেকে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে কী করে রাওয়ালপিন্ডিতে এল। কেনই বা হত্যাকারীকে মামলার স্বার্থে বাঁচিয়ে না রেখে সাথে সাথেই হত্যা করা হলো। এ রহস্যের জট আজো পাকিস্তানের রাজনীতির অঙ্গনে কেউ খুলবার চেষ্টা করেনি। লিয়াকত আলী নিহত হলেন। পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্রিটিশ লবি আর মার্কিন লবির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে পারলেন না।

জেলখানায় কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিল কমিনফর্মের নির্দেশে। কমিনফর্ম হচ্ছে কমিউনিস্ট ইনফরমেশন ব্যুরো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে কমিনফর্ম গঠিত হয়েছিল ৯টি দেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে নিয়ে। এ ৯টি দেশ হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি, যুগোশ্লাভিয়া, চেকোশ্লাভিয়া, ইতালি ও ফ্রান্স। কমিনফর্মের লক্ষ ছিল বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা, সংবাদ আদান-প্রদান। কিন্তু কমিনফর্মও এক সময় তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক কমিনটার্ন-এর ভূমিকা গ্রহণ করে। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশ বাস্তবায়নই এককালে কমিনফর্মের কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এ পরিস্থিতির প্রতিবাদ করলে ১৯৪৮ সালে জুন মাসে যুগোশ্লাভিয়াকে কমিনফর্ম থেকে বহিষ্কার করা হয়। কমিনফর্মের প্রধান দফতর বেলগ্রেড থেকে রুমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্ট স্থানান্তরিত করা হয়। আবার ক্রুশ্চেভের আমলে যুগোশ্লাভিয়াকে খুশি করতেই ১৯৫৭ সালের ১৭ এপ্রিল কমিনফর্ম ভেঙে দেয়া হয়। এই ক্ষেত্রে কমিনফর্মই হচ্ছে শেষ কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা।

রাজনীতির ইতিহাসে আন্তর্জাতিকভাবে শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ করার প্রথম প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন কার্ল মার্কস। ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস ও ফ্রিডারিক এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেন। এ ম্যানিফেস্টোতে বলা হয় যে-পৃথিবীর ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস এবং একদিন পুঁজি ও শ্রমের তীব্র সংঘর্ষের ফলে শ্রমিক শ্রেণি ক্ষমতায় আসবে এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হবে শোষণহীন সমাজ।

এই কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর পরিপ্রেক্ষিতেই মার্কস-এঙ্গেলস আন্তর্জাতিকভাবে শ্রমিক শ্রেণিকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। ১৮৬৪ সালে তিনি গড়ে তোলেন ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশন। ১৮৭৬ সাল পর্যন্ত এ সংগঠন বেঁচে ছিল। মার্ক ১৮৮৩ সালে মারা যান। মাকর্মপন্থীরা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন ১৮৮৯ সালে। প্যারিসে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কারস কংগ্রেসের বৈঠক বসে। নামকাওয়াস্তে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বেঁচে ছিল ১৯১৪ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে মতানৈক্য ছিল চরম।

দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে মতানৈক্য দেখা দেয় বিশেষ করে যুদ্ধে সমাজতন্ত্রীদের ভূমিকা নিয়ে। তখন প্রথম মহাযুদ্ধ এগিয়ে আসছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, যুদ্ধে সমাজতন্ত্রী কমিউনিস্টদের ভূমিকা কী হবে। সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল যুদ্ধ হচ্ছে সর্বহারাদের একটি সুযোগ। যুদ্ধের সময় সর্বহারা শ্রেণির রাজনৈতিক দলের কর্তব্য হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে নিজ নিজ দেশের পুঁজিবাদী সরকারকে আঘাত করা এবং এ দুর্বল মুহূর্তে আঘাত করে ক্ষমতা দখল করা।

কিন্তু একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যতীত কোনো দেশেই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলো না। গণতান্ত্রিক সমাজবাদী (সোস্যাল ডেমোক্রেটরা) যুদ্ধের সময় জাতীয়তাবাদী হয়ে গেল এবং নিজ দেশের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহযোগী হল। প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক হলো অর্থহীন-অস্তিত্বহীন।

এই পটভূমিতে সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবের পর ১৯১৯ সালে তৃতীয়বারের মতো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেন লেনিন। বৈঠক ডাকা হয় মস্কোতে, লেনিনের নেতৃত্বে গঠিত এই আন্তর্জাতিকের নাম হয় তৃতীয় আন্তর্জাতিক বা কমিনটার্ন (কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল)।

তৃতীয় আন্তর্জাতিক গঠনের ৫ বছর পর মারা যান লেনিন। সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে আসেন স্ট্যালিন। স্ট্যালিন নেতৃত্বে আসার পর প্রথম বিতর্ক শুরু হয় সমাজতন্ত্রের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে। একক বিচ্ছিন্ন একটি দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব কিনা সমাজতন্ত্রের বিজয় বা পূর্ণ বিজয় সম্ভব কিনা এ প্রশ্নে পৃথিবীতে তিনটি মত দেখা দেয়। স্ট্যালিনের মতে, একটি দেশের শুধু সমাজতন্ত্রের বিজয় নয়, পূর্ণ বিজয় সম্ভব। ট্রটীর মতে বিজয় বা পূর্ণ বিজয় আদৌ সম্ভব নয়। এমনকি ইউরোপের অন্যান্য দেশে বিপ্লব না হলে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের বিনির্মাণের কাজ শুরু করা সব নয়। তৃতীয় ধারার মতে, একটি দেশের সমাজতন্ত্রের পূর্ণ বিজয় আদৌ সম্ভব নয়, তবে সমাজতন্ত্রের বিনির্মাণের কাজ শুরু করা যায়। ভারতে প্রথম ধারার অনুসারী ছিল কমিউনিস্ট পার্টি, দ্বিতীয় ধারার অনুসারী ট্রটস্ফীবাদীরা এবং তৃতীয় মতের অনুসারী বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল আরএসপি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে তৃতীয় আন্তর্জাতিক স্ট্যালিনের মতকেই গ্রহণ করে এবং প্রচার করতে থাকে।

এই তৃতীয় আন্তর্জাতিকে সঙ্কট দেখা দেয় ১৯২৮ সাল থেকে। তৃতীয় আন্তর্জাতিকে ৬ষ্ঠ কংগ্রেসে নতুন কৌশল নির্ধারণ হয়। গণতান্ত্রিক সমাজবাদীদের (সোস্যাল ডেমোক্র্যাট) ফ্যাসিস্ট বলে আখ্যায়িত করা হয়। এমনকি তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার নির্দেশ দেয়া হয়। এই তত্ত্ব অনুসারে ভারতের কমিউনিস্টরা ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনের বিরোধিতা করে। কারণ কংগ্রেসের নেতৃত্বে ছিল সংস্কারবাদী প্রতিক্রিয়াশীল গান্ধী এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। এই তত্ত্বের ভয়াবহ পরিণতি দেখা দেয় পরবর্তীকালে। জার্মানিতে সোস্যাল ডেমোক্র্যাট ও কমিউনিস্টরা বিভক্ত হয়ে যায়। হিটলারের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থান ঘটে ১৯৩৩ সালে। ১৯৩৫ সালে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসের বৈঠক বসে। এবার পপুলার ফ্রন্টের তত্ত্ব আনা হয়। বলা হয়, ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থানের ফলে পৃথিবীতে নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবী এখন তিন ভাগে বিভক্ত– (১) সোভিয়েট সমাজবাদ (২) গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদ (ব্রিটেন, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) (৩) ফ্যাসিবাদ। বলা হয় ফ্যাসিবাদকে রুখবার জন্য গণতান্ত্রিক সমাজবাদীদের সাথে ঐক্য করা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লেনিনপন্থী দাবিদার কমিউনিস্ট সোসালিস্টদের পক্ষ থেকে বলা হলো–এটা সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাঁচাবার কৌশল। এতে লেনিনবাদের চিহ্নমাত্র নেই।

এ ব্যাখ্যা সত্য প্রমাণিত হলো ১৯৩৯ সালে। তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ঘনঘটা। যে কোনো মুহূর্তে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। ঐ মুহূর্তে আগস্ট মাসে জার্মানি রাশিয়ার সাথে অনাক্রমণ চুক্তি করল। অর্থাৎ জার্মানি তখন পশ্চিম ইউরোপ আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পূর্বে রাশিয়াকে ঠেকা দেয়াই ছিল এ চুক্তির লক্ষ্য। অথচ পপুলার ফ্রন্ট তত্ত্বে ফ্যাসিবাদের সাথে চুক্তির কথা ছিল না। বিশ্বের রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলো এ সত্ত্বেও বলল, এটাই সঠিক। এবার যুদ্ধ হচ্ছে জার্মানি ও ব্রিটেন-ফ্রান্সের সাথে। এ যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আমাদের নিজ দেশের সরকারকে উৎখাতের সংগ্রাম করতে হবে। ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি বলল–এ যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। এ যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। কিন্তু তেমনটি ঘটল না। ১৯৪১ সালের জুন মাসে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করল। বিশ্বের মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের এবার স্লোগান পাল্টে গেল। এবার আর সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ নয়। রাশিয়া আক্রান্ত হওয়ায় এ যুদ্ধ জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছে। সুতরাং পপুলার ফ্রন্ট তত্ত্ব অনুযায়ী গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ, ফরাসি, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের যুদ্ধকালীন বন্ধু। এদের বিরুদ্ধে এখন কোনো আন্দোলন নয়। এখন যুদ্ধ ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করার জন্য। এ তত্ত্বের ফলে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি যুদ্ধের সময় ব্রিটিশের সাথে সহযোগিতা করে। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করে। সুভাষচন্দ্র বসুকে ফ্যাসিস্টদের দালাল বলে আখ্যা দেয়।

এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তিনটি বৃহৎ শক্তি অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধকালীন মৈত্রী হয়। ১৯৪৩ সালে আবার দু’শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে দাবি করে যে, তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে দিতে হবে। কারণ তৃতীয় আন্তর্জাতিকের নির্দেশে দেশে দেশে কমিউনিস্টরা নাশকতামূলক কাজ চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক চাপে স্ট্যালিনকে রুজভেল্ট ও চার্চিলের প্রস্তাব মেনে নিতে হয়। তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে দেয়া হয়। যদিও প্রকাশ্যে বলা হয় যে, বিশে কমিউনিস্ট আন্দোলন শক্তিশালী হওয়ায় এখন আর আন্তর্জাতিকের প্রয়োজন নেই। দেশে দেশে কমিউনিস্টরা নিজেরাই আন্দোলন করবে। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজস্ব প্রয়োজনেই চাপে পড়ে আন্তর্জাতিক ভেঙে দিতে হয়।

কিন্তু কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিকের প্রয়োজন কোনোদিন ফুরায় না। সাম্যবাদী বিশ্ব আন্তুর্জাতিক কোনো দেশের গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ নয়। তাই আবার কমিনফর্মের নামে নয়া আন্তর্জাতিক গড়ে তোলা হয় ১৯৪৭ সালে। সদর দফতর স্থাপিত হয় বেলগ্রেডে। এবার বেলগ্রেড থেকেই অভিযোগ ওঠে যে কমিনফর্মের নামে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার মতামত চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে যুগোশ্লাভকে কমিনফর্ম থেকে বহিষ্কার করা হয়। কমিনফর্ম ভেঙে দেয়া হয় ১৯৫৭ সালে। সেই কমিনফর্মের নির্দেশেই কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৫০ সালে জেলখানার আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তন করে। আন্তর্জাতিকের নামে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে দেশে দেশে চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের এভাবে শিকার হয় কমিউনিস্ট আন্দোলন। এই কমিনফর্ম-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলখানায় আন্দোলন স্তিমিত হলো। কিন্তু বাইরে তখন আন্দোলন নতুন করে গতি পাচ্ছে। লিয়াকত আলীর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন খাজা নাজিমুদ্দীন। গভর্নর জেনারেল হলেন আমলা গোলাম মোহাম্মদ। প্রধানমন্ত্রী হয়ে ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকা আসেন। তিনিও মোহাম্মদ আলী জিন্নার ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। পল্টন ময়দানে তিনি এক জনসভায় বললেন- উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হলো পূর্ব বাংলায়। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট আহ্বান করা হয় ২১ ফেব্রুয়ারি। ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে রাজনৈতিক দলসমূহের এক সভা হয়। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন মওলানা ভাসানী। ৪ ফেব্রুয়ারি ১০ হাজার ছাত্র ছাত্রী ঢাকায় মিছিল করে। ২১ ফেব্রুয়ারি নিয়ে পূর্ব বাংলায় সরকারি মহলে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। তখন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নূরুল আমিন। মুখ্য সচিব অর্থাৎ চিফ সেক্রেটারি ছিলেন জাদরেল পাঞ্জাবি আমলা আজিজ আহম্মদ। বলা হতো আজিজ আহম্মদ-ই ছিলেন তখন পূর্ব বাংলার প্রকৃত শাসনকর্তা। সিদ্ধান্ত হয় ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করার। কিন্তু ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট বিশ্বাসভাজন ছিলেন না। ফলে নারায়ণগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক অবাঙালি কোরেশীকে ঢাকায় রাতারাতি বদলি করে আনা হয়। ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি হয়। সেই ১৪৪ ধারা ভেঙে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা মিছিল করে।

তবে ১৪৪ ধারা ভাঙা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। বলা হয়, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ১৪৪ ধারা ভাঙতে রাজি ছিল না। তারা কোনো বড় ধরনের গোলমালে যেতে রাজি হননি। মুখ্যত ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এ ব্যাপারে কার কী ভূমিকা ছিল তা এখনো অস্পষ্ট। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন অনেকেই ভাষা সৈনিক হবার দাবিদার। এই খেতাব নিয়ে তাঁদের মধ্যে অনেকে এখন সভা সমিতিতে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। তবে এ সম্মান তাঁরা পাবার যোগ্য কিনা সে প্রশ্নের জবাব তাঁদেরই দেবার কথা। তাঁরা নিজের কথা সঠিকভাবে বললে এ অস্পষ্টতা অনেকটা দূর হতো। এ প্রসঙ্গে শুধু একটি কথাই জোর দিয়ে বলা যায়, সেদিন সাধারণ ছাত্ররা বিশেষ করে মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল।

আমি তখন ঢাকা জেলে। প্রায় বছর চারেক হলো বরিশাল জেল থেকে ঢাকা জেলে এসেছি। জেলা শহরে থাকতাম। রাজধানীর খবর তেমন রাখতাম না। পূর্ব বাংলার খবরের কাগজ একমাত্র দৈনিক আজাদ। এ কাগজটিতেও বিরোধী দলের খবর তেমন থাকত না। তাই খবর পাওয়া ছিল খুব কষ্টকর। অপরদিকে ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর বামপন্থী রাজনীতি একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। কে কোথায় আছে তাও দীর্ঘদিন খবর পাইনি। দলের নেতা অনেকেই দেশান্তরী হয়ে গেছেন। এমনকি মোজাম্মেল দা-ও নাকি কলকাতায় চলে গেছেন (মোজাম্মেল হক পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। দৈনিক পাকিস্তান-এর প্রথম বার্তা সম্পাদক–যিনি কায়রোগামী পিআই-এর বিমান দুর্ঘটনায় ১৯৬৫ সালের ২০ মে মারা যান)। আমাদের নেতা অনিল দাশ চৌধুরী, আব্দুল খালেক খান ও ছাত্রনেতা নারায়ণ দাশ শর্মা কোথায় আছেন তাও জানি না। বরিশালের এই তিন নেতা মোজাম্মেল-দাসহ পাকিস্তান সৃষ্টির বছর কয়েকের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে যান। আদালত তাদের শাস্তি দেয়। শুনেছিলাম তারা সিলেটে জেলে আছেন। মুক্তি পেয়েছেন কবে তাও জানি না। লোকমুখে শুনেছি ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর মোজাম্মেল দা ও অনিল দা কলকাতায় চলে গেছেন। ভেবেছি হয়তো নারায়ণও চলে গেছে কলকাতায়। জানতাম না খালেক দা কোথায়? খালেক দা-আব্দুল খালেক খান। পরবর্তীকালে সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। খালেক দা মারা গেছেন ২০০২ সালে।

সময়টা ছিল অস্বস্তিকর ও অনিশ্চিত। তখন ফাল্গুন মাস। হঠাৎ যেন মনে হলো দক্ষিণের বাতাস এসে সব পুরনো পাতা ঝরিয়ে দিল। ঢাকা জেলের তখন পুরনো হাজতে আছি। তিন দিকে উঁচু উঁচু দেয়াল। বারবার চোখ দেয়ালে ধাক্কা খায়। এককালে ওখানে ২০ জন বন্দি ছিলেন। ৬ মাসের মধ্যে ১৯ জনকে চশমা নিতে হয়েছিল। আমি দক্ষিণ দিকে ঘরে থাকতাম। পাশে উঁচু দেয়াল। সেই দেয়াল ছাড়িয়ে একটি অশ্বথ গাছ। সেই অশথ গাছের পাতা ঝরা ও নতুন নতুন পাতা দেখে বছরের পর বছর ঋতু পরিবর্তন লক্ষ করতাম।

সেই দেয়ালের জগতে ২১ ফেব্রুয়ারি একজন সিপাহি এল। পরনে লুঙ্গি। একটি ব্যাগে তার প্যান্ট ও জামা। সে এসে বলল, দেশ দোজখ হয়ে গেছে। চারিদিকে গুলি আর গুলি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলি হয়েছে। অসংখ্য ছাত্র মারা গেছে। সে ভয়ে সরকারি জামা-কাপড় পরে জেলে ঢুকতে পারেনি। লুঙ্গি পরে ঢুকেছে।

আমরা চমকালাম। কিভাবে চমকেছিলাম বর্ণনা করা যাবে না। পূর্ববাংলা অর্থাৎ পাকিস্তানে এমন ঘটনা ঘটতে পারে আমরা তা আশা করিনি। সবার মনে ছিল মুক্তি পাবার চিন্তা। এটা জানা ছিল যে, সহজে মুক্তি হচ্ছে না। আমাদের মুক্তির জন্য কেউ আন্দোলনও করবে না। হঠাৎ যেন সবকিছু পাল্টে গেল। সন্ধ্যার দিকে জেলখানায় নতুন কণ্ঠের ধ্বনি শোনা গেল। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সমগ্র জেলখানা মুখরিত। একদল তরুণ ঢাকা জেলে ভরে গিয়েছে। ওরা কিছু মানে না। ওরা কিছু মানতে চায় না। কিন্তু আমাদের কারো সাথে ওদের দেখা হলো না। কারণ রাজনীতির ভাষায় আমরা ‘বি ক্লাস’। অর্থাৎ আমরা দাগী আসামী। আমাদের সাথে ওদের রাখা চলে না। আমাদের সাথে এলে ওরা খারাপ হয়ে যাবে।

কিন্তু আমরা কী করবো? দেশে গুলি হবে। হত্যা হবে। তাতে আমাদের কিছুই করার নেই। জেলে বন্দি আছি বলে কি কিছুই করতে পারব না। সিদ্ধান্ত হলো পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি আমরা ২৪ ঘন্টা অনশন করব। অথচ অনশন করবার মতো স্বাস্থ্য কারও ছিল না। ২২ ফেব্রুয়ারি ভোরে এক সিপাহি লুকিয়ে একটি আজাদ পত্রিকা দিয়ে গেল। পত্রিকাটিতে বড় করে আছে আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিনের পদত্যাগের খবর। খবর আছে খয়রাত হোসেন ও আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ-এর। ভেতরে খবর আছে মিছিল, গুলি আর আন্দোলনের।

আমরা সবাই উজ্জীবিত। কিন্তু শরীর বড্ড দুর্বল। ২৪ ঘণ্টার অনশনও যেন শেষ করা যাচ্ছিল না। রাত ১২টায় আমার জন্য চিকিৎসক এলেন। বললেন–কোনো কিছু না খেলে অঘটন ঘটে যেতে পারে। আমি বছরখানেক ধরে স্বাভাবিক খাবার খেতে পারছিলাম না। দীর্ঘদিন অনশনে শরীর ভেঙে গিয়েছিল। বছর দুয়েক ধরে দুবেলা বার্লি খেতাম। অন্য কিছু সহ্য হতো না। বন্ধুরা বললেন, কিছু খেতে হবে। আমি বললাম–শুধুমাত্র ধনে ভিজানো জল পেলেই হবে। ঐ জল খেলেই বমি বমি ভাব কেটে যাবে–আমি ঘুমিয়ে যাব। তারপর ২৩ ফেব্রুয়ারির ভোর এল। আমার আর উঠবার শক্তি ছিল না। সারা জেলখানায় তখন তারুণ্যের কলরব আর কোলাহল। জেলখানায় ২১ ফেব্রুয়ারি এল নতুন বাতাসের মতো। ১৯৪৮ সালে জেলে এসেছিলাম। ১৯৫০ সালে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিল। সেই দাঙ্গার পর আন্দোলনের প্রত্যাশা দিনের পর দিন ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিল। সে আবহাওয়া একেবারে পাল্টে দিল ২১ ফেব্রুয়ারি। মনের জগতে নতুন হাওয়া। নতুন উদ্দীপনা। তবে দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে অনেক দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছিল।

বরিশালে গ্রেফতার হয়েছিলেন অগ্নিযুগের বিপ্লবী দেবেন ঘোষ। তাঁর সাথে গ্রেফতার হয়েছিলেন তার বড় ভাইয়ের ছেলে দেবকুমার ঘোষ, যিনি মনা ঘোষ নামেই বিশেষ পরিচিত। গ্রেফতার হয়েছিলেন বরিশালের বাণীপীঠ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রেমাংশু সেনগুপ্ত।

দেবেনদা অর্থাৎ দেবেন ঘোষ এবং মনাদার সাথে আমার সম্পর্ক কলেজ জীবন থেকে। এরা দুজনেই এককালে অনুশীলন সমিতির সদস্য ছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁরা আরএসপি গঠন করেন। দেশ ভাগ হবার পূর্ব মুহূর্তে জয়প্রকাশের নেতৃত্বে সোস্যালিস্ট পার্টিতে তারা যোগ দেন।

আমি কলেজ জীবনে আরএসপি’র সংস্পর্শে আসি। দীর্ঘদিন বরিশালে দেবেন দা-দের বাসায় থেকেছি। আমি মোজাম্মেল দা-সহ (মোজাম্মেল হক) অনেকেই দেবেন দা-দের বরিশালের কাউনিয়ার বাসায় ছিলাম। বাসাটি ছিল রাজনীতিকদের হোটেল। কে কখন আসত, কে কখন খেত, কে কখন ঘুমাত তার কোনো হিসাব ছিল না। দেবেনদার বৌদি অর্থাৎ মনাদার মা সব কিছু দেখাশোনা করতেন। বরিশালের ঐ একটিমাত্র বাসায় কোনো জাত-পাতের বিচার ছিল না।

মনাদা ছিলেন সাদাসিদে। ঘোরপ্যাঁচ বুঝতেন না। তত্ত্বের বেশি ধার ধারতেন না। মেঝ কাকা অর্থাৎ দেবেন ঘোষ যা বলবেন তাই শিরোধার্য। তবে এই সাদাসিদে মানুষটির আর একটি রূপ ছিল। অস্ত্র চালনায় তিনি ছিলেন দক্ষ। অনুশীলন সমিতি গড়ে উঠেছিল কতগুলো ক্লাবকে কেন্দ্র করে। দৈহিক কসরত থেকে শুরু করে লাঠি খেলা, ছোরা খেলা সবকিছুর প্রশিক্ষণ দেয়া হতো এই ক্লাবে। এই কাউনিয়া ক্লাব থেকে এককালে মনাদাকে পাঠানো হয়েছিল বিহারে সদাকৎ আশ্রমে। এই আশ্রমে মনাদা অস্ত্রচালনা শিক্ষা দিতেন। ব্রিটিশ আমলে মনাদা ও দেবেন দা দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন। দেবেন দা অভিযুক্ত হয়েছিলেন বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলায়। অনেকে বলেন, দেবেন দা’র পরিবার বরিশালের নাজিরপুরের উত্তরে বিস্তীর্ণ এলাকার জমির মালিক ছিলেন। বরিশালে তাদের দুটি কাটা কাপড়ের দোকান ছিল। একটির পর একটি মামলা মোকাবেলা করতে গিয়ে তাদের সবকিছু বিক্রি করতে হয়েছে। গল্পের মতো প্রচারিত আছে, বরিশাল সদর হাসপাতালের অনেকগুলো পেইং ওয়ার্ড যাদের নামে প্রতিষ্ঠিত সেই দাতারা টাকা রোজগার করেছিলেন দেবেন দা-দের বিরুদ্ধে আইনজীবী হিসেবে ব্রিটিশ পক্ষের উকিল হয়ে। শেষ জীবনে তাঁদের অনুতাপ হয়। তাই ঐ মামলায় আয় করা টাকা তারা হাসপাতালে দান করেন।

দেবেন দা’র সাথে দেখা হয় আমার ১৯৪৬ সালে। তিনি তখন ৬ বছর পর জেল থেকে এসেছেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত একটানা ৮ বছর জেলে ছিলেন। আবার গ্রেফতার হয়ে যান ১৯৪০ সালে। দেবেন দা তখন সর্বজনশ্রদ্ধেয়। আরএসপি’র নেতা। আমাদেরও নেতা। কিন্তু দেবেন দা-দের সাথে আমার মতানৈক্য শুরু হলো কিছুদিন পরেই। অগ্নিযুগের প্রবীণ বিপ্লবীদের অনেকে ভাবলেন-ভারতবর্ষে সমাজতন্ত্র করতে হলে বড় দল করতে হবে। আরএসপির নেতৃত্বে সারা ভারতবর্ষে বিপ্লব সম্ভব নয়। তখন সমাজতন্ত্রী নেতা হিসাবে জয়প্রকাশ নারায়ণ, অশোক মেহতা, নরেন্দ্র দেও, অরুণা আসফ আলী, রাম মনোহর লোহিয়া সারা ভারতে পরিচিত। তাঁরা আবার গান্ধীর আশীর্বাদপুষ্ট। আমাদের অনেক নেতা মনে করলেন, এঁদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হলে ভারতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ত্বরান্বিত হবে। আমাদের নেতারা বললেন ভিন্ন কথা। তারা বলেন-জয়প্রকাশ এবং তাঁদের দল প্রকৃতপক্ষে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। এরা সোস্যাল ডেমোক্রাট। এরা ভোটের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র চায়, এরা বিপ্লব করবে না। এবং গান্ধীজীর প্রভাবের বাইরে তারা যেতেও পারবে না। অর্থাৎ আরএসপি’র তরুণ নেতৃত্ব দেবেন দা-দের সাথে একমত হলেন না। মনা দা, দেবেন দা চলে গেলেন আরএসপি থেকে।

১৯৫০ সালে দাঙ্গার পর দেবেন দা ও মনা দা গ্রেফতার হলেন। তাঁদের বরিশাল থেকে ঢাকা জেলে আনা হলো। তাদের পাঠানো হলো আমাদের ওয়ার্ডে। আমি চমকে গেলাম। মনে হলো কোন দেশে জন্মেছি! পাকিস্তান সরকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গ্রেফতার করেছেন অগ্নিযুগের বিপ্লবী দেবেন ঘোষ ও মনা ঘোষকে। এ কোন রাজনীতি? এ কোন পুরস্কার? সারাজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে বৃদ্ধ দেবেন ঘোষ গ্রেফতার হলেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দায়ে। বরিশালের একটি মাত্র বাসায় কোনো সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। অথচ পাকিস্তান সরকার সেই বাসাটিকেই আক্রমণ করলো দাঙ্গার দায়ে। একশ্রেণির বন্ধুরা বললেন–এটাই তো হবার কথা। তাদের কথা হচ্ছে, দেবেন দা, মনা দা’র ভারতে চলে যাওয়া উচিত ছিল। সেখানে তারা অগ্নিযুগের বিপ্লবী হিসেবে সমাদর পেতেন। সাহায্য পেতেন। পাকিস্তানে তাদের ভিক্ষুকের মতো জীবনযাপন করতে হতো না।

কিন্তু শত দুঃখেও দেবেন দা মাতৃভূমি ছাড়েননি। ১৯৫৪ সালে তিনি পূর্ববাংলা আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বয়স একশ’ ছাড়িয়েছে। চোখে তেমন দেখেন না। কানে শোনেন না বললেই চলে। বরিশালের কাউনিয়ার বাসায় থাকেন। চেষ্টা করেন যতদূর সম্ভব অন্যের উপকার কতে। মনা দা মারা গেছেন দেশ স্বাধীন হবার পর। দীর্ঘদিন বহুমূত্রে ভুগছিলেন। চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বড্ড ইচ্ছে ছিল চোখের চিকিৎসার। ইচ্ছে ছিল নতুন করে পৃথিবী দেখার। আমার কাছে বার বার চিঠি আসত। অন্যের হাতের লেখায় আর মনা দা’র জবাবে। তিনি লিখতেন-নির্মল, তুমি আমাকে বিদেশে পাঠাতে পার না, আমার চোখের একটা চিকিৎসা করাতে? আমার পক্ষে কোনো কিছুই সম্ভব হয়নি। মনা দা পরিবার নিয়ে এক দুর্বিসহ জীবনযাপন করতেন। বাণীপীঠ স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রেমাংশু সেনগুপ্তের কোনো খোঁজ পাইনি। তিনি ঢাকা জেলে আমাদের ওয়ার্ডে দীর্ঘদিন ছিলেন। প্রচণ্ডভাবে ভগবানে বিশ্বাস করতেন। প্রতিদিন আমার সাথে তর্ক হতো। বড্ড দুঃখ পেতেন আমি ভগবান বিশ্বাস করি না বলে। বেদ-উপনিষদ থেকে অনেক যুক্তির অবতারণা করতেন। আমি বলতাম-ভগবান আমার সৃষ্টিকর্তা হলে ভগবানের সৃষ্টিকর্তা কে? এ প্রশ্নের জবাব কোথায়? আমি যা দেখি না তার আমি বিশ্বাস করি না।

প্রেমাংশু বাবু বলতেন, তুমি লন্ডন দেখেছ? আমি বলতাম, না। তিনি বলতেন তাহলে লন্ডন আছে বিশ্বাস কর কী করে? আমি বলতাম, পরোক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। এবার তিনি পাল্টা প্রশ্ন করতেন। বলতেন, যারা ভগবানের সান্নিধ্যে গিয়েছে তাহলে তুমি তাদের অভিজ্ঞতা মানবে না কেন? আমি বলতাম–সান্নিধ্যে যাবার কোনো প্রমাণ নেই। এরপর আর কথা জমতো না।

জেলখানা থেকে মুক্তি পাবার পর ১৯৫৩ সালে বরিশালে গিয়েছিলাম। কালীবাড়ি রোডে খুঁজতে গিয়েছিলাম বাণীপীঠ স্কুল ও প্রেমাংশু বাবুকে। কালিবাড়ি রোডের বিএম স্কুলের পশ্চিমে গিয়ে ডানে দেখলাম বাণীপীঠ স্কুলের চিহ্নমাত্র নেই। বাণীপীঠ স্কুলের ভিটিতে ধান চাষ হচ্ছে। ধানের ডগা লক লক করছে। এরপর প্রেমাংশু বাবুর খোঁজ করার মানসিক অবস্থা আমার ছিল না। বাণীপীঠ স্কুলের ভিটিতে এখন পরিবার পরিকল্পনার বিরাট দালান। এখন কে রাখে সে খবর!

১৯৫২ সাল। দেখতে দেখতে ৪ বছর কেটে গেল জেলখানায়। ১৯৪৮ সালের আগস্টে গ্রেফতার হয়েছিলাম বরিশালে। বরিশাল জেল থেকে ঢাকা এসেছিলাম অক্টোবরে। তারপর অনেক ঘটনা ঘটল। জেলখানায় দিনের পর দিন অনশন হলো। ১৯৪৯ সালে ভারত হায়দারাবাদ অভিযান চালাল। এ অভিযানকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানে গ্রেফতার হলো হাজার হাজার লোক।

ঢাকা জেল ভরতে থাকল। মাদ্রাজের এক তরুণকে গ্রেফতার করে আনা : হলো ঢাকা জেলে। সে নাকি ভারতের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জনমাথাইর আত্মীয়। তবে তাকে প্রকৃতিস্থ মনে হতো না। মাঝে মাঝে অদ্ভুত চিঠি লিখত। চিঠির ঠিকানা লেখা থাকত–to god, P.O HEAVEN, Dominian HEAVEN…। এ সময় এক হিন্দিভাষী ভারতীয়কে ধরে আনা হয়েছিল। ধর্ম বিশ্বাসে মুসলমান। সে নাকি ভারতের চর। সে মাঝে মাঝে মাছি ধরে ধরে খেত। এরা বাইরে থাকলে ভারত নাকি পাকিস্তানকে দখল করে নেবে।

এই চার বছরে অনেকের সাথে দেখা হয়েছে জেলে। চট্টগ্রামের অমল সেন, আব্দুস সাত্তার, অনঙ্গ সেন, হাসি দত্ত, কালীপদ চক্রবর্তী। কুমিল্লার চন্দ্রশেখর দাশগুপ্ত, ইয়াকুব মিঞা, এবাদত উল্লাহ, ফরিদ খান, কান্তি সেন, সত্য ঘোষাল, অমূল্যকাঞ্চন দত্ত রায়, নরেশ চক্রবর্তী। ময়মনসিংহের আলী নেওয়াজ খান, সিরাজুল ইসলাম, সুধীন দত্ত রায়, প্রফুল্ল সেন, সতীশ সাহা, মাধব সান্যাল, আলতাফ আলী, জমির আলী, হাসি বসু, অজয় রায়। ঢাকার ধরনী রায়, রণেশ দাশগুপ্ত, শৈলেন রায়, তকিউল্লাহ, নাসির, মুনির চৌধুরী, নাদেরা বেগম, ইরা চৌধুরী, বিনয় বসু, আব্দুর রহমান মাস্টার, জিতেন ঘোষ, সিরাজুল হক। বরিশালের নরেন্দ্রনাথ রায়, নুটু ব্যানার্জি, অবনী সরকার, কাশী ব্যানার্জি, অজিত বসু, প্রশান্ত দাশগুপ্ত। এ ধরনের বিভিন্ন দলের বিভিন্ন জনের সাথে ঢাকা জেলে দেখা হয়েছে। কখনো একসাথে থেকেছি। কখনো ভিন্নভাবে থেকেছি। এছাড়াও থেকেছি ফরিদপুরের সমরেন্দ্র নাথ সিংহ ও প্রফুল্ল রায়, মুন্সিগঞ্জের শফিউদ্দিন আহমদ ও খুলনার আনোয়ার হোসেনের সাথে।

২. যাদের সাথে জেলে ছিলাম

যাদের সাথে জেলে ছিলাম তাদের মধ্যে তিনজনের সাথে এক সময় নৈকট্য গড়ে উঠেছিল। তাদের মধ্যে একজন আনোয়ার। গরীবের ছেলে। দৌলতপুর কলেজের ছাত্র। আমাদের সাথে বেশ কিছুদিন ছিল ঢাকা জেলে। মুক্তি পেয়ে চলে যায় খুলনায়। আবার গ্রেফতার হয়। ১৯৫০ সালে ২৪ জানুয়ারি রাজশাহী জেলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। আনোয়ার মারা যায়।

১৯৪৯ সালে আরো দু’জন রাজবন্দি আসে আমাদের এলাকায়। একজন মুন্সিগঞ্জের সামসুদ্দিন আহমেদ। অপরজন এমএ আউয়াল। পরবর্তীকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। ইত্তেফাকের সহকারি সম্পাদক ছিলেন। দেশ স্বাধীন হবার পর আদমজী জুট মিলের প্রশাসক হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে যোগ দিয়েছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদে।

রাজনীতিতে সামসুদ্দিন আহমেদের জীবন বৈচিত্র্যপূর্ণ। তিনি এককালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। আবার ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এটা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির এক ধরনের কৌশল। তাদের কৌশল ছিল অন্যান্যদের প্রতিষ্ঠান দখল করা। যে প্রচেষ্টা তারা করেছে পাকিস্তান আমলে। ন্যাপ ও আওয়ামী লীগে নিজস্ব লোক ঢুকিয়ে দিয়েছে। লক্ষ করা গেছে, এ কৌশল কাজে আসেনি। এ কৌশল ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার জর্জ ডিমিট্টভের পপুলার ফ্রন্ট তত্তের পরিণতি।

এই উপমহাদেশে এই তত্ত্বের পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। কমিউনিস্ট পার্টি থেকে যারা কংগ্রেস বা মুসলিম লীগে ঢুকেছিল তারা কেউ আর নিজ দলে ফিরে আসতে পারেনি। নিজ দলে ফিরে এসেও শেষ রক্ষা হয়নি। কমিউনিস্ট পার্টির যে সদস্য একালে আওয়ামী লীগ, ভাসানী ন্যাপ বা মোজাফফর ন্যাপে ঢুকেছে তারাই সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে।

সামসুদ্দিনের ক্ষেত্রে প্রায় তেমনটি ঘটেছিল। ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের সম্পাদক হিসেবে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে তাঁর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। মুসলিম লীগের রাজনীতিতে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো তরফের আস্থা অর্জন করতে পারেননি।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর সামসুদ্দিন আহমেদ খুবই জনপ্রিয় হয়েছিলেন। সব আন্দোলনেই তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু এক সময় তিনি দলের আস্থা হারিয়ে ফেলেন। কমিউনিস্ট পার্টির সন্দেহ হয় যে, সামসুদ্দিন আহমেদ পুলিশের এজেন্ট হয়ে গেছেন। সুতরাং তাঁকে এড়াতে হবে। সার্কুলার চলে গেল দলের সব সদস্যদের কাছে। সামসুদ্দিনের ছোট ভাই সফিউদ্দিন আহমেদ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। সেও সার্কুলার পেল। আর দুই ভাই এক সাথে জেলে এল আমাদের ওয়ার্ডে।

আমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নই। ফলে সামসুদ্দিন আহমেদের আড্ডা হলো আমার এলাকায়। বড় দুঃখ করতেন তিনি। পার্টির জন্য তিনি জিন্নাহর সাথে টক্কর ধরেছেন। সকলের বিরাগভাজন হয়েছেন। সেই পার্টিই এখন তাকে বিশ্বাস করে না। এক গভীর বিক্ষোভ ছিল সামসুদ্দিন আহমেদের মনে। শেষ পর্যন্ত সামসুদ্দিন আহমেদের অবস্থান হলো আবার সেই মুসিলম লীগের সাথে। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। এককালের মুসলিম লীগের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের সাথে পাকিস্তান চলে গেছেন। পাকিস্তানের নূরুল আমীন ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। সামসুদ্দিন আহমেদ ছিলেন তার একান্ত সচিব। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ঢাকা এসেছিলেন। আমার সাথে আর দেখা হয়নি।

১৯৪৯ সাল। দেখলাম ঢাকা জেলে আমাদের ওয়ার্ডে এক তরুণ এল জেল পুলিশের সাথে। তার সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষার অনেক বইপত্র। শুনলাম তরুণের নাম এমএ আউয়াল। ভাবলাম এই বয়সে ভভদ্রলোক প্রবেশিকা পরীক্ষা দিচ্ছেন–ব্যাপারটি কী!

এমএ আউয়ালের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব থানার আশ্বিনপুর। শৈশবে তার বাবা মারা যান। চলে যান কলকাতায়। কলকাতায় খিদিরপুর ডক এলাকায় তাঁর পরিচয় হয় ড, মালেকের সাথে। সেখানে তিনি শ্রমিক রাজনীতি শুরু করেন এবং শুরু করেন লেখালেখি। আমি পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথমদিকে এমএ আউয়ালের লেখা পড়েছি। আরএসপির সাপ্তাহিক গণবার্তায় ও কমিউনিস্ট পার্টির দৈনিক স্বাধীনতায়। সেকালে এই দলগুলো মুসলিম ছেলেদের নিয়ে খুব টানা-হেঁচড়া করত। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী দলগুলোতে তখন মুসলমান ছেলেদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ফলে এদের দলে টানার একটা উদ্যোগ ছিল সকল দলে। সেভাবেই এমএ আউয়াল গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিলেন। প্রবেশিকার চৌকাঠ পার হয়েই।

যে ছাত্রটি তখন প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেনি, তখন কিন্তু সে খ্যাতি অর্জন করেছিল ছাত্রনেতা হিসাবে। পূর্ববাংলায় ৯টি জেলায় তার প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত প্রবেশ নিষিদ্ধ হলো ঢাকা জেলায়। তাই জেলখানায় আসতে হলো। তার কথায়, লেখাপড়া করার তেমন ইচ্ছা তার ছিল না। কিন্তু শিক্ষা বোর্ডের তকালীন চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ সাহেব নাকি তাকে উৎসাহিত করেছেন লেখাপড়ার জন্য এবং কথা দিয়েছেন বোর্ডের অনুমতি তাকে দেয়া হবে। তার বইপত্র সবই সংগ্রহ করে দেয়া হলো। সেই প্রতিশ্রুতিতেই তার পরীক্ষা দেবার বাসনা।

তবে এই সামসুদ্দিন সাহেব কিংবা আউয়াল সাহেব কেউই দীর্ঘদিন জেলখানায় থাকেননি। কেউ এসেছেন। কেউ গিয়েছেন। শুধুমাত্র আমরা কিছু লোক জেলখানায় রয়ে গেছি বছরের পর বছর।

জেলখানায় আউয়াল সাহেবের সাথে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছে। আমি তখন আরএসপি’র ছাত্র ফ্রন্ট, পাকিস্তান ছাত্র এসোসিয়েশনের সদস্য। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব বাংলার নিখিল বঙ্গ ছাত্র কংগ্রেসের নাম পাল্টানা হয়। পাল্টিয়ে করা হয় পাকিস্তান ছাত্র এসোসিয়েশন। আউয়ালের প্রস্তাব ছিল এক সাথে ছাত্রলীগ করবার। আমি বললাম ছাত্রলীগ সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠান আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আউয়াল বলল–কালক্রমে এই সংগঠনের নাম থেকে মুসলিম’ শব্দ তুলে দেয়া হবে। পরবর্তীতে ১৯৫১ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অপেক্ষায় ছিল কাউন্সিল অধিবেশনে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদনের। কিন্তু এর মধ্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এসে যায়। তাই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর ছাত্র আন্দোলনের একটি নতুন ঘটনা ঘটে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। এই সংগঠনের উদ্যোক্তারা জানান, দেশে কোনো অসাম্প্রদায়িক ছাত্র প্রতিষ্ঠান না থাকায় ভাষা আন্দোলনের আলোকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়েছে। কিন্তু এই বক্তব্য ইতিহাসের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। কারণ ইতিপূর্বেই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ অসাম্প্রদায়িক হবার ঘোষণা দিয়েছে। অপরদিকে এ কথাও সত্য যে, যারা এককালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেছিলেন তাঁদের অনেক নেতাই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠনের নেতৃত্ব দিলেন। সুতং প্রশ্নটি নীতিগত বা আদর্শগত নয়। কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র ফ্রন্টছাত্র ফেডারেশনের নামে তখন কাজ করতে পারছিল না। তাই এককভাবে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে একটি ছাত্রফ্রন্ট প্রয়োজন। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের হাতে চলে গিয়েছে। এই পটভূমিতেই ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম হয়। যারা বলেন, একটি অসাম্প্রদায়িক ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠনের তাগিদেই ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়েছিল তারা জেনেশুনে বা অজ্ঞতাবশত এই ব্যাখ্যা দেন।

যদিও এ ঘটনা আমি অনেক পরে জেনেছি। এমএ আউয়ালের কথা এল বলে প্রাসঙ্গিকভাবে এ কথাগুলো উল্লেখ করলাম। ১৯৫৩ সালে আমাদের দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা ছাত্রলীগে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিই। সে কাহিনিও অনেক দীর্ঘ।

এমএ আউয়াল দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন না। সামসুদ্দিন আহমেদও তাড়াতাড়ি মুক্তি পেয়ে যান। ভাষা আন্দোলনের সময় আউয়ালের নামে আবার হুলিয়া জারি করা হয়। ভাষা আন্দোলনে আউয়াল গ্রেফতার হয়েছিল কিনা মনে নেই। তবে জেলখানায় তার সাথে আমার আর দেখা হয়নি।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যারা জেলে এসেছিলেন আস্তে আস্তে ‘ সবাই ছাড়া পেতে থাকেন। তখন জেলখানায় আমার শরীর খুবই খারাপ। সিভিল সার্জন লিখলেন, এই রাজবন্দিকে বাইরে ছেড়ে দেয়া না হলে বেশিদিন বাঁচবে না। সুতরাং তাকে মুক্তি দেয়া যায়।

আমার মুক্তির জন্য তদ্বির করছিলেন দেবেন দা। অর্থাৎ বরিশালের দেবেন ঘোষ। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি কুমিল্লার ধীরেন দত্তের সাথে আলোচনা করেন আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কে। একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে দেখা করেন পূর্ববাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীনের সাথে। নূরুল আমীন সিভিল সার্জনকে রিপোর্ট দিতে বলেন এবং রিপোর্টের ভিত্তিতেই আমার মুক্তির নির্দেশ দেয়া হয়।

এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না। ভাবতাম, যতদিন পাকিস্তান আছে ততদিন জেলে থাকতে হবে। তখন ঢাকা জেলের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন নাসির উদ্দিন সরকার। খ্যাতনামা চিকিৎসক। তিনি আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন। একদিন তিনি বললেন, এদেশে আপনার কোনো চিকিৎসা হবে না। মুক্তি পেয়ে কলকাতায় যান। হয়তো কলকাতার ট্রপিক্যাল মেডিসিন হাসপাতালে আপনার চিকিৎসা হতে পারে। কিন্তু ডাক্তার সাহেব জানতেন না, আমি মুক্তি পেলেই কলকাতায় যেতে পারব তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তখন ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে পাসপোর্ট-ভিসা চালু হয়েছে। পাকিস্তান সরকার এ কাজটি করেছেন ভাষা আন্দোলনের পর। পাসপোর্ট-ভিসা চালু হবার আগে যে কেউ যখন খুশি ভারত যেতে পারত। ভারত থেকে পাকিস্তান আসতে পারত। পাকিস্তান সরকারের সন্দেহ হলো এই অবাধ যাতায়াতের সুযোগ নিয়ে ওপার থেকে দুস্কৃতিকারীরা আসছে। তারাই আন্দোলনে ইন্ধন যোগাচ্ছে। দৈনিক মর্নিং নিউজ খবর ছাপাল, নারায়ণগঞ্জে হাজার হাজার ধুতিপরা হিন্দু ভাষা আন্দোলনের পক্ষে মিছিল করছে। সুতরাং অবাধ যাতায়াত বন্ধ করতে হবে। পাসপোর্ট-ভিসা চালু করতে হবে। কিন্তু কাজটি সহজ হলো না। তখন ভারত থেকে আসা অসংখ্য চাকরিজীবী পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে। তাদেরও বাড়িতে যাতায়াত করতে হয়। তারা হুমকি দিলো পাসপোর্ট-ভিসা চালু হলে দল বেঁধে তারা ভারতে চলে যাবে। এবার নূরুল আমীন ভিন্ন প্রস্তাব দিলেন। বললেন, আপাতত পাসপোর্ট-ভিসা চালু হচ্ছে না। পরবর্তীকালে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। কিন্তু রাজি হলেন না পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধান রায়। তিনি পাসপোর্ট ও ভিসা চালুর পক্ষে নন। তিনি বললেন, তবে এ নিয়ে বারবার বিতর্ক করা যাবে না। পাসপোর্ট-ভিসা চালু করতে হলে এখনি করতে হবে। নইলে কোনোদিনই নয়। পাকিস্তান সরকার পাসপোর্ট-ভিসা চালু করতে বাধ্য হলো।

ঠিক এই সময় একদিন দুপুরের দিকে আমাকে জেল অফিসে ডাকা হলো। ভাবলাম নিশ্চয়ই অন্য জেলে পাঠিয়ে দেয়া হবে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। এমনিতেই শরীর খারাপ। অন্য জেলে গেলে ঢোকাই মুশকিল হবে। ঢাকা জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আমি কোনোদিন প্রিয়ভাজন ছিলাম না। আমার সাথে বাঙালি, বিহারি সকল জেল পুলিশেরই ভালো সম্পর্ক ছিল। জেলের খবরাখবর ছিল আমার নখদর্পণে। বাইরের খবর আদান-প্রদান করতে পারতাম অতি সহজেই। তাই ভয় ছিল হয়তো আমাকে অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে। জেল গেটে নিয়ে ঠিক এমন কথাই আমাকে বলা হয়। বলা হলো–এত খবর আপনি রাখেন কী করে? তবে আপনাকে অন্য জেলে পাঠানো হচ্ছে না। বলা হলো, অন্য জেলে বদলি নয়–আপনার মুক্তির নির্দেশ এসেছে। আমি চমকে গেলাম। আমি এখন কোথায় যাব?

জেল গেটে ডেপুটি জেলার বললেন, আপনি রিলিজড। রিলিজ? আমি জিজ্ঞাসা করলাম, নিঃশর্ত? নইলে কিন্তু আমি জেলের বাইরে যাব না। ডেপুটি জেলার জামান সাহেব (বৃহত্তর ফরিদপুরের এ যাবতকালীন সর্বকনিষ্ঠ ডেপুটি জেলার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কারাগারসমূহের মহাধ্যক্ষ হয়েছিলেন) হাসলেন। বললেন, এবার আপনার নিঃশর্ত মুক্তি। কিন্তু কত টাকা চান? কত টাকা আপনার বাড়ি যেতে লাগবে? পাঁচ টাকা, দশ টাকা, পনের টাকা।

ডেপুটি জেলারের কথা শুনে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বললাম, এক পয়সাও না। আপনার মতো অনেক ডেপুটি জেলার আমাদের বাড়িতে থেকে মানুষ হয়েছে। তাই আপনার বুঝবার কথা নয়, আমার কত টাকা প্রয়োজন হবে।

পরিবেশ খারাপ হতে থাকলে হস্তক্ষেপ করলেন একজন পুলিশ অফিসার। তাকে আমি চিনি না। তিনি বললেন, ডেপুটি জেলার সাহেব, নির্মল সেনকে নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না। তিনি অসুস্থ। তিনি কোথায় যাবেন কেউ জানে না। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া। পড়েছেন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে। রাজনৈতিক অনেক বন্ধু আছেন ঢাকায়। উচ্চ মহল থেকে তাঁর সম্পর্কে আমাদেরকে বিশেষভাবে বলে দেয়া হয়েছে। বলে দেয়া হয়েছে–যেখানে তিনি যেতে চান সেখানে তাঁকে নিরাপদে পৌঁছে দিয়ে ঢাকায় এসে আমাদের রিপোর্ট করতে হবে। তাই সব দায়িত্ব আমাদের। এমনকি তিনি দেশান্তরী হতে চাইলেও সে ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে।

পুলিশ কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির হাত থেকে বের হলাম বেলা দুটার দিকে। সবকিছুই তখন নতুন মনে হচ্ছে। প্রথম ঢাকা এসেছিলাম ১৯৩৯ সালে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হবার পর বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। দ্বিতীয়বার ঢাকা এসেছিলাম ১৯৪৮ সালের ময়মনসিংহ সম্মেলনে যাবার পথে। সেটা ছিল জানুয়ারি মাস। ১৯৪৮ সালের অক্টোবরেই ঢাকা জেলে এলাম রাজবন্দি হিসেবে। এই ৪ বছরে ঢাকা জেল থেকে মাত্র একবার বের হয়েছি। ডাক্তার দেখাতে অনেক পুলিশ দিয়ে আমাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। তারপর আর বাইরের বোদ দেখার সুযোগ হয়নি।

১৯৫২ সালের শেষে মুক্তি পেয়ে মনে হলো আমি কোথায় যাব? ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর দল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বাইরে কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জানি না। শুনেছিলাম মোজাম্মেল দা কলকাতায় গিয়েছিলেন। সেখানে আরএসপি’র মুখপত্র দৈনিক গণবার্তার প্রধান বার্তা পরিবেশক হয়েছিলেন। শুনেছি পাসপোর্ট-ভিসা চালু হবার আগেই তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। ঢাকার একটি সংবাদপত্রে কাজ করছেন। খালেক দাও নাকি ঢাকায়। তিনিও নাকি সংবাদপত্রে কাজ করেন। দলের অন্যতম নেতা শ্রমিক নেতা নেপাল সাহা দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। মুক্তি পেয়ে কোথায় আছেন জানি না। শুনেছি রুহুল আমীন কায়সার অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গেছেন। শুনেছি আবদুল গাফফার চৌধুরী ঢাকায় আছেন। ঢাকা বেতারে কাজ করছেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন। যিনি শামসুদ্দিন আবুল কালাম নামে পরিচিত।

আমার এক মামা ছিলেন মালিটোলায়। বাংলাবাজারে বইয়ের দোকান ছিল। শিক্ষকতা করতেন প্রিয়নাথ স্কুলে (বর্তমান নবাবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে)। তিনি এককভাবে ঢাকা বোর্ডের বই সরবরাহ করতেন। ১৯৫০ সালের দাঙ্গায় তিনি সব কিছু হারিয়েছেন। সবকিছু হারিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছেন। এক মেসোমশাইর বাসা ছিল গোয়ালনগরে। তিনি লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের অন্যতম মালিক ছিলেন। তিনিও দেশান্তরী দেশ বিভাগের পর।

জেলখানার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম আমি কোথায় যাব। বাড়িতে কে আছে তাও জানি না। মা দেশান্তরী হয়েছে অনেকদিন আগে। দেশে তিন কাকা আছেন। একজন কোটালীপাড়ায়। অপর দু’জন টুঙ্গীপাড়ার পাটগাতীতে। শুনেছি ছোট কাকা পাসপোর্ট-ভিসা চালু হবার আগেই চলে গেছেন ভারতে। এছাড়া ঢাকা থেকে বাড়ি যেতে হলেও অনেক ঝামেলা। স্টিমারে বরিশাল। বরিশাল থেকে খুলনাগামী স্টিমারে পাটগাতী স্টেশনে নামতে হবে। তারপর ঘণ্টা তিনেক নৌকায়। সে পথের কী হাল তাও জানি না।

হঠাৎ মনে এল ঢাকার মোহন দাস রোডের কথা। যতদূর মনে ছিল হেমেন দাস রোডে অগ্নিযুগের বিপ্লবী স্বদেশ নাগের একটি বাড়ি আছে। স্বদেশ নাগ এককালে আরএসপি করতেন। পরবর্তীকালে জয়প্রকাশের সমাজতন্ত্রী দলে যোগ দেন। সে যুগের বিপ্লবীরা ঢাকা এলে স্বদেশ নাগের বাড়িতেই থাকতেন। এখানে উঠতেন মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, ধীরেন দত্ত, ফণী মজুমদার এবং দেবেন ঘোষ প্রমুখ। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম হেমেন দাস রোডেই যাব।

হেমেন দাস রোডে স্বদেশ বাবুর সাথে দেখা হলো। তিনি খুব খুশি হলেন বলে মনে হলো না। কারণ তখন সারা দেশে ভয়ের রাজত্ব। মুসলিম লীগের ত্রাসের শেষ ছিল না। বিশেষ করে হিন্দু ছিল ভীষণভাবে শঙ্কিত। তারপর আমি রাজবন্দি এবং ধর্মের বিচারে মুসলমান নই।

স্বদেশ বাবু খুব দুঃখ সুলেন। বললেন, এখানে থাকো। চেষ্টা করে দেখো কোনো বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা যায় কিনা। তোমার বাড়ি যাবার একটা ব্যবস্থা হবেই। তবে একবার শামসুদ্দিনের কাছে যাও। শামসুদ্দিন রেডিওতে চাকরি করে। ঢাকা জেলের কাছেই রেডিও অফিস। শামসুদ্দিন তোমাকে নিশ্চয়ই খবর দিতে পারবে।

বিকেলের দিকে আমি রেডিও অফিসে গেলাম। আমার সাথে গোয়েন্দা বাহিনীর দু’জন লোক। ওরা কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। আমার নাম করে অফিসে স্লিপ পাঠালাম। শামসুদ্দিন দা যেন কেমন হয়ে গেলেন। বললেন, তুই কোথায় থেকে এলি? কোথায় ছিলি এতদিন? আমার যেন মনে হলো শামসুদ্দিন দা কোনো খবরই রাখেন না।

শামসুদ্দিন দা’র সাথে দেখা হয়নি দীর্ঘদিন। তার সাথে পরিচয় বরিশালে ছাত্রজীবনে। তিনি তখন আরএসপি’র ছাত্র ফ্রন্টের অন্যতম নেতা। কবিতা লেখেন। গল্প লেখেন। শামসুদ্দিন দা তখন বিশেষ আকর্ষণ। ছাত্রজীবনেই তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘শাহেব-বানু’ প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছেন ছোটদের জন্য উপন্যাস ‘কাকলী মুখর। মুসলিম লীগের তখন প্রচণ্ড প্রতাপ। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের ছাত্র আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেন না। তিনি নিখিল বঙ্গ ছাত্র কংগ্রেসের অন্যতম নেতা। শামসুদ্দিন দা ছিলেন আমাদের কাছে একটি গল্প।

দেশভাগের আগে শামসুদ্দিন দা ব্রজমোহন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। যতদূর মনে আছে তিনি এমএ পড়ার জন্য কলকাতা যান। পাকিস্তান সৃষ্টি হবার সময় শামসুদ্দিন দা বললেন–তিনি পাকিস্তানে থাকবেন না। তাঁর কথায় পাকিস্তান হবে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। ঐ রাষ্ট্রে তিনি থাকবেন না। তাই চলে গেলেন কলকাতায়। ১৯৪৮ সালের ২৯ মার্চ আমি কলকাতা যাই একটি পরিবারকে পৌঁছে দিতে। কলকাতা গিয়ে শামসুদ্দিন দা’র খোঁজ নিলাম। তিনি থাকেন পার্ক সার্কাসের কংগ্রেস একজিবিশন রো-তে। তাকে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। লোয়ার সার্কুলার রোডে আরএসপি’র রাজ্য দফতরে গেলাম। তখন সেখানে থাকতেন ড. অরবিন্দ পোদ্দার। তখন ‘ক্রান্তি’ নামে আরএসপির একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বের হতো। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ড. নীহার রায় ও ত্রিদিব চৌধুরী। তবে পত্রিকাটির সব কাজ চালাতেন ড, অরবিন্দ পোদ্দার। অরবিন্দ পোদ্দারকে জিজ্ঞেস করলাম শামসুদ্দিন দা’র কথা। তিনি বললেন, আপনার দাদা এখন বড্ড ব্যস্ত। খুব লেখালেখি করছেন। তাঁকে। এখন খুঁজে পাওয়া ভার। শামসুদ্দিন দা’র সাথে দেখা না করেই বরিশাল ফিলাম। তার কয়েক মাস পর গ্রেফতার হলাম। এই দীর্ঘদিন তেমন খবর রাখিনি। শুনেছিলাম শামসুদ্দিন দা পূর্ববাংলায় ফিরে রেডিওতে কাজ নিয়েছেন। আর তাঁকে নিয়ে একটি ভিন্ন ধরনের বিতর্ক চলছে শিল্পী-সাহিত্যিক মহলে।

তবে এ বিতর্কের জন্মসূত্র রাজনীতি। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে মতানৈক্য ছিল আরএসপি’র। এ ব্যাপারে কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুরা দুঃখজনকভাবে অসহনশীল। আরএসপি’র কাউকে তারা সহ্য করতে পারতেন না। আরএসপিকে কোণঠাসা করতে মুসলিম লীগ, পরবর্তীকালে আওয়ামী মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ এবং ন্যাপের সাথেও তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আবার কমিউনিস্ট বন্ধুদের কথায় তারাই একমাত্র সাচ্চা সমাজতন্ত্রী। যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধিতা করবে তারা নিশ্চয়ই মার্কিনপন্থী। আরএসপি অন্ধভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতি অনুসরণের পক্ষপাতি ছিল না এবং এই মৌলিক পার্থক্যের জন্যই আরএসপি’র জন্ম হয়েছিল। সুতরাং আরএসপিকে ঠেকানো ছিল যেন কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুদের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের অংশ। তার চরম শিকার হতে হয়েছিল শামসুদ্দিন আবুল কালাম ও আবদুল গাফফার চৌধুরীকে।

এই দুজনের সাথে আমি সব প্রশ্নে একমত ছিলাম, তাও নয়। কিন্তু এদেশে ডিগবাজির ইতিহাসও কম নয়। যারা পাকিস্তান আমলে আদমজী পুরস্কার পাবার জন্য দৌড়-ঝাঁপ করেছেন, পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে তকমা পেয়ে গলায় ঝুলিয়ে বুক ফুলিয়ে হেঁটেছেন তারা কিন্তু আজো প্রগতিবাদী। তাঁরা সবচেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা এবং বাঙালি। কিন্তু আজো আবদুল গাফফার চৌধুরী কোনো নিবন্ধ লিখলে সাত রকমের প্রশ্ন ওঠে। আমার প্রগতিবাদী বন্ধুরা বলেন, ধ্যাৎ! গাফফার চৌধুরী তো সারাজীবনই দালালি করেছে। একে নিয়ে বিতর্ক করে লাভ নেই। আমি গাফফার চৌধুরীর পক্ষে কিছু বলছি না। গাফফারকে যারা প্রতিদিন গালি দেন তাদের বলব-বন্ধুরা, একটু নিজেদের অতীত স্মরণ করুন। একবার হলেও আয়নার কাছে দাঁড়িয়ে নিজেদের অতীতের কথা চিন্তা করুন। এমনকি ‘৭১ সালেও আপনারা সকলে সঠিক ভূমিকা পালন করতে পেরেছেন তার প্রমাণ কিন্তু মিলছে না।

শামসুদ্দিন দা’র কথায় তেমন ঘাবড়ে গেলাম না। জানতাম, তিনি খুব অসুবিধায় আছেন। প্রথমে মনে হয়েছিল জেলখানা থেকে বের হয়ে গোয়েন্দা নিয়ে সরাসরি রেডিও পাকিস্তানে যাওয়া ঠিক হবে কি না। শামসুদ্দিন দা বিপদে পড়বেন কি না। তবুও আমার উপায় ছিল না। তাই বন্ধুদের খোঁজ-খবর করতে শামসুদ্দিন দা’র কাছে গিয়েছিলাম। তিনি কারো ঠিকানা দিতে পারছিলেন না। নিজের দাদার ঠিকানা দিলেন। বললেন, কাল ভোরে আমার বাসায় আসবি। তোর সাথে অনেক কথা আছে।

ঐ দুই গোয়েন্দা সাথে নিয়ে আমি আবার বের হলাম। এবার হাঁটছি ফুলবাড়িয়া স্টেশনের দিকে। কোথায় যাব ঠিক জানি না। স্টেশনের কাছে পৌঁছাতে দূর থেকে দেখি খালেক দা আসছেন। খালেক দা আমাকে দেখে অবাক হলেন। বললেন, তুমি কোথা থেকে এলে! কখন মুক্তি পেলে? কোথায় থাকছ? কোথায় খাচ্ছ? আমি তখন নির্বাক। আদৌ ভাবিনি খালেক দা’র সাথে আমার রাস্তায় দেখা হবে। বললাম, আপনাদের খুঁজছিলাম। শামসুদ্দিন দা’র কাছ থেকে এলাম।

খালেক দা গোয়েন্দাদের বিদায় নিতে বললেন। বললেন, তুমি আমার সাথে চলো। বললেন, চলো বংশাল রোডে। ওখানে মোজাম্মেল আছে। একটি দৈনিক পত্রিকায় চাকরি করে। যতদূর মনে আছে দৈনিকটির নাম ‘আমার দেশ’। সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ। আমাকে দেখে মোজাম্মেল দা যেন চিৎকার করে উঠলেন। আমার হাতে তখন বাড়ি যাবার একটা স্টিমার টিকেট। তিনি টিকেটটি নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন। বললেন, তোমার বাড়ি যাওয়া হবে না। তুমি কিছুদিন ঢাকা থাকবে। তোমার জন্য পাসপোর্ট করতে হবে। কলকাতায় গিয়ে তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে হবে। কলকাতায় তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি খুব দুঃখ করছিলেন–তোমাকে ফেলে কেন আমরা সবাই ভারতে চলে এলাম। মোজাম্মেল দা বললেন, কলকাতায় যাওয়া তোমার প্রথম কাজ। তারপর তুমি কোটালীপাড়া যাবে।

আমি সেই পড়ন্ত বেলায় মোজাম্মেল দা’র মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম। এই সেই মোজাম্মেল দা। ১৯৪৭ সালে আমি বরিশাল বিএম কলেজে পড়ি। তিনি আমাদের নেতা। দেশ বিভাগের পর মা চলে গেলেন পশ্চিমবঙ্গে। আমি বরিশালে, জানতেন তিনি। আমি মোজাম্মেল দা’কে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কী করব। তিনি বললেন, তোমার যাওয়া হবে না। তুমি রাজনীতি করবে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২। ঢাকা বংশাল রোডের একটি অফিসে আমি মোজাম্মেল দা’র সামনে দাঁড়িয়ে। আমি বললাম, মোজাম্মেল দা, আমার একটি কথা আছে। ১৯৪৭ সালে আপনি বলেছিলেন, তোমার দেশ ছেড়ে যাওয়া হবে না। এবার আমি বলছি–আমি দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না। আমি আগে কোটালীপাড়া যাব। আপনি পাসপোর্ট-ভিসার চেষ্টা করতে পারেন। পাসপোর্ট ভিসা পেলে আমি যাব মাকে দেখতে।

মোজাম্মেল দা আমার পাসপোর্টের চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে আমি পাসপোর্ট পেয়েছিলাম দুই মাসের জন্য। সে পাসপোর্ট আমার হাতে আসতে আসতে দুই মাস কেটে গেছে। এরপর ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার আমাকে কোনো পাসপোর্ট দেয়নি।

মোজাম্মেল দা আমার কা শুনে বললেন, ঠিক আছে। চলো, পাতলাখান লেনে যাই। পাতলাখান লেনে গাফফার আছে। অর্থাৎ আবদুল গাফফার চৌধুরী। যতদূর মনে পড়ে গাফফার দোতলায় থাকত। আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।

১৯৪৮ সালে বিএসসি প্ৰীক্ষার্থী ছিলাম। ১৯৫৩ সালে আবার চেষ্টা করছি ঐ বিএসসি পড়বার। দুটি সেশন চলে গেছে, তাই নতুন অনুমতি নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেলখানায় বিজ্ঞান পড়া যায় না। তাই জেলার দিনগুলো আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ায় কোনো কাজে আসেনি।

কিন্তু আমার জন্যে তদ্বির করবে কে? বরিশাল এসে দেখলাম পুরনো বন্ধু তেমন কেউ নেই। দলের অন্যতম নেতা সুধীর সেন জেলখানায়। বরিশাল শহরে অসংখ্য চেনাজানা লোক আছে। রাজনৈতিক দলের সদস্য আছে। কিন্তু থাকব কোথায়। শেষ পর্যন্ত ঐ দেবেন দা অর্থাৎ দেবেন ঘোষের বাসায়ই উঠতে হলো। ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ এডওয়ার্ড ম্যাক-ই-নানীর সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কমিটির সদস্য। ক্যাথলিক চার্চের লোক। বাড়ি আয়ারল্যান্ড। আইসিএল। ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময় নোয়াখালীর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বর্ষায় ব্রিটিশের পক্ষে গোয়েন্দাগিরিও করেছেন।

একটি বিশেষ লক্ষ্যে তাঁকে ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ করা হয়েছিল। ছাত্র আন্দোলনের জন্যে তখন ঢাকার বাইরের ৩টি কলেজ চিহ্নিত করা হয়েছিল। এই তিনটি কলেজ হলো– বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং রংপুরের কারমাইকেল কলেজ। পাকিস্তান সরকার এ কলেজগুলোতে প্রাক্তন সিভিল সার্ভেন্টদের নিযুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সুবাদে ব্রজমোহন কলেজে আসেন ম্যাক-ই-নানী।

এডওয়ার্ড ম্যাক-ই-নানী আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করলেন। বললেন, তিনি ঢাকা গিয়ে আমার জন্যে তদ্বির করবেন। তদ্বিরের জন্যে আমিও ঢাকা গেলাম। আবদুল গাফফার চৌধুরীর ভগ্নিপতি আব্দুল হামিদ তালুকদার তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার। তাঁর কাছে গেলাম গাফফারকে নিয়ে।

শেষ পর্যন্ত আবার ব্রজমোহন কলেজে পড়বার অনুমতি মিলল। দেবেন দা একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন বরিশালে এক বাসায় পড়াবার বিনিময়ে। বিপদ দেখা দিল ভর্তি নিয়ে। পাকিস্তান আমলে কড়া নিয়ম ছিল। মুচলেকা দিতে হতো যে রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করব না এবং সে জন্য প্রয়োজন হতো একজন স্থানীয় অভিভাবকের।

বরিশাল শহরে কে আমার স্থানীয় অভিভাবক হবেন? আমি জেলখানা থেকে এসেছি। সরকারের সুনজরে নেই। কেউ রাজি হবেন না আমার স্থানীয় অভিভাবক হতে। এবার সহযোগিতা করলেন জাহিদ হোসেন জাহাঙ্গীর। তিনি জাহাঙ্গীর হোসেন নামে পরিচিত। ছাত্র জীবনে আরএসপি করতেন। তাঁর ব্যক্তিগতভাবে পারিবারিক দিক থেকে বরিশালে বেশ প্রভাব ছিল। তিনি আমাকে ব্রজমোহন কলেজের তৎকালীন ভাইস প্রিন্সিপাল দেবেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জির কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি ডিএনসি নামে পরিচিত। ইংরেজির অধ্যাপক ডিএনসি আমার স্থানীয় অভিভাবক হলেন। ১৯৫৩ সালের জুলাইতে আমি পুনরায় ব্রজমোহন কলেজে বিএসসি শেষ বর্ষের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হলাম। সামনে পরীক্ষা।

আমি কলেজে ভর্তি হবার পর প্রিন্সিপালের আচরণ পাল্টে গেল। তিনি আমাদের ক্লাসের কাছাকাছি আসতেন। দেখতেন, আমি ক্লাসে আছি কি না। কোনো ছাত্র আমার সঙ্গে কলেজ প্রাঙ্গণে কথা বললে তিনি ডেকে পাঠাতেন। বলতেন–Do not spoil yourself he is a maxist (নিজেকে নষ্ট করো না–ঐ ছেলে মার্কসবাদী)। বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রদের ডেকে বলতেন, সাবধান, ওর সঙ্গে ঘুরলে বৃত্তি কাটা যাবে। অর্থাৎ প্রিন্সিপালের জন্যেই কলেজে আমি আমার অজান্তে ভয়ের বস্তুতে পরিণত হলাম।

এই রাজনীতি নিয়ে একটি ঘটনা আছে ম্যাক-ই-নানীর আমলে ব্রজমোহন কলেজে। ১৯৫৩ সালে স্ট্যালিন মারা যান। ছাত্র সংঘের পক্ষ থেকে কলেজ ছুটি ঘোষণা দাবি জানানো হলে তিনি উচ্চকণ্ঠে হেসে দিলেন-দ্য ক্যান্সার ইজ আউট। তিনি ছুটি দিতে রাজি হলেন না। পরদিন কলেজ ধর্মঘট। ফলে ছাত্র সংসদের সঙ্গে প্রিন্সিপালের বিরোধ দেখা দেয় এবং তিনি ভিপিসহ ছাত্র সংসদের সদস্যদের বহিষ্কার করেন। এ সময় আমি কলেজে ভর্তি হই।

তবে আমার তখন রাজনৈতিক তেমন পরিচিতি ছিল না ছাত্রদের মধ্যে। ছাত্র সংসদ ছিল ছাত্র ইউনিয়নের দখলে। ছাত্রলীগ দুর্বল। এ সময় আমাদের দল ছাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছাত্রলীগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। আমি বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হই। সাধারণ সম্পাদক হন হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি গোলাম রাব্বানী। কলেজের রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে।

অপরদিকে পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ঘোষিত হয়। ঘোষণা করা হয় ৫৪ সালের প্রথম দিকে পূর্ব বাংলায় সাধারণ নির্বাচন হবে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হবার পর এটাই ছিল প্রথম সাধারণ নির্বাচন। সুতরাং রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। এ সময় ঘোষণা হয়, ব্রজমোহন কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে।

১৯৫৪ সাল। পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন। এর আগে কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয়া হলো। বিরোধী দলের পক্ষে ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হলো। নাম–কলিজিয়েট ফ্রন্ট। টিকল না। আমি ভিপি প্রার্থী কলিজিয়েট ফ্রন্ট থেকে।

এ নির্বাচন নিয়ে একটি ঘটনা ঘটল। এ নির্বাচন আমার মনে তখন বেশ দাগ কেটেছিল। নির্বাচনের পূর্বদিন রাতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তাঁরা বললেন, সামনে সাধারণ নির্বাচন ব্রজমোহন কলেজে আমাদের জিততে হবে। না হলে সাধারণ নির্বাচনে তার ছাপ পড়বে। তা ছাড়া ব্রজমোহন কলেজের ছাত্রদের মধ্যে মাত্র ২০০ হিন্দু ছাত্র। আপনি দাঁড়ালে নির্বাচনে জেতা যাবে না। আপনি সরে দাঁড়ান।

তাদের বক্তব্য আমার অযৌক্তিক মনে হয়নি। তবে খারাপ লেগেছিল হিন্দু-মুসলমান প্রশ্নটি উত্থাপন করায়। সব সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখেছি কমিউনিস্ট পার্টি বরাবরই সাধারণ মানুষকে শ্রেণি ভিত্তিতে না দেখে সম্প্রদায় হিসেবে দেখেছেন। এ হিসেবে পাকিস্তান সমর্থন করেছে। মুসলিম লীগের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল কমরেড’ খুঁজেছে। এবারও তাদের মুখ্য যুক্তি হচ্ছে আপনি হিন্দু–তাই আপনার দাঁড়ানো ঠিক হবে না।

আমি রাজি হলাম না। ভাবলাম এই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে চিন্তার রাজনীতি সঠিক নয়। আমি পরাজিত হতে রাজি। তবে হিন্দু বা মুসলমান হিসেবে নয়। সুতরাং নির্বাচন হবে আগামীকাল এবং আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।

তবে সরকার সেভাবে ভাবেনি। আমাদের ভাবনার বাইরে একটি সিদ্ধান্ত ছিল সরকারে। সে সিদ্ধান্ত কার্যকর করলেন ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ। নির্বাচনের দিন দুপুরের দিকে তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন তাঁর কক্ষে। ইতোমধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল যে আমাকে দাঁড়াতে দেয়া হবে না। অধ্যক্ষ শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করে আগেই তাঁর কথা বলেছেন। অধ্যক্ষের শঙ্কা হচ্ছে, আমি নির্বাচিত হলে শ্লোগান উঠবে-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক।’ আমি দাবি করব বহিষ্কৃত ছাত্রদের ফিরিয়ে নেয়া হোক। সুতরাং আমাকে দাঁড়াতে দেয়া হবে না। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তাহলে নির্মল সেনের মনোনয়নপত্র কেন গ্রহণ করা হয়েছিল? কোন ভিত্তিতে? তখনই বলা উচিত ছিল যে তুমি দাঁড়াতে পারবে না। জবাবে অধ্যক্ষ বলেছিলেন–তিনি নাকি ধারণাই করতে পারেননি যে, আমি নির্বাচিত হব। ভেবেছিলেন আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ক্ষতি নেই। কারণ আমি পরাজিত হবই। সেদিন নাকি তাঁর ধারণা হয়েছে আমি জিতে যাব। সুতরাং তার সিদ্ধান্ত, আমাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেই দেয়া হবে না। এ ক্ষমতা নাকি ছাত্র সংসদের প্রধান হিসেবে তার আছে। তিনি শিক্ষকদের আশ্বাস দিলেন যে কলেজে হাঙ্গামা এড়াবার জন্যে এ পথ নেয়া হচ্ছে এবং আমার নির্বাচনের জন্যে কোনো টাকা ব্যয় হয়ে থাকলে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে দিয়ে দেবে।

আমি এ খবর পেয়েই অধ্যক্ষের কক্ষে ঢুকলাম। ঢোকামাত্র অধ্যক্ষ ম্যাক ই-নানী বললেন–তুমি কলেজে গণ্ডগোল করছ। তোমার ছেলেরা সন্ত্রাস করছে। আমি বললাম, আপনি মিথ্যা বলছেন। কলেজে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে। অধ্যক্ষ বললেন, তোমাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেয়া হবে না।

আমি বললাম, কেনো?

তিনি বললেন, আমার ইচ্ছে। তুমি নির্বাচিত হয়ে ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক’ বলবে। বহিষ্কৃত ছাত্রদের কলেজে ফিরিয়ে নিতে বলবে। কলেজে গোলমাল হবে। আমি বললাম, আমাকে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করতে না দেবার আপনি কে? তিনি বললেন, আই অ্যাম দি কনস্টিটিউশন-আমি ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র। আমি বললাম, আমি আপনার নির্দেশ মানি না। আমি বললাম, আমি নির্বাচন করব। আপনি পারলে ঠেকাবেন। আপনার সঙ্গে নির্বাচনের কক্ষে দেখা হবে। আমি অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলাম।

তখন ব্রজমোহন কলেজে সরাসরি ভাইস প্রেসিডেন্ট, সাধারণ সম্পাদক বা সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হতো না। নির্বাচনী কলেজ প্রতিনিধি গঠিত হতো প্রতিটি শ্রেণির প্রতিনিধি নিয়ে। বিভিন্ন শ্রেণির জন্যে বিভিন্ন পদ নির্ধারিত থাকত। নির্বাচিত কলেজ প্রতিনিধি ঐ তিনটি পদে নির্বাচন করত। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো কলেজ মিলনায়তন কালী প্রসন্ন হলে, অর্থাৎ কেপি হলে।

আমি নির্বাচন হলে ঢোকামাত্র আমাদের পক্ষে একজন আমার নাম ভিপি হিসেবে প্রস্তাব করল। অন্য দু’জনের নামও প্রস্তাবিত হলো। ভিপি প্রার্থী ছিল তিনজন–আমি, কলেজিয়েট ফ্রন্টের অন্যতম প্রার্থী হাবিবুল্লাহ ও মুসলিম ছাত্র সংঘের আব্দুল বারী। নাম প্রস্তাবিত হবার সঙ্গে সঙ্গে অধ্যক্ষ উঠে দাঁড়ালেন, বললেন–নির্মল সেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। কারণ সে ভর্তির সময় মুচলেকা দিয়েছিল যে কলেজে রাজনীতি করবে না।

আমি উঠে বললাম, আপনি ডাহা মিথ্যা কথা বলছেন। এমন কোনো মুচলেকা আমি দিইনি। আর ছাত্র সংসদ নির্বাচন আদৌ রাজনীতিও নয়। এবার অধ্যক্ষ বললেন, আমি সংসদের প্রধান হিসেবে তার প্রার্থীপদ বাতিল করলাম। আমি তখন আমাদের সমর্থকদের কলেজিয়েট ফ্রন্টের প্রার্থী হাবিবুল্লাহকে ভোট দেবার জন্যে বললাম। অধ্যক্ষ বললেন, তুমি কাউকে সমর্থন করতে পারবে না। তোমার সদস্যপদ বাতিল। আমি বললাম, তাহলে অধ্যক্ষ হিসেবে আপনি নিরপেক্ষ নন। আপনাকেও আমার সাথে কক্ষের বাইরে যেতে হবে। দীর্ঘদেহী ব্রিটিশ আইসিএস এডওয়ার্ড ম্যাক-ই-নানী আমার সঙ্গে কক্ষ থেকে বের হলেন। কিছুক্ষণ পরে নির্বাচনের ফল বের হলো। আমাদের সমর্থিত তিনজন প্রার্থীই জিতে গেল। অধ্যক্ষ বললেন, নির্মল সেন একজন গুণ্ডা। পরদিন তিনি আমার স্থানীয় অভিভাবক অধ্যাপক দেবেন চ্যাটার্জিকে বললেন-নির্মলকে টেস্ট দিয়ে চলে যেতে বলুন–আমি ওকে আটকাব না।

ইতিমধ্যে নির্বাচনী গোলমাল শুরু হলো। আমি খুনের মামলায় জড়িয়ে। গেলাম। খুন হলো তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের বরিশাল সফর নিয়ে।

১৯৪৮ সালে গ্রেফতার হয়ে বরিশাল ছেড়েছিলাম। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বরিশালে এলাম ১৯৫৩ সালে। ১৯৪৮ সালে জেলে যাবার ফলে বিএসসি পরীক্ষা দেয়া হয়নি। ভেবেছিলাম বিএসসি পরীক্ষাটা শেষ করব। তাই বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে আবার ভর্তি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবার হয়তো হুড়-হাঙ্গামা হবে না। কিন্তু ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা হলো। নতুন করে হাঙ্গামা শুরু হলো। মনে হচ্ছিল সেবারও পরীক্ষা দেয়া হবে না।

জেলখানা থেকে ফিরে বরিশালে এক ভিন্ন চিত্র দেখলাম। এককালের বরিশালের রাজনীতিতে কমিউনিস্ট পার্টি, আরএসপি এই দুটি বামপন্থী দলের প্রভাব ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর নির্যাতনের ফলে দুটি দলই বিপর্যস্ত। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন নিয়ে এ দুটি দলের মৌলিক পার্থক্য ছিল। পার্থক্য ছিল জাতীয় রাজনীতি নিয়েও। কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তান সমর্থন করেছিল। আরএসপি সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসুর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সার্বভৌম বাংলার আন্দোলনে নেমেছিল। পাকিস্তান আমলে আরএসপি ও কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্ব ও চিন্তার দিক থেকে পার্থক্য থাকলেও সরকারি নির্যাতনের ফলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেরই চেষ্টা করা হতো।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে রুখবার জন্যে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল। এই যুক্তফ্রন্টে ছিল আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, শেরে বাংলা ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি, মওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম এবং গণতন্ত্রী দল। প্রথম দিকে আরএসপি এই নেতৃত্বের সম্পর্কে প্রশ্ন তুললেও পরবর্তীকালে সকল বামপন্থী দলই যুক্তফ্রন্টকে সমর্থন দেয়। ১৯৫৩ সালে আরএসপি পুনর্গঠিত হয়। এই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হলেন রুহুল আমিন কায়সার, নিতাই গাঙ্গুলী ও এবিএম মূসা। এই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কাজ করা শুরু করি এবং বরিশালে আমি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হই।

১৯৫৪ সাল। নির্বাচন এগিয়ে আসছে। বরিশালে নির্বাচনী সফরে আসবেন পূর্ব পাকিস্তানের তক্কালীন প্রধানমন্ত্রী জনাব নূরুল আমীন। সঙ্গে আসবেন উত্তর প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী আব্দুল কাইয়ুম খান। বরিশালের ছাত্রদের সিদ্ধান্ত-এ সফর ঠেকাতে হবে।

আমি তখন কলেজ নিয়ে বিব্রত। কলেজ নির্বাচন নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ইতিমধ্যে আর এক কাণ্ড ঘটিয়েছে আইএসসির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্ররা। তারা একদিন পড়ন্ত বেলায় পদার্থবিদ্যার ক্লাসের আগে ছুটি দেবার জন্যে শিক্ষকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু ক্লাসের শিক্ষক রাজি হননি। তখন তিনজন ছাত্র কলম থেকে কালি ছিটিয়ে দিয়েছে সামনে বসা ছাত্রীদের শাড়িতে। ছাত্রীরা চিৎকার করে উঠলে ক্লাস ছুটি হয়ে যায়। অভিযোগ চলে যায় অধ্যক্ষের কাছে। তিনি নির্দেশ দিলেন, তিনজন ছাত্রকে কলেজ থেকে বহিষ্কারের। তবে এ নির্দেশ কার্যকর করার পূর্বে ভাইস প্রিন্সিপালকে বললেন–আমার মতামত জানার জন্যে। আমি তখন কলেজে যাই না। টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে গেছি। তবুও অধ্যক্ষের আশঙ্কা এ ছাত্রদের বহিষ্কার করা হলে আমি হয়তো কলেজে গণ্ডগোল করব। তাই আমাকে ডেকে পাঠানো হলো কলেজে।

কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালের কক্ষে কথা শুরু হলো। ভাইস প্রিন্সিপাল দেবেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি (ডিএনসি) আমার স্থানীয় অভিভাবক। তিনি বললেন–নির্মল, তুমি কোনো প্রতিবাদ করো না। তোমার সামনে অনেক বিপদ। গণ্ডগোল করলে পরীক্ষা দেয়া হবে না। আমরা সকলেই চাই তুমি পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে যাও কলেজ থেকে।

আমি বললাম, স্যার লঘু পাপে গুরু দণ্ড হয়ে যাচ্ছে। এই বয়সের ছেলেরা মেয়েদের দেখলে শিস দেয়। শাড়িতে কালি দেয়াটাও অসম্ভব কিছু নয়। এই বয়সের এটাই ধর্ম। ছেলেগুলো আমার কাছে এসেছিল। আমি বলেছি, তোমাদের মনে এমন কিছু থাকলে চিঠিপত্র লিখতে পারতে। এভাবে কালি দেয়া ঠিক হয়নি। ওরা আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। ক্ষমাও চেয়েছে। আমি ওই মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করতে বলেছি।

ভাইস প্রিন্সিপাল বললেন, তোমার কথা শুনতে ভালো। কিন্তু প্রিন্সিপাল তোমার কথা মানবেন না। তুমি এ ব্যাপারে নাক গলাবে না। আমি বললাম, তাহলে এ ব্যাপারে আমার অভিযোগ আছে। আমার অভিযোগ হচ্ছে বিজ্ঞানের অনেক শিক্ষকই ঘণ্টার পর ঘন্টা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে দাঁড়িয়ে ছাত্রীদের সবকিছু বোঝানোর চেষ্টা করেন। ছাত্ররা ডাকলে কাছেও আসেন না। তাই আমাদের ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে ঐ শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি কিন্তু ছাত্রদের এসব কথা বলব।

ভাইস প্রিন্সিপাল বললেন, তাহলে তোমার এ ব্যাপারে প্রস্তাব কী? আমি বললাম, শুধুমাত্র একটা ওয়ার্নিং। ঐ ছাত্রদের আপনি ডেকে সতর্ক করে দিন যে, ভবিষ্যতে এমন ঘটলে তোমাদের বহিষ্কার করা হবে। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। ছাত্ররা বেঁচে গেল।

যতদূর মনে আছে–এ হচ্ছে ১৯৫৪ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের কথা। জানুয়ারি মাসের ১৯ তারিখ নূরুল আমীন বরিশাল সফরে আসবেন। বরিশাল তখন উত্তপ্ত। এক সন্ধ্যায় মিছিলের সামনে পড়ায় এক মুসলিম লীগ নেতার মুখে থুতু দেয়া হয়েছে। মিছিলে গোন উঠেছে নরুল আমীনকে জুতা মারো। এ পরিস্থিতিতে ১৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সকল দলকে ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে ডাকা হলো। কমিউনিস্ট পার্টি এবং ইউনিয়নের কথা হচ্ছে নূরুল আমীনের বিরুদ্ধে কঠিন কিছু করা ঠিক হবে না। কোনো খুন জখম হলে এই অজুহাত দেখিয়ে সারা দেশে হয়তো নির্বাচনই বন্ধ করে দেয়া হবে। এ ঝুঁকি আমাদের নেয়া ঠিক হবে না। আমি বললাম, আপনাদের কথা আমি মানতে রাজি আছি। কিন্তু সরকার পক্ষ কিছু ঘটালে ছাত্রলীগ তার প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ করবেই। শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা শেষ হলো।

১৯ জানুয়ারি সকাল থেকেই বরিশাল শহর থমথমে। আমরা তেমন কোনো বিক্ষোভের ব্যবস্থা করিনি। সদর রোডে ছাত্রলীগ অফিসে মাইক থেকে বক্তৃতা দিচ্ছি। নূরুল আমীন সদলবদলে ঢাকা থেকে বরিশালে পৌঁছাবেন স্টিমারে। আমাদের বারণ সত্ত্বেও ডজন খানেক ছাত্র পকেটে কালো রুমাল নিয়ে স্টিমার স্টেশনে যায়। নূরুল আমীন স্টিমার থেকে নামবার সঙ্গে সঙ্গে তারা কালো রুমাল দেখায়। তাদের গ্রেফতার করা হয়। এই গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের মধ্যে ছিল নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের এককালের সভাপতি আকতার উদ্দিন এবং ছাত্রলীগ নেতা নুরুল ইসলাম মঞ্জুর। এদের গ্রেফতারের খবর আগুনের মতো ছড়িয়ে গেল শহরে। তখন শর্ষিনার পীরের মুরিদেরা মুসলিম লীগের সমর্থনে মিছিল করেছিল সারা বরিশালে। ছাত্রলীগের অফিস থেকে সব স্কুল এবং কলেজে ধর্মঘটের খবর পাঠানো হলো। খবর এল কলেজে মাত্র একটি ক্লাস হচ্ছে। ঐ কলেজে ধর্মঘটের খবর পাঠানো হলো। ঐ ক্লাসের নেতৃত্বে আছে মুসলিম ছাত্রলীগের ছেলেরা। আমি কলেজে পৌঁছালাম। শিক্ষকরা বললেন, কী করব? পার্সেন্টেজ দিয়ে ছুটি দেব না এমনিই ছুটি দিয়ে দেব? আমি বললাম, পার্সেন্টেজের দরকার নাই। এমনিই ছুটি দিয়ে দেন। মুসলিম লীগের নেতৃত্বের ক্লাসটিতে ঢুকলাম। ওদের নেতা নুরুল উল্লা (পরবর্তীকালে ইঞ্জিনিয়ার নূরুল উল্লা নামে খ্যাত], যিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জগন্নাথ হলের হত্যাকাণ্ডের ছবি তুলে খ্যাতি লাভ করেছিলেন]। নূরুল উল্লার ডাক নাম ছিল ভানু। ভানু আমাকে দেখেই সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে এল।

তারপর শুরু হলো মিছিল। সকলের মুখে এক কথা, নূরুল আমীন কোথায়? তাকে ঘেরাও করতে হবে। ছাত্রদের মুক্তি দিতে হবে। ইতিমধ্যে প্রিন্সিপাল ম্যাক-ই-নানী একটি ভিন্ন পদক্ষেপ নিলেন। তিনি লিখিতভাবে কলেজে জানালেন যে তার কলেজের ছাত্রদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি জেলে গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করলেন। জেল কর্তৃপক্ষকে জানালেন ছাত্রদের জেলে রেখে নূরুল আমীনের সঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজনে তাঁর যোগ দেয়া সম্ভব নয়।

এ খবর ছাত্রদের সাহসী করে তুলল। মিছিল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল। জানা গেল নূরুল আমীন সার্কিট হাউসে চলে গেছেন। আমার ইচ্ছা ছিল সংঘর্ষ এড়াবার। চেষ্টা করলাম সার্কিট হাউস এড়িয়ে মিছিল নিয়ে যাবার। কিন্তু সম্ভব হলো না। মিছিল গিয়ে সার্কিট হাউস ঘিরে ফেলল।

তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। ছেলেরা অস্থির হয়ে উঠেছে। পুরো সার্কিট হাউসের লনে দাঁড়িয়ে আছেন ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, বিভাগীয় কমিশনার জিএম ফারুকী এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী খান আব্দুল কাইউম খান। নূরুল আমীন সার্কিট হাউসের ভেতরে, এমন সময় এসপি আমাকে ডেকে পাঠালেন, বললেন কী চান? আমি বললাম গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের ছেড়ে দিতে হবে। তিনি বললেন, ছেড়ে দেয়া হবে। আমি বললাম, তাদের ছেড়ে দেয়া নয়, এখানে এনে দেখাতে হবে। তাহলে মিছিল চলে যাবে।

এসপি বললেন, তাই হবে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের আমাদের সামনে হাজির করা হবে। আমি মিছিল নিয়ে টাউন হলের দিকে চলে যাবার কথা বললাম। ছাত্র-জনতা কেউই রাজি হলো না। ঘেরাও চলল। ইতিমধ্যে দক্ষিণ দিক থেকে মুসলিম লীগের লাঠিয়াল বাহিনী এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের মিছিলের ওপর। সার্কিট হাউসের সামনে তখন নির্মিত হচ্ছিল একটি পেট্রোল পাম্পের ভবন। পড়ে ছিল ইট-কাঠ। জনতার হাতিয়ার হয়ে উঠল এই ইট। দু’পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে এক সময় এসপি মুসলিম লীগের নেতাদের নিয়ে সার্কিট হাউসের পেছন দিক থেকে বের হয়ে চলে গেলেন এ কে স্কুলের মাঠে জনসভা করতে। সে জনসভা ভণ্ডুল হয়ে গেল।

বিকেলের দিকে সারা শহরে যেন উন্মত্ততা চলছে। শর্ষিনার পীরের মুরিদদের ধরে আনা হচ্ছে। খোঁজা হচ্ছে মুসলিম লীগের লাঠিয়াল বাহিনীকে। এদের ওপর যুক্তফ্রন্টের কর্মিদের প্রচণ্ড রাগ। কারণ ওদের মধ্যেই অনেকে ছিল চেনাজানা। বলেছিল মুসলিম লীগের এতদিনের ভাড়া খাটব, আবার ফিরে আসব। কোনো গোলমাল করব না। অথচ তারাই আমাদের মিছিলে হামলা করেছে লাঠি নিয়ে।

আমি ছাত্রলীগ অফিসে বসা। খবর এল মুসলিম লীগের লাঠিয়াল বাহিনী এ কে স্কুলে স্থান নিয়েছে। যুক্তফ্রন্টের ছেলেরা জিন্দেগী রেস্টুরেন্ট থেকে সুন্দরী কাঠের লাঠি নিয়ে ছুটেছে। আমিও ছুটলাম। জনতা তখন মারমুখী। আমাকে বলছে, আপনি বারণ করতে পারবেন না। ওদের আমরা মেরে ফেলব।

আমি ঠেকাতে পারলাম না। আমরা এ কে স্কুলে ঢুকবার আগেই মুসলিম লীগ বাহিনীর অনেকে পালিয়েছিল। কিন্তু পালাতে পারেনি আব্দুল মালেক। আমার সামনে তার মাথায় ছুঁড়ে দেয়া হলো একটি বিরাট পাথর। মালেক পড়ে গেল। আমি ফিরলাম টাউন হলে। টাউন হলের সামনে তখন হাজার হাজার জনতা। সকল দলের নেতারা বক্তৃতা দিলেন। আমি কাউকে জিজ্ঞাসা না করেই ঘোষণা করলাম, আমরা পরবর্তী ঘোষণা দেবার পূর্বে বরিশাল জেলার কোনো স্কুল-কলেজ আর খুলবে না।

জনসভা থেকে বের হয়ে আসতেই অন্যান্য দলের বন্ধুরা ধরল। বলল, এ ঘোষণা কেন দিলেন? পদস্থ পুলিশ অফিসাররা এলেন। বললেন, স্কুল-কলেজ কবে খুলবে। কারো কথার জবাব দিলাম না। সেদি’ এ ঘোষণা কেন দিয়েছিলাম আজ আর মনে নেই। বড় ক্লান্ত ছিলাম। ফিরে গেলাম কালীবাড়ি রোডের আস্তানায়। ছাত্র পড়িয়ে থাকি। শুনলাম আহত মালেকের তাপমাত্রা ৯৫ ডিগ্রিতে নেমে গেছে।

২০ জানুয়ারি ১৯৫৪। সারা বরিশাল শহরে একটি অস্থিরতা। সকলের মনে আশঙ্কা। কী হবে। সরকার পক্ষ কালকের ঘটনার বিরুদ্ধে কী ধরনের ভূমিকা নেবে। আহত আব্দুল মালেক বাঁচবে কি না।

বিকালের দিকে ছাত্রলীগ অফিসে এলাম। এ সময় ছাত্রলীগ অফিসের সামনের দেয়ালে প্রতি ঘণ্টার খবর লিখে কাগজে লাগিয়ে দিচ্ছিলাম। দাবি করছিলাম, আব্দুল মালেক আমাদের লোক। কিছুক্ষণ পরে খবর এল মালেক মারা গেছে। সকলেই খানিকটা থমকে গেলাম। অফিসে নামলাম। জানতাম এবার পুলিশ তৎপর হবে।

সে রাতে ইচ্ছে করেই বাসায় থাকলাম। বাড়ির মালিক ধনী ব্যবসায়ী। পুলিশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো। দুপুর রাতে আমার ঘুম ভাঙানো হলো। বাড়ির মালিকের হাতে থানার এজাহারের অনুলিপি। পুলিশ প্রায় দু’শ জনের বিরুদ্ধে। মামলা দায়ের করেছে বরিশাল সদর থানায়। আমি তিন নম্বর আসামী–এজাহারে লেখা হয়েছে, নির্মল সেন (কমিউনিস্ট)। পিতার নাম নেই। ঠিকানা নেই। এজাহারে বয়ানে লেখা, একজন হিন্দু ছেলে মুসলমানের পোশাকে মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সেদিন আমার পরনে ছিল পাজামা পাঞ্জাবি। আমাকে রাতে বাসা ছাড়তে হলো। রাতে থাকতে হলো বাড়ির মালিকের দোকানের দোতলায়।

কিন্তু কোথায় যাব! স্থির হলো বাড়ির মালিকের গ্রামের বাড়ি গৌরনদী থানার মেদাকুলে যাব। দুদিন পর বরিশালের উত্তরে মহামায়ার মেলা। দুপুরে বোরখা পরে রিকশায় উঠলাম। চারদিকে কাপড়ের ঘের দেয়া রিকশায়। মহামায়ায় গিয়ে বাস ধরলাম। বাস যাচ্ছিল বরিশাল থেকে অধুনা মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার ভুরঘাটা। ভুরঘাটার পথে ইল্লা নেমে হাঁটা পথে মেদাকুল। মেদাকুলে একটি সুবিধা ছিল। যে বাড়িতে থাকতাম সে বাড়ির পাশে খাল। খালের ওপারে ফরিদপুর জেলা। মেদাকুল বরিশাল জেলায়। সুতরাং দু’জেলার পুলিশ এড়ানো সম্ভব ছিল।

কিন্তু গ্রামে দিন কাটানো কঠিন। একদিন গৌরনদীর দারোগা সাহেব এলেন ঐ বাড়িতে আমার সন্ধানে। বাড়ির কর্তা বললেন, আপনার কোনো ভয় নেই। ঐ দারোগা আপনার কক্ষেই ঘুমাবে। আমাদের টাকায় ওদের সংসার চলে। আপনাকে ধরবার মুরোদ নেই। বাড়ির মালিক বড় ব্যবসায়ী। আন্তঃদেশ সুতা ব্যবসায়ী। তাঁকে এড়ানো সেকালের গৌরনদী থানার কোনো দারোগার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এবং তাই-ই হলো। রাতে দারোগা সাহেব আমার কক্ষে ঘুমালেন। তেমন কোনো কথা হলো না। তিনি আমাকে চিনলেন মনে হলো না। ভোরবেলা চলে গেলেন।

আমি বুঝলাম এ বাড়িতে থাকা যাবে না। পুলিশ জেনে ফেলেছে আমি কোথায়। তাই ভাবলাম বরিশাল ফিরব। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস। হয়তো সরকার কিছুটা শিথিল করবে বাড়াবাড়ি। ২২ ফেব্রুয়ারি বরিশাল এলাম। পুরান আস্তানায় জায়গা নিলাম। সকালে বলল–এভাবে থাকলে ধরা পড়বে। আমি বললাম, পুলিশ ভাবতে পারবে না যে আমি পুরান আস্তানায় ফিরে এসেছি। তবে পুলিশ সত্যি সত্যি আমাকে খুঁজেছিল হন্যে হয়ে। মাঝখানে পুলিশ প্রধান বিখ্যাত সামসুদ্দোহা সাহেব বরিশাল সফর করে গেছে। তাই পুলিশ সতর্ক এবং সন্ত্রস্ত।

সারা দেশে তখন নির্বাচনী জোয়ার। শেরেবাংলা ফজলুল হক, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট হক ভাসানী যুক্তফ্রন্ট নামে পরিচিত। এদের সঙ্গে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রচারে যোগ দিয়েছেন সীমান্ত গান্ধী আব্দুল গাফফার খান। পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৩০৯। এর মধ্যে অমুসলমানদের জন্যে ৭২। তারা স্বতন্ত্রভাবেই নির্বাচনে নেমেছে। মুসলিম আসন সংখ্যা ২৩৭। নির্বাচনের সময়কালেই বোঝা গেলো মুসলিম লীগ গো হারা হারবে। যুক্তফ্রন্টের নেতাদের মোকাবেলা করার মতো তাদের কোনো নেতা নেই। শুধু পাকিস্তান সৃষ্টির পর ৭ বছরের ইতিহাস আছে নির্যাতন ও বঞ্চনার। এই নির্যাতন ও বঞ্চনার প্রতিবাদে প্রণীত হয়েছিল যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা। ঐ ২১ দফায় ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি, শহীদমিনার নির্মাণ, ২১ ফেব্রুয়ারি ছুটি, প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের বাসভবন বাংলা ভাষা প্রচারের জন্যে ব্যবহারের দাবি নুরুল আমিনের বাসভবন বর্ধমান হাউস এখন বাংলা একাডেমী], দাবি ছিল কেন্দ্রের হাতে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও মুদ্রা ব্যবস্থা রেখে পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেবার। এ দাবি সারাদেশে নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করল। এর বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের কোনো যুক্তিই গ্রহণযোগ্য হলো না কোনো মহলে। তাদের পক্ষে সভা সমাবেশ করাই সম্ভব হলো না।

মেদাকুল থেকে বরিশাল এসে বুঝেছিলাম মুসলিম লীগ হেরে গেছে। আমাদের বেশিদিন আত্মগোপন করে থাকতে হবে না। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো ৮ মার্চ।

নির্বাচনের ফলাফল শুনতে সকল রাস্তায় ভিড়। সকল বাড়িতে এবং দোকানে তখন রেডিও ছিল না। রেডিওয়ালা দোকানের সামনে ভিড় হতো। মাইক্রোফোন লাগিয়ে খবর শোনানো হতো। তখন ভয়েস অব আমেরিকা বা বিবিসি’র তেমন নামধাম ছিল না। উল্লেখযোগ্য ছিল আকাশবাণী।

খবর আসতে থাকল যুক্তফ্রন্টের জয়ী হবার। প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীন পরাজিত হলেন ছাত্রলীগের এককালীন সম্পাদক খালেক নওয়াজ খানের কাছে। ২৩৭ আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট জিতল ২২৭টি আসনে। ৯ আসন পেল মুসলিম লীগ। পাকিস্তান সৃষ্টির দাবিদার মুসলিম লীগ পাকিস্তান সৃষ্টির ৭ বছরের মধ্যে পরাজিত হলো শতকরা ৯৭ ভাগ ভোটে। বাকি ৭২ অমুসলমান আসনে যারা জয়ী হলেন তারাও চরম মুসলিম লীগ বিরোধী। ব্যালটে একটি সংসদীয় বিপ্লব হয়ে গেলো সেকালের পূর্ব পাকিস্তানে।

সকলের ধারণা তখন বাইরে যাওয়া যায়। যুক্তফ্রন্ট জিতেছে। পুলিশ দেখলেও গ্রেফতার করবে না। তেমন বিশ্বাস না হলেও একদিন সন্ধ্যার দিকে বের হলাম। হঠাৎ দেখা হলো এসপি সাহেবের সঙ্গে। বললেন, আপনি খুনের মামলার আসামী। এভাবে বের হলে আমাদের চাকরি থাকে না। আদালতে যান। জামিন পেয়ে যাবেন। অন্যান্য সকলে জামিন পেয়েছেন। বুঝলাম আমার বের হওয়া নিরাপদ নয়। যুক্তফ্রন্ট জিতেছে বলে আমাকে ধরতে পারছে না পুলিশ।

দিন সাতেক পর সিদ্ধান্ত হলো আদালতে আত্মসমর্পণ করব। এতদিনে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। আমাকে জামিন দিতেই হবে। কিন্তু তেমনটি হলো না। আমিসহ দশজন ছাত্র আদালতে হাজির হলাম। আমাদের উকিল সদ্য নির্বাচিত পরিষদ সদস্য এন ডব্লিউ লিয়াকতউল্লাহ এবং অ্যাডভোকেট শমসের আলীসহ অসংখ্য আইনজীবী। ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে ব্যতীত ৯ জনকে জামিন দিলেন। বললেন আমার বিরুদ্ধে খুন, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুটপাটের অভিযোগ আছে। আমি বরিশাল নয়, ফরিদপুর জেলার অধিবাসী অর্থাৎ ভিন্ন। জেলার লোক। তাই আমাকে জামিন দেয়া যাবে না।

আমাকে জামিন না দেয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়া হলো। আদালত প্রাঙ্গণে ছাত্রদের ভিড় জমতে শুরু করল। তাদের থামানো মুশকিল। অবস্থা সামাল দেয়া না হলে হয়তো ভাঙচুর হবে। ছাত্রলীগ নেতারা উকিলদের কাছে বললেন, পরিস্থিতি সামলানো মুশকিল হবে। উকিলেরা হাকিমের সঙ্গে কথা বললেন। এবার আমার জামিন হলো। তবে শর্ত দেয়া হলো শুধু উকিল নয়, নগদ অর্থ জামিন থাকিবে। সেই হাকিম সাহেবের কথা এখনো মনে আছে। তিনি পরবর্তী হাজিরার দিনও আমার জামিন বাতিলের চেষ্টা করেছিলেন। আবার সেই হাকিম সাহেবই দেশে ৯২(ক) ধারা জারি হলে আমার অনুপস্থিতিতে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণে রাজি হননি। আমি তখন পলাতক। যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দিয়ে পাকিস্তান সরকার জেলে পুরেছে হাজার হাজার যুক্তফ্রন্টের নেতা ও কর্মীদের।

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জামিন পেলাম। ভেবেছিলাম ভালো থাকব। বিএসসি পরীক্ষা জুন মাসে। এবার পরীক্ষা দিতে পারব। এ পরীক্ষা দেবার কথা ছিল ১৯৪৮ সালে। গ্রেফতার হবার কারণে পরীক্ষা দেয়া হয়নি। আশা ছিল এবার জেল এড়াতে পারব। পরীক্ষা দেবো নিয়মিত। কিছুদিন পর মনে হলো এবারও পরীক্ষা দেয়া হবে না। বিপুল ভোট যুক্তফ্রন্ট নির্বাচিত হলো। কিন্তু সরকার গঠন নিয়ে একমত হতে পারল না।

ঠিক হলো ২ এপ্রিল যুক্তফ্রন্টের নেতা নির্বাচিত করা হবে। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক যুক্তফ্রন্টের নেতা নির্বাচিত হলেন। কিন্তু মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে শেরেবাংলা, শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে একমত হলেন না। অনেক বাদানুবাদ হলো। শেষ পর্যন্ত তিনজন সদস্য নিয়ে শেরেবাংলা, প্রথম মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। অনেক কাঠখড় পোড়ানার পর ১৫ জন সদস্য নিয়ে যুক্তফ্রন্ট সম্প্রসারিত হলো ১৫ মে।

প্রতিপক্ষ এ সুযোগই খুঁজছিলেন। প্রতিপক্ষ হচ্ছে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার। সামরিক বেসামরিক আমলা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তখন পাকিস্তান সরকারের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড প্রভাব। তখন সারাবিশ্বে ঠাণ্ডা যুদ্ধের কাল। এই ঠাণ্ডা যুদ্ধের শুরু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মান জাপান ইতালির বিরুদ্ধে মিত্রশক্তি অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। এবং জিতেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের রাজনৈতিক আদর্শ ছিল একেবারে বিপরীতমুখী। প্রথম মহাযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়েছিল। পাশ্চাত্যের শাসকবর্গ অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের ভয় ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরেও এমন ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাদের লক্ষ্য ছিল শুধু জার্মানিকে পরাজিত করা নয়, পরবর্তী সময়ে কমিউনিজম অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব খর্ব করা। অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের লক্ষ্য ছিল

সমাজতান্ত্রিক শিবিরে প্রভাব বলয় বৃদ্ধি। এই দুশিবিরের প্রভাব বলয় বৃদ্ধির প্রতিযোগিতার নামই ছিল ঠাণ্ডা যুদ্ধ। এ যুদ্ধ প্রকাশ্যরূপ নিয়েছিল কোরিয়ায়। এ প্রতিযোগিতায় পৃথিবী তিনভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এই তিনটি ভাগ হচ্ছে (১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট বিরোধী শিবির; (২) সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির; (৩) যুগোস্লাভিয়া, ভারত, মিসর, ইন্দোনেশিয়ার নেতৃত্বে জোট নিরপেক্ষ শিবির। এই তিন ভাগের প্রথম ভাগের সঙ্গে ছিল পাকিস্তান। দ্বিতীয় ভাগে নিরপেক্ষ ভারত। অপরদিকে কমিউনিস্ট চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের কাছে পাকিস্তান ছিল গুরুত্বপূর্ণ তার ভৌগলিক অবস্থানের জন্যে। এবং অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকারের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুসলিম লীগ উৎখাত হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক ছিল তাদের কাছে। তাই পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ হেরে যাওয়ার পর তঙ্কালীন পাকিস্তানের মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে এ নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না। ভাবখানা যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সকল নীতি নির্ধারক। তবে প্রকৃতপক্ষে অবস্থা তেমনই ছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের পরাজয়ের পর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ভেঙে খান খান করার। এর অন্যতম কারণ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত সদস্যদের প্রকাশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা এবং ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষ শরিক ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল পাকিস্তানকে কমিউনিস্টবিরোধী ঘাঁটি বানাতে। পেশোয়ারে বিমান ঘাঁটি মার্কিন বিমানকে ব্যবহার করতে দেয়া হতো সোভিয়েত ইউনিয়নে গোয়েন্দাবৃত্তি করার জন্যে। আর প্রস্তুতি চলছিল পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের। পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের পূর্বেই এ চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। নবনির্বাচিত পরিষদের অধিকাংশ সদস্য এ চুক্তির বিরুদ্ধে স্বাক্ষর অভিযানে সাড়া দেয়। তাই পূর্ব পাকিস্তানের বিজয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়। পূর্ব পাকিস্তান সরকারকে উৎখাত করা তাদের কর্মসূচির অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় কালাহান নামক একজন মার্কিন সাংবাদিক পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। তিনি প্রচার শুরু করেন যে, হক সাহেব দু’বাংলার ঐক্য চান। আর এই ষড়যন্ত্রের অপর এক পর্যায়ে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত হওয়ার দিন ১৫ মে আদমজীতে ভয়াবহ বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা হয়। প্রমাণ করার চেষ্টা হয় যে–পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট সরকারের অধীনে অবাঙালিরা আদৌ নিরাপদ নয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ক্ষমতা সংকোচন করতে শুরু করে এবং সদলবলে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে করাচি ডেকে পাঠানো হয়।

অভিযোগ আনা হয় যে, যুক্তফ্রন্ট সরকার দু’বাংলা এক করতে চাচ্ছে। নির্বাচনের পর পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কলকাতা গেলে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হয়। সেই সংবর্ধনা সভায় হক সাহেব নাকি এমন কথা বলেছেন, যার অর্থ হচ্ছে, স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান। অপমানজনকভাবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কালাহানকে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করায়। হক সাহেবদের বিবৃতি দিতে হয় যে, তারা পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা চান না।

কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। হক সাহেব ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা ঢাকা ফিরতে ফিরতে পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট শাসন জারি হলো। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়া হলো। গভর্নর হয়ে এলেন ইস্কান্দার মীর্জা ও চিফ সেক্রেটারি হয়ে এলেন এনএম খান। গ্রেফতার হলেন শেখ মুজিবুর রহমানসহ হাজার হাজার নেতা ও কর্মী।

বরিশালে আমরা কী করব? গ্রেফতার অনিবার্য। এমনই খুনের আসামী এবার পুলিশ কিছুতেই ছাড়বে না। মাত্র কিছুদিন আগে স্কুল-কলেজ খুলেছে। নতুন করে ধর্মঘট ডাকাও কঠিন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, আদালতে হাজির হতে পারবো না। জামিন বাতিল হবে। হুলিয়া জারি হবে। বরিশাল থাকা যাবে না। থাকা যাবে না বাড়িতে। অপরদিকে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে বা না নিয়ে অন্যান্য দলের সকল নেতারা গা ঢাকা দিয়েছে। ক্ষেপে গেছে ছাত্ররা। তাদের দাবি একটা কিছু করা প্রয়োজন এবং করতে হবে।

কিন্তু হরতাল করা কি আদৌ সম্ভব? সিদ্ধান্ত হলো বরিশালের একটি স্কুলে উদ্যোগ নিয়ে দেখা যাক। বরিশাল শহরের ব্রজমোহন স্কুল অর্থাৎ বিএম স্কুলে ছাত্রসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেখানে তখন আব্দুল মান্নান হাওলাদার পড়ত। আবদুল মান্নান হাওলাদার আবদুল মান্নান নামে পরিচিত। প্রথমে আমাদের দল আরএসপি করত। ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হয়। পরে আমাদের ছেড়ে শ্রমিক লীগে যোগ দেয়। দেশ স্বাধীন হবার পর লালবাহিনী গঠন করে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়।

সিদ্ধান্ত হয় ওই স্কুলেই একদিনের ধর্মঘট ডাকতে হবে। আমি একটা ছোটো কাগজে স্বাক্ষর দিয়ে লিখে পাঠালাম। কাগজটি স্কুলের দেয়ালে সেঁটে দেয়া হলো। ধর্মঘট হলো। বিএম স্কুলে কোনো ঘোষণা ব্যতীতই।

এবার পুলিশ তৎপর হলো। আমার আর বরিশাল থাকা সম্ভব নয়। সে সময়ের একটি মজার ঘটনা এখনো আমার মনে আছে। বিএম স্কুলে ধর্মঘট করতে গিয়ে আমাদের একজন ছাত্রকর্মী তিমির রায় চৌধুরী গ্রেফতার হয়ে গেল। সেদিন কালীপূজা। রাতে অন্য ছেলেরা এসে বলল, তিমিরের মা কালী মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছেন–এতে লোক মারা যাচ্ছে, নির্মল সেন মারা যাচ্ছে না কোনো। নির্মল সেন মারা গেলে আমার ছেলেটাকে জেলে যেতে হতো না। সেদিন অনেক সঙ্কটের মধ্যেও হাসি পেয়েছিল। তিমিরের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল সর্বশেষ ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গে। তিমির একটি কলেজের বাংলার অধ্যাপক। জানি না এখন কোথায় কিভাবে আছে।

আমার তখন মারা যাবার সময় ছিল না। কোথায় যাব? শেষ পর্যন্ত বরিশাল ছাড়বার সিদ্ধান্ত নিলাম। ক’দিন পর বিএসসি পরীক্ষা। এবারে পরীক্ষা দেয়া হবে না। আবার গৌরদী থানার মেদাকুল। মেদাকুল থেকে মাদারীপুর। মাদারীপুর থেকে একদিন লঞ্চে সুরেশ্বর। সুরেশ্বর থেকে। গোয়ালন্দ-নারায়ণগঞ্জের স্টিমারে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা। তখন ১৯৫৪ সালের জুন মাস।

নারায়ণগঞ্জ থেকে সন্ধ্যার দিকে ঢাকায় পৌঁছালাম। শৈশবে ঢাকায় ছিলাম। বাবা ইস্টবেঙ্গল ইন্সটিটিউশনে শিক্ষকতা করতেন। বই লিখতেন। তারপর আবার ঢাকা এলাম দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। বাবা বই লিখতেন বিভিন্ন লাইব্রেরির। ভিন্ন নামে সে বই বিক্রি হতো। আমার মেসো প্রিয়নাথ সেন ছিলেন লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের অন্যতম মালিক। মামা ছিলেন বাংলাবাজার বইয়ের দোকানের মালিক, শিক্ষক। ঢাকা বোর্ডের বইয়ের একমাত্র সরবরাহকারী। আর এক মেসো ছিলেন উকিল। সে সব বিভাগপূর্ব ১৯৪৭ সালে। দেশ বিভাগের পর যাঁরাও বা ছিলেন তাঁরাও চলে গেছেন ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর। সুতরাং এবার ১৯৫৪ সালে ঢাকায় থাকার সমস্যা প্রকট। পকেটে আট টাকা দশ আনা। চশমার বাট ভেঙে গেছে। দু’টি জামা, দু’টি পাজামা, দুটি লুঙ্গি, দুটি হাফপ্যান্ট সম্বল। উঠলাম দলনেতা অর্থাৎ আরএসপির নেতা নিতাই গাঙ্গুলীর মেসে।

নিতাই গাঙ্গুলী দেশ বিভাগের পূর্বে ঢাকা জেলা আরএসপি’র সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারিদের আন্দোলনের সময় ১৯৪৯ সালে গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতার সঙ্গে। অন্যান্য সকলে মুক্তি পেলেও নিতাই গাঙ্গুলী মুক্তি পেলেন ১৯৫৩ সালে। তাঁকে মুক্তি দিয়ে বলা হলো–আপনাকে আপনার মামাবাড়ি কেরানীগঞ্জ থানার  শুভাড্ডায় অন্তরীণ করা হলো। শুভাড্ডায় গিয়ে দেখা গেলো আমাদের ভিটি পর্যন্ত অপরের দখলে। কেউ কোথাও নেই। নিতাই গাঙ্গুলী ঐ নির্দেশ অমান্য করে ঢাকায় থেকে গেলেন। চাকরি পেলেন ঢাকেশ্বরী মিলের সদর দফতর ঢাকায়। এর একটি ইতিহাস আছে। ব্রিটিশ যুগে বাঙালি মালিকানায় অনেক মিলকারখানা গড়ে উঠেছিল। এরা সেকালের স্বদেশী আন্দোলনে সাহায্য সহযোগিতা করত। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অগ্নিযুগের বিপ্লবী দল অনুশীলন সমিতিকে সবদিক থেকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। তাই ঢাকেশ্বরী মিলে প্রথমদিকে নিতাই গাঙ্গুলীর চাকরি পেতে বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু সে চাকরিও টেকেনি ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি হবার পর। ঢাকেশ্বরীর চাকরি ছেড়ে তাকে সংগ্রহ করতে হয়েছিল দৈনিক মিল্লাতে সহ সম্পাদকের চাকরি। ১৯৫৯ সালে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার এড়াতে তিনি দেশান্তরী হন।

হাটখোলা রোডে ঢাকেশ্বরী মিলের প্রধান দফতর ছিল। পাশে ছিল মেস। একদিন সন্ধ্যায় মেসে এসে উঠলাম। নিতাই বাবুর চাকরিও খুব বড়ো চাকরি নয়। তার ওপর কদিন থাকব। আমিই বা কোথায় যাব। খুনের আসামী। দিনে-দুপুরে বের হওয়া মুশকিল।

ঠিক হলো ছাত্র পড়াব। যতদূর লুকিয়ে সম্ভব অন্যত্র থাকব। নাম পাল্টাব। এ ব্যাপারে সাহায্য করলেন মানিকগঞ্জের অনিল চৌধুরী। এককালে কংগ্রেস করে জেল খেটেছেন। অনেক মহলে পরিচিত। তিনি বললেন, এক বাসায় ছাত্র পড়াবার কথা। রাজি হয়ে গেলাম। এর আগে তেমন ছাত্র পড়াইনি। বরিশালে দু’একটি ছাত্র পড়িয়েছি। তাও বেশিদিন নয়। কিন্তু উপায় নেই। কী করা যাবে।

অনিল বাবু বললেন, শিক্ষকতা করতে হলে ইন্টারভিউ দিতে হবে। সেই ইন্টারভিউ দিতে হলো দুপুর বেলা। রিকশায় হুড দিয়ে হাটখোলা থেকে পুরান মোগলটুলিতে মুকুল ফৌজের অফিস। মুকুল ফৌজের পরিচালক মোহাম্মদ মোদাব্বের হোসেন। ওই বাসা থেকে অর্ধসাপ্তাহিক পাকিস্তান নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ওই বাসায় পড়াতে হলে আমাকে কথা বলতে হবে মোহাম্মদ মোদাব্বের-এর সাথে। মোহাম্মদ মোদাব্বের কলকাতার দৈনিক আজাদের বাঘা বার্তা সম্পাদক ছিলেন। ঢাকায় মিল্লাতের সম্পাদক ছিলেন। বরিশাল থাকতে তার নাম শুনেছি। স্কুলে পড়াবার সময় তার লেখা ‘সন্ধানী আলো’ বইটি পুরস্কার পেয়েছিল। রাজনীতির দিক থেকে কড়া মুসলিম লীগ হলেও বিশ্বাসের দিক থেকে ছিলেন র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট অর্থাৎ মানবেন্দ্র রায় (এমএন রায়)-এর অনুসারী। আর আমাদের দল আরএসপি সম্পর্কে তিনি ভালো করেই জানতেন। আরো জানতেন যে, বরিশালে তাঁর মুকুল ফৌজের অনেকেই আমাদের প্রতি অনুরক্ত।

সঙ্গে অনিল চৌধুরী। দুপুর রোদে গিয়ে হাজির হলাম মোদাব্বের সাহেবের বাসায়। দেখা হতেই জিজ্ঞাসা করলেন-তোমার নাম?

–নির্মল সেন।

নির্মল সেন? তুমি পাঁচ বছর জেলে ছিলে। তুমি খুনের আসামী। তোমার নামে হুলিয়া আছে–ধরে দিলে ৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে এমন কথা আমি শুনেছি।

মোদাব্বের সাহেব যেনো এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলেন। অনিল বাবু আমার দিকে বারবার তাকাতে থাকলেন। আমিও অবাক হতে থাকলাম। ভাবলাম এ ভভদ্রলোক এতো কথা জানেন কী করে? বুঝলাম এখানে শিক্ষকতা করা আমার হবে না।

আমি বললাম, সবই সত্যি। তবে পাঁচ হাজার টাকা ঘোষণার কথা শুনিনি। এবার মোদাব্বের সাহেব ভিন্ন কথা তুললেন। বললেন, তুমি ভয় পেও না। তোমার কাকা ড, ধীরেন্দ্রনাথ সেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান–হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডের সম্পাদক। তাঁর সঙ্গে আমার কলকাতায় দেখা হয়েছিল। তিনি একবার তোমার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীনকে বলতে। নাজিমুদ্দীন-সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তোমার কাকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আমি তোমার কথা নাজিমুদ্দীন সাহেবকে বলতে ভুলে গেছি। আজ হঠাৎ তোমার নাম শুনে সে কথা মনে হলো। কিন্তু আমার প্রশ্ন–তুমি এভাবে ছাত্র পড়াতে এলে কেন? তোমার তো ছাত্র পড়িয়ে বাঁচার কথা নয়।

আমি বললাম, এ প্রশ্ন আপনার করবার কথা নয়। আমি এসেছি এটাই সত্য। মোদাব্বের সাহেব চুপ করে গেলেন। বললেন ঠিক আছে, এখানে পড়াবে। আমি বললাম, থাকার জায়গা নেই? তিনি বললেন, তা হবে না। তবে তোমাকে কথা দিতে পারি আমার বাসায় পড়ালে তুমি জেলে গেলেও আমি সাহায্য করতে পারব।

আমি আর বেশি কথা না বাড়িয়ে চলে এলাম। হাটখোলা নিতাই বাবুর মেস থেকে চলে এলাম। নাম পাল্টালাম। বনগ্রামে একটি মেসে জায়গা নিলাম। থাকা খাওয়া ৪৫ টাকা। ঐ টাকাও মাসে আয় করতে পারতাম না। বাড়ির লোক জানে না আমি কোথায়। কলকাতায় মা জানেন না আমি কোথায়। তার ধারণা আমার জেলে থাকা অনেক ভালো। তাহলে মা জানতে পারেন আমার স্থায়ী ঠিকানা। চিঠি লিখতে পারেন নিয়মিত।

পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা চলছে। ৯২(ক) ধারার শাসন হচ্ছে প্রেসিডেন্টের শাসন। অর্থাৎ প্রদেশে কোনো মন্ত্রিসভা থাকবে না। প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী চার এজেন্ট প্রদেশের গভর্নর আমলাদের নিয়ে শাসন চালাবে। এই আমলাদের দিয়ে শাসন চালু রাখতে হলে প্রয়োজন হবে কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের বিশ্বস্ত লোক। তাই পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গভর্নর ও চিফ সেক্রেটারি পাল্টানো হয়। তখন গভর্নর ছিলেন চৌধুরী খালিকুজ্জামান। তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশের অধিবাসী। ভারত বিভাগের সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নার পরিবর্তে ভারতের মুসলিম লীগের সভাপতি হন। ১৫ আগস্ট ভারতীয় গণপরিষদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ভাষণ দেন। তারপর একদিন ভারতীয় মুসলমানদের নেতৃত্ব ছেড়ে পাকিস্তানে চলে আসেন এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগের এক সময় সভাপতি হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত হন। তিনি মুখ্যত রাজনীতিক। শোনা যায় এই রাজনীতিক গভর্নর একটি নির্বাচিত সরকারকে বাতিল করে পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারি পছন্দ করেননি। পাকিস্তান সরকার যাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেননি। তাই পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারির সঙ্গে সঙ্গে তাকে পাল্টানো হয়। গভর্নর হয়ে আসেন প্রতিরক্ষা সচিব মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা। একই সঙ্গে চিফ সেক্রেটারি ইসহাক সাহেবকেও পাল্টে দেয়া হয়। তিনিও নাকি নরমপন্থী ছিলেন, পরবর্তীকালে যিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। ইসহাক সাহেবের পরিবর্তে চিফ সেক্রেটারি হয়ে এলেন জাঁদরেল আমলা এনএম খান। এনএম খান ইতিপূর্বে পূর্ব পাকিস্তানে চাকরি করেছেন। সেই সুবাদে অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে পরিচিতি ছিলেন। তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানে নিযুক্তির অন্যতম কারণ ছিল এক শ্রেণির রাজনীতিবিদের কেনাবেচার চেষ্টা করা।

পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারি করলেও প্রাদেশিক পরিষদ বাতিল করেননি। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য তাঁদের সদস্যপদেই আছেন। পাকিস্তান সরকারের উদ্দেশ্য ছিল এই সদস্যদের কেনাবেচা করে যদি একটি সরকার গঠন করা যায় এবং সে কাজটিই ইস্কান্দার মীর্জা ও এনএম খান শুরু করলেন পূর্ব পাকিস্তানে এসে। অর্থাৎ তাদের লক্ষ্য ছিল যুক্তফ্রন্ট ভাঙতে হবে। একটি অনুগত সরকার গঠন করতে হবে পূর্ব পাকিস্তানে। এ উদ্যোগের পেছনে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদ।

আগেই উল্লেখ করেছি যে, পৃথিবীর রাজনীতিতে তখন তিনটি ভাগ। একান্তই স্পষ্ট- (১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেততে পাশ্চাত্যের শিবির, (২) সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির, (৩) যুগোশ্লাভ-ভারতের নেতৃত্বে জোট নিরপেক্ষ শিবির। সেকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো নর্থ আটলান্টিক চুক্তিসহ একের পর এক সমাজতান্ত্রিক শিবির বিরোধী জোট গঠন করা হচ্ছিল। অপরপক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ওয়ারশ চুক্তি। তৃতীয় বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র এই দু’জোটের সঙ্গে না গিয়ে একটি তৃতীয় জোট-জোট নিরপেক্ষ ধারা গঠন করে। পাকিস্তানের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত। ভারতের এই রাজনীতি পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও এই রাজনীতির প্রভাব পড়ে। সেই সময়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ নিচ্ছিল। আর সেই সময়ই পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র জয়লাভ করে। বিরাট সংখ্যক নবনির্বাচিত পরিষদ সদস্য পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির বিবৃতি দেয়। তাই যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। কারণ এই এলাকায় পাকিস্তানই ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত বন্ধু।

এই দল ভাঙা শুরু হলো পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারির পর। পাকিস্তানের সরকার মুখ্যত আঘাত হানল আওয়ামী লীগ ও গণতন্ত্রী দলের বিরুদ্ধে। বেশি ক্ষত্রিস্ত হলো না হক সাহেবের কৃষক শ্রমিক পার্টি বা মওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম। যুক্তফ্রন্টের তখন বেহাল অবস্থা। শেখ সাহেবসহ হাজার কয়েক কর্মী বন্দি। যুক্তফ্রন্টের সরকার তাকে নজরবন্দি করেছেন। আশরাফ উদ্দীন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে যুক্তফ্রন্ট পরিষদ দলের সভা হলো। সিদ্ধান্ত হলো সাবেক মন্ত্রী এবং জাতীয় পরিষদের সদস্যগণ দলে দলে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করবেন। তবে সভাও শান্তিতে হলো না। পুলিশ এসে সকলকে চলে যাবার নির্দেশ দিলে সভা ভেঙে গেল। তবুও শেষ চেষ্টা করা হলো। হক সাহেবের কাছে যাওয়া হলো। তিনি এ কর্মসূচিতে রাজি হলেন না। সকলকে এলাকায় গিয়ে বিপ্লবাত্মক কর্মসূচি গ্রহণের পরামর্শ দিলেন। তাই যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে আর তেমন কিছু করা হলো না।

ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ১৬ জুন এক বক্তৃতা দিলেন। হক সাহেবদের দেশদ্রোহী বলে ঘোষণা করলেন। অভিযোগ করলেন হক সাহেব নাকি এ ব্যাপারে স্বীকারোক্তি করেছেন। এরপরে হক সাহেবের বাসায় পুলিশ পাহারা কড়াকড়ি করা হলো। তিনি কিছুতেই কোনো প্রতিবাদ করলেন না। মাওলানা ভাসানী তখন ইউরোপে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী অসুস্থ অবস্থায় বিদেশে। হক সাহেব নজরবন্দি। সুতরাং ৯২(ক) ধারার বিরুদ্ধে আন্দোলন তেমন জমল না। জমল ষড়যন্ত্র আর কোন্দল।

দেশে ৯২(ক) ধারা জারি। রাজনীতি সীমিত। আত্মগোপন করে আমার পক্ষে আর রাজনীতি করাও সম্ভব নয়। এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে গেল। আমি বিশ্ববিদ্যালয় যাবার পথে কার্জন হলের সামনে বাস থেকে নামতেই কয়েকজন গোয়েন্দা বিভাগের লোক আমার কাছে এল। পালাবার কোনো পথ। ছিল না। তাদের মধ্যে একজন বললেন, আপনার ভয় পাবার কিছু নেই। মনে হয় ভভদ্রলোককে আমি বরিশালে দেখেছি। তিনি বললেন, আপনাকে ধরা হবে না। যে কোনো কারণেই হোক, বরিশাল জেলা গোয়েন্দা বিভাগের দ্বিতীয় কর্মকর্তা (ডিআইও-২) ইউসুফ সাহেব আপনার প্রতি সদয়। তিনি বলেছেন, এ ছেলেটি বারবার ভুগছে। জেলে যাচ্ছে। পরীক্ষা দিতে পারছে না। এবার তাকে ডিস্টার্ব করবে না। তাকে ঢাকায় পড়াশুনা করতে বলো। তার গ্রেফতারি পরোয়ানা বরিশাল থেকে তার নিজের জেলা ফরিদপুরের গোপালগঞ্জে পাঠিয়ে দেবে। সে যেন বরিশাল না আসে বা বাড়ি না যায়।

কথাগুলো আমার তেমন বিশ্বাস হয়নি। তবে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও স্বস্তি পেলাম। গ্রেফতার না হয়েও চলে এলাম। সেদিন থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হব। আবার বিএসসি পরীক্ষা দেব। রাজনীতি শুরু করব। বরিশাল ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। ঢাকায় ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। আমি ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক নির্বাচিত হলাম। তখন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হলেন আবদুল মতিন তালুকদার এবং সম্পাদক ছিলেন এমএ আউয়াল।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার টাকা কোথায়? ছাত্র পড়ানো নিয়ে একদফা গোলমাল হয়ে গেছে। রাগ করে ছেড়ে দিলাম ছাত্র পড়ানো। ঘটনাটি ঘটেছিল মাইনের টাকা নিয়ে। জীবনে কোনোদিন পড়িয়ে টাকা নিইনি। তাই মাস চলে গেলেও টাকা চাইতে পারিনি। একদিন মোদাব্বের সাহেবের স্ত্রী বললেন, তোমার কি টাকার প্রয়োজন নেই? এই বলে আমার পকেটে টাকা খুঁজে দিলেন। আমি টাকা গুনিনি। মেসে এসে দেখলাম টাকার অংশ নির্ধারিত টাকার চেয়ে বেশি। অর্থাৎ আমাকে বেশি টাকা দেয়া হয়েছে না বলে। মাথা টনটন করে উঠল। ভাবলাম, আমাকে কি বকশিশ দেয়া হলো আমাকে না বলে! পরদিন পড়াতে গিয়ে বললাম, আপনাদের টাকা ফিরিয়ে নিন। আমি আর আপনাদের বাসায় পড়াব না। তারা বিস্মিত হলেন।

মোদাব্বের সাহেবের স্ত্রী হোসনে আরা। ড. শহীদুল্লার ভাইয়ের মেয়ে। শিক্ষা জীবনে কংগ্রেসী রাজনীতি করেছেন। কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে মাউন্ট পুলিশ ডিঙিয়ে কংগ্রেসের পতাকা উড়িয়েছেন। দেশ ভাগ হওয়ার পর ঢাকায় এসেছেন। সারাদিন তিনি সাপ্তাহিক পাকিস্তানের কাজ করেন। ঘর গোছান, ছড়া লেখেন। অতিথিদের আপ্যায়ন করেন। প্রতি শুক্রবার অর্ধ-সাপ্তাহিক পাকিস্তান বের হবার দিন। চার ছেলে এক মেয়ে নিয়ে কাগজ ভাঁজ করেন। টিকিট লাগান। ডাকে পাঠান। সে এক আশ্চর্য কাণ্ড। সারাদিন বাড়ির সকলে ব্যস্ত।

আমার কথা শুনে বিস্মিত হলেন। বললেন, তুমি ভুল বুঝেছ। তুমি খুব ভালো পড়াও। তোমাকে দ্বিগুণ টাকা দেয়া উচিত। তাই আমি আর সাহেব সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু টাকা বেশি দিয়েছি। তাতে মনে করার কী আছে। আমার মেজাজ তখন তিরিক্ষি। বললাম, আপনি আমাকে বললেন না কেন? রিকশাওয়ালাকে দশ আনার পরিবর্তে বারো আনা দিলে খুশি হয়, আমি রিকশাওয়ালা নই। এ টাকা আমি নেবো না। এই বলে টাকা রেখে চলে গেলাম।

কিন্তু এরপর কী করবো। মেসের টাকা বাকি পড়েছে। আত্মীয়স্বজন কেউ আমার কথা জানে না। শুনেছি আমি বরিশাল ছাড়বার পর মেজো কাকার ছেলে নাকি এসেছিল বরিশালে আমার খোঁজে। ফিরে চলে গেছে আমাকে না পেয়ে। আমিও তাদের কোনো খোঁজ দিইনি। কারণ বারবার পুলিশ যাবে বাড়িতে। হেনস্তা হবে। যাদের আমি কোনোদিন সাহায্য করতে পারিনি তারা হেনস্তা হোক আমার জন্যে তা আমি চাইনি। কলকাতায়ও চিঠি লিখিনি মা বা ভাইয়ের কাছে। জেলে থাকা পর্যন্ত কলকাতা থেকে ডাকে টাকা আসত। কিন্তু পাসপোর্ট চালু হবার পর সে পথও বন্ধ।

এর মধ্যে একদিন অনিল চৌধুরী এলেন আমার মেসে। বললেন, তুমি নাকি টিউশনি ছেড়ে দিয়েছ? বললাম, হ্যাঁ। বললেন, এবার কী করবে? তুমি পলাতক খুনের আসামী, এ পরিচয়ে কোথাও আর ছাত্র পড়াতে পারবে কি? যে বাসায় তুমি পড়াতে তারাও তোমাকে চিনে ফেলেছে। তুমি এক বাসায়ই পরিচিত থাকো মামলা থাকা পর্যন্ত। মোদাব্বের সাহেবের স্ত্রী তোমাকে যেতে বলেছেন।

আবার সে বাসায় গেলাম। এবার সমঝোতা হলো আগামী মাস থেকে আমাকে বর্ধিত বেতন দেয়া হবে। আগের মাসে দেয়া বাড়তি টাকা আমি নেব না। মোদাব্বের সাহেবের স্ত্রী দুঃখ পেলেন। বললেন, তোমার বাবা মার মতো আমাদের বয়স। এতে অপমান বোধ করছ কেনো? আমি এবার সব টাকাই নিলাম। দোকানে গিয়ে বাড়তি টাকা দিয়ে বই কিনে ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে দিলাম।

ছাত্রছাত্রী পড়াতে গিয়ে এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমার বারবার হয়েছে। লক্ষ করেছি প্রতিটি বাসায় প্রাইভেট টিউটর কাজের মানুষের মতোই একজন। এরা বাড়ির কাজের লোকের মতো টাকা নেয়। অথচ চাকর নয়। এরা রক্তের সম্পর্কে অভিভাবক নয়। অথচ উপদেশ দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এই অবস্থানটি টিকিয়ে রাখা কষ্টকর। অনেকে প্রাইভেট টিউশনি করতে গিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকে। জল খাবার প্রত্যাশা করে। মাসের পর মাস টাকা না দিলে মুখ ফুটে বলতে পারে না। অনেক বাসায় মেয়ে পড়াতে গেলে দোরগোড়ায় ঝি বসিয়ে রাখা হয়। কখনোবা হঠাৎ করে অভিভাবকদের মধ্যে কেউ এসে মাস্টারের চরিত্রের পরীক্ষা নেয়।

কথাটি আমাকে মোজাম্মেল দা বলেছিলেন প্রথমে। আগেই বলেছি, মোজাম্মেল হক আমাকে রাজনীতিতে এনেছিলেন। এককালে আরএসপি করতেন। সাংবাদিক ইউনিয়নের সম্পাদক হয়েছিলেন। অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলাসেকালের দৈনিক পাকিস্তানের প্রথম বার্তা সম্পাদক ছিলেন। তিনি চাননি আমি পাকিস্তানে থাকি। তিনি বলেছিলেন, কী করে থাকবে? বললাম, টিউশনি করব। মোজাম্মেল দা বললেন, তুমি পারবে না, নির্মল। যে সমাজে তুমি মানুষ হয়েছে-মুসলিম সমাজ সেটা নয়। এখানে কোনো বাড়িতে গেলে তোমাকে চাকর দিয়ে চা দেবে। তুমি কোনো চুড়ির শব্দ শুনবে না। তুমি কলকাতায় চলে যাও। আমি বলেছিলাম, মোজাম্মেল দা, আমি পারব। দেখুন না কী হয়।

পরে বুঝেছি আমার মানসিকতা নিয়ে টিউশনি করা মুশকিল। আমি বলতাম–আমি সপ্তাহে প্রতিদিন আসতে পারি। কোনোদিন নাও আসতে পারি। তবে শর্ত হচ্ছে–আমাকে কোনোদিন জিজ্ঞাসা করা যাবে না–আমি কেন গতকাল আসিনি। অনেক বাসায়ই এ শর্তটি মনে রাখতে পারত না। কোনোদিন অনুপস্থিত থাকলে জানতে চাইত, কেনো আগের দিন আসিনি। আমাকে সঙ্গে সঙ্গে কোনো চিন্তা-ভাবনা না করেই বলতে হতো, কাল থেকে আমি আর পড়াব না। আমি তোমাদের কোনো ফার্ম-এ চাকরি করি না যে কৈফিয়ত দিতে হবে। এভাবে অনেক টিউশনি আমি মাসের মাঝখানে ছেড়ে দিয়েছি। পকেটে পয়সা থাকেনি। মুড়ি খেয়ে দিন কাটিয়েছি ঢাকা শহরে। কেউ কোনোদিন জানতে পারেনি।

পাকিস্তানের রাজনীতি আবার সেই নির্দিষ্ট বলয়ে ঘুরপাক খেতে শুরু করল। পাকিস্তান মার্কিন ব্লকের রাষ্ট্র। কমিউনিস্ট বিরোধী শক্ত ঘাঁটি। পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচিত হলে কমিউনিস্টরা দেশ দখল করবে। পাশে ধর্ম নিরপেক্ষ জোটনিরপেক্ষ ভারত। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে সরকারে। সেই ভারতের পূর্বাঞ্চলে পূর্ব পাকিস্তান। তাই পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট সরকার বহাল থাকা সঠিক নয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এ ধারণা দিতে পেরেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। তাই পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সাহায্য-সহযোগিতা ছিল।

কিন্তু ইচ্ছে হলেই পূর্ব পাকিস্তানে সে সময় ৯২(ক) ধারা জারি না করে কোনো সরকারের পক্ষে নিরাপদ থাকা সম্ভব নয়। তাই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়ায় শেরেবাংলা ফজলুল হকের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ করলেন।

ঘটনাটি ছিল এমন–পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করলে হক সাহেব প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি জীবনে শেষবারের মতো কলকাতা শহরে যান, যে শহরে তাঁর কর্মজীবন কেটেছে যে শহরে তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এখন কোলকাতা আর তার পার্শ্ববর্তী এলাকা পূর্ব পাকিস্তানে উদ্বাস্তুদের ভিড়। হক সাহেব কোলকাতায় গিয়ে বিপুল সংবর্ধনা পেলেন। সংবর্ধনার জবাবে হক সাহেব বললেন, বঙ্গদেশ খণ্ডনের দ্বারা বাঙালিকে, বাঙালি সত্তাকে, বাঙালি স্বকীয়তাকে, বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও বাঙালি মনের কামনাকে দু’টুকরো করা যায় না। যাবেও না। মতলববাজরা দেশটাকে দু’টুকরো করলেও এপার বাংলা, ওপার বাংলার ভাষা ঐ বাংলা ভাষা। মিথ্যার প্রাচীর থাকলেও এপার বাংলা, ওপার বাংলার মানুষ একই ভাষায় কথা বলে। সংস্কৃতিগতভাবে একইভাবে চলাফেরা করে। ইতিহাসের প্রয়োজনে আবার তারা একে অপরের নিকটবর্তী হবে।

কোলকাতায় দি স্টেটসম্যান এ ভাষণের শিরোনাম করল-হক সাহেব আশা করছেন, দু’বাংলার কৃত্রিম প্রাচীর থাকবে না। আনন্দবাজারের শিরোনাম–উভয়বঙ্গের মিথ্যার প্রাচীর ভেঙে ফেলার সংকল্প।

কোলকাতার পত্রিকার এই খবরকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্র শুরু হলো। পূর্ব পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল হলো। হক সাহেব নজরবন্দি হলেন। পূর্ব পাকিস্তানের নতুন নিযুক্ত গভর্নর মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা সংবাদ সম্মেলনে বললেন, কোথায় মওলানা ভাসানী। আমি তাকে প্রয়োজনে গুলি করব। আমার শাসনের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করলে সহ্য করা হবে না। দরকার হলে আমি পূর্ব বাংলার জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে সৈন্যবাহিনী নিয়োগ করব। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করতে দশ বিশ হাজার মানুষ হত্যা করতেও পিছপা হব না।’ ২৩ জুলাই অন্তরীণ অবস্থায় হক সাহেব রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের ঘোষণা দিরেন।

পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারি হওয়ায় মুসলিম লীগের নেতারা খুশি হলেন। কিন্তু তাদের এ আনন্দও দীর্ঘস্থায়ী হলো না। গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ২৩ অক্টোবর গণপরিষদ ভেঙে দিলেন। মুসলিম লীগের অধিকাংশ নেতা ১৯৪৬ সালে নির্বাচন হওয়ায় গণপরিষদের সদস্য ছিল। এবার সে সদস্যপদও গেল। গভর্নর জেনারেলের কাজটি ছিল একান্তই অগণতান্ত্রিক। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে আনন্দের ঢেউ দেখা গেল। শত্রুর শত্রু আমার মিত্র। আমার শত্রু মুসলিম লীগ। সেই মুসলিম লীগ অধ্যুষিত গণপরিষদ গোলাম মোহাম্মদ ভেঙে দিয়েছে। সুতরাং গোলাম মোহাম্মদ আমার বন্ধু। তাই হঠাৎ যুক্তফ্রন্টের শরিক দল আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, গণতন্ত্রী দল এবং নেজামে ইসলাম গভর্নর জেনারেল ওপর খুশি হলো।

২৩ অক্টোবর গভর্নর জেনারেল গণপরিষদ ভেঙে দিলেন। প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার মোহাম্মদ আলী তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরে গিয়েছিলেন। তাঁকে দেশে ফিরবার জন্যে জরুরি বার্তা পাঠানো হলো। তিনি করাচি ফিরে এলে তাকে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের নির্দেশ দেয়া হলো। ২৫ অক্টোবর মোহাম্মদ আলী দেশে ফিরে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। এই মন্ত্রিসভাকে বলা হলো মিনিস্ট্রি অব ট্যালেন্ট। বিজ্ঞজনদের মন্ত্রিসভা। এ মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা, এককালের সীমান্ত প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী ড, খান সাহেব, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কৃষক শ্রমিক পার্টি নেতা আবু হোসেন সরকার, শিল্পপতি ইস্পাহানী, মোঃ শোয়েব চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী, মরি গোলাম আলী প্রমুখ। আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী তখন জুরিখে চিকিৎসাধীন।

আমরা হতভম্ব হলাম। এ কোন রাজনীতি। দীর্ঘদিন পর জনতার আশা আকাক্ষা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগকে পরাজিত করে মার্চ মাসে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচিত হলো। ২ এপ্রিল যুক্তফ্রন্টের পরিষদ দলের নেতা নির্বাচিত হলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। কিন্তু একটি যৌথ মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারলেন না। তিনি কৃষক শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকার, ভাগ্নে সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া এবং নেজামে ইসলামের আশরাফ উদ্দীন চৌধুরীকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল (সোহরাওয়ার্দী সাহেবের অনিচ্ছা সত্ত্বেও)। হক সাহেব রাজি হলেন না। ইতোমধ্যে চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলি পেপার মিলে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা। অনেক আলোচনার পর ১৫ মে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত হলো–মন্ত্রিসভায় শেখ মুজিবুর রহমান অন্তর্ভুক্ত হলেন। সে দিনই আদমজীতে বাঙালি-বিহারী দাঙ্গা হলো। হক সাহেবের কোলকাতার সংবর্ধনা সভায় একটি কথিত উক্তিকে ভিত্তি করে ৩০ মে পূর্ব পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারি হলো। বলা হলো, কমিউনিস্ট বিশৃঙ্খলা দমনে ব্যর্থ শেরেবাংলার মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করা হলো। ২ জুলাই বিবৃতি দিয়ে হক সাহেব রাজ চাকরি ছেড়ে দিলেন।

তখন দেশে এক চরম হতাশা। সেই মুহূর্তে নজরবন্দি হক সাহেবের সহকর্মী আবু হোসেন সরকার আর কারগারে আটক শেখ মুজিবুর রহমানের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রী হলেন বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর অধীনে। এই মোহাম্মদ আলী অবিভক্ত বাংলার শেষ মন্ত্রিসভায় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অধীনে অর্থমন্ত্রী ছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বিদেশে ছিলেন। অনেকে আশা করলেন হয়তো বা তিনি দেশে ফিরে মন্ত্রিসভায় যোগ দেবেন না। এ সময়কার উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে ৯২(ক) ধারার শাসনকালেই পাকিস্তান কমিউনিস্ট বিরোধী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া রক্ষা চুক্তি (সিটো)-এর সদস্য হয়।

এ মন্ত্রিসভা গঠনের পর ১৫ ডিসেম্বর গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ঢাকায় আসবেন বলে ঘোষণা করা হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগের ধারণা হলো শহীদ সাহেব মন্ত্রিসভায় যাবেন। তাই কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের পক্ষে। সুতরাং গোলাম মোহাম্মদকে সংবর্ধনা জানালে তাদেরই মন্ত্রিসভা গঠনের জন্যে ডাকা হবে ৯২(ক) ধারা প্রত্যাহারের পর।

অপরদিকে ঢাকা আসার পূর্বে গোলাম মোহাম্মদ ঘোষণা দিলেন, শেরেবাংলা ফজলুল হক তার একান্ত বন্ধু। তিনি দেশের আদৌ শত্রু নন। ফলে কৃষক শ্রমিক পাটি ভাবল গোলাম মোহাম্মদকে সংবর্ধনা জানালে মন্ত্রিত্ব তারাই পাবে।

সুতরাং ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় কার্জন হলের সংবর্ধনা সভায় আতাউর রহমান এবং আবু হোসেন সরকার উভয়েই গোলাম মোহাম্মদকে মালা দিলেন। তখন পূর্ব পাকিস্তানের জেলে বন্দি হাজার হাজার নেতা ও কর্মী। আমরা আত্মগোপন করে আছি। আর আমাদের নির্বাচিত নেতারা মালা নিয়ে ছুটছেন–কে আগে স্বৈরশাসককে মালা দেবে।

১৯৫৪ সালের ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ। সকলের তখন প্রতীক্ষা শহীদ সোহরাওয়ার্দী কবে দেশে ফিরবেন। তিনি বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় যোগ দেবেন কিনা।

আর এদিকে আমার জীবনে ১৯৫৪ সালের জুলাই মাস। অনেক দেনদরবার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনুমতি পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ৯৮ টাকা প্রয়োজন। অনেক কষ্ট করে ৪৮ টাকা সংগ্রহ করেছি। বাকি ৫০ টাকার খবর নেই। হাতে মাত্র একদিন। বের হবার উপায় নেই। মনে হচ্ছে পুলিশ আবার সতর্ক হয়েছে। একদিন বন্যার জল দেখতে গিয়ে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলাম।

সেবার ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। ঢাকার বিভিন্ন সড়কে নৌকা চলত। ভাবলাম কোন এলাকায় কেমন বন্যা হয়েছে তা দেখে আসি। শুনেছিলাম মুন্সীগঞ্জ শহরে নাকি একহাঁটু জল। অনেক কষ্ট করে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে একটি ছোট লঞ্চে মুন্সীগঞ্জ পৌঁছলাম। সত্যি সত্যি মুন্সীগঞ্জে জল আর জল। বেশ কিছুক্ষণ জলের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করলাম। একটু একটু বৃষ্টি পড়ছে। এমন সময় দেখলাম এক ভভদ্রলোক ছাতি মাথায় দিয়ে আমাকে অনুসরণ করছেন। কিছুক্ষণ পর আমার কাছে এসে বললেন, আমি বরিশালের লোক। মুন্সীগঞ্জ থানার ওসি। আপনাকে আমি চিনি। এখনই ঢাকায় ফিরে যান। কেন এসেছেন এখানে গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে?

আমার আর বন্যা দেখা হলো না। আমি মুন্সীগঞ্জ গিয়েছি তাই কেউ জানে না। তাড়াতাড়ি ফিরতে হলো বৃষ্টির মধ্যেই। ঢাকা ফিরে বুঝলাম বিপদ কাটেনি। সব সময় বাইরে যাওয়া যাবে না। বাইরে না যেতে পারলে টাকা পাব কোথায়। দেশের কোনো লোকই আমার প্রকৃত পরিচয় জানে না। মাসে যা আয় করি তাতে মেসের খাওয়া এবং থাকার ভাড়া হয় না। হোটেল রেস্টুরেন্টে খাওয়ার অভ্যাস নেই। আর পয়সাও নেই।

এই হোটেল রেস্টুরেন্টে খাওয়া নিয়েও কম বিপদে পড়িনি জীবনে। ছোটবেলায় শুনেছি খারাপ ছেলেরা হোটেল রেস্টুরেন্টে খায় এবং আজ্ঞা মারে। ভালো ছেলেদের এটা করণীয় নয়। সুতরাং বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে পড়বার প্রথম যুগে আমি কোনোদিন কোনো রেস্টুরেন্টে ঢুকিনি। আড্ডা মারিনি। চা খাইনি। কলকাতায় গিয়ে এই রেস্টুরেন্টে খাওয়া নিয়েই একবার বিপত্তি ঘটল।

আমার সঙ্গে আমার এক বোনের বর। কলকাতায় শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কে গিয়েছি। তিনি বললেন, এখানে রেস্টুরেন্টে ভালো চপকাটলেট আছে। চল রেস্টুরেন্টে খাই। আমি বললাম, ভালো ছেলেরা রেস্টুরেন্টে যায় না বা খায় না। তিনি আমাকে জোর করে নিয়ে গেলেন। একটি চপ কিনে দিলেন। আমার চোখে তখন জল। চোখের জলে আমার খাওয়া হলো না। শুধু ভাবলাম আমি খারাপ হয়ে গেলাম।

সেই আমি ঢাকায় ১৯৫৪ সালে রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে বিপদে পড়লাম। শৈশবে শুনেছি ভালো ছেলেরা নেশা করে না। বিড়ি, সিগারেট, চা খায় না। তাই রেস্টুরেন্টে আমাকে নিয়ে গেলে অন্যের বিপদ হয়। মোজাম্মেল দা বলতেন, নির্মল চা খাও। তুমি চা খেলে সস্তায় হয়। চায়ের বদলে অন্য কিছু খেতে অনেক পয়সা প্রয়োজন। ১৯৪৮ সালে নতুন করে ভালো ছেলে হবার জন্যে চা ছেড়ে দিলাম। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় এসে সস্তায় কিছু খাবার জন্যে আবার চা খাওয়া শুরু করতে হলো।

প্রকৃতপক্ষে নিয়মিত চা খাওয়া ভুলে গিয়েছিলাম। একান্ত দু-একজন পরিচিত ব্যতীত কারো পয়সায় খাওয়া আমার ধাতে সইত না। সেই দিক থেকে নির্ভর ছিলেন একমাত্র নিতাই গাঙ্গুলী। তিনিও অল্প মাইনের চাকুরে।

সেই নিতাই গাঙ্গুলীই দুপুরের দিকে আমার মেসে এলেন। তখন শুয়ে শুয়ে ভাবছি কী করা যায়। আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির শেষ তারিখ। নিতাই বাবু বললেন, ব্যাপার কী অনেক দিন দেখা নেই। বললাম, টাকা নেই। আরো ৫০ টাকা প্রয়োজন। কালকে ভর্তির শেষ তারিখ। বললেন, শুয়ে থাকলে কি সমস্যার সমাধান হবে? আমি বললাম, আমি চার্লস ডিকেনস-এর ডেভিড কপারফিল্ডের মিকবার চরিত্র পছন্দ করি। এই বই আমাদের পাঠ্য ছিল ম্যাট্রিকে। মিকবার প্রায় সব সময়ই কপর্দকশূন্য থাকত। বলত একটা কিছু ঘটবেই (সামথিং উইল টার্ন আপ)। আমি সেই একটা কিছু ঘটবার আদর্শে বিশ্বাসী। তাই শুয়ে আছি। করার কিছু নেই।

নিতাই বাবু হাসলেন। পরের দিন ৫০ টাকা পাঠিয়ে দিলেন। আমি ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএসসির শেষ পর্বে। মাস খানেক পরে ঢাকা হলে (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) সিট পেয়ে চলে গেলাম। আমার জীবনের আর এক অধ্যায় শুরু হলো।

হলে থেকেও আমার আত্মগোপনের একটি রাস্তা জুটে গেল। আস্তানা ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড। আমাদের দলের সদস্য। পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন দলের প্রথম সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান তখন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের আইএসসি’র দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ১৯৫৪ সালের জুলাই মাসে ধরা পড়ল তার যক্ষ্মা হয়েছে। তখন ঢাকায় কোনো টিবি হাসপাতাল ছিল না। মিটফোর্ড হাসপাতালের প্রধান ভবনের চারতলায় টিবি রোগীদের জন্যে একটি ওয়ার্ড ছিল। সিদ্দিকুর রহমান ভর্তি হলেন ওই ওয়ার্ডে। ৫৬ জন রোগী আর আমি। দিনের পর দিন মাসের পর মাস ওই হাসপাতালে গিয়েছি। ডাক্তার লুঙ্কর রহমান আমাকে ধমকাতেন। বলতেন, আপনি মারা পড়বেন। তখন দেখতাম রোগীদের নিকটতম আত্মীয়েরা নাকে রুমাল দিয়ে ওয়ার্ডে ঢুকত। তারা বুঝত না যে এতে রোগীরা মনে করে আমরা পরিত্যক্ত। নিঃসহায়। আমরা বড় একাকী। আমি কোনোদিন নাকে রুমাল দিয়ে যাইনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দক্ষিণের জানালা খুলে বসে বসে গল্প করেছি। দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা। ওপারে জিনজিরা দেখেছি। দেখেছি বুড়িগঙ্গায় নৌকা চলা আর স্টিমারের হুল্লোড়। আমি নিশ্চিত ছিলাম এই ওয়ার্ডে পুলিশের লোক আমাকে খুঁজতে আসবে না।

তাও রাজনীতি এড়ানো গেল না। ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের। ১৯৫৪ সালে চারদিকে বন্যা। ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ সিদ্ধান্ত রিলিফ দিতে হবে। টাকা, কাপড় তুলতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের গ্রুপ ভাগ করে পাঠাতে হবে বিভিন্ন এলাকায়। এ নিয়ে একদিন বৈঠক বসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠন ডাকসুর অফিসে। বৈঠকে একজন ছাত্রী বলল, তারা কিছুতেই ছেলেদের সঙ্গে যাবে না। তাকে আমি চিনি না। মনে হলো সে নেত্ৰীস্তরের হবে। এ নিয়ে সকলেই উত্তেজিত, বিতর্কে লিপ্ত। এক সময় হঠাৎ আমি বলে ফেললাম, তোমরা কেউ গেলে ভোরবেলা হলে গিয়ে কানধরে নিয়ে আসা হবে।

সকলে একেবারে নীরব হয়ে গেল। বিতর্কের ছাত্রীটি আমার কাছে এল। বলল, ঠিক আছে আমরা যাব। তবে আপনি ভোরবেলা এসে গ্রুপ ভাগ করে দেবেন। আপনাদের বিগলিত ব্যানার্জি মার্কা ছাত্রদের সঙ্গে আমরা যাব না। শুনলাম ছাত্রীটির নাম কামরুন্নাহার লায়লী। বাড়ি পিরোজপুরে। ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী। পরদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাইনি। শুনেছি ছাত্রছাত্রী সকলে এসেছে। গ্রুপ ভাগ করে চলে গেছে রিলিফের জন্যে টাকা আদায় করতে। ক’দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলের কিছু ছাত্রীর বরাত দিয়ে আমার কাছে একটি চিঠি এল। সে চিঠিতে লেখা ছিল, আমরা শুনেছি আপনি আত্মগোপন করে আছেন। অর্থকষ্টে আছেন। আমরা আপনাকে অর্থ সাহায্য করতে চাই। কী করা যায়, আমাদের জানাবেন।

আমি জানতাম এদের মধ্যে অধিকাংশ ছাত্র ইউনিয়ন অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক। হয়তো এরা আমাকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বলে ধারণা করেছে এবং সাহায্য করতে চাচ্ছে। আর সেকালে একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল–সকল বিপ্লবীরাই কমিউনিস্ট পার্টি করে। সকল মার্কসবাদী, লেনিনবাদীরাই কমিউনিস্ট। পূর্ব বাংলায় যে এককালে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল (আরএসপি)সহ অনেক বামপন্থী দল ছিল তা অনেকেরই জানা ছিল না। দেশ বিভাগের পর অনেক নির্যাতন সহ্য করেও কমিউনিস্ট পার্টি নিজস্ব কাঠামো ধরে রাখতে পারলেও অন্যান্য বামপন্থী দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল চরমভাবে। আমি ভাবলাম নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলার প্রয়োজন। অন্যের পরিচয়ে সাহায্য নেয়া অন্যায়। তাই তাদের জানালাম, আমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নই। আমি বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল করি। সুতরাং আপনারা নিজের দলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। আর এ মুহূর্তে আমার সাহায্যের প্রয়োজন নেই।

এবার প্রশ্ন উঠল আরএসপি কী? কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাদের তফাৎ কী। এ দুটি দল কি এক হতে পারে না? একদিন কামরুন্নাহার লাইলী এসে বললো, আপনাদের দু’দলের বসতে হবে। আমরা চাই আপনারা এক হোন। আমি বললাম, তুমি ব্যবস্থা করো। আমরা রাজি। লাইলীর সঙ্গে তখন আমার সম্পর্ক অনেক সহজ এবং তখন এই একটি ছাত্রীই দেখেছি আপাদমস্তক রাজনীতিক। বৈঠকের তারিখ নির্ধারিত হলো ২৯ আগস্ট। কামরুন্নাহার লাইলী জানাল, কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আলোচনার কথা তাকে জানিয়েছে তাদের খালেদা আপা। তাদের কাছে যতদূর শুনেছি খালেদা আপার প্রকৃত নাম যুঁইফুল বসু। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা কমরেড খোকা রায়ের স্ত্রী। এই ভদ্রমহিলার নাম আমি বরিশালে শুনেছি। তাঁর বাড়িও এককালে বরিশাল ছিল। তাঁর এক বোন আমাদের দল আরএসপি করত। সেই খালেদা আপাই নাকি কমিউনিস্ট পার্টির মেয়েদের নেতৃত্ব দিতেন। যদিও আজ পর্যন্ত কোনোদিন এ খবর আমি যাচাই করিনি। আমার এ ব্যাপারে একেবারেই আগ্রহ কম। ছদ্ম নামটি খালেদার পরিবর্তে রাবেয়া হতে পারে।

কিন্তু আমাদের পক্ষে কে আলোচনা করবে? আলোচনার বিষয়বস্তু কী হবে কামরুন্নাহার লাইলী বারবার এ প্রশ্ন নিয়ে এল। আমাদের সিদ্ধান্ত হলো আমরা কেউ নই, সিদ্দিকুর রহমানই আলোচনা করবেন। তিনি হাসপাতালে থাকলেও অনেকটা সেরে উঠেছেন। তাই কোথাও গেলে পুলিশ তাকে তেমন খোঁজ খবর নেবে না।

এখন তা হলে আলোচনার বিষয়বস্তু কী হবে? আমি লাইলীকে বললাম, সিদ্দিক দু’টি প্রশ্নের জবাব চাইবে। এ দু’টি প্রশ্ন হচ্ছে আরএসপি-কমিউনিস্ট পার্টির পার্থক্যের মূলকথা। (১) আরএসপি মনে করে লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিন সঠিক পথ গ্রহণ করেননি। লেনিন কখনো বলেননি যে একটি দেশে সমাজতন্ত্রের পূর্ণ বিজয় সম্ভব। কিন্তু স্ট্যালিন ক্ষমতায় এসে লেনিনের এ নীতি পরিহার করেন। অন্যদেশে বিপ্লবের দায়িত্ব না নিয়ে পৃথিবীর কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির লেজুড়ে পরিণত করেন। এক্ষেত্রে ট্রটস্কির নীতির সঙ্গে আরএসপি’র তফাৎ আছে। ট্রটস্কি বিশ্বাস করতেন ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে বিপ্লব না হলে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের পূর্ণ বিজয়ও সম্ভব নয়। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রের বিনির্মাণ শুরু করাও সম্ভব নয়–আরএসপি’র মত হচ্ছে–অন্যদেশে বিপ্লব না করেও সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব।

(২) আরএসপি মনে করে স্ট্যালিনের এই নীতি ত্রিশের দশকে ডিমিট্রিভ তত্ত্বের জন্ম দেয়। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক প্রস্তাবে বলা হয় যে, পৃথিবী তিনভাগে বিভক্ত–১. সোভিয়েত সমাজবাদ, ২. গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদ, ৩. ফ্যাসিবাদ। ডিমিট্ৰিভের পপুলার ফ্রন্ট তত্ত্বে বলা হয়েছিল ফ্যাসিবাদকে রুখতে গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ঐক্য করা যায়। আরএসপি মনে করে ওই গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ঐক্যের নীতিই পরবর্তীকালে সহ-অবস্থানের নীতির জন্ম দেয়। ১৯৪৩ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের চাপে তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে দেয়।

আমাদের এ দু’টি প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া গেলে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সমঝোতা কঠিন নয়। তবুও কামরুন্নাহার লাইলী চাপ দিতে থাকল আমাদের আলোচনায় বসাবার জন্যে। সর্বশেষ আমি বললাম, লাইলী এত ভেবে লাভ নেই। তোদর পার্টি আমাদের সঙ্গে বসবে না। বললেন, নির্মল সেন আত্মগোপন করলেও ৯২(ক) ধারায় আদলে তাদের নেতা নিতাই গাঙ্গুলী তার কার্যে বহাল তবিয়তে আছে। এরা সরকারের দালাল। তাদের সঙ্গে বসা যাবে না না। ঝুঁকি আছে। কারণ আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি অন্য কাউকে কমিউনিস্ট মনে করে না। মনে করে মার্কিন দালাল। ওরা ছাড়া সাচ্চা কমিউনিস্ট বা প্রগতিশীল আর কেউ নেই। লাইলী আমাদের কথা বিশ্বাস করল না।

এরপর ক’দিন লাইলীর দেখা নেই। লাইলী এল ২৭ আগস্ট। সিদ্দিককে বলে গেল কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বৈঠক হবে না। কারণ তারা মনে করে আরএসপি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল। ওদের সঙ্গে বসলে ঝুঁকি আছে। সিদ্দিক মাস তিনেক হাসপাতালে থাকার পর বরিশাল চলে গেল। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বৈঠকের পর্ব এভাবে শেষ হলো। দেশের রাজনীতিতে তখন ভিন্ন। নাটক।

রাজনীতিতে সকলের দৃষ্টি তখন করাচির দিকে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রী হবেন-এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে কিন্তু তিনি দেশে নেই বলে মন্ত্রিসভায় যোগ দেননি। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগের সিদ্ধান্ত, শহীদ সোহরাওয়াদীকে ঠেকাতে হবে। তিনি মন্ত্রিসভায় যোগ দিলে আর রাজনীতি করা যাবে না।

ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে শহীদ সোহরাওয়ার্দী করাচি ফিরলেন। করাচিতে আওয়ামী লীগের আট নেতার বৈঠক। সকলেরই মত প্রধানমন্ত্রীত্ব পেলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভায় গেলে আপত্তি নেই। কিন্তু শহীদ সাহেব ভিন্ন কথা বললেন। তিনি বললেন, গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ তাকে ছ’টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রতিশ্রুতি ছ’টি হচ্ছে–(১) শহীদ সাহেব মন্ত্রিসভায় ঢুকবার তিনদিন (মতান্তরে তিন সপ্তাহ) পরে তাকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে। (২) আওয়ামী লীগের আরো দু’জন মন্ত্রী নেয়া হবে। (৩) সংবিধান রচনার ভার শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ওপর দেয়া হবে। (৪) ছ’মাসের মধ্যে সংবিধান রচনা শেষ করে একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করা হবে। (৫) এক বছরের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন হবে। (৬) নতুন সংসদে সংবিধান সংশোধনের পূর্ণ অধিকার থাকবে।

আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ রাজি হলেন না। তাদের যুক্তি-কদিন পরেই যখন শহীদ সাহেব প্রধানমন্ত্রী হবেন, তখন আর আগে যোগ দিয়ে লাভ কি? কদিন পরে শহীদ সাহেব প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই মন্ত্রিসভা গঠন করুক। কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দী কোনো কিছুই মানলেন না। তিনি বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেন ২০ ডিসেম্বর। পরবর্তী সময়ে দেখা গেলো, কেন্দ্রীয় সরকার শহীদ সাহেবকে দেয়া কোনো প্রতিশ্রুতিই মানছে না। একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব মুক্তি পেলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের নতুন কোনো মন্ত্রী নেয়া হলো না। উপরন্তু কৃষক শ্রমিক পার্টির নেতা আবু হোসেন সরকারকে মন্ত্রিসভার সদস্য করা হলো।

আমরা তখন সকল ঘটনার নীরব সাক্ষী। দেশে ৯২(ক) ধারা অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট শাসন। সভা মিছিল সমাবেশ করা মুশকিল। অপরদিকে নেতৃত্বের কোন্দল। প্রগতিশীল শক্তি বিভ্রান্ত। ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সমর্থক হলেও যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাক তা কেউ চায়নি। অথচ মনে হচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীরা যুক্তফ্রন্ট ভাঙতে চাচ্ছে। সেই ষড়যন্ত্রে জেনে হোক না জেনে হোক শরিক হয়েছেন সকল দলের নেতবৃন্দ। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যুক্তফ্রন্টের নেতা শেরেবাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনা হয়।

কিন্তু অনাস্থা প্রস্তাব এনে আওয়ামী লীগ লাভবান হলো না। কারণ পরিষদের সকলেই ছিল যুক্তফ্রন্টের মনোনীত সদস্য। কেউ আওয়ামী লীগ বা কেএসপির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়নি। তাই আওয়ামী লীগের এক শ্রেণির সদস্য যুক্তি দেখাল–আমরা আওয়ামী লীগের নির্দেশ মানতে রাজি নই। নির্দেশ হতে হবে যুক্তফ্রন্টের। ফলে হক সাহেবের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে আওয়ামী লীগ জিততে পারল না। আমরা শুধু দেখলাম। ১৯৫৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তফ্রন্টের নতুন নেতা নির্বাচিত হলো। ভোট নিয়ে অনেক হইচই হলো। বিকেলে টেলিগ্রাম বের হলো। উভয় পক্ষই দাবি করলেন তারাই জিতেছেন। আওয়ামী লীগ গ্রুপের নেতা হলেন আতাউর রহমান খান। কৃষক শ্রমিকের পার্টি কেএসপি দাবি করল অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়নি। তাই তাঁরা জিতেছেন।

আমাদের মনে হলো, জিতেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদে পাকিস্তানের সামরিক বেসামরিক আমলার নেতৃত্বে মুসলিম লীগের রাজনীতি। পূর্ব পাকিস্তানে যুজফ্রন্টের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তারা আতঙ্কিত হয়েছিল। এবার তাদের শঙ্কা দূর হলো। আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত হলো পূর্ব পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট। এগিয়ে এলো ২১ ফেব্রুয়ারি।

২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস। ১৯৫৪ সালের সাড়ম্বরে পালিত হয়েছিল। এবার ১৯৫৫ সালে দেশে কোনো মন্ত্রিসভা নেই। মিছিল করা যাবে না। কোথাও গোপন বৈঠকও করা যাচ্ছে না। হলে হলে পুলিশের এজেন্ট। তাদের মধ্যে অনেকে এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। তখনকার লালবাগ থানার ওসির বাড়ি ছিল বরিশালে। তার এক ছোট ভাই একদিন আমার কাছে ঢাকা হলে এল। বললো, সরে যান। ভাইজান পাঠিয়েছে, আজ আপনাদের গ্রেফতার করতে পারে। আপনি গ্রেফতার হলে বিপদ হবে। আপনার বিরুদ্ধে খুনের মামলা আছে।

প্রকৃতপক্ষে আমার পক্ষে গ্রেফতার হওয়া সম্ভব ছিল না। হল থেকে দূরে চলে গেলাম। তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ আউয়াল। সভাপতি আব্দুল মমিন তালুকদার। যতদূর মনে আছে ২০ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে মিছিল করার চেষ্টা করায় ২১ ছাত্রীসহ অনেক ছাত্র গ্রেফতার হয়ে গেল। পরের দিন ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপিত হলো-পুলিশ প্রহরায়। গ্রেফতারের মধ্যে ছিল এমএ আউয়ালসহ অনেক ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা। মাসখানেক পরে জেলখানা থেকে সকলে ছাড়া পেল।

জেলখানা থেকে বের হয়ে আউয়াল আমাকে জানাল-ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ঐক্যের প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। ছাত্র ইউনিয়ন নেতারা জেলে আলাপ-আলোচনায় সম্মত হয়েছে ছাত্রলীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হতে। ছাত্র ইউনিয়ন আগামীতে তাঁদের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডাকবে। কাউন্সিল ডাকবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এ ব্যাপারে মধ্যস্থতা করেছে ছাত্রলীগের ফরিদপুর জেলা কমিটির নেতা লিয়াকত হোসেন। লিয়াকত তখন জেলে ছিল। অনেকে বলল, লিয়াকত বিশ্বাসের দিক থেকে কমিউনিস্ট পার্টির কাছাকাছি এবং বরাবরই সে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ঐক্যের কথা বলেছে। ঐক্যের প্রশ্নটি খুব জোরালো ছিল দেশের ছাত্র রাজনীতিতে। ছাত্রলীগের প্রতীক ছিল-শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি। ছাত্র ইউনিয়নের ঐক্য, শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি। প্রশ্ন হতো, ছাত্রলীগের প্রতীক ঐক্য নয় কেন? তাহলে কি ছাত্রলীগ ঐক্য চায় না?

একবার রাজশাহীতে ছাত্রসভায় এ ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলাম আমি ও মমিন তালুকদার। ছাত্রসভায় প্রশ্ন উঠল–আপনাদের প্রতীক ঐক্য নয় কেনো? আপনারা কি ঐক্য চান না? ছাত্রলীগের সভাপতি তালুকদার সাহেব জবাব দিলেন–যে শিক্ষা ঐক্য শেখায় না সে শিক্ষা আদৌ শিক্ষাই নয়। তাই আমাদের সংগঠনের প্রতাঁকের মধ্যে ঐক্য নেই।

মনে হলো, ছাত্ররা খুশি হলো না। আমি বললাম, দেখুন আমি জবাব দিতে পারি। আপনারা রাগ করবেন না তো? কারণ যারা প্রশ্ন করছেন তাঁরা সকলে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য। আমার কথা কিন্তু ছাত্র ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যাবে।

আমার কথা হচ্ছে-ছাত্রলীগ গঠিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। তখন ঐ প্রতিষ্ঠানেরই সদস্য ছিলেন পরবর্তীকালে ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতারা। তাই সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সংগঠন করায় ঐক্যের প্রশ্ন ওঠেনি। পরবর্তীকালে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পর একটি অসাম্প্রদায়িক ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠনের লক্ষ্যে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়। এ ব্যাপারে আমি পূর্বেই লিখেছি যে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠন ছিল তৎকালীন আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগের ফসল। দেশ বিভাগের কালে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল ছাত্র ফেডারেশন [এই ছাত্র ফেডারেশন ছিল নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশন অনুমোদিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের অঙ্গ]। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এ নামে পূর্ব পাকিস্তানে কাজ করায় অসুবিধা দেখা দেয়। এ নামের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি জড়িত এবং প্রতিষ্ঠান ভারতের একটি সংগঠনের অঙ্গ। ফলে পাকিস্তান ছাত্র সংগঠনের নাম পাল্টাবার প্রশ্ন দেখা দেয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত নতুন কোনো সংগঠন। করা সম্ভব ছিল না। তাই কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর নিজস্ব ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগ পর্যন্ত এরা কেউ ছাত্র ফেডারেশনের নামে, কেউ আবার ছাত্রলীগের নামে কাজ করত। এমনকি ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর ও ময়মনসিংহে ছাত্র ইউনিয়ন কোনো কমিটি গঠন করেনি। ঐ দুটি জেলায় তারা ছাত্রলীগের মাধ্যমে কাজ করত। এ দু’টি জেলা কমিটি মুখ্যত কমিউনিস্ট পার্টির পরামর্শেই চলত।

একই কাজ আরএসপি করেছিল ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর। তাদের প্রভাবিত ছাত্র প্রতিষ্ঠান নিখিল বঙ্গ ছাত্র কংগ্রেসের নাম পাল্টে রাখা হয় পাকিস্তান ছাত্র এসোসিয়েশন–পিএসএ।

এ পটভূমি মনে রেখেই আমি রাজশাহীতে ছাত্রসভায় বলেছিলাম, ছাত্র ইউনিয়ন গঠন করে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে প্রথম ভাঙন সৃষ্টি করা হয়। এবং যারা এই ভাঙন সৃষ্টি করেছিল তারাই প্রতীক নিয়েছিল ঐক্য। ছাত্রলীগ যখন গঠন হয়েছিল ১৯৪৮ সালে, তখন ঐক্যের প্রশ্ন ওঠেনি। যারা ভেঙেছে তারাই ঐক্যের কথা বেশি বলছে। কারণ ১৯৫২ সালে শুধুমাত্র অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে নতুন সংগঠন গঠনের প্রয়োজন ছিল না। কারণ ১৯৫১ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দ তুলে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ফলে কাউন্সিলে ঐ প্রস্তাব পাস করা সম্ভব হয়নি। ১৯৫৩ সালে এ সিদ্ধান্ত কাউন্সিলে চূড়ান্ত হয়। সকলেই জানত এ ঘটনা ঘটবে–যেমন ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দ তুলে দেয়া হলেও এর আগে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা মোহাম্মদ তোয়াহার মনোনয়ন নিতে অসুবিধা হয়নি। এমনটি ১৯৫৪ সালে অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রী দলের টিকেটে নির্বাচিত হয়ে বরিশালের মহিউদ্দীন আহমেদ এবং আব্দুল করিম পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন। সুতরাং এ নিয়ে কথা না বাড়ানো অনেক ভালো। সবকিছু হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্তের ফলে। তাই আমি আউয়ালকে বলেছিলাম, ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্রলীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হবে না। কমিউনিস্ট পার্টি এ সিদ্ধান্ত মানতে পারে না।

একটি নির্দিষ্ট রাজনীতির এই ধারাবাহিকতায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রফ্রন্ট হিসেবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলেছিলাম-ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্রলীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হবে না। হতে পারে না। এর মধ্যে একদিন আউয়াল জানাল, নির্মল ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভা হয়েছে-সাতজন সভায় উপস্থিত ছিল। সর্বসম্মত হয়েছে তারা ছাত্রলীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হবার। আমার তেমন বিশ্বাস হলো না।

কিছুদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে দেখি মহা হইচই। ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়েছে। সে বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রলীগকে ঐক্যের জন্যে আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ইউনাইটেড স্টুডেন্টস লীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হবার। ছাত্র ইউনিয়নের বিজ্ঞপ্তি পড়লে মনে হবে, তারাই ঐক্যের অগ্রদূত। তারাই এগিয়ে এসে আহ্বান জানিয়েছে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের। তাদেরই ত্যাগের ফল ঐক্যবদ্ধ অর্থাৎ ইউনাইটেড স্টুডেন্টস লীগ নামে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের আহ্বান।

সারা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। অনেকেই জানত যে, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের ঐক্যবদ্ধ হবার প্রচেষ্টা চলছে। হঠাৎ এ ধরনের প্রচারপত্র আমাদের সবাইকে হতভম্ব করে দিল। তবে আমার কাছে ছাত্র ইউনিয়নের এই প্রস্তাব সঠিক বলে মনে হলো না। দীর্ঘদিন পরে একটি সংগঠনের অপর একটি সংগঠনে অবলুপ্ত হওয়া সহজ নয়। এতে মতানৈক্য হতেই পারে। শুনলাম ছাত্র ইউনিয়নের কমিটির পূর্ণাঙ্গ সভায় এবং কাউন্সিলে ছাত্রলীগের নামে ঐক্যবদ্ধ হবার প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। তারা নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইউনাইটেড স্টুডেন্টস লীগ নামে ঐক্যবদ্ধ হবার। তাদের কাছে এটাই স্বাভাবিক ছিল।

কিন্তু বিপদে পড়লাম আমরা। ব্যক্তিগতভাবে আমিও খুশি হয়েছিলাম ঐক্যবদ্ধ হবার প্রস্তাবে। কারণ ছাত্রলীগ থেকে আওয়ামী লীগের জন্ম। তাই এ দু’টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক ছিল। ঢাকার বাইরে দু’টি সংগঠনকে পৃথক করে দেখা হতো না। আওয়ামী লীগের সকল সভায়ই ছাত্রলীগ নেতারা বক্তৃতা দিতেন। সাধারণ সম্পাদক এমএ আউয়াল ও আমি এর বিপক্ষে ছিলাম। আমাদের বক্তব্য ছিল–ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের লেজুড় নয়। তাই আওয়ামী লীগের সভায় ছাত্রলীগ নেতাদের বক্তৃতা দিতে হলে আগে লিখিতভাবে ছাত্রলীগকে অনুরোধ করতে হবে। ছাত্রলীগ অনুমোদন করলেই একমাত্র ছাত্রলীগ নেতারা আওয়ামী লীগের মঞ্চে বক্তৃতা দিতে পারবে। আমাদের মনোভাবের ফলে এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, আমি একদিন পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভার মঞ্চ থেকে বক্তৃতাদানকারী একজন ছাত্রলীগ নেতাকে নামিয়ে দিয়েছিলাম। এ ঘটনা অনেকেই ভালো চোখে দেখত না। অপর দিকে তখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন। ছাত্রলীগের ওপর আওয়ামী লীগের প্রভাব বাড়ছে। ব্যক্তিগতভাবে এমএ আউয়াল শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রিয়পাত্র। ফলে পরবর্তীকালে ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। আমি ভেবেছিলাম ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হলে হয়তো ছাত্রলীগকে নিরপেক্ষ রাখা যাবে। কিন্তু ছাত্র ইউনিয়নের এই বিজ্ঞপ্তির পর মনে হলো সবকিছু ভেস্তে যাচ্ছে।

তবুও একটা বৈঠকের ব্যবস্থা করা হলো। বৈঠক বসবে ১৫৭ নম্বর। নবাবপুর রোডে। ছাত্রলীগ অফিসে। জন্মলগ্নে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রথম অফিস ছিল ৯০ মোগলটুলীতে। মুসলিম শব্দটি তুলে দেবার প্রশ্নে ছাত্রলীগ দু’ভাগ হয়ে যায়। যারা মুসলিম শব্দ তুলে দেবার পক্ষে ছিল তাদের অফিস স্থানান্তরিত হয়ে ১৫৭ নম্বর নবাবপুর রোডে। এই দফতরটিও আমরা বিনা ভাড়ায় পেয়েছিলাম। ছাত্রলীগের জন্মের প্রথম দিকে এক বন্ধু এই দফতরটি আমাদের দিয়েছিলেন। আমি ছাত্রলীগে থাকা পর্যন্ত এ ভবনেই ছাত্রলীগের অফিস ছিল।

সেদিন ঐক্য সম্পর্কিত বৈঠক বসার কথা ছিল বেলা ৯টায়। ৯টার মধ্যেই ছাত্র ইউনিয়নের নেতা এসএ বারী এটি, আনোয়ারুল আজিম এবং আব্দুস সাত্তারসহ অনেকেই আমাদের অফিসে উপস্থিত হলেন। ছাত্রলীগের সম্পাদক এমএ আউয়াল পৌঁছালেন বেলা দশটায়। তাকে আমি বিলম্বে আসার কারণ জিজ্ঞেস করতেই এমএ আউয়াল ক্ষিপ্ত হলেন। তিনি বললেন-ছাত্র ইউনিয়নের এই নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। তারা কথা দিয়ে কথা রাখেনি। আমাদের না জানিয়ে তারা তাদের নিজস্ব প্রস্তাব বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করেছেন। সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে ধারণা হয়েছে আমরাই ঐক্য চাই না। এ পরিস্থিতিতে তাদের সাথে নতুন করে ঐক্য নিয়ে আলোচনা করার কোনো অবকাশ নেই। তারা জানে, ইউনাইটেড স্টুডেন্টস লীগ গঠনের দাবি আমরা কিছুতেই মেনে নেব না। সাধারণ ছাত্ররা এ ঐক্য প্রক্রিয়ার পূর্ব ইতিহাস জানে না। তাই মনে করবে ছাত্র ঐক্য না হবার জন্যে আমরাই দায়ী।

আমার মনে হলো দুই সংগঠনের ঐক্যের আর কোনো সম্ভাবনা নেই। আউয়ালের মন্তব্যগুলো অপমানজনক। ভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিজেদের দফতরে আমন্ত্রণ জানিয়ে এ ধরনের কথাবার্তা আদৌ রুচিকর নয়। তবুও আমি শেষ চেষ্টা করলাম। আমি একটি নতুন প্রস্তাব দিলাম ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দের কাছে। আমি বললাম, আমাদের সভাপতি আব্দুল মোমিন তালুকদার, সম্পাদক এমএ আউয়াল এবং দফতর সম্পাদক আমি নির্মল সেন একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর করে দিচ্ছি। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে-দুটি সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ হবার পর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগই নাম থাকবে। তবে ঐ সংগঠনের কর্মকর্তা হিসেবে যাদের নামই আপনারা লিখে দেবেন আমরা তিনজন সে কমিটি মেনে নেব। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা সাদা কাগজে স্বাক্ষর করে দিচ্ছি।

আমি এ প্রস্তাব সম্পর্কে পূর্বে কারো সঙ্গে আলাপ করিনি। তবে জানতাম সভাপতি ও সম্পাদক আমার প্রস্তাব পছন্দ না করলেও প্রকাশ্যে কিছু বলবেন না। আমার প্রস্তাব শুনে দু’জনেই গম্ভীর হয়ে গেলেন। ছাত্র ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ বললেন, ইউনাইটেড স্টুডেন্টস লীগ ব্যতীত কোনো প্রস্তাবে একমত হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

আমাদের বৈঠক ভেঙে গেল। আমার ধারণা ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনয়নের ঐক্যের এটাই বোধ হয় ছিল সর্বশেষ প্রচেষ্টা। আমি ছাত্র রাজনীতি থাকাকালীন ভিন্ন কোনো প্রচেষ্টা হয়েছে বলে শুনিনি। এ প্রচেষ্টা ভেঙে যাবার পর আমারও ছাত্রলীগ থেকে যাবার দিন ঘনিয়ে এল। বিপদ বাড়ল আমার এবং আমাদের। আমরা যারা কোনোদিনই চাইনি যে ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের লেজুড় হোক তাদের অসুবিধা হলো। শহীদ সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রীয় সরকারের আইনমন্ত্রী। সুতরাং কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো নীতির বিরু কোনো কিছু করা বা বলা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে গেল। অপরদিকে কৃষক শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকারও কেন্দ্রীয় সরকারের সকল নীতির প্রতিবাদ করতে থাকলেন। আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুখ চেয়ে। কিছুই বলতে পারল না।

এ মুহূর্তে নতুন সঙ্কট দেখা দিল গণপরিষদ নিয়ে। ইতোপূর্বে ২৩ অক্টোবর গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ গণপরিষদ ভেঙে দিয়েছিলেন। ৭ নভেম্বর সিন্ধুর চিফ কোর্ট গণপরিষদ বিলুপ্তির আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে। গভর্নর জেনারেল এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। ২১ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট সিন্ধু চিফ কোর্টের রায় বাতিল করেন এবং অবিলম্বে সংবিধান প্রণয়নের জন্যে একটি সংস্থা গঠনের আদেশ দেন। সেই আদেশ অনুযায়ী গভর্নর জেনারেল ১৫ এপ্রিল আর একটি আদেশ জারি করেন। এই আদেশের নাম হচ্ছে সংবিধান কনভেনশন আদেশ। এই আদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল আরো কিছু শর্ত। এই শর্তে বলা হয় পাকিস্তান দুই ইউনিটে বিভক্ত হবে। পূর্ব পাকিস্তান হবে একটি ইউনিট এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে গঠিত হবে আর একটি ইউনিট। পশ্চিম পাকিস্তানের ৪ প্রদেশের স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। সর্বক্ষেত্রে সংখ্যা সাম্যনীতি প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ পূর্ব বাংলার জনসংখ্যা শতকরা ৫৬ ভাগ হলেও তারা পশ্চিম পাকিস্তানের মতোই ৫০ ভাগ সুযোগ-সুবিধা পাবে। এর নাম ছিল সংখ্যাসাম্য। এই প্রস্তাবনার ব্যাপারে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন আপোষহীন। তিনি হুমকি দিলেন যে, প্রয়োজনবোধে সামরিক বিধানের মাধ্যমে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করা হবে।

এই নির্দেশের বিরুদ্ধে সমগ্র পূর্ব বাংলার সকল মহল বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। কৃষক শ্রমিক পার্টি, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলো। তারা সংবিধান কনভেনশন বয়কটের প্রস্তাব গ্রহণ করল। এ সময় ইস্কান্দার মীর্জা ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় এলেন। ইস্কান্দার মীর্জা কৃষক শ্রমিক পার্টিকে তাদের প্রস্তাবনা বোঝাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কৃষক শ্রমিক পার্টি মীর্জার প্রস্তাবে রাজি হলো না। শুধুমাত্র শহীদ সোহরাওয়াদী আওয়ামী লীগকে সম্মত করালেন। আওয়ামী লীগ কনভেনশনে যোগ দিতে সম্মত হলো। সারাদেশে তখন আওয়ামী লীগ সমালোচিত। আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানী লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পথে কলকাতাতে অবস্থান করছেন। তিনি কলকাতা থেকে বিবৃতি দিয়ে সংবিধান কনভেনশনের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলেন। কিছুটা হলেও আওয়ামী লীগের মুখ রক্ষা হলো।

কিন্তু সবকিছু পাল্টে গেল মওলানা ভাসানীর ঢাকা আগমনের পর। ২৫ এপ্রিল মওলানা সাহেবকে নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় পৌঁছালেন। সেই একটি রাতের কথা আমার এখনও মনে আছে। আমি তখন ঢাকা হলে থাকি। গভীর রাতে আমাদের হলে এলেন ছাত্রলীগের এককালীন সভাপতি বর্তমান শিক্ষক নেতা কামরুজ্জামান সাহেব। বলা হলো–ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের মওলানা ভাসানী ডেকেছেন। আমাদের যেতে হবে পুরান ঢাকার কারকুন বাড়ি লেনে জনাব ইয়ার মোহাম্মদের বাড়ি। গভীর রাতে আমরা সেখানে হাজির হলাম। আমাদের মধ্যে ছিল আব্দুল মোমিন তালুকদার, এমএ আউয়াল, নূরুল ইসলাম, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আব্দুল জলিল এবং ছাত্র ইউনিয়নের এসএ বারী, আব্দুস সাত্তার প্রমুখ। আমরা জানতাম না কেন আমাদের ডাকা হয়েছে। শুধু এটুকু জানতাম যে সংবিধান সম্মেলনে যোগদান নিয়ে আওয়ামী লীগে বিরোধ চলছে। ওই সম্মেলনে যোগ দেয়া নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তখনও হয়নি। আমাদের ধারণা ছিল শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে না।

আমরা নিজেদের মধ্যে এই আলোচনাই করছিলাম। ইতোমধ্যে মওলানা সাহেব আমাদের কক্ষে এসে ঢুকলেন। কুশল বিনিময় করলেন। বললেন, গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ এবং প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী তাঁকে কথা দিয়েছেন যে, আওয়ামী লীগের তিনটি শর্ত তারা মেনে নেবে। শর্ত তিনটি হচ্ছে–(১) প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, (২) রাজবন্দিদের মুক্তি, (৩) যুক্ত নির্বাচন। মওলানা সাহেব বললেন, এই তিন শর্তে তিনি সংবিধান সম্মেলনে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরপর তিনি আমাদের মতামত জিজ্ঞেস করলেন।

আমরা ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গেলাম। আদৌ ভাবতে পারিনি যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা মওলানা সাহেবের কথা মেনে নিতে পারলাম না। বললাম, এই ঝানু আমলাদের বিশ্বাস করবার কোনো কারণ নেই। এছাড়া আমরা সংখ্যাসাম্য মানব কেন? এমনিতেই সব ব্যাপারে বাঙালিরা বঞ্চিত হচ্ছে। এবার সাংবিধানিকভাবে আমাদের বঞ্চিত করার চেষ্টা হচ্ছে। আমরা গভর্নর জেনারেল বা প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করি না। মওলানা সাহেব আমাদের সঙ্গে তেমন বিতর্কে যোগ দিলেন না।

আমাদের এই কথাবার্তার মধ্যে তার চিরপরিচিত ভাঙা বাংলায় কথা বলতে বলতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী আমাদের কক্ষে ঢুকলেন। তিনি আমাদের লক্ষ্য করে বললেন-তোমাদের কথা আমি বুঝি। কিন্তু কাউকে তো বিশ্বাস করতে হবে। সকলকে অবিশ্বাস করলে তো চলবে না। গভর্নর জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী আমাদের পাকা কথা দিয়েছেন। বলেছেন, আমাদের শর্ত মেনে নেবেন।

এবার বিস্ফোরণ ঘটল–আবদুল গাফফার চৌধুরী বললো–শহীদ সাহেব, আপনার সব কথাই আমরা বুঝি। তবে আমাদের ধারণা হচ্ছে আপনাদের দিয়ে সব কাজ করিয়ে নিয়ে একদিন আপনাকেই মন্ত্রিসভা থেকে কিক আউট করবে। গাফফারের কথার তীব্র প্রতিক্রিয়া হলো। মোমিন তালুকদার ও নুরুল ইসলাম ক্ষিপ্ত হলো। আমাদের আলোচনা তেমন আর এগুল না। এক সময় মওলানা সাহেব ও শহীদ সাহেব আমাদের কক্ষ থেকে। চলে গেলেন। রাত তখন শেষ। আমরা ইয়ার মোহাম্মদের বাড়ি দোতলা থেকে নিচতলায় নামলাম। দেখলাম কতিপয় তরুণ কিছু হ্যান্ডবিল বিতরণ করছে। তারা আওয়ামী লীগের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবং তারা আওয়ামী লীগেরই লোক।

ভোরের আকাশের দিকে তাকিয়ে নবাবপুর রোড দিয়ে হাঁটছিলাম। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। যতদূর প্রতিবাদ করার কথা ছিল তা করতে পারলাম না। আওয়ামী লীগ এ প্রস্তাব মেনে নিল। প্রতিরোধ করার মতো কোনো শক্তিই দেশে থাকল না। কারণ শেরেবাংলার কৃষক শ্রমিক পার্টি শেষ পর্যন্ত আপোষ করবেই। মৃত মুসলিম লীগ ও অর্ধমৃত কংগ্রেস কাগজপত্রে বয়কট করলেও রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না। আর ৯২(ক) ধারার যাতাকলে বামপন্থীরা বিপর্যস্ত। কেউ জেলে। কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

২৭ ফেব্রুয়ারি শুনলাম অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে এ প্রস্তাব পাস করাতে হয়েছে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদে। তিনি লিখিতভাবে মুচলেকা দিয়েছেন… আমি এতদ্বারা ঘোষণা করছি যে, ২২ দফা ও যুক্ত নির্বাচন প্রস্তাবাবলি কনিস্টিটিউশন কনভেনশনে গ্রহণ করবার লক্ষ্যে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব–যতদূর পর্যন্ত প্রস্তাবগুলো সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যর্থ হলে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করব।

কিন্তু এত করেও আওয়ামী লীগ হালে পানি পেল না। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সদস্যরা মনোনয়নপত্র দাখিল করল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান, তোফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) ও আলি আহমাদসহ আওয়ামী লীগ সদস্যরা মনোনয়নপত্র দাখিল করলেন। অন্য কোনো দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল না। ধারণা সৃষ্টি হলো যে, পূর্ববাংলা থেকে আওয়ামী লীগের শতকরা একশ জন সদস্যই নির্বাচিত হবে। কিন্তু গভর্নর জেনারেলের তখন অনেক খেলা বাকি। তিনি মনোনয়নের তারিখ পিছিয়ে দিলেন। ইতোমধ্যে ফেডারেল কোর্ট গভর্নর জেনারেলের সংবিধান কনভেনশনের নির্দেশ বাতিল করে দিল। ফেডারেল কোর্টের পক্ষ থেকে বলা হলো–সংবিধান কনভেনশন নয়, সংবিধান প্রণয়নের জন্যে গণপরিষদ গঠন করতে হবে। এই গণপরিষদ গঠনের জন্যে ২৮ মে নতুন নির্দেশ জারি করা হলো। গভর্নর জেনারেল নির্দেশ দিলেন ১৯৫৫ সালে ২৮ মে গণপরিষদ গঠনের। এই গণপরিষদের দুই ইউনিটের ভিত্তিতে গণপরিষদ গঠিত হবে। গণপরিষদে সংখ্যাসাম্য থাকবে। পূর্ববাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের ৪০ জন করে সদস্য থাকবেন। নির্বাচনে পূর্ববাংলার ৩১ জন মুসলমান ও ৯ জন অমুসলমান নির্বাচিত হলো। কারণ তখন স্বতন্ত্র নির্বাচন পদ্ধতি চালু ছিল। ৩১ জন মুসলিম সদস্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেল ১২; কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্র দলের কোয়ালিশন পেলো ১৬, মুসলিম লীগ একটি ও স্বতন্ত্র দুটি। মুসলিম লীগ সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী। শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন কেন্দ্রের আইনমন্ত্রী। গণপরিষদে তার সমর্থক সংখ্যা ১২। এর পরেও তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চাচ্ছেন। এ আশ্বাসই নাকি গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে দিয়েছেন।

কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি কাজে এল না। প্রতিশ্রুতি ভাঙার পালা শুরু হলো পূর্ববাংলার নতুন সরকার গঠন নিয়ে। পূর্ববাংলার প্রাদেশিক পরিষদের আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। কিন্তু তাদের ক্ষমতা দেয়া হলো না। অসুস্থতার জন্যে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ সুইজারল্যান্ড গিয়েছিলেন। আইনমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দীও সুইজারল্যান্ড গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে কিছু সমস্যা নিয়ে আলাপের জন্যে। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী এ সুযোগ নিলেন। ১৯৫৫ সালের ৬ জুন পূর্ব বাংলা থেকে ৯২(ক) ধারা তুলে নেয়া হলো। আওয়ামী লীগ ভেবেছিল মন্ত্রিসভা গঠনের জন্যে তাদেরই ডাকা হবে। কিন্তু ডাকা হলো যুক্তফ্রন্টের নামে কৃষক শ্রমিক পার্টি, গণতন্ত্রী দল ও নেজামে ইসলামকে। পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী হলেন আবু হোসেন সরকার। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন।

শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যের অজুহাতে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ৫ আগস্ট পদত্যাগ করলেন। এবার ভারপ্রাপ্ত গভর্নর জেনারেল হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্কান্দার মীর্জা। প্রধানমন্ত্রী হলেন মুসলিম লীগের চৌধুরী মোহাম্মদ আলী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন একে ফজলুল হক, যাকে মাত্র কিছুদিন আগে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করে পূর্ববাংলায় ৯২(ক) ধারা জারি করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী পুনরায় রাষ্ট্রদূত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিরোধী দলের নেতা হলেন। তিনি মন্ত্রিসভার সদস্যপদ ত্যাগ করলেন। এবার শুরু হলো পাকিস্তানের রাজনীতিতে আরেক অধ্যায়।

সারা পাকিস্তানজুড়ে তখন এক অভাবনীয় রাজনীতির খেলা চলছিল। কোনো আদর্শ বা নীতির বালাই ছিল না। ব্যক্তিস্বার্থ ছিল মূলকথা এবং এটাই ছিল স্বাভাবিক। পাকিস্তানের জন্ম কোনো স্থির বিশ্বাসের পরিণতি নয়। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের দাবি সফল হবে এ কথা অনেক মুসলিম লীগ নেতা বিশ্বাস করতেন না। ভারত বিভাগের সময় পাকিস্তানের দু’অংশে রাজনৈতিক চিত্র ছিল পরস্পরবিরোধী। সিন্ধু, পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ (বেলুচিস্তান) ছিল জোতদার ও জমিদারের দেশ। একশ্রেণির পাঞ্জাবিরা সেনাবাহিনীতে ছিল। সিন্ধু এবং পাঞ্জাবের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সর্বকালে জোতদার ও জমিদারদের হাতে ছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এককালে তীব্র ছিল পাঞ্জাবে। কিন্তু সে নেতৃত্ব ছিল শিখ ও হিন্দুদের হাতে। সিন্ধু ও পাঞ্জাবের অধিকাংশ মুসলিম নেতৃত্ব ছিল জমিদার ও ব্রিটিশ সরকারের অনুগত। রাজনৈতিক আদর্শের বালাই ছিল না। দলত্যাগ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। সিন্ধু ও পাঞ্জাবে এককলে কিছুটা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় তা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়।

অপরদিকে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের চিত্র ছিল একান্তই ভিন্ন। এরা ধর্মবিশ্বাসে গোড়া মুসলমান। কোনোদিনই ব্রিটিশ সরকারের কাছে মাথা নত করেনি। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে এরা কংগ্রেসের সহযোগিতা ও সহানুভূতি পেয়েছে। এই প্রদেশে কংগ্রেস শক্তিশালী ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় এই প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা ছিল। নেতৃত্বে ছিলেন সীমান্ত গান্ধী আব্দুল গাফফার খান। সীমান্ত প্রদেশের কংগ্রেস দেশবিভাগের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। এ প্রদেশটি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার শিকার। এদের সান্তনা দেবার জন্যে ব্রিটিশ ও কংগ্রেস সীমান্ত প্রদেশে গণভোটের ব্যবস্থা করে। বলা হয়েছিল, সীমান্ত প্রদেশের অধিবাসীরা ভারত কিংবা পাকিস্তানে যাবে। গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। সীমান্তের কংগ্রেস এ গণভোট পাত্তা দেয়নি। গণভোটে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ পাকিস্তানে যোগ দেয়।

উপরের চিত্র থেকে পরিষ্কার যে, পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো একক রাজনীতি বা একক নেতৃত্ব ছিল না। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে কোনো প্রদেশেই মুসলিম লীগ সরকার ছিল না। ফলে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মুসলিম লীগ তেমন শক্তিশালী ছিল না পশ্চিম পাকিস্তানে। তবুও জিন্নাহ-লিয়াকত আলী জীবিত থাকা পর্যন্ত রাজনীতিতে মুসলিম লীগের কিছুটা নেতৃত্ব ছিল। তাদের মৃত্যুর পর সে নেতৃত্ব ভেঙে পড়ে।

তখন আর একটি ঘটনা ঘটে পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে। দেশ বিভাগের ফলে এ দুটি প্রদেশ থেকে লাখ লাখ হিন্দু ও শিখ ভারতে চলে যায়। ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে আসে লাখ লাখ মুসলমান। একই সঙ্গে ভারত থেকে পাকিস্তানে আসে ব্রিটিশ আমলের আমলারা, বম্বে ও গুজরাটের ব্যবসায়ীরা। নিজস্ব ব্যক্তি ও শ্রেণিস্বার্থেই এরা পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ শুরু করে। পাকিস্তানের রাজনীতিকদের দুর্বলতার জন্যে এবং অনিবার্য কারণে পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে সামরিক বাহিনী। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিকাংশ কর্মকর্তা জন্মসূত্রে পাঞ্জাবি এবং জমিদার শ্রেণির। দেশ বিভাগের মুহূর্তে কাশ্মীর নিয়ে সংঘর্ষসহ বিভিন্ন কারণে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তারাও রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

এর আবার একটি ভিন্ন কারণও ছিল। এ কারণটি হচ্ছে পাকিস্তানে প্রভাব বিস্তার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশের প্রতিযোগিতা। পাকিস্তান ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। পাকিস্তানে ব্রিটিশ সহায়-সম্পত্তি ছিল। পাকিস্তান ব্রিটিশ কমনওয়েলথে ছিল। অর্থনৈতিক দিক থেকেও ছিল ব্রিটিশ মুদ্রা অর্থাৎ স্টার্লিং ব্লকে।

অথচ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী পরিবেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তান হয়ে ওঠে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান সীমান্তে বৃহৎ দু’টি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। পাকিস্তানের পাশে ভারত জোটনিরপেক্ষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় সোভিয়েতপন্থী।

এ পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছিল পাকিস্তানকে কজায় নিতে। এক সময় সাহায্যের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর একটি অংশের ব্যয়ভার বহন করত। পেশোয়ারের বিমানঘাঁটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দিত। ফলে ব্রিটিশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব তুঙ্গে ওঠে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে অনেকের ধারণা এই দ্বন্দ্বেই রাওয়ালপিণ্ডির ষড়যন্ত্রের নামে সামরিক বাহিনীর একশ্রেণির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করা হয়। আইয়ুব খান অনেককে ডিঙিয়ে প্রধান সেনাপতি হন। সোভিয়েত ইউনিয়নের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। পরবর্তীকালে রাওয়ালপিণ্ডির এক জনসভায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। সে হত্যা মামলার কোনো তদন্ত হয়নি। লিয়াকত আলীকে হত্যা করেছিল সীমান্ত প্রদেশের হাজরা জেলার সৈয়দ আকবর। সে তখন অন্তরীণ ছিল। তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন খাজা শাহাবুদ্দিন। খাজা শাহাবুদ্দিনের বড়ো ভাই খাজা নাজিমুদ্দিন তখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল। লিয়াকত আলী নিহত হবার পর খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। গভর্নর জেনারেল হন আমলাদের প্রখ্যাত নেতা গোলাম মোহাম্মদ। এই গোলাম মোহাম্মদই পরবর্তীকালে খাজা নাজিমুদ্দিনকে পদচ্যুত করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে ডেকে এনে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়। অর্থাৎ পাকিস্তানের রাজনীতিতে তখন পিছু হটছে ব্রিটিশ। এগিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানই ছিল তৎকালীন রাজনীতির কেন্দ্র।

তবে পূর্ববাংলার চিত্র ছিল একান্তই ভিন্ন। পাকিস্তান সৃষ্টির সময় পূর্ববাংলার মুসলিম লীগের নেতৃত্বে সীমিত সংখ্যক জোতদার-জমিদার থাকলেও অধিকাংশ নেতা ছিলেন উকিল ও মোক্তার। মুসলিম লীগের মূল শক্তি ছিল ছাত্র সংগঠন। এ ছাত্র সংগঠনের তরুণরা অনেক সময়ই নেতাদের পাত্তা দিত না। তাদের কাছে পাকিস্তান ছিল হিন্দুদের প্রতিযোগিতামুক্ত ব্যবসা-বাণিজ্য চাকরি পাবার একটি স্বপ্নের আবাস। তারা পাকিস্তানকে দেখেছে নিত্যদিনের জীবনের দেনাপাওনার হিসেবের ভিত্তিতে। তাই তারা প্রথম থেকেই ছিল অধিকার সচেতন। তাদের কাছে রাষ্ট্র ভাষার আন্দোলন প্রথমদিকে কোনো আবেগ বা ঐতিহ্যের আন্দোলন ছিল না। ছিল অধিকার রক্ষার আন্দোলন। তাদের কাছে ইংরেজির সঙ্গে উর্দুর কোনো পার্থক্য ছিল না। ইংরেজি তাদের পদে পদে পরাভূত করেছে হিন্দুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়। তাই তারা বিদেশি ভাষা উর্দু মেনে নিয়ে আর একবার পরাভূত হতে চায়নি।

এছাড়া পূর্ববাংলায় ছিল অবিভক্ত বাংলার বামপন্থী আন্দোলনের রেশ এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহ্য। এ বাঙালি তরুণরাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ১৯৪৬ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তির দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। এ ঐতিহ্যের তারতম্যের জন্যেই পূর্ববাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক চিত্রের তারতম্য ছিল। এখানে লক্ষণীয় যে, এ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বামপন্থী তরুণরাই ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে একই মঞ্চে দাঁড় করিয়েছিল। পরাজিত করেছিল মুসলিম লীগকে। পূর্ববাংলা পরিণত হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের ঘাঁটিতে। পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। পূর্ববাংলার রাজনীতিতে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ত্রাতা হিসেবেই আবির্ভূত হন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাসাম্য ও এক ইউনিট মেনে নেয়। আর পশ্চিমাদের এ সুযোগ দিয়ে বিনিময়ে ৮০ জনের পার্লামেন্টে মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হবার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে আদর্শের কোনো বালাই ছিল না।

একই প্রতিযোগিতায় নামেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক কৃষক শ্রমিক পার্টি নিয়ে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন পাকিস্তান মন্ত্রিসভায়। দুটি দলই সব আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়েছিল ব্যক্তিস্বার্থে। তখন সঠিক বুর্জোয়া আদর্শ ধারণ করেও কোনো রাজনৈতিক দল দেশে আত্মপ্রকাশ করেনি। ব্যক্তি বড় হয়ে উঠেছিল–দলটির মূল চরিত্র ছিল সুবিধাবাদী।

এই আওয়ামী লীগ ও কেএসপি তখন পূর্ববাংলার রাজনীতির নেতৃত্বে। দেনা-পাওনাই ছিল তাদের মূল চালিকা শক্তি। এই দেনাপাওনার জন্যেই দু’টি দল বারবার পূর্ববাংলার স্বার্থ বিক্রি করেছে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃত্বের কাছে।

অপরদিকে মুসলিম লীগ না থাকলেও তার ভাবাদর্শ নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে তখন সামরিক বেসামরিক আমলার নেতৃত্বে গড়ে উঠছিল একটি পুঁজিপতি শ্রেণি। রাজনীতির মঞ্চ থেকে একের পর এক বিদায় নিচ্ছিল রাজনীতিকরা। পশ্চিম পাকিস্তানে পুঁজির বিকাশ হচ্ছিল আমলাদের নেতৃত্বে। রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আসছিল আমলারা। এরা ছিল একান্তই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর। এরা তাই নিজস্ব প্রয়োজনে পূর্ববাংলায় নিজস্ব মিত্র খুঁজছিল এবং রাজনীতির দিক থেকে তাদের পছন্দ ছিল মার্কিন ঘেঁষা শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

৯২(ক) ধারা আমলে পাকিস্তান কমিউনিস্ট বিরোধী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থার (সাউথ ইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশন) এবং বাগদাদ চুক্তি স্বাক্ষর করে। পূর্ববাংলার নেতাদের মধ্যে একমাত্র শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই দুই কমিউনিস্ট বিরোধী জোটের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মূল রাজনৈতিক সংগঠন পূর্ববাংলার আওয়ামী মুসলিম লীগ এ চুক্তি সমর্থন করল না–তাই পশ্চিম পাকিস্তানের আমলা নেতৃত্বের সঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কোনো সমঝোতাই স্থায়ী হচ্ছিল না। পার্লামেন্টে ১২ সদস্যের নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী ব্যক্তিগতভাবে যতই পশ্চিম ঘেঁষা হোক না কেনো, রাজনীতির বাস্তব ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব তেমন ছিল না।

তবুও তকালীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাকিস্তানের উভয় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য শেষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁকে রাজনীতি থেকে অপসারণ না করে সামরিক-বেসামরিক আমলাদের পক্ষে ক্ষমতায় আসা সম্ভব ছিল না। তাই একবার শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ক্ষমতায় এনে ছুঁড়ে ফেলে দেবার ষড়যন্ত্রেই শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে বারবার প্রধানমন্ত্রী হবার টোপ দেয়া হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আওয়ামী লীগকে সে সত্যটি অনুধাবন করতে হয়েছে পরবর্তীকালে।

১৯৫৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ অক্টোবর ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়। তবে এ প্রস্তাব গ্রহণও সহজ ছিল না। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঘণ্টার পর ঘন্টা এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যুক্তি দিতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান এ প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়ালে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পিছু হটতে হয়। ভোর ৪টায় এ প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৪৯ সালে জন্মের ৬ বছর পর ১৯৫৫ সালে এসে আওয়ামী মুসলিম লীগ আওয়ামী লীগে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবার পরেই যুক্ত নির্বাচনের প্রশ্ন গুরুত্ব লাভ করে। ব্রিটিশ আমলের মুসলিম লীগ দাবি করেছিল তারাই মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি। তাই তারা পৃথকভাবে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। অপরদিকে কংগ্রেস নিজেকে অসাম্প্রদায়িক ও সকল ভারতবাসীর প্রতিষ্ঠান বলে মনে করত। তাই তারা যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ও মুসলিম লীগের আঁতাতে স্বতন্ত্র নির্বাচন পদ্ধতি চালু হয় এবং একই সময় অনুন্নত বলে তফশিল সম্প্রদায়ের জন্যে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়। নির্বাচন সম্পর্কে এই উত্তরাধিকার নিয়ে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভারত ও পাকিস্তান নামে বিভক্ত হয়। তাই পাকিস্তান মুসলিম লীগের নীতিগতভাবেই যুক্ত নির্বাচন করার কোনো উপায় ছিল না। আওয়ামী মুসলিম লীগ মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়ার পরে এ দাবি নিয়ে সামনে এগিয়ে আসে।

এ যুক্ত নির্বাচন নিয়ে কিছু কিছু ঘটনা এখনও আমার মনে আছে। ১৯৫৬ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানে সংবিধান প্রণয়ন শুরু হয়। সংবিধান প্রণয়ন নিয়ে তমুল বিতর্কের সষ্টি হয় পূর্ব বাংলায়। বিশেষ করে এক ইউনিট ও সংখ্যা সাম্যের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলায় সভা সমাবেশ শুরু হয়। একের পর এক মিছিল হতে থাকে ঢাকায়। তখন আমি ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক। আমাদের দল বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল (আরএসপি) তখন নিষিদ্ধ। কমিউনিস্ট পার্টিও তখন নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। আমাদের তখন প্রকাশ্যে কাজ করার কোনো সুযোগ ছিল না। প্রকাশ্যে কাজ করার অর্থ হচ্ছে-নির্যাতন এবং কারাবরণ। আমাদের অনেক বন্ধুদেরই মত ছিল প্রয়োজন হলে ঝুঁকি নিয়েই প্রকাশ্যে কাজ করতে হবে। তখন পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আবু হোসেন সরকার। তাঁর আমলে রাজারবাগে পুলিশ ধর্মঘট হয়। এ ধর্মঘটের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে কতিপয় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। আমাদেরও আবার নতুন করে গা ঢাকার চেষ্টা করতে হয়। শুধু আমি থেকে গেলাম ছাত্রলীগ হিসেবে প্রকাশ্যে কাজ করার জন্যে। এ সময়ে সংবিধানে যুক্ত নির্বাচনের সংযোজনের দাবি উঠতে থাকে।

এ যুক্ত নির্বাচন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রলীগের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় বক্তা আমি এবং ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি আবদুল মোমিন তালুকদার। আমরা যুক্ত নির্বাচন সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস করাতে সমর্থ নই। তখন পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের অধিবেশনে চলছিল (বর্তমান জগন্নাথ হল মিলনায়তনে)। আমরা পরিষদ ভবনে গিয়ে আমাদের প্রস্তাব পেশ করি।

তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন বিচারপতি ইব্রাহিম। এ সময় একদিন আমি তাঁর বাসায় যাই। তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল বরিশাল থেকে। বরিশালে তিনি দীর্ঘদিন বিচারপতি হিসেবে ছিলেন। ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান সৃষ্টির পর তাঁর আদালতে প্রতিবারই আমরা সুবিচার পেয়েছি। তাই তাঁর সম্পর্কে একটি ভিন্ন ধারণা ছিল আমার ছাত্র জীবনের প্রারম্ভে। সেই বিচারপতি ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়, যুক্ত নির্বাচন প্রস্তাব পাস হবার পর। তিনি আমাকে বললেন-নির্মল, কাজটি তুই ঠিক করিসনি। আমি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিশ্বাস করি না। তুই নিশ্চয়ই লক্ষ করে থাকবি বরিশালে আমি কোনোদিন মুকুল ফৌজের অনুষ্ঠানে যাইনি। আমি মুসলিম লীগের রাজনীতি পছন্দ করি না। আমি শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে বিশ্বাস করি না। তিনি যুক্ত নির্বাচনের প্রস্তাব এনেছেন তোদের অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের বঞ্চিত করার জন্যে। স্বতন্ত্র নির্বাচন থাকলে সংখ্যালঘুরা রাজনীতির রদবদলের নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হবে। তারা যে দলকে সমর্থন করবে তারাই মন্ত্রিসভা গঠন করবে। যুক্ত নির্বাচন হলে সংখ্যালঘুরা তেমন নির্বাচিত হতে পারবে না। রাজনৈতিকভাবে তারা পরাজিত হয়ে যাবে। তোর এ প্রশ্নটি লক্ষ করা উচিত ছিল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী কোনো আদর্শের তাড়নায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি।

ঠিক একই কথা বলেছিলেন প্রয়াত রসরাজ মণ্ডল। তফশিল ফেডারেশনের নেতা রসরাজ মণ্ডল তখন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী। তার কাছে আমি ছাত্রলীগের আমতলার প্রস্তাবের অনুলিপি দিয়েছিলাম। তিনি প্রস্তাব হাতে নিয়ে বললেন, আপনি শেষ পর্যন্ত আমাদের সর্বনাশ করলেন। আপনাদের প্রস্তাবই হচ্ছে যুক্ত নির্বাচন সম্পর্কে ছাত্রদের প্রথম প্রস্তাব।

আমি সেদিন কোনো জবাব না দিয়ে চলে এসেছিলাম। কিন্তু আমার প্রিয় ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি ইব্রাহিমের কথার জবাব আমাকে দিতে হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, স্যার আপনার কথার জবাব আমি আজকে না। আপনার কথাই সত্য কিন্তু আমি একটি আদর্শে বিশ্বাস করে রাজনীতি করি। আমার আদর্শ সাম্প্রদায়িক গণ্ডি মানে না। আমি বিশ্বাস করি, যে কোনো জায়গা থেকেই হোক অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে। স্যার, আপনি অনেক কিছু জানলেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জ্বালা আপনার পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এ জ্বালা অনুধাবন করতে পারে পূর্ব বাংলার হিন্দু, পশ্চিম পাঞ্জাবের হিন্দু ও শিখ এবং সারা ভারতের মুসলমান। কেউই ইচ্ছে করে পূর্ব পুরুষের ভিটা ছেড়ে চলে যায় না। যায় অনেক চোখের জলে। সে ঘটনাই ঘটছে এ উপমহাদেশে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্যে। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাতিয়ার ছিল স্বতন্ত্র রাজনীতি পদ্ধতি। সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে হলে এ পদ্ধতির ইতি টানতেই হবে। সেদিন বিচারপতি ইব্রাহিম আমার কথা শুনে হেসেছিলেন। বললেন–তোর মতো বয়সে আদর্শবোধ থাকাই স্বাভাবিক। ঠিক আছে, তুই যা করছিস ভালোই করেছিস। কিন্তু আমি তোর সঙ্গে একমত নই।

সেদিন নির্বিবাদে স্যারের ভবন থেকে বের হয়েছিলাম। বিপদে পড়লাম গভীর রাতে একটি পত্রিকা অফিসে। পত্রিকাটির নাম সাপ্তাহিক যুগবাণী। সম্পাদক বহু বিতর্কিত চিত্তরঞ্জন সুতার। তিনি তখন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। আমি তখন ঐ পত্রিকার বিনা পয়সার কলাম লেখক। আমি উপসম্পাদকীয় লিখি। আমি সে রাতে যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে উপসম্পাদকীয় লিখেছিলাম, কী করে যেনো তার কাছে খবর পৌঁছেছিল। তিনি গভীর রাতে পত্রিকা অফিসে পৌঁছালেন। বললেন, এমনি করে ঢালাওভাবে যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে লেখা যাবে না। আমি বললাম, তাহলে আমি লিখব না। আজ থেকেই আপনার পত্রিকার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ। সেদিন দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের মধ্যে আলাপ হলো। তারপর আমি নতুন করে উপসম্পাদকীয় লিখলাম। আমার লেখায় নতুন করে একটু ঘুরিয়ে একটি বাক্যবিন্যাস করলাম। আমাকে লিখতে হলো–আমরা যুক্ত নির্বাচন চাই। তবে অনুন্নত সম্প্রদায়ের জন্যে কিছুদিনের জন্যে আসন সংরক্ষণ করা বাঞ্ছনীয়।

যদিও শেষ পর্যন্ত কোনো সুপারিশ কাজে আসেনি। পাকিস্তানের সংবিধানে একটি অদ্ভুত ধারা সংযোজিত হয়েছিল নির্বাচন সম্পর্কে। রাতভর বিতর্কের পর সিদ্ধান্ত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্যে যুক্ত নির্বাচন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্যে স্বতন্ত্র নির্বাচন। সেই সংবিধানের পূর্ব পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ আর পশ্চিম পাকিস্তান এখন পাকিস্তান। বাংলাদেশে এখন চালু আছে যুক্ত নির্বাচন পদ্ধতি। আর পাকিস্তানে এখনও চালু আছে স্বতন্ত্র নির্বাচন পদ্ধতি।

১৯৫৬ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের সংবিধান রচনা শুরু হলো। এবার সে সংবিধানের বিরুদ্ধে বিরোধীদলীয় নেতা হলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সংবিধান সম্পর্কে বিতর্কে শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাঁর ইতিহাস বিখ্যাত ভাষণ দিয়েছিলেন। সে যেনো আর এক সোহরাওয়ার্দী। যে সংবিধানের কাঠামো তিনিই প্রণয়ন করেছিলেন পূর্ববর্তী সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে, সেই সংবিধানের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়ালেন হিমালয়ের মতো। কিন্তু কাজে এল না।

পূর্ব বাংলায় তখন প্রতিদিন মিটিং এবং মিছিল। আমি তখন আজকের শহীদুল্লাহ হল তৎকালীন ঢাকা হলে থাকি। হরতালে আমার দায়িত্ব পড়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ভবন এবং চানখারপুল এলাকায়। হরতাল থাক বা না থাক প্রতিদিন হরতালের জন্যে টোকাইরা আমার রুমের সামনে ভোরবেলা ভিড় জমাত। আমি তখন ঢাকা হলের তিনতলার পশ্চিম দিকের একটি কক্ষে থাকতাম।

এ কক্ষটিতে থাকার একটা শর্ত ছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এ কক্ষে তালা লাগানো যাবে না। অর্থাৎ নকল তালা থাকবে। এ কক্ষে জানালার কপাট খুলে ঘুমাতে হবে। কোনো কিছু বন্ধ রাখা যাবে না। এ সিদ্ধান্তের একটা ভিন্ন প্রেক্ষিত ছিল। প্রেক্ষিত হচ্ছে তঙ্কালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ডা. এস এন মিত্রকে কেন্দ্র করে। ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কাছে গেলে তিনি তাদের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করতেন, কোন হলের ছাত্র? হলের নাম শুনে ওষুধ লিখতে শুরু করতেন। খুব বেশি হলে জিজ্ঞেস করতেন ঘুমাবার সময় দরোজা জানালা খোলা থাকে কিনা। যারা দরোজা জানালা খোলা রেখে ঘুমাত তাদের তিনি ভালো করে দেখতেন। অন্যথায় কথাই বলতেন না। তাই আমি ডা, মিত্রর কাছে গেলে প্রতিদিনই ঝগড়া হতো এবং এ পরিপ্রেক্ষিতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমাদের রুমে থাকতে হলে দরোজা-জানালা খুলে ঘুমাতে হবে। এভাবে ঘুমাতে অনেকেই রাজি হতো না। অনেকে অসুস্থ হয়ে যেত। আমাদের কক্ষ থেকে অন্যত্র চলে যেত। ওই কক্ষে আমরা যারা দীর্ঘদিন টিকেছিলাম তার মধ্যে ছিলেন জহিরুল ইসলাম, আহমদ হোসেন, মনমোহন রায় এবং হিমাংশুরঞ্জন দত্ত। পরের তিনজনের কেউ কেউ পরবর্তীকালে চাকরিতে যুগ্মসচিব এবং অতিরিক্ত সচিব স্তরে পৌঁছেছিলেন।

আমাদের এ কক্ষের সামনে প্রতি ভোরে টোকাই জমতো। হরতাল না থাকলে তারা বিরক্ত হতো। হরতালের দিন আমাদের সঙ্গে নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যেত। তবে তারা আমাকে বিশেষ পছন্দ করতো না। কারণ আমি ঢিল মারতে দিতাম না। গাড়িতে আগুন দিতে দিতাম না। এমনকি রিকশার দমও ছেড়ে দিতে দিতাম না। হরতালের দিন গাড়ি দেখলে টোকাইদের খুব আনন্দ হতো। সঙ্গে সঙ্গে ওরা ইট নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যেতো। আমাকে কিছুতেই সামনে যেতে দিতো না। এমনকি একটি হরতালের দিনে সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো হলের সামনে একটি গাড়ি দেখা দিল। টোকাইরা তখন গাড়ির আরোহীকে নামিয়ে ফেলেছে। সামনে এগিয়ে চিনলাম গাড়ির আরোহী ঢাকার ডিসি হায়দার সাহেব। হায়দার সাহেব অবাঙালি। আমি তাকে বললাম, আপনি একটু সামনে হেঁটে এগিয়ে যান। গাড়িটি আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি। তবে এমনি করে আজকে আপনার বের হওয়া ঠিক হয়নি। টোকাইরা বিক্ষুব্ধ হলো। তারা গাড়ি ছাড়তে কিছুতেই রাজি নয়। অনেক অনুনয় বিনয় করে গাড়ি ছাড়াতে হলো।

এ হরতাল নিয়ে আর একটি ভিন্ন ঘটনা ঘটল পরবর্তীকালে। সেদিন আমি টোকাইদের নিয়ে পুরোনো বেতার ভবনের দিকে এগিয়েছি। এমন সময় ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সের এক মানুষ আমার কাছে এগিয়ে এল। আমাকে বলল, চলুন হিন্দুদের দোকানগুলো পুড়িয়ে দেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? সে জবাব দিল, ১৯৫০ সালের দাঙ্গার সময় আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অথচ কারো বাড়ি আমি আগুন দেইনি বা লুটও করিনি। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে ৫ বছর আমাকে জেল খাটানো হয়েছে। মিথ্যা মামলায় যখন জেল খাটলাম তখন রায়ট করতে অসুবিধা কী? আমি বললাম, ঠিক আছে। পরে একদিন রায়ট করা যাবে। আজকে রায়টের হরতাল নয়। আজকে আমাদের দাবিদাওয়া আদায়ের হরতাল। পরে একদিন সবাই মিলে রায়ট করা যাবে। সে মানুষটি আমার কথা শুনল। আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকল। সন্ধ্যা পর্যন্ত হরতাল করল আমার সঙ্গে।

এ হরতাল আর বিক্ষোভের মধ্যে একদিন পাকিস্তান সংবিধান প্রণয়ন করা হলো। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভালো বক্তৃতা করলেন ঠিকই কিন্তু দাবি আদায় হলো না। প্রকৃতপক্ষে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ছাড়া কোনো দাবি আদায় করা গেল না। প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ঘোষণা করলেন, ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে ওই সংবিধান চালু করা হবে। উল্লেখ্য, ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরের মুসলিম লীগ অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। সে পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস পালন করা হতো। কিন্তু সংবিধান নিয়ে একমত হওয়া গেল না। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সংসদ থেকে বেরিয়ে আসলেন। সংবিধানে স্বাক্ষর করলেন না। তারা ২৩ মার্চ প্রজাতন্ত্র দিবসও পালন করলেন না। এ নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মতানৈক্য হলো। শহীদ সোহরাওয়ার্দী পরবর্তীকালে সংবিধানে সই করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারা সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি। ১৯৫৬ সালে সংবিধান প্রণয়নের পর পূর্ববাংলার নাম হলো পূর্ব পাকিস্তান।

পূর্ব পাকিস্তানে তখন প্রধানমন্ত্রী কৃষক শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকার। প্রদেশের গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। কেন্দ্রে মুসলিম লীগ ও কেএসপি। পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগ অথচ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় নেই। আবু হোসেন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রতিদিনই সভা মিছিল হরতাল হতে শুরু করল। অপরদিকে কোন্দল দেখা দিল কেএসপির কোয়ালিশন সরকারে। আওয়ামী লীগেও বিরোধ দেখা দিল বৈদেশিক নীতি নিয়ে। পাকিস্তানের সংবিধানে অর্থবছর পরিবর্তন করা হলো। নতুন অর্থবছর হলো জুলাই থেকে জুন। অথচ আবু হোসেন সরকার ভয় পাচ্ছিল প্রাদেশিক পরিষদ ডাকতে। বাজেট পাস করতে। কারণ ভয় ছিল পরাজয়ের। অপরদিকে আওয়ামী লীগ দাবি জানাচিছল প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন ডাকতে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার আবু হোসেন সরকারকে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার নির্দেশ দেয়। পরিবর্তে আবু হোসেন সরকার পদত্যাগ করেন ৩০ আগস্ট।

আবু হোসেন সরকার পদত্যাগ করায় দেশে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পূর্ব পাকিস্তানে তখন দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন চালের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিছিল হচ্ছে চালের দাবিতে। ৪ সেপ্টেম্বর এমন একটি মিছিল জিঞ্জিরা থেকে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে চকবাজার হয়ে নতুন ঢাকার দিকে আসছিল। পুলিশ এই মিছিলে গুলি করে। চার জন নিহত হয়। আওয়ামী লীগসহ সকল ছাত্র প্রতিষ্ঠান সারাদেশে এই হত্যার প্রতিবাদে হরতাল আহ্বান করে ৫ সেপ্টেম্বর।

৫ সেপ্টেম্বর আমার হরতালের দায়িত্ব পড়ে হাইকোর্ট এলাকায়। আমার সঙ্গে ছিলেন ফজলুল হক হলের ছাত্র আবদুর রহিম। যিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রধান তথ্য অফিসার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন।

আমাদের এলাকা ছিল হাইকোর্ট মোড় থেকে মেডিক্যাল কলেজের মোড় পর্যন্ত। সেদিন এই এলাকায় কতগুলো দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। ওইদিন প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন ছিল। আবু হোসেন সরকার পদত্যাগ করলেও গভর্নর ফজলুল হক তখনো কাউকে নতুন সরকার গঠন করতে বলেননি। তাই সেদিন পরিষদ অধিবেশন থাকায় অসংখ্য সদস্যকে তকালীন পরিষদ ভবন (জগন্নাথ হল) মিলনায়তনে যেতে হচ্ছিল আমাদের এলাকা হয়ে এবং প্রতিটি গাড়ি নিয়েই বিবাদ হচ্ছিল।

এক সময় দেখা গেল, সামরিক বাহিনীর পাহারায় কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস আসছেন। স্বাভাবিকভাবেই জনতা উত্তেজিত হয়ে উঠল। লতিফ বিশ্বাস কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী। আর ঢাকায় গুলি হয়েছে ভুখা মিছিলের ওপর। তাই জনতার বিক্ষুব্ধ হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। এ পরিস্থিতিতে আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের গাড়িবহর হাইকোর্টের কাছে এলে আমরা তাঁকে গাড়ি ছেড়ে দিতে বললাম। বললাম, আপনাকে পৌঁছে দেব পরিষদ ভবনে। তিনি আমাদের কথায় রাজি হলেন। হেঁটে চললেন আমাদের সঙ্গে।

কিন্তু আমরা রমনা গেটের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে মিছিল হিংস্র হয়ে উঠল। মিছিল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। ভাবলাম পরিষদ ভবন নয়, লতিফ বিশ্বাসকে বাঁচাতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীনিবাসে পৌঁছে দেব। কারণ তাঁকে নিরাপদে পরিষদ ভবন পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারব বলে মনে হচ্ছিলো না। ইতোমধ্যে কে যেন তার মুখে গোবর মাখিয়ে দিল।

রমনা গেটের উত্তরে মিছিলে গোলযোগ শুরু হলো। বাংলা একাডেমীতে মিছিল পৌঁছাতে পারল না। সিদ্ধান্ত নিলাম যে কোনো ভবনে তাঁকে ঢুকিয়ে দিতে হবে। বাংলা একাডেমীর দক্ষিণ পাশে আজকের পুষ্টি ভবনে তাঁকে ঢুকিয়ে দিলাম। কিন্তু জনতা তখন মারমুখি। আর সঙ্গী তখনকার ছাত্রলীগের সদস্য আজকের জাতীয় পার্টি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। তাঁকে বললাম, মোয়াজ্জেম একটা বক্তৃতা দিয়ে মিছিল ফিরিয়ে নাও।

সেদিন মোয়াজ্জেমের বক্তৃতা আজো আমার মনে আছে। মোয়াজ্জেম হোসেন বলল, ভাইসব মানুষ দেখে কারা পালায়?-কুকুর। আপনারা কি কুকুরের পিছু ছুটবেন? না, মিছিলে যাবেন আমাদের সঙ্গে?

মিছিল চলে এল আমাদের সঙ্গে। তখনো জানতাম না যে, এর চেয়েও বড়ো সমস্যা অপেক্ষা করছে রমনা গেটে। আবদুস সালাম খান এবং হাশেমুদ্দীন সাহেব তখন গাড়িতে যাচ্ছিলেন পরিষদ ভবনের দিকে। এ দু’জন এক সময় আওয়ামী লীগ করতেন। এরা আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভায় গিয়েছিলেন দল ছেড়ে। তাই এদের বিরুদ্ধে জনতার স্বাভাবিক আক্রোশ ছিল। রমনা গেটের মোড়ে এদের গাড়ি এলে আমি গাড়ি থামালাম। বললাম, নামুন। পৌঁছে দিচ্ছি পরিষদ ভবনে। গাড়িতে যেতে পারবেন না। তারা গাড়ি থেকে নামতেই মিছিল থেকে এক লোক গিয়ে তাদের মুখে গোবর মাখিয়ে দিল। কোনো মতে তাঁদের নিয়ে মেডিক্যাল কলেজের দিকে এগোলাম। কিছুটা পশ্চিমে গিয়ে তুলে দিলাম ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট ড. মযহারুল হকের বাসায়। কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করলাম ভিড় বাড়ছে। জনতা ক্ষিপ্ত হচ্ছে। ফজলুল হক হলের প্রভোস্টের বাসা বাঁচানো দায়। আমি একটি রিকশা নিয়ে পরিষদ ভবনের দিকে গেলাম। ভাবলাম মাওলানা সাহেব বা শেখ সাহেবকে ছাড়া এ জনতা ঠেকানো যাবে না। তাদের একজন প্রয়োজন। নইলে অঘটন ঘটে যেতে পারে।

৩. পরিষদ ভবনে পৌঁছে তোপের মুখে

পরিষদ ভবনে পৌঁছে তোপের মুখে পড়লাম যেন। সামনে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার। পাশে কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার আমাকে দেখে চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, পরিষদে আপনার বিরুদ্ধে মোসন আনব। আপনি আমাদের সদস্যদের পরিষদ ভবনে আসতে বাধা দিচ্ছেন। আমি শুধু লতিফ বিশ্বাসের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। প্রকৃত চিত্র হচ্ছে–আমি না থাকলে আজ লোকটি রাজপথে নির্ঘাত মারা পড়ত।

আমি প্রধানমন্ত্রীকে পাস কাটিয়ে গেলাম। পরিষদ ভবনে মওলানা ভাসানীকে পেলাম না। শেখ সাহেবকে বললাম। তিনি মিছিল নিয়ে আমার সঙ্গে এলেন। সেদিন দেখেছিলাম মিছিল নিয়ন্ত্রণের অটুট ক্ষমতা। তিনি আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের উত্তরের রাজপথে এসে জনতাকে ধমক দিলেন। বললেন, তোমাদের পরিষদ সদস্যদের আক্রমণ করতে কে বলেছে? কে বলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাড়িতে ঢিল মারতে? জনতা টু শব্দটি না করে আস্তে আস্তে সরে গেল। আর ইতোমধ্যে ড. মযহারুল হকের বাসা থেকে আমার কাছে একটি স্লিপ এলো৷ পি লিখেছেন হাশেম উদ্দীন আহমদ। তিনি লিখেছেন, তার কাপড়ের অবস্থা বেহাল। বাড়ি থেকে নতুন কাপড় না এলে পরিষদে যাওয়া সম্ভব হবে না। আমি স্লিপটি শেখ সাহেবের হাতে দিলাম। তিনি হেসে শ্লিপটি হাতে নিলেন। আমি জানতাম, এ মানুষটিই এ কাজটি করতে পারবেন এবং করবেন।

হরতালের পরে রাতে শুনলাম গভর্নর এ কে ফজলুল হক আবু হোসেন সরকারের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং আওয়ামী লীগকে মন্ত্রিসভা গঠন করতে বলেছেন। মনে হলো আমার ছাত্রলীগ ছাড়বার পালা এল। কারণ প্রদেশে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা। ছাত্রলীগের পক্ষে এই মন্ত্রিসভার বিরোধিতা করা সহজ হবে না। আর আমার পক্ষে আওয়ামী লীগকে অন্ধ সমর্থন দেওয়া সম্ভব হবে না।

সেই সময়টা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তখন আত্মীয়স্বজন কারো সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল না। ১৯৫৪ সালের পর আমার আর বাড়ি যাওয়া হয়নি। চিঠিপত্রও বন্ধ। আমার সঙ্গে কারো খবর রাখাও বিপজ্জনক। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি যে কত বিপজ্জনক তা তখন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তখন আমার সঙ্গে মতানৈক্য দেখা দিচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১২ সেপ্টেম্বর চৌধুরী মোহাম্মদ আলী পদত্যাগ করেন। ৮০ জনের পার্লামেন্টে মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হন। এ সময় তাঁর উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা হচ্ছে ৮ সেপ্টেম্বরে রাজবন্দি মুক্তি।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ওয়াদা ছিল। ওই ওয়াদায় বলা হয়েছিল জননিরাপত্তা আইন বাতিল করা হবে এবং রাজবন্দিদের মুক্তি দেয়া হবে। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান তাঁর মন্ত্রিসভার সকল সদস্য নিয়ে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে যান। ৫৯ জন রাজবন্দিকে মুক্তি দেন। ইতিহাসে এ ছিল একটি অনন্য ঘটনা। পৃথিবীর কোনো সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে জননিরাপত্তা আইন বাতিল হয়নি। এভাবে মুক্ত হয়নি কোনো দেশের রাজবন্দিরা। কেন্দ্রে তখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হননি।

প্রশ্ন উঠেছিল জননিরাপত্তা আইন না থাকলে দেশ চলবে কী করে? তখন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ। পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্ট বিরোধী সরকার। সুতরাং পাকিস্তানে কমিউনিস্টদের আটক করার জন্যে একটি আইন প্রয়োগ করা হবেই। পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানেরই অঙ্গ। সুতরাং কেন্দ্রীয় সরকার নতুন করে জননিরাপত্তা আইন জারি করলে পূর্ব পাকিস্তানেও তা প্রযোজ্য হবে। তবে জননিরাপত্তা আইন না থাকলে কী অবস্থার সৃষ্টি হয় পরবর্তীকালে সে নজির পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ সরকারই দেখিয়েছে। এই আওয়ামী লীগ সরকারই শেষ পর্যন্ত ৭ জন কমিউনিস্ট নেতাকে গ্রেফতার করেছিল চোরাচালানীর অভিযোগে। আওয়ামী লীগের এ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানো তখন সহজ ছিল না। ইত্তেফাকের পাতায় পাতায় তখন কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে ঝড় বইত। ইত্তেফাকের মালিক সম্পাদক মরহুম তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) তখন ইচ্ছামতো কমিউনিস্টদের গালি দিতেন।

এ সময় একটি ভিন্ন কারণে আমি মওলানা ভাসানীর কাছাকাছি আসি। একদিন সন্ধ্যা রাতে হলে ফিরে দেখি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও মোহাম্মদ তোয়াহা আমার জন্যে আমার পাশের কক্ষে অপেক্ষা করছেন। আমি খানিকটা বিস্মিত হলাম। তাঁরা বললেন, বিশেষ কারণে তারা আমার কাছে এসেছেন। কারণটি হচ্ছে মওলানা সাহেবের প্রথম পুত্র আবু নাসের খান ভাসানী অর্থাৎ বাবুকে পড়াতে হবে। বাবু প্রবেশিকা পরীক্ষার্থী। ছাত্র তেমন ভালো নয়। আমার উপায় ছিল না তাদের ফিরিয়ে দেবার। তবে বলেছিলাম আমি কিন্তু বিনা বেতনে পড়াব না এবং টাকা নিয়েই বাবুকে পড়াতাম। বাবু আমার কাছে এসেই পড়ত। বাবু দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল।

তখনও আমি ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক। তখন পিরোজপুর ও ভোলায় দুটি উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানী এ দুটি জেলায় সফর করবেন। আমি এককালে বরিশালের ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। আমাকে তার সফরসঙ্গী হতে হলো। এই সফরে গিয়ে আমি মওলানা ভাসানীর একটি বিশিষ্ট রূপের সন্ধান পেলাম। তার সঙ্গে আমার শুরু হলো বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক। আমরা একটি বিশেষ লঞ্চে করে বরিশাল যাত্রা করেছিলাম। যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্টেশনে লঞ্চটি থামতো। মওলানা সাহেব সব স্টেশনেই ভাষণ দিতেন। তার প্রথম স্টেশনের ভাষণকে কেন্দ্র করেই আমার সঙ্গে বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। তিনি তাঁর ভাষণে বললেন-”দুনিয়ার সকল সম্পদ শতকরা পাঁচ জনের হাতে জমা হইয়াছে। দুনিয়ায় শতকরা ৯৫ ভাগ মজলুম। ১৯৬০ সালের মধ্যে তামাম দুনিয়া হইতে সাম্রাজ্যবাদ নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবে। দেশে দেশে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা হইবে।…’

মওলানা সাহেবের ভাষণের পর লঞ্চ ছেড়ে দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মওলানা সাহেব, এ তথ্য আপনি কোথা থেকে পেলেন? এ তথ্য সঠিক নয়। ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৬০ সাল। মাত্র ৪ বছর। এ ৪ বছরের মধ্যে দুনিয়া থেকে সাম্রাজ্যবাদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। এ তথ্যটি আপনি বেভানের কাছ থেকে পেয়েছেন। বেভান ব্রিটিশ শ্রমিক দলের বামপন্থী অংশের নেতা। শুনেছিলাম মওলানা সাহেব লন্ডনে থাকাকালীন বেভানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। বেভানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে পাকিস্তানের জন্ম এবং কাশ্মীর নিয়ে। আমার ধারণা হয়েছিল মওলানা সাহেব হয়তো তার কাছে এমন একটা কিছু শুনেছেন।

মওলানা সাহেব আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। এমনিতেই তিনি আমার আচরণে খুশি নন। আমি তাঁকে হুজুর বলে সম্বোধন করি না। এটি তিনি লক্ষ করেছেন।

তবে মওলানা সাহেবের জবাবের জন্যে আমাকে অপেক্ষা করতে হলো না। লঞ্চ আর একটি স্টেশনে পৌঁছাল। সেই স্টেশনেও মওলানা সাহেবকে ভাষণ দিতে হলো। শ্রোতা অধিকাংশ মুসল্লি। মওলানা সাহেব এবার আর সাম্রাজ্যবাদ শব্দটি উল্লেখ করলেন না। তিনি কোরান থেকে দুটি সুরার উদ্ধৃতি দিলেন। খলিফা হারুন-অর রশিদের শাসন আমলের কথা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, ইসলামের বিধান হচ্ছে দুনিয়ার সকল মানুষ দুনিয়ার সকল সম্পদের অংশীদার। ইসলাম সাম্যের ধর্ম। ইসলাম হচ্ছে অসাম্যের বিরুদ্ধে জেহাদ।

এমনি করে ভোলার বিভিন্ন জনসভায় তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন। উপস্থিত জনসভায় তিনি ভাষণ দিলেন। উপস্থিত জনতার মনমেজাজ পরিচ্ছদ লক্ষ রেখেই তাঁকে বক্তৃতা করতে দেখলাম। কোথাও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের কথা বললেন। কোথাও বললেন ইসলামের সাম্যের কথা। আরো লক্ষ করলাম, সব সভায় তিনি একক বক্তা হতে চান। তারপরে কেউ বক্তৃতা দিতে পারে না। তার দীর্ঘ ভাষণের পর তিনি জিজ্ঞেস করেন–আদৌ কোনো বক্তা আছে কিনা। নিজে নিজেই বলেন, আর কোনো বক্তা নেই। কাজেই প্রস্তাব পাঠ শুরু করেন। চোখের সামনে কোনো কাগজ ছাড়াই তিনি স্কুল, কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, সড়ক-সেতুগুলো দাবি করেন এবং এক সময় বলেন, এখানেই শেষ।

আমার জীবনে এ ধরনের সমাবেশের অভিজ্ঞতা আদৌ ছিল না। কখনো লক্ষ করিনি নেতাদের এ ধরনের বৈশ্যতা। কেউ যেন মওলানা সাহেবের সামনে কথা বলতে পারে না। তিনি হঠাৎ সবাইকে ধমক দেন। কারো যুক্তি বেশিক্ষণ শুনতে চান না। নিজেই শুরু এবং শেষ করেন। তাঁর সঙ্গে বৈঠক করতে গেলে হতে হয় নির্বাক শ্রোতা। প্রতিবাদ করা যেত না। আমার সঙ্গে এমন ঘটনাই ঘটেছিল।

আমরা উপনির্বাচনের সফরে বেরিয়েছিলাম। কথা ছিল ভোলা ও পিরোজপুর দু’টি এলাকাতেই জনসভায় ভাষণ দেয়া হবে। কিন্তু ভোলা সফর শেষে তিনি বললেন, তিনি এখন ঢাকায় ফিরবেন। কাগমারী যাবেন। আমি বললাম, তা হবে না। তিনি বললেন, বেশি বাড়াবাড়ি করো না। বরিশালে খবর দিয়ে দাও, ওরা যেনো স্টিমারে টিকেট কেনে। আমি আগামীকালই স্টিমারে ঢাকা যাব।

উপায় নেই। আমরা বিশেষ লঞ্চে বরিশাল ফিরলাম। পিরোজপুরে আর জনসভা হলো না। স্টিমারের প্রথম শ্রেণিতে আমাদের আশ্রয় হলো। তখন বরিশাল থেকে স্টিমার নারায়ণগঞ্জ আসত। ঢাকা পর্যন্ত আসত না।

স্টিমার নারায়ণগঞ্জে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা হেলে পড়ে পশ্চিমে। মওলানা সাহেব দেরি করেই ঘুম থেকে উঠলেন। বললাম, নাস্তার কথা। তিনি প্রথম রাজি হলেন না। বেশ কিছু পরে বললেন, নাস্তার অর্ডার দাও। নাস্তা এলো। প্রথম শ্রেণির দামি নাস্তা দেখে তিনি বলেন, এ নাস্তার অনেক দাম। পয়সা সৃষ্ট করা যাবে না। আর আপনি এ নাস্তাই আনতে বলেছেন। তিনি কিছুটা খেলেন। বাকিটা কর্মচারীদের দিয়ে দিলেন। নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে বললেন, আমি চাষাড়ায় ওসমান আলীর বাড়িতে থাকব। তুমি ঢাকা যাও। মুজিব আর মাহমুদ আলীকে খবর দাও আমার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জে দেখা করতে। মাহমুদ আলী তখন গণতন্ত্রী দলের নেতা। গণতন্ত্রী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। কোয়ালিশন সরকারে আছে। আমার মনে হলো, মওলানা সাহেব উপনির্বাচন নিয়ে দুজনের সঙ্গেই আলোচনা করতে চান।

আমি নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা ফিরলাম। সকলকে খবর দিলাম। পরদিন ভোরে ইত্তেফাকে দেখলাম, অসুস্থ মওলানা ভাসানীর কাগমারী গমন। আর আমি ঢাকায় পৌঁছে আর এক সঙ্কটের মুখোমুখি হলাম। শুনলাম মিসরের বিরুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্স হামলা চালিয়েছে। প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্র জনতা পুরানা পল্টনের মোড়ে ব্রিটিশ ইনফরমেশন সার্ভিসের ভবন পুড়িয়ে দেয়।

ইংরেজ ও ফরাসি মিসর হামলার কারণ ছিল সুয়েজ খাল। একশ’ তিন মাইল দীর্ঘ সুয়েজ খাল ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে আরব সাগরকে যুক্ত করেছে। এ খাল কাটা না হলে নৌপথে ইউরোপ থেকে এশিয়ায় আসতে হতো উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে। প্রয়োজন হতো মাসের পর মাস। সুয়েজ খাল খননের ফলে পাশ্চাত্যের উপনিবেশ শক্তিবর্গের প্রাচ্যে শাসন ও শোষণের পথ আরো সহজ হয়। খালটি খনন করে ফরাসি নাগরিক ফার্ডিন্যান্স দ্য লেসেপস ১৮৫৯-১৮৬৯ সালে। এক সময় ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার মিসরের কাছ থেকে এক কোম্পানির শেয়ার কিনে কোম্পানির মালিক হয়। মিসরের নাসের ক্ষমতায় আসার পর নীল নদের ওপর বাঁধ দেয়ার পরিকল্পনা করে। এ বাঁধ আসোয়ান বাঁধ নামে পরিচিত। এ বাঁধে পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গ অর্থ সাহায্য দিতে রাজি না হওয়ায় প্রেসিডেন্ট নাসের ১৯৫৬ সালের জুন মাসে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন। এ জাতীয়করণের তিন মাস পর ব্রিটিশ ও ফ্রান্স ৩০ অক্টোবরে মিসরে হামলা চালায়। সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধমকে ইঙ্গ-ফ্রান্স সরকারকে নতিস্বীকার করতে হয়। ঢাকাতে ভস্মীভূত হয় ব্রিটিশ ইনফরমেশন সার্ভিসের ভবন। নতুন সঙ্কট দেখা দেয় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতিতে। প্রশ্ন ওঠে পাশ্চাত্য ঘেঁষা শহীদ সোহরাওয়ার্দী কোন দিকে যাবেন?

সুয়েজ সংঘর্ষ শুরু হলো ২৯ অক্টোবর। কলম্বো শক্তিসমূহ ১২ নভেম্বর নয়াদিল্লিতে বৈঠক আহ্বান করল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজি হলেন না এই বৈঠকে যেতে। পরিবর্তে তিনি প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জাকে নিয়ে তেহরান চলে গেলেন বাগদাদ চুক্তির বৈঠকে যোগ দিতে। বাগদাদ চুক্তি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের কমিউনিস্ট বিরোধী সামরিক জোট।

মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের বাগদাদ চুক্তির তীব্র বিরোধী ছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকায় ক্ষুব্ধ হলো মিসর। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মিসর সফরে যেতে চাইলে নাসের প্রত্যাখ্যান করল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে সুয়েজে যুদ্ধ বিরতি হলো। সিদ্ধান্ত হলো সুয়েজে খবরদারি করবে জাতিসংঘ বাহিনী। পাকিস্তান এ বাহিনীতে সৈন্য দিতে চাইলে মিসর আপত্তি জানায়। অর্থাৎ সুয়েজ সঙ্কট শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করল মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া থেকে। তবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সমর্থন জানায়নি মিসরের প্রশ্নে। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান ও মওলানা ভাসানী বিবৃতি দিয়েছিলেন–মিসরের পক্ষে। পূর্ব পাকিস্তানে মিসর দিবস পালিত হয়েছিল। এ দিবস পালনে আওয়ামী লীগ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান একমত না হলেও বিরোধিতা করেননি।

আওয়ামী লীগ পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন হলেও এ সংগঠনের মূল শক্তি ছিল পূর্ব পাকিস্তান। এই পূর্ব পাকিস্তানে ছিল একটি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহ্য। আবার বিভিন্ন বামপন্থী দল প্রকাশ্যে কাজ করতে না পেরে আওয়ামী লীগের আশ্রয় নিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ছিল সকল ধরনের যুদ্ধচুক্তি বিরোধী এবং প্রতিবাদ জানিয়েছিল পাক মার্কিন সামরিক চুক্তি, বাগদাদ চুক্তি এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া প্রতিরক্ষা চুক্তির। অথচ আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাশ্চাত্য ঘেঁষা এবং এই চুক্তির সমর্থক। ফলে সঙ্কট অনিবার্য হয়ে উঠল।

আমি এ সফরে বিপদে পড়লাম ভিন্ন দিক থেকে। দীর্ঘদিন পর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৫৪ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি কামরুজ্জামান পদত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন তাঁরা এ পদে আছেন। এ নিয়ে বিক্ষোভ আছে ছাত্রদের মধ্যে। তাই সিদ্ধান্ত হলো ১৯৫৮ সালের প্রথম দিকে সম্মেলন হবে। সম্মেলনের নাম উঠতেই প্রশ্ন উঠল, পরবর্তী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কে হবে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রস্তাব এল মোমিন তালুকদার সভাপতি থাকবেন না। সভাপতি হবেন এম এ আউয়াল, সাধারণ সম্পাদক হবে নির্মল সেন। অনেক আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো।

কিন্তু সম্মেলনের পূর্ব মুহূর্তে সবকিছু পাল্টে গেল। প্রস্তাব এল, এবার পূর্বের কমিটি বহাল থাকবে। শুধু নির্মল সেন দফতর সম্পাদক থেকে সহ সভাপতি হবে। সভাপতি মোমিন তালুকদার মাত্র ক’মাস পরে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তাঁর আসন শূন্য হলে নির্মল সেন সভাপতি হবেন।

আমি এ জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। জানতামও নাম। সম্মেলনে এ প্রস্তাব উঠলে আমি বিরোধিতা করলাম। প্রতিবাদে নয়টি জেলার প্রতিনিধিরা সম্মেলন ত্যাগ করল। তাদের সন্তুষ্ট করার জন্যে সঙ্গে সঙ্গে একটি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নিখিল পাকিস্তান কো-অর্ডিনেটিং কমিটি গঠন করা হলো। আমাকে তার সদস্য করা হলো। আমি চলে এলাম। প্রকৃতপক্ষে সেদিন আমার সঙ্গে ছাত্রলীগের সম্পর্ক ছিন্ন হলো। আর আমার পক্ষে ছাত্রলীগে থাকাও সম্ভব ছিল না। কারণ শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হবার পর আমাদের দল অর্থাৎ আরএসপি’র বৈঠক বসেছিল কুমিল্লায়। কুমিল্লা বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল–আমাকে ছাত্রলীগ ছাড়তে হবে। ছাত্রলীগ অন্ধভাবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাম্রাজ্যবাদ ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি সমর্থন করছে। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের লেজুড় হয়ে গেছে। সময় সুযোগ বুঝে ছাত্রলীগ ছাড়তে হবে। আমি ছাত্রলীগ থেকে চলে এলাম। তবে প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা দিলাম না। তাই মাঝে মাঝে ছাত্রলীগ নেতারা আমার কাছে আসতেন আলোচনার জন্যে। আমি জানতাম আমি চলে আসায় ছাত্রলীগকে বিপদে পড়তে হবে। অসম্মানজনকভাবে এম এ আউয়ালকে চলে যেতে হবে ছাত্রলীগ থেকে। কারণ সব হিসাব, সংগঠনের যোগাযোগ আমার সঙ্গে। আমি না থাকলে সে থাকতে পারবে না। নতুন ছেলেরা সব হিসাব চাইবে। তাই আউয়াল প্রায়ই আসত আলোচনার জন্যে। এখানে বলা প্রয়োজন, আমি যখন ছাত্রলীগে যোগ দিই তখন সারাদেশে ছাত্রলীগের মাত্র তিনটি জেলায় সক্রিয় কমিটি ছিল। আমি চলে আসার আগে দেশের ১৭ জেলায়ই সক্রিয় কমিটি গঠিত হয়।

কিন্তু ছাত্রলীগে আমার আর ফেরা হলো না। ইতোমধ্যে একদিন প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় এলেন। তিনি সলিমুল্লাহ হল প্রাঙ্গণে ভাষণ দিলেন তাঁর পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে। এ ভাষণে তিনি উল্লেখ করলেন তাঁর বিখ্যাত জিরো– শূন্য তত্ত্ব। তিনি বললেন, পাকিস্তানের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলো কতগুলো গণিতের শূন্য-এর মতো। এর বাঁ দিকে যে কোনো অংক বসালেই তার অর্থ হয়। যেমন একটি শূন্যের বাঁয়ে এক বসলে ১০ হয়। অন্যথায় শূন্য হয়ে যায়। এই এক অংকটি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্যতীত আমরা শূন্য থেকে যাবে এবং এই অংকেই তিনি বাগদাদ চুক্তি, পাক মার্কিন সামরিক চুক্তি এবং সিটো চুক্তির সমর্থক। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এ ভাষণে পাণ্ডিত্য থাকলেও গ্রহণযোগ্য হলো না সাধারণ ছাত্র সমাজের কাছে। ওই সভায় আমি যাইনি। শুধুমাত্র আমাকে ঢাকা হলে বসে অনেক কথা শুনতে হলো। সকলেই জিজ্ঞাসা করতে শুরু করল–আর কতদিন ছাত্রলীগে থাকবেন?

তবে এর পরেও ঘটনার বাকি ছিল। একদিন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এম এ বারী এ টি আমার রুমে এলেন। আমাকে বললেন, আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় সমাবেশ ডেকেছে ফজলুল হক হল, এসএম হল, ইকবাল হলের ছাত্র সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্টরা। আলোচনার বিষয়বস্তু মওলানা ভাসানীর কথিত বক্তব্য। এই ছাত্র নেতারা নাকি কাগমারীতে মাওলানা সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন ইউরোপ সফর শেষে মাওলানা সাহেব মাত্র দেশে ফিরেছেন, তাই নাকি ছাত্র নেতাদের তাঁর কাছে যাওয়া। আলোচনাকালে মওলানা সাহেব নাকি ছাত্রনেতাদের কাছে ব্রিটিশ শ্রমিক দলের বামপন্থী নেতা বেভানের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করেছিলেন। ঘটনটি নিম্নরূপ

মওলানা সাহেব আলোচনাকালে বেভানের কাছে কাশ্মীর সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারের মতামত জানতে চান। বেভান নাকি বলেছিলেন, মওলানা, কাশ্মীর দিয়ে কী হবে, তোমরা পাকিস্তান চেয়ে ভুল করেছ।

মওলানা সাহেবের কাছে এই কথা শুনে ছাত্রনেতারা মওলানা ভাসানীকে জিজ্ঞাসা করেন, বেভান এ কথা বলার পর আপনি কী বললেন? মওলানা সাহেব নাকি জবাবে বলেছিলেন, আমার কী বলার আছে। বেভান ঠিকই তো বলেছে।

মওলানা সাহেবের কথায় ছাত্রনেতারা ক্ষুব্ধ হয়। তারা ঢাকায় এসে প্রচার শুরু করে যে, মওলানা ভাসানী পাকিস্তান বিদ্বেষী, ভারতীয় এজেন্ট। সুতরাং তার বিরুদ্ধে সভা সমাবেশের সিদ্ধান্ত হয়। মওলানা সাহেব তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি।

বারী সাহেব বললেন, কাল আমতলার সমাবেশে মারামারি হবে। পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর অবস্থান দুই মেরুতে। তাই মওলানা ভাসানীকে হেনস্তা করা প্রয়োজন। নইলে এই তুচ্ছ ঘটনার জন্যে মওলানা সাহেবের কথিত উক্তির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ ডাকার কোনো কারণ ছিল না।

আমার কাছে ঘটনাটি স্পষ্ট হয়ে এল। বুঝতে কষ্ট হলো না যে, ছাত্রলীগের শহীদ সোহরাওয়ার্দী পন্থীরাই এ কাজটি করেছে। সংঘর্ষ অনিবার্য। কিন্তু আমি কী করবো। ছাত্রলীগ প্রায় ছেড়ে দিয়েছি। আর সপ্তাহখানেক ধরে জ্বরে ভুগছি। আমাকে দেখার আমি ব্যতীত কেউ নেই। ইতোমধ্যে আমাকে শুনতে হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি এবং পরবর্তীকালে ন্যাপ নেতাদের হস্তক্ষেপে আমি ছাত্রলীগের সম্পাদক হতে পারিনি। তাদের বক্তব্য, নির্মল সেন হিন্দু। তাই দেশের সবচে’ বড় ছাত্র প্রতিষ্ঠানের নেতা হিন্দু হলে কাশ্মীর এবং অন্যান্য প্রশ্নে নাকি অসুবিধা হবে। এ যুক্তি দিয়েছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের ভেতরের এবং বাইরের বামপন্থী নেতারা। ডানপন্থীরা নন। এবার আবার সেই ডানপন্থী-বামপন্থীদের সংঘর্ষের মোকাবেলায় আমাকে নামতে হবে। তাই জ্বর নিয়ে একটি আলোয়ান গায়ে দিয়ে হাজির হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়। তখনো সমাবেশ শুরু হবার অনেক দেরি। মনে হলো ‘দু’পক্ষের কাছে আমিই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি।

আমতলায় পৌঁছে ছাত্রলীগের কোনো বড় নেতার সাক্ষাৎ পেলাম না। দেখা হলো সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি সামসুল হক, ফজলুল হক হলের ভিপি আব্দুল মতিন ও ইকবাল হলের ভিপি দেওয়ান সফিউল আলমের সঙ্গে। দেওয়ান সফিউল কুমিল্লা কলেজে পড়বার সময় আমাদের দল আরএসপি’র সংস্পর্শে এসেছিল। এদের সকলের সঙ্গে কথা বললাম। স্থির হলো কোনো উস্কানিমূলক বক্তব্য নয়। কাশ্মীরের দাবিতে যাদের যা খুশি বলতে পারে।

ঘণ্টাখানেক পর সমাবেশ শুরু হলো। লক্ষ করলাম মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের অনেকে ছাত্র সমাবেশে এসেছে। মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রলীগ বরাবর দুর্বল। সভার শুরুতে বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন সামসুল হক। বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি কারো নাম উল্লেখ না করে বললেন, পাকিস্তানে কোনো মীর জাফরকে সহ্য করা হবে না। সঙ্গে সঙ্গে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র কালিদাস বৈদ্য স্লোগান দিলেন–মওলানা ভাসানী জিন্দাবাদ। প্রতিপক্ষ স্লোগান দিলো–শহীদ সোহরাওয়ার্দী জিন্দাবাদ–হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। সেকালে মারামারিতে বোমা-রাইফেল, পিস্তল ছিল না। তাই সংঘর্ষ হাতাহাতিতে সীমাবদ্ধ থাকল। দীর্ঘক্ষণ সংঘর্ষ চলার পর দোতলা থেকে অর্থনীতি বিভাগের ড. নূরুল হুদা ও ইংরেজির টার্নার নিচে নেমে এলেন। তাঁদের উপস্থিতিতে সবাই শান্ত হয়ে গেল।

সে সময়ের একটি ঘটনা আজও মনে পড়ছে। ছাত্রলীগের সদস্যরা ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যদের ভারতীয় দালাল মনে করত। তাই ওই দিন ছাত্রলীগের এক সদস্য ছাত্র ইউনিয়নের এক সদস্যকে কান ধরে বলতে বাধ্য করছিল–কাশ্মীর পাকিস্তানে চাই। দৃশ্যত সংঘর্ষে ছাত্রলীগ জিতেছিল। বিকেলের দিকে আমতলায় দাঁড়িয়ে ছিল বাংলার ছাত্র সুনীল মুখোপাধ্যায় (পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক)। আমি তখন ক্লান্ত। আলোয়ান ছিঁড়ে গেছে সংঘর্ষ ঠেকাতে। সুনীল বাবুকে জিজ্ঞাসা করলাম–এরপর কী হবে বলুন? তিনি হেসে বললেন, আমতলায় কোনোদিন সিরাজদ্দৌলা জিততে পারে না। এরপর ছাত্রলীগে ফেরার কথা আর ভাবতে পারছিলাম না।

এরপর আর এক বিপদ এগিয়ে এল আমার জন্যে। পূর্ব পাকিস্তানে তখন আওয়ামী কংগ্রেসে কোয়ালিশন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান এবং অর্থমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিদ্ধান্ত নতুন গোলযোগের সূত্রপাত করে।

১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি হল ছিল। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল), জগন্নাথ হল এবং ছাত্রলীগের জন্যে চামেলী হল (বর্তমানে রোকেয়া হল)। সলিমুল্লাহ হল ও ফজলুল হক হল মুসলমান ছাত্রদের জন্যে। জগন্নাথ হল হিন্দু ছাত্রদের জন্যে এবং ঢাকা হল ছিল সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্যে নির্দিষ্ট। তবে ঢাকা হলে কোনোদিন মুসলিম ছাত্র ভর্তি না থাকায় (শুধুমাত্র ড. শহীদুল্লাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ শফিউল্লাহ কিছুদিনের জন্যে এ হলের ছাত্র হয়ে সলিমুল্লাহ হলে চলে যায়) ঢাকা হল শেষ পর্যন্ত অমুসলমান ছাত্রদের হলে পরিণত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর হিন্দু ছাত্র সংখ্যা হ্রাস পায়–এ সময় পাকিস্তান সরকার জগন্নাথ হলের উত্তরের বাড়িতে পোস্টমাস্টার জেনারেলের অফিস স্থাপন করে। দক্ষিণ বাড়িতে স্থাপিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার অফিস-জগন্নাথ হল মিলনায়তন পরিণত হয় পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদে। জগন্নাথ হলের হিন্দু ছাত্রদের পাঠানো হয় ঢাকা হলে। ঢাকা হল পরিণত হয়। ঢাকা জগন্নাথ হলে। অমুসলমান ছাত্রসংখ্যা আরো হ্রাস পেলে ঢাকা হলের পূর্বের এলাকা দিয়ে দেয়া হলো ফজলুল হক হলকে। ফলে তখন নাম হয় ফজলুল হক হল এক্সটেনশন।

১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেন যে জগন্নাথ হলকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে শুধুমাত্র উত্তর বাড়ি নিয়ে। দক্ষিণ বাড়িতে রেজিস্ট্রার অফিস থাকবে। তবে নতুন রেজিস্ট্রার ভবন নির্মিত হলে ঐ বাড়িও ছেড়ে দেয়া হবে। ঢাকা হলকে মুসলিম হলে পরিণত করা হবে। জগন্নাথ হলকে অমুসলমান ছাত্রদের ছাত্রাবাসে পরিণত করা হবে। ঢাকা হল মুসলিম হলে আর অমুসলমান ছাত্রদের চলে যেতে হবে জগন্নাথ হলে।

ঢাকা হলের ছাত্ররা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জেনকিনস। ঢাকা হলের একদল প্রতিনিধি তাঁর সঙ্গে দেখা করলে তিনি জানালেন, তিনি নিজে খ্রিস্টান, তিনি সংখ্যালঘু ছাত্রদের সুবিধা-অসুবিধা জানেন। তাঁর ধারণা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংখ্যালঘু ছাত্রদের সংখ্যা আর বৃদ্ধি পাবে না। অথচ মুসলিম ছাত্র সংখ্যা বাড়ছে–তাই অমুসলিম ছাত্রদের জগন্নাথ হলে যাওয়া উচিত। এ সময় গেলে তাদের অনেক সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে। এ সিদ্ধান্তে রাজি হলে তারা অনেক ভালো করবে। ঢাকা হলের ছাত্রদের বক্তব্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি কোনো পরিবর্তন আনতে হয়, তাহলে সম্প্রদায় ভিত্তিতে আনা চলবে না। সকল হল সকল সম্প্রদায়ের জন্যে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। কোনো সম্প্রদায়ের জন্যে বিশেষ হল থাকতে পারে না। সকল হল হবে কসমোপলিটন। এ দাবি না মানা হলে ঢাকা হল যেমন আছে তেমন থাকবে। ড, জেনকিনস একমত হলেন না। তবে চলে যাবার পূর্বে ঢাকা হলকে মুসলিম হল করার পরিবর্তে কসমোপলিটন হল করার সিদ্ধান্ত দিয়ে গেলেন। তবে জগন্নাথ হল অমুসলমান ছাত্রদের হলে পরিণত করার সিদ্ধান্ত বহাল থাকল।

ড. জেনকিনস চলে যাবার পর ভাইস চ্যান্সেলর হলেন। বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম। ইব্রাহিম সাহেবের সঙ্গে তৎকালীন রেজিস্ট্রার হাদি তালুকদারের সুসম্পর্ক ছিল না। আমরা ইতিমধ্যে হল সম্পর্কে ইব্রাহিম সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, ঢাকা হলের ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তীকালে সকল সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কিন্তু ইব্রাহিম সাহেব চিকিৎসার জন্যে লন্ডন গেলে রেজিস্ট্রার হাদি তালুকদার এক অদ্ভুত নির্দেশ জারি করলেন ঢাকা হলের ছাত্রদের ওপর। যতদূর মনে আছে জুন মাসের শেষের দিকে এক নির্দেশ জারি করে বললেন, ঢাকা হলের সকল হিন্দু ছাত্রদের ১ জুলাইয়ের মধ্যে জগন্নাথ হলে চলে যেতে হবে। ঢাকা হল কসমোপলিটন হল। এ হলে সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদের থাকবার অধিকার আছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো ক্ষমতা নেই কাউকে নির্দেশ দিয়ে হল থেকে তাড়াবার। দ্বিতীয়ত জগন্নাথ হল তখন বাসযোগ্য ছিল না। দীর্ঘদিন পিএমজি থাকায় কোনো মেরামত হয়নি। পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, জল নেই, ক্যান্টিন নেই, কমনরুম নেই, প্রভোস্ট অফিস নেই। একটি ছাত্রাবাসের জন্যে প্রয়োজনীয় কিছু নেই। একমাত্র লোভনীয় হচ্ছে প্রতিজন ছাত্রের জন্যে এক আসনের একটি কক্ষ। সর্বশেষ কথা হচ্ছে–ভাইস চ্যান্সেলর কথা দিয়েছিলেন, আলোচনার মাধ্যমেই সকল সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু সবকিছুই হলো একতরফা। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, কেউই ঐ তারিখে ঢাকা হল ত্যাগ করব না।

আমরা সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম। ভাইস চ্যান্সেলর ফিরে এলেন। তিনি বললেন, সকলকে জগন্নাথ হলে যেতে হবে না, যাদের খুশি তারা যাবে। আমরা বললাম, তাও হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল হলকে ঢাকা হলের মতো কসমোপলিটন হল করতে হবে। আমরা সকল হলে থাকব। নইলে যে কোনোদিন যে কোনো হল থেকে আমাদের তাড়ানো হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের কথা মানলেন না। মাঝখানে একদিন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য অগ্নিযুগের অন্যতম বিপ্লবী রাজশাহীর প্রভাস লাহিড়ী আমাকে ডাকলেন। বললেন, তুমি নাকি ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার এসএন মিত্রের সঙ্গে দেখা করেছ। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান এ অভিযোগ করেছেন। আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আমি ভারতীয় হাইকমিশনের কাউকে চিনতাম না। শুধু জানতাম আমার সম্পর্কে তাদের ধারণা অনুকূল নয়। পরদিন ভোরে ইত্তেফাকে এ সম্পর্কে রাজনৈতিক মঞ্চে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার লিস্ট বের হলো। তিনি সরাসরি লিখলেন-একজন সংখ্যালঘু বিপ্লবী ছাত্রনেতা ঢাকা হল-জগন্নাথ হল নিয়ে ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তারপর যা লিখবার সবই লেখা হয়েছিল ইত্তেফাকের পাতায়। শুধুমাত্র আমার প্রতিবাদ পত্রটি ছাপা হয়নি।

এভাবে চারিদিকে প্রচারণা করে ঢাকা হলের ছাত্রদের চরমপথ গ্রহণে বাধ্য করা হলো। এসময় অনশন ধর্মঘট করতে বাধ্য হলাম। সিদ্ধান্ত হলো প্রথম দিন ছ’জন ছাত্র অনশনে যাবে। এরা দুর্বল হলে তরল জাতীয় কিছু গ্রহণ করবে। দ্বিতীয় দিন আমি অনশনে যোগ দেব। আমার অনশন হবে একান্তই কোনো কিছু না খেয়ে।

এ ধরনের অনশন করার অভ্যাস আমার হয়েছিল জেলখানায়। ১৯৪৮ ৪৯-৫০ সালে ঢাকা জেলে চারবার অনশন করেছিলাম। ৬ দিন, ২৪ দিন, ৪০ দিন এবং ৫০ দিন। অনশনের ফলে অসুস্থ হয়েছিলাম, যে অসুখের ঐতিহ্য বহন করে জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। তাই ১৯৫৭ সালে অনশনে যাওয়া আমার পক্ষে কঠিন ছিল না। আর আমাকে বারণ করারও কেউ ছিল না। ১৯৪৮ সালে মা পশ্চিমবঙ্গে চলে গেলেন। গোপালগঞ্জের গ্রামে বাবা আছেন। দু’কাকা আছেন টুঙ্গিপাড়ায়। জেলে থাকতে থাকতে আমার সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর। আর তারা কোনোদিনই আমার কোনো সিদ্ধান্তে বাধা দেননি।

প্রথমদিকে ৬ জন ছাত্র অনশন শুরু করে। দ্বিতীয় দিনে আমাকে নিয়ে ৭ জন। চারদিকে একটি থমথমে ভাব। ঢাকা হলের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে ভয় পাচ্ছে। একটি দুঃখজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সর্বত্রই যেন একটা সাম্প্রদায়িক মনোভাব। মনে হয় ঢাকা হলের সংখ্যালঘু ছাত্ররা একটা অন্যায় কাজ করছে। ঢাকা হলে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান তিন সম্প্রদায়ের ছাত্র থাকলেও চিহ্নিত হচ্ছে হিন্দু হল বলে। সুতরাং হিন্দু হলের ছাত্রদের আন্দোলন নিশ্চয়ই হবে সাম্প্রদায়িক। প্রকৃতপক্ষে তল্কালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন একটি বিবৃতি দেয়া ছাড়া কোনো ছাত্র সংগঠনই আমাদের আন্দোলনের পক্ষে এগিয়ে আসেনি। তারা বিক্ষুব্ধ। কারণ আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায় এবং আমি ছাত্রলীগের সদস্য হয়েও ঐ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছি।

অনশনের দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যাবেলায় ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি ইব্রাহিম আমাদের দেখতে এলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সকল হলের প্রভোস্ট। প্রভোস্টদের মধ্যে ছিলেন ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব। তিনি ঢাকা হলের ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট ছিলেন। নতুন পরিস্থিতিতে তিনি জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট নিযুক্ত হয়েছেন। নতুন পদ পেয়ে তিনি খুশি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বোঝাতে চাচ্ছিলেন, ঢাকা হল মুসলিম হল হয়ে যাক। জগন্নাথ হলকে অমুসলমানদের হল হিসেবে চালু করা হোক। একটু দেনদরবার করতে পারলে এ পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু ছাত্ররা অনেক সুযোগ-সুবিধা পাবে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘু ছাত্রদের সংখ্যা আর বৃদ্ধি পাবে না। এবার সুযোগ হারালে সংখ্যালঘু ছাত্ররা আর কোনদিন সুযোগ-সুবিধা পাবে না। ড, গোবিন্দ দেবের মতে আমরা একমত হতে পারিনি। তিনি আমাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে জগন্নাথ হলের দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তিনি তখন আমাদের কাছে ছিলেন অসহায়। তাই ভাইস চ্যান্সেলর আমাদের কক্ষে ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম, ড, গোবিন্দ দেব থাকলে আপনাদের সঙ্গে কোনো কথা হবে না। তাঁকে চলে যেতে হবে। তিনি অসম্মানিত হলে আমরা দায়ী থাকব না। ড. গোবিন্দ দেব হতচকিত হয়ে গেলেন এবং কক্ষ ছেড়ে বের হয়ে গেলেন।

ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে ছিলেন ঢাকা হলের নবনিযুক্ত প্রভোস্ট এম এন কিউ জুলফিকার আলি। বছর খানেক আগে তিনি ঢাকা হলে প্রভোস্ট হয়েছেন। কিন্তু আমরা তাঁকে কোনোদিন হলে ঢুকতে দিইনি। আমি বললাম, জুলফিকার আলি সাহেবকে আমরা হলের প্রভোস্ট মানি না। তিনিও কক্ষে থাকলে কোনো আলোচনা হবে না। তাকেও চলে যেতে হবে। তিনিও চলে গেলেন।

এবার আলোচনা শুরু হলো। বিচারপতি ইব্রাহিম বললেন, Best of the things will be done for the minority students. তাঁর কথাগুলো এখনও আমার কানে ভাসছে। তিনি বললেন, তোমরা অনশন করছ। আমরা তোমাদের সব দাবি মেনে নেব। তোমরা অনশন প্রত্যাহার করো। আলোচনায় আমাদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন ঢাকা জগন্নাথ হল সভাপতি তরুণ সেন। সাধারণ সম্পাদক শিশির দাস, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার এককালীন প্রধান দেবপ্রিয় বড়ুয়া এবং পদার্থবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. অজয় রায়।

বিচারপতি ইব্রাহিমকে আমি বললাম, স্যার, আমার একটি কথার জবাব দিতে হবে। ঢাকা হল কসমোপলিটন হল। এ হলে সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদের থাকার অধিকার আছে। আপনারা কোন যুক্তিতে এ হলের হিন্দু ছাত্রদের বাধ্যতামূলকভাবে জগন্নাথ হলে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন? আমি ঢাকা হলে থাকব কি-না সে সিদ্ধান্ত আমি নেব। আমার ওপর কোনো অধিকার আপনাদের নেই।

বিচারপতি ইব্রাহিম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। পরে বললেন, এ নির্দেশটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এবার তোমরা যারা খুশি এখানে থাকবে এবং যারা খুশি জগন্নাথ হলে যাবে। এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলার নেই। আমি প্রবাসে থাকাকালীন এ নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। এ নির্দেশ আর কার্যকর নয়। আমি বললাম, আমাদের মূল দাবি হচ্ছে ঢাকা হলের মতো সব হলকে কসমোপলিটন করতে হবে। সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কোনো হল থাকতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্যে সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কোনো ছাত্রী নিবাস নেই। তাই ছাত্রদের ক্ষেত্রেও এ ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাই আমাদের দাবি স্ট্যাচুট পরিবর্তন করে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এবং ফজলুল হক মুসলিম হল থেকে মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়া হোক। সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্যে এই হল দুটির দুয়ার খুলে দেয়া হোক।

বিচারপতি ইব্রাহিম বললেন, কোনো হলের স্ট্যাচুট পরিবর্তন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এতে অনেক ঝামেলা হবে। আমি বললাম–স্যার আপনার কথা সত্য নয়। ইচ্ছা হলেই আপনারা স্ট্যাচুট পাল্টাতে পারেন। আপনারা জগন্নাথ হলের স্ট্যাচুট পাল্টিয়েছেন। স্ট্যাচুট অনুযায়ী জগন্নাথ হল শুধুমাত্র হিন্দু ছাত্রদের জন্যে সংরক্ষিত ছিল। স্ট্যাচুট পাল্টে আপনারা জগন্নাথ হলকে অমুসলমান হলে পরিণত করেছেন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জগন্নাথ হলে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান তিন সম্প্রদায়ের ছাত্ররাই থাকতে পারবে। তাই জগন্নাথ হলের স্ট্যাচুট পাল্টানো গেলে সলিমুল্লাহ হল ও ফজলুল হক হলের স্ট্যাচুট কেন পাল্টানো যাবে না?

ইব্রাহিম সাহেব চুপ করে গেলেন। বললেন, তুমি এত কথা জানলে কী করে। বললাম, স্যার, আপনাদের লাল বইটা দেখেছি। আপনাদের লাল বই আমাদের দেখা নিষিদ্ধ। কিন্তু আমাদেরও উপায় ছিল না। তাছাড়া আমাদের ভিন্ন যুক্তি আছে ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) সম্পর্কে। পাকিস্তানের সংবিধানে আছে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি সাহায্য পেলে সেই প্রতিষ্ঠানে কোনো সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীকে প্রবেশে বাধা দেয়া যাবে না। সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীকে থাকবার এবং পড়বার সুযোগ দিতে হবে। ইকবাল হলে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার ১২ লাখ টাকা সাহায্য দিয়েছে। তাই ইকবাল হলের দুয়ার আমাদের জন্যে খুলে দিতে হবে। এর পরেও কথা আছে। জগন্নাথ হল এখনও মানুষের বাসোপযোগী নয়। জগন্নাথ হল এ মুহূর্তে কতগুলো পায়রার খোপের সমষ্টি। ওই হলে ছাত্রদের যাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

এরপরে আর আলোচনা জমল না। ভাইস চ্যান্সেলর নীরব হয়ে গেলেন। বিদায় নেবার পূর্বে আবার অনশন প্রত্যাহারের আবেদন জানালেন। অনশনের তৃতীয় দিনে অর্থমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর এলেন। তিনি খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করলেন। বললেন–ঠিক আছে অনশন যখন শুরু করেছেন চালিয়ে যান। দেখি কতদূর কী করা যায়। কিছুক্ষণ পর দেখা করতে এলেন আর একজন মন্ত্রী-কংগ্রেসের শরৎ মজুমদার। তিনিও সমর্থন জানিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে এলেন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ফণীভূষণ মজুমদার। তাকে খুব চিন্তিত মনে হলো। তিনি বললেন, কী করবে? তোমার বাড়ি থেকে তোমার অবস্থা জানতে চেয়েছে। আমি বললাম, ভাববার কিছু নেই। বাড়িতে একটা টেলিগ্রাম করে দিন।

অনশনের চতুর্থ দিনে হাওয়া পরিবর্তন হতে শুরু হলো। আমাকে জানানো হলো ঢাকার আদিবাসীদের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা করেছে। তারা নাকি বলেছে দেশের হিন্দুরা তো এমনিতেই দেশ ছেড়ে চলে গেছে। বাকি আছে টাকা হলে শ’তিনেক ছাত্র। এদের সমস্যা তাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হোক। এক বন্ধু এসে জানিয়ে গেল ঢাকা হলের অনশন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক যুগান্তরে সম্পাদকীয় বেরিয়েছে। বলা হয়েছে, এই অনশন নিয়ে অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে পশ্চিমবাংলায় তার প্রতিক্রিয়া হবে। সন্ধ্যার দিকে সেকালের সমাজতন্ত্রী দলের নেতা অধ্যাপক পুলিন দে এলেন। তিনি বললেন–নারায়ণগঞ্জের হিন্দু ব্যবসায়ীরা একটি ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের প্রস্তাব হচ্ছে–তারা টাকা দিয়ে পুরো ঢাকা হল কিনে ফেলবে। হলটি হিন্দু ছাত্রদের জন্যেই থাকবে। অথবা হলের মাঝখানে একটি দেয়াল দেয়া হবে। পশ্চিম দিকে থাকবে অমুসলমান ছাত্ররা। পূর্ব দিকে থাকবে ফজলুল হক হল এক্সেটেনশন। যেমন আছে তেমন।

পুলিন বাবুর প্রস্তাবে আমি রাজি হলাম না। বললাম, সংগ্রাম আমাদেরই করতে দিন। কারো সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন নেই। আমি তখন বিব্রত বোধ করছিলাম চারদিক থেকে। চারিদিকে সাম্প্রদায়িক পরিবেশ। ঢাকা হলের ছাত্ররা ক্লাসে যাচ্ছে না। শুনেছি মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমানের বাসভবনে। ছাত্রলীগ নেতাদের বৈঠক হয়েছে। সে বৈঠকের ফলাফল একান্তই আমাদের বিপক্ষে। আমি কাউকে কিছু বলতে পারছিলাম না। ভয় পাচ্ছিলাম। আমার কথা শুনলেই সবাই আরো ভয় পেয়ে যাবে। সকলের মন ভেঙে যাবে। আমার এককালের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা প্রচার করছে নির্মল সেনও সাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে। সেও হিন্দু ছাত্রদের জন্য অনশন শুরু করেছে। বড় বড় কথা বললেও নির্মল সেনও শেষ পর্যন্ত হিন্দু।

এ পরিস্থিতি আমাকে বারবার মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমি যখন অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্যে সংগ্রাম করেছি তখন এ প্রশ্ন ওঠেনি। আমি ন্যাশনাল মেডিক্যাল ছাত্রদের জন্যে সংগ্রাম করেছি। তল্কালীন এলএমএফ ছাত্রদের দাবির সমর্থনে অনশন করতে ময়মনসিংহ গিয়েছি। রাজশাহীতে গিয়েছি। তখনও প্রশ্ন ওঠেনি। আমার অসুবিধা ছিল আমাদের দল আরএসপি’র এককালে পূর্ব পাকিস্তানে বড় সংগঠন থাকলেও দেশ বিভাগের পরে প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। ছাত্রফ্রন্টে আমার সহযোগি ছিল ছাত্রলীগ। সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে তারা সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। ছাত্র ইউনিয়ন কথাবার্তায়, চলনে-বলনে অসাম্প্রদায়িক হলেও সামনাসামনি প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে অবস্থান নিতে পারত না। তাদের ছিল নিদারুণ দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব। তাই তকালীন ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলি আক্কাস আমাকে প্রতিদিন এসে খবর দিলেও প্রকাশ্যে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি ছাত্র ইউনিয়ন। ফলে সে সময় আমাকে বড্ড নিঃসঙ্গ মনে হতো। বলার মতো একটি মানুষ আমি খুঁজে পাইনি। এর মধ্যে অনশনের ৫ম দিনে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেল।

শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। পদাধিকার বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। অনশনের ৫ম দিনে তিনি আমাদের দেখতে এলেন। শেরেবাংলা ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী। তাই কথায় কথায় বলতেন–আমি তোমাদের সব দাবি মেনে নিচ্ছি। তোমরা অনশন বন্ধ করো। শেরেবাংলার সঙ্গে তখন অসংখ্য তোক ঢাকা হলে। লোকে লোকারণ্য। আমি শেরেবাংলাকে বললাম, আমি আপনাকে শৈশব থেকে চিনি। শ্রদ্ধা করি। কিন্তু বিশ্বাস করি না। আমি জানি একথা আপনি রাখতে পারবেন না। আমার কথায় সবাই যেন চমকে উঠলেন। কেউ কোনো কথা বললেন না। শেরেবাংলা সদলবলে ঢাকা হল থেকে সলিমুল্লাহ হলে চলে গেলেন। পরে শুনলাম তিনি সলিমুল্লাহ হলে এক ছাত্রসভা করেছেন। আমার আচরণের কথা বলেছেন। ছাত্ররা নাকি বলেছে-সলিমুল্লাহ হলের স্ট্যাচুট পরিবর্তন হবে একমাত্র রক্তের বিনিময়ে। অর্থাৎ অবস্থা আরো ঘোলাটে হয়ে উঠল।

সন্ধ্যার সময় ভাইস চ্যান্সেলর অফিস থেকে এক ভভদ্রলোক এসে আরেক খবর দিয়ে গেলেন। খবরটি হচ্ছে আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তারেরা নাকি রিপোর্ট দিয়েছে আমার শরীর ভেঙে যাচ্ছে। তাই ভাইস চ্যান্সেলর একাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডেকেছিলেন। একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যরা নাকি একবাক্যে বলেছেন, তাঁদের করার কিছু নেই। আর আমার সম্পর্কে বলেছেনLet him die peacefully. এ খবর কতটুকু সত্য আমি কোনোদিন যাচাই করার চেষ্টা করিনি। তবে আমাকে নিয়ে যে ইব্রাহিম সাহেব চিন্তিত ছিলেন তা আমি বিশ্বাস করি। তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিন ধরে।

অনশনের ৬ষ্ঠ দিনে তেমন কিছু ঘটল না। চারিদিকে চুপচাপ। মনোরঞ্জন বাবু ও শরৎ বাবু এসে আমাদের দেখে গেলেন। কোনো মহলে কোনো উচ্চবাক্য নেই। অনশনের ৭ম দিনের সন্ধ্যাবেলা দলবল নিয়ে উপস্থিত হলেন বিচারপতি ইব্রাহিম। তাঁর কাছে নাকি খবর গেছে আমার অবস্থা ভালো নয়। চিকিৎসকরা আমার দায়িত্ব নিতে রাজি নন। কক্ষে ঢুকেই ভাইস চ্যান্সেলর বললেন, নির্মল, বলো তো আমি কে? আমি বললাম, আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের ভাইস চ্যান্সেলর মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি বললেন, তুমি কি আমাকে শ্রদ্ধা করো? আমি বললাম, করি। বিচারপতি ইব্রাহিম বললেন, তাহলে আমার নির্দেশ, আজকে তুমি কোনো কথা বলতে পারবে না। আমি বললাম, তা হতে পারে না।

ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম আঁটঘাট বেঁধেই এসেছিলেন। তিনি শুনেছিলেন আমার অবস্থা খারাপ। ডাক্তাররা কোনো দায়িত্ব নেবে না। আমার হাসি পাচ্ছিল। কারণ ৭ দিনের অনশনে আমার কিছুই হয় না। ১৯৪৯ সালে ঢাকা জেলে শুধু জল খেয়ে ১১ দিন ছিলাম। অনশন আমার কোনোদিনই কষ্টকর মনে হয়নি। মনোবল থাকলে অনশনে কিছুই হয় না। তাই ডাক্তারের রিপোর্ট সত্ত্বেও আমি আদৌ শঙ্কিত ছিলাম না। ভাইস চ্যান্সেলর ইব্রাহিম বললেন, নির্মল, আমি ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নির্দেশ দিচ্ছি আজ তুমি কোনো কথা বলতে পারবে না। তুমি অসুস্থ। আমি বললাম, আপনার নির্দেশ আমাদের স্বার্থের বাইরে যাচ্ছে। আমাকে কথা বলতে হবেই। আমার কথার প্রতিবাদ করলেন সকল প্রভোস্ট একযোগে। তারা বললেন, তুমি বলছো তুমি ভাইস চ্যান্সেলরকে সম্মান করো। তাই তার নির্দেশ তোমাকে মানতে হবে। নইলে ভাইস চ্যান্সেলরকে অসম্মান করা হবে। আমার ঢাকা হলের বন্ধুরা আমাকে চুপ থাকতে বলল। এবার কথা শুরু করলেন ভাইস চ্যান্সেলর মোহাম্মদ ইব্রাহিম।

ভাইস চ্যান্সেলর বললেন, সেই আগের একই কথা–সংখ্যালঘু ছাত্রদের জন্যে সবকিছু করা হবে। তোমরা অনশন প্রত্যাহার করো। আমি বললাম, এমন কথায় কিছু হবে না। ভাইস চ্যান্সেলর আমাকে আবার চুপ থাকার কথা বললেন। তিনি বললেন, তোমাদের সকলকে জগন্নাথ হলে যেতে হবে না। যাদের খুশি তারা জগন্নাথ হলে যাবে। যারা ঢাকা হলে থাকতে চায় তারা ঢাকা হলেই থাকবে। জগন্নাথ হল সংস্কার করা হবে। জল, আলো, ক্যান্টিন কমনরুমের ব্যবস্থা করা হবে। আমি কথা দিচ্ছি, আমি ভাইস চ্যান্সেলর থাকলে ইকবাল হল কসমোপলিটন হল হবে। জগন্নাথ হলের রেজিস্ট্রার অফিস ও মিলনায়তন তোমরা একদিন পাবে।

আমি লক্ষ করলাম, আমাদের ঢাকা হলের ছাত্র বন্ধুরা অনেক নমনীয়। তারা অনশন অব্যাহত রাখতে সাহস পাচ্ছিল না। সকলেই অনশন ভাঙতে নিমরাজি। ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে সকল হলের প্রভোস্টরা প্রতিশ্রুতি দেয়ায় অনশন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হলো। আমি কিছুই করলাম না। ভাইস চ্যান্সেলর বললেন, তুই কাল সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে যাবি। আমি বললাম, আমার সময় হবে না। আমি আগামীকাল কুমিল্লা যাবো। কুমিল্লায় আমার দলের বৈঠক আছে। অনশন প্রত্যাহারের পর অর্থমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর এলেন। তিনি অনশন প্রত্যাহারের কথা জানতেন না। বললেন, এত তাড়াতাড়ি অনশন প্রত্যাহার করলেন কেন? আমরা তো আলোচনা শুরু করেছিলাম। আমার কথার কিছু ছিল না। আমি পরের দিন ঐ শরীর নিয়েই ট্রেনে কুমিল্লা চলে গেলাম। দু’দিন পরে ঢাকা ফিরলাম।

ঢাকা এসে দেখি পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নিয়েছে। ঢাকা হলের ছাত্ররা এক নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, জগন্নাথ হলকে সংখ্যালঘু হল হিসেবে ঘোষণা করা হোক। ঐ হলটিতে শুধুমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছাত্ররাই থাকবে। তাদের আশঙ্কা হচ্ছে–জগন্নাথ হল অমুসলমান কসমোপলিটন থাকলে একদিন ভবিষ্যতে আবার হয়তো নতুন দাবি উঠবে। মুসলমান ছাত্ররা বলবে ঐ হলকে কসমোপলিটন করা হোক। সকল ছাত্রকে ঐ হলে থাকতে দিতে হবে।

আমি বললাম, এ সিদ্ধান্তে আমি একমত নই। কোনো সংখ্যালঘু হল করা যাবে না। আমাদের মূল দাবি ছিল সকল হলকে কসমোপলিটন করা। আবার এখন আমরা দাবি করছি জগন্নাথ হলকে সংখ্যালঘু হল করার। এ দাবি মূল দাবির সঙ্গে আদৌ সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আমার সকল বন্ধু খুশি না হলেও আমার প্রস্তাব সবাই মেনে নিল।

সন্ধ্যার দিকে ভাইস চ্যান্সেলর আমাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি একটি নতুন প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, নির্মল, তোর সেদিনের কথায় আমি বিবেকের দংশন অনুভব করেছি। আমরা জগন্নাথ হলের স্ট্যাচুট পরিবর্তন করেছি। অথচ এসএম হলের স্ট্যাচুট পরির্বন করতে পারছি না। এই বৈপরীত্য চলতে পারে না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি জগন্নাথ হলের স্ট্যাচুট আবার পাল্টে দেব। জগন্নাথ হল আবার হিন্দু ছাত্রদের হল হবে। আমি বললাম, স্যার, এ প্রস্তাব আমি মানব না। আমরা সকল হলকে কসমোপলিটন করার কথা বলেছি। জগন্নাথ হলকে নতুন করে হিন্দু হল বানাতে চাই না। তিনি বললেন, নির্মল তুই বুঝবার চেষ্টা কর। এদেশে হিন্দু ছাত্রদের সংখ্যা কোনোদিন বৃদ্ধি পাবে না। জগন্নাথ হলের সিট খালি থাকবে। মুসলমান ছাত্ররা দাবি তুলবে আমরা ঐ সিটে থাকব। একদিন দেখবি এসএম হলের ছাত্ররা জগন্নাথ হল দখল নিয়ে গেছে। ওরা বলবে, শুধুমাত্র অমুসলমান ছাত্রদের জন্যে নয়, সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্যে জগন্নাথ হলের দুয়ার মুক্ত থাক। বিচারপতি ইব্রাহিম জোর দিয়ে বললেন–আমি এ পথ বন্ধ করে দিয়ে যেতে চাই। তুই রাজি হয়ে যা। আমি বললাম, কিছুতেই রাজি হব না। এবার তিনি আমাকে সরাসরি একটা প্রশ্ন করলেন। জিজ্ঞেস করলেন-তুই কি পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘু ছাত্রদের প্রতিনিধি? আমি বললাম না। আমি শুধু ঢাকা হলের ছাত্রদের প্রতিনিধি।

বিচারপতি ইব্রাহিম এরপর তেমন কোনো কথা বললেন না। শুধু বললেন, ঠিকমতো তোর কথা ভেবে দেখব। বললেন, তোর একটা কাজ আছে। আগামীকাল ভোরে ঢাকা হলের প্রতিনিধিরা জগন্নাথ হলে যাবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীরা থাকবে। সব মাপজোক করবে। কক্ষগুলোতে বাতাস ঢুকবার জন্যে দেয়াল কেটে ঘুলঘুলি করা হবে। কোথায় কমনরুম ক্যান্টিন হবে তাও ঠিক করা হবে। আমি বললাম, দক্ষিণের রেজিস্ট্রি অফিস ও এসেম্বলি অফিস কী হবে। তিনি বললেন, কালক্রমে হলগুলো তোরা পেয়ে যাবি।

পরদিন সবাই মিলে জগন্নাথ হলে গেলাম। প্রকৌশলীরা এলেন। সব মাপজোক শুরু হলো। জগন্নাথ হলে খাওয়া আর ঢাকা হলে থাকার পালা। এ ব্যাপারে ভাগাভাগি হয়ে গেল। আমরা ৭০ থেকে ৭৫ জন ছাত্র ঢাকা হলে থেকে গেলাম। বাদ বাকি সকলেই চলে গেল জগন্নাথ হলে। এ ব্যাপারেও কৌশল গ্রহণ করলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নতুন যারা ভর্তি হতে এসেছিল সেই সংখ্যালঘু ছাত্রদের ঢাকা হলে ভর্তির ফরম দেয়া হলো না। প্রায় সকলকেই বাধ্য করা হলো জগন্নাথ হল থেকে ভর্তির ফরম কিনতে।

সেদিন আমার এবং আমাদের এ সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কিনা এ নিয়ে পরবর্তীকালে প্রশ্ন উঠেছিল। জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের প্রথম অভিষেক অনুষ্ঠানে আমি তিরস্কৃত হয়েছিলাম বিপ্লবী ছাত্রনেতা বলে। বলা হয়েছিল আমি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেছিলাম। আমি ভিন্ন অবস্থান নিলে সংখ্যালঘু ছাত্ররা অনেক কিছু পেত। আমার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জগন্নাথ হলের একটি বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ঐ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছিলেন হলের প্রভোস্ট ড. গোবিন্দ দেব। প্রধান অতিথি ছিলেন সামরিক শাসনের ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি হামিদুর রহমান। আমি তখন ঢাকা হলের ছাত্র। এই বিচারপতি হামিদুর রহমানের আমলেই আমাকে ২৪ ঘণ্টার নোটিসে ঢাকা হল ছাড়তে বলা হয়েছিল। আমার প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল কলাভবনে। অজুহাত, আমি বিজ্ঞানের ছাত্র সুতরাং আমাকে কার্জন হলের চৌহদ্দিতেই থাকতে হবে। এভাবে জগন্নাথ হলের ইতিহাসের প্রথম পর্ব শেষ হলো। পরবর্তীকালে ঢাকা হলে অমুসলমান ছাত্রদের জন্যে দিনগুলো ছিল নিদারুন দুঃখজনক। সে কাহিনী পরে বলছি।

ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগে নতুন সঙ্কট দেখা দিল পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সকল ধরনের সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধে। প্রথম থেকে আওয়ামী লীগ বাগদাদ চুক্তি ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার চুক্তির (সিটো) বিরোধী। পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতানৈক্য ছিল। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবার পূর্বে এ নিয়ে সংকট দেখা দেয়নি। সংকট দেখা দিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবার পর।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সুয়েজনীতি সকল মহলে তীব্রভাবে সমালোচিত হলো। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় এসে ১৯৫৬ সালের ৯ ডিসেম্বর সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে এক ভাষণ দিলেন। তিনি প্রকাশ্যেই সামরিক চুক্তির সমর্থন করলেন। এ পরিস্থিতিতে মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন আহ্বান করলেন। কাউন্সিল পূর্ববর্তী ওয়ার্কিং কমিটির সভা বসল ৬ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করা গেল, এই কমিটির বৈঠকে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে একটি অভিনব প্রস্তাব গৃহীত হলো। প্রস্তাবে বলা হলো কাউন্সিলে সামরিক চুক্তি সম্পর্কে কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে না। প্রস্তাবের পক্ষে ৩৫ ভোট এবং বিপক্ষে ১ ভোট পড়লো। এই ভোটটি দিয়েছিলেন অলি আহাদ, যিনি পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।

তবুও গণ্ডগোল দেখা দিল পরবর্তী সময়ে কাগমারীতে আফ্রো-এশিয়া সাংস্কৃতিক সম্মেলন নিয়ে। আফ্রো-এশিয়া সাংস্কৃতিক সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন মওলানা ভাসানী।

এই সম্মেলনে তিনি ভারত এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন শিক্ষাবিদ এবং সাহিত্যিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তখন কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। আর তখনই কাগমারী সম্মেলনে এসেছিলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী আবদুল ওয়াদুদ, সুফিয়া ওয়াদিয়া, পরোধ স্যানাল, রাধা রাণী দেবী প্রমুখ। কাগমারী সম্মেলন উপলক্ষে মহাত্মা গান্ধী, কায়েদে আযম, আব্রাহাম লিংকন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, তিতুমীর, হাকিম আজমল খান, লেনিন, শেক্সপিয়রসহ অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তিদের নামে তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল।

এই তোরণ নির্মাণের ফলে মওলানা ভাসানীকে ভারতীয় এজেন্ট বলে আখ্যায়িত করা হয়। মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে দৈনিক ইত্তেফাক বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করে। পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে আওয়ামী লীগে ভাঙন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় ছিল যে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সামরিক চুক্তির বিরোধিতা করলেও ওয়ার্কিং কমিটিতে সে প্রস্তাব কোনোদিনও গৃহীত হতো না। মওলানা ভাসানী সামরিক চুক্তি ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষণ দিতেন। কিন্তু বৈঠকে কোনো প্রস্তাব উত্থাপিত হতো না। অধিকাংশ সভায় তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে নিজের ভাষণের পর বৈঠক ত্যাগ করতেন। ফলে তার সমর্থকরা কোনোদিনই বৈঠকে এ ধরনের প্রস্তাব মানতেই সাহস পেতেন না। শেষ পর্যন্ত শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমান যে ধরনের প্রস্তাব চাইতেন সে ধরনের প্রস্তাবই গৃহীত হতো। এবারও কাগমারী সম্মেলনে তাই ঘটল। আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে কোনো প্রস্তাব গৃহীত হলো না। কোন্দল চূড়ান্ত রূপ নিলো আফ্রো-এশিয়া সাংস্কৃতিক সম্মেলন নিয়ে। কাগমারী সম্মেলনের পর মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালের ১৬ মার্চ লিখিতভাবে পদত্যাগ করলেন।

আওয়ামী লীগ থেকে মওলানা ভাসানীর পদতাগপত্র দেবার পর শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ একশ্রেণির আওয়ামী লীগ নেতার ধারণা হলো যে এর পেছনে আওয়ামী লীগের একশ্রেণির অনুপ্রবেশকারী বামপন্থী নেতারা দায়ী। এঁদের অনেকেই কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আছে এবং এদের নেতৃত্ব করছেন সংগঠনের সম্পাদক অলি আহাদ। ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক বসল ৩০ মার্চ। অলি আহাদের বিরুদ্ধে সংগঠনের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হলো। প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করলেন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান। এ অধিবেশনে অলি আহাদ পাল্টা অভিযোগ আনেন মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করার জন্যে। পরে বৈঠক মুলতুবি হয়ে যায়। বিকালের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মনসুর আহমেদ। তিনি নিজে প্রস্তাব উত্থাপন করে অলি আহাদকে বরখাস্ত করেন। এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আব্দুস সামাদ আজাদসহ ৯ জন সদস্য পদত্যাগ করেন। উপস্থিত ৩০ জন সদস্যের মধ্যে ১৪ জন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।

মওলানা ভাসানী তখন ফতুল্লা ঘাটে নৌকায় অবস্থান করছিলেন। অলি আহাদসহ বিক্ষুব্ধ সদস্যগণ মওলানা সাহেবের কাছে গিয়ে ওয়ার্কিং কমিটির সভা ডেকে সমস্যা মোকাবেলার আহ্বান জানান। মওলানা সাহেব তাতে রাজি হলেন না। তিনি ৩১ মার্চ রোববার নারায়ণগঞ্জে জনসভা করার নির্দেশ দেন। ১৮ ও ১৯ মে বগুড়ায় কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেন। খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ১ জুন থেকে ৭ জুন পর্যন্ত আত্মশুদ্ধির জন্যে অনশন পালনের সিদ্ধান্ত নেন। মওলানা ভাসানী ১ জুন অনশন শুরু করলে ৩ জুন আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক বসে। এবার তিন বছরের জন্যে অলি আহাদকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। পদত্যাগী ৯৯ জন সদস্যের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে নতুন ৯ জন কো-অপট করা হয়।

মওলানা সাহেব জানান, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে আলোচনা হলেই তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের প্রশ্ন উঠতে পারে-এই পটভূমিতে ১৩ ও ১৪ জুন ঢাকার পিকচার প্যালেসে (পাকিস্তান সিনেমা হল) আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আহ্বান করা হয়। কাউন্সিলের আলোচ্য বিষয় অলি আহাদকে বহিষ্কার, সামরিক চুক্তি, পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, খাদ্যশস্য মূল্যবৃদ্ধি তথা মওলানা ভাসানীর অনশন।

এবারও সেই এক ঘটনা ঘটল। মওলানা সাহেব অধিবেশনের প্রথমে নিজস্ব বক্তব্য দিয়ে হল ত্যাগ করেন। সম্মেলনে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পররাষ্ট্রনীতিসহ সবকিছু গৃহীত হয়। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের সদস্যরা মওলানা ভাসানীর সমর্থকদের ওপরে হামলা চালায়। মারামারির পর বরিশাল ছাত্রলীগের কতিপয় সদস্য ঢাকা হলে আমার কক্ষে আসে এবং বীরবিক্রমে তাদের ভূমিকা বর্ণনা করতে থাকে। আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, এবার আওয়ামী লীগ দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ১৪ জুন বিকালে পল্টন ময়দানে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঘোষণা করেন, পূর্ব পাকিস্তান শতকরা ৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন পেয়ে গেছে।

এরপর আমাদের পক্ষে ছাত্রলীগে থাকা আদৌ সম্ভব হলো না। আমি এনায়েত উল্লাহ খান, আহমেদ হুমায়ুন, নূরুল হক চৌধুরী (মেহেদী), আব্দুল হালিম, আনিসুর রহমান, জহিরুল ইসলামসহ ছ’টি জেলার ৬৮ জন নেতা ও কর্মী ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করি। ফরিদপুর এবং ময়মনসিংহ শাখা ছাত্রলীগ অবলুপ্ত হয়ে যায়।

এরপরে মওলানা ভাসানীর আওয়ামী লীগে থাকা আর সম্ভব ছিল না। তিনি ১৩ ও ১৬ জুন দু’দিনব্যাপী ঢাকায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এক বৈঠক ডাকেন। এ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় ২৫ ও ২৬ জুলাই ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ মওলানা ভাসানী এবার পাকিস্তানভিত্তিক নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেবেন। মওলানা ভাসানীর সিদ্ধান্ত সেদিন আমাকে কৌতূহলী করেছিল, বিস্মিত করেনি।

আমি লক্ষ্য করছিলাম, দেশে একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হতে যাচ্ছে। এ দলের প্রধান বক্তব্য হবে–সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ভাগ হচ্ছে। এমন ঘটনা পৃথিবীতে কমই ঘটেছে। এ কথা সত্য, সেকালের আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগ ভাঙনের বিরুদ্ধে ছিল–কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তাদের অনুসৃত নীতি এই ভাঙনের অন্যতম কারণ ছিল।

পৃথিবীর দেশে দেশে রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলো এ নীতি অনুসরণ করেছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চরম বৈরী সম্পর্ক ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে। পাশ্চাত্য শিবিরের উভয় পক্ষই তখন নিজের প্রভাব বলয় বিস্তারে ব্যস্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমগ্র বিশ্বে তার প্রভাব বিস্তারের জন্যে আগ্রাসী অভিযান শুরু করেছিল। বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি শ্লোগান দিচ্ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন ছিল কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর প্রধান কর্মসূচি। এই ঢাকার বুকে দেখা গেছে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব, ফস্টার যালেস ঢাকা সফরে এলে তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছিল।

স্বাধীন নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি নিঃসন্দেহে সমর্থনযোগ্য। কিন্তু শুধুমাত্র পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে একটি দল ভাঙা বা নতুন দল গড়া অনেকের কাছে হাস্যকর মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নকে অন্ধভাবে অনুসরণের ফল। কারণ একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি সে দেশের অভ্যন্তরের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতেই নির্ধারিত হয়। শুধুমাত্র পররাষ্ট্রনীতি কোনো দেশের বা সরকারের প্রগতিশীলতার মাপকাঠি নয়। সেকালে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি তার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রেক্ষিতেই নির্ধারিত হয়েছিল। জন্মলগ্নেই ভারত কিছুটা শিল্পোন্নত ছিল। ভারতে প্রভাবশালী পুঁজিপতি ছিল। মার্কিন বা সোভিয়েত শিবিরে না গিয়ে মাঝখানে থেকে দরকষাকষি করাই ছিল তার পক্ষে লাভজনক। এই দরকষাকষির শক্তি পাকিস্তানের ছিল না। আবার পররাষ্ট্রনীতি জোটনিরপেক্ষ হলেই যে প্রগতিশীল হয় না, তার প্রমাণ মিসর। বিদেশনীতির ক্ষেত্রে মিসর সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে সমর্থন করেছে। আবার চরম নির্যাতন করেছে নিজের দেশের কমিউনিস্টদের। ভারত জোটনিরপেক্ষ হলেও চীনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ডেকে এনেছে। সুতরাং জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করলেই কোনো সরকার বা দল প্রগতিশীল হবে এ কথা বলার অবকাশ নেই। তাই শুধু জোটনিরপেক্ষ নীতির ওপর ভিত্তি করে কোনো রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তা একান্তই অবৈজ্ঞানিক। কারণ প্রতিটি দল একটি শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। সেই শ্রেণির স্বার্থ ভিত্তি করেই দলের নীতি নির্ধারিত হয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে, ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে ন্যাশনাল আওয়ামী পাটি অর্থাৎ ন্যাপ নামে যে সংগঠনটি মওলানা ভাসানী যাদের নিয়ে গঠন করলেন তাদের শ্রেণি চরিত্রের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের শ্রেণি চরিত্রের তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। ন্যাপে এসেছিলেন পাঞ্জাবের জননেতা মিঞা ইফতেখার উদ্দিন আহমদ, সিন্ধুর জিএম সৈয়দ, বেলুচিস্তানের আব্দুস সামাদ, সীমান্ত গান্ধী আবদুল গাফফার খান। শ্রেণি চরিত্রের দিক থেকে এদের মধ্যে অধিকাংশই সামন্তবাদী ধ্যানধারণারই মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনেও এঁরা একান্তভাবেই জমিদার শ্রেণির অর্থাৎ মওলানা ভাসানী যে দলটি গড়েছিলেন সে দলটি আদৌ শ্রেণি চরিত্রের বিষয়ে আওয়ামী লীগ থেকে পৃথক ছিল না। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে আওয়ামী লীগের এই বিভাজন ছিল অবৈজ্ঞানিক ও অনভিপ্রেত এবং রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক নীতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। আমার ধারণা মস্কোর নেতারা তখনো এ ব্যাপারে তত সতর্ক ছিলেন না। ১৯৫৩ সালে স্টালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টিতে অনেক পরিবর্তন হচ্ছিল। সেই পরিবর্তনের হাওয়া পূর্ব পাকিস্তান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। পৌঁছালে হয়তো বা সেদিন আওয়ামী লীগ শ্রেণিচরিত্রের প্রশ্ন বিবেচনা না করে শুধুমাত্র পররাষ্ট্রনীতিকে কেন্দ্র করে নতুন দল গঠন করত না। এটি যে সঠিক ছিল না তা প্রমাণিত হয়েছে পরবর্তীকালে। যতদিন সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজন ছিল ততদিন পর্যন্ত ন্যাপ সজীব এবং সচল ছিল। পরবর্তীকালে অধিকাংশ ন্যাপ নেতা আওয়ামী লীগে ফিরে গিয়েছিলেন এবং এক সময় এই ন্যাপ নেতারা কাগজপত্রে এবং দলিলে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বাকশাল গঠন করেছিলেন। অথচ এঁরাই ১৯৫৭ সালে শেখ সাহেবকে সাম্রাজ্যবাদের দালাল বলে আওয়ামী লীগ ভেঙে ন্যাপ গঠন করেন। আমার ধারণা, সেকালে আওয়ামী লীগে ভাঙন এবং ন্যাপ গঠনের জন্যে দায়ী সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতির অন্ধ অনুসরণ এবং এ কাজটি করেছেন কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুরা।

তবে ১৯৫৭ সালের ২৫-২৬ জুলাইয়ের একটি ভিন্ন কাহিনীও আছে। সেদিন ন্যাপের সম্মেলন এবং জনসভায় আওয়ামী লীগের গুণ্ডামি ছিল অবিস্মরণীয়। সেদিন পল্টন ময়দানে পশ্চিম পাকিস্তানের সম্মানিত নেতাদের ওপর গুণ্ডারা হামলা করেছিল। পণ্ড করতে চেয়েছিল রূপমহল হলে তাদের সম্মেলন। আওয়ামী লীগের সে আচরণ ছিল অশোভন, বর্বর এবং ধৃষ্টতাপূর্ণ আর দৈনিক ইত্তেফাক সেদিন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে Nehru Aided Party বলে অভিহিত করেছিল।

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠনের আগে মওলানা ভাসানী আমাকে ডেকেছিলেন। বললেন, আমি নতুন দল গঠন করছি। আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিচ্ছি। তোমরা ছাত্রলীগ ছেড়ে দিয়েছ–আমার সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তান যাবে। দেখা যাক সারা পাকিস্তানব্যাপী কোনো সংগঠন গড়ে তোলা যায় কি না।

মওলানা সাহেবের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ব্যারিস্টার শওকত আলীদের সদরঘাটের বাসায়। মওলানা সাহেব খুব আন্তরিক হলেও বোঝাতে পারলাম না যে এটা হবার নয়। কমিউনিস্ট পার্টি কিছুতেই আমাকে এ ধরনের কোনো সুবিধা দেবে না। কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য অনুযায়ী আমি ট্রটস্কিপন্থী। তারাই একমাত্র সাচ্চা কমিউনিস্ট। অন্যান্য সকলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল। আর দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে শতকরা প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ জন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যই ট্রটস্কির কোনো মূল গ্রন্থ পড়েনি। দলীয় প্রচার পুস্তিকা পড়ে এবং নেতাদের কাছে শুনে ট্রটস্কির মুণ্ডপাত করছে। আমি আদৌ ট্রটস্কিপন্থী নই। আমাদের দল সেকালের আরএসপি (বর্তমানে শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল) লেনিনপন্থা অনুসারী ট্রটস্কি বা স্টালিনকে সঠিক বলে মনে করে না। তবে রুশ বিপ্লবের নেতা হিসেবে সকলকেই সম্মান দেয়।

এছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আমাদের সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল, ভিন্ন। কোনো দলে অনুপ্রবেশের নীতি নিয়ে। ব্রিটিশ ভারতেও কমিউনিস্ট পার্টি মনে করতো অন্য দলে নিজেদের সদস্যদের ঢুকিয়ে তাদের নীতি পরিবর্তন করা যায় বা সীমিত ক্ষেত্রে হলেও ভিন্ন দলের নীতি নিয়ন্ত্রিত করা যায়। এই বিশ্বাস থেকেই তারা ব্রিটিশ ভারতে নিজেদের সদস্যদের মুসলিম লীগে ঢুকিয়েছে মুসলিম লীগের নেতৃত্ব দান বা নীতি নিয়ন্ত্রণের আশায়। শেষ পর্যন্ত কোনোটাই হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির সেই সদস্যই হারিয়ে গেছে। একই বিশ্বাস থেকে এ দেশে কমিউনিস্ট পার্টি ন্যাপে ঢুকেছে। ন্যাপের নেতৃত্ব করেছে। শেষ পর্যন্ত আর কমিউনিস্ট পার্টিতে ফিরে আসেনি। যদিও এ ধরনের নীতি গ্রহণের ব্যাপারে আর একটি বিবেচনাও কাজ করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকা এবং নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় কমিউনিস্ট পার্টি এ নীতি গ্রহণ করেছিল।

আমাদের এ ব্যাপারে একেবারে বিপরীত নীতি ছিল। আমাদের দল কোনো দিন ভিন্ন দলের ছায়ায় কাজ করেনি। ভিন্ন ফ্রন্টে ভিন্ন দলের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করলেও দলের প্রশ্নে কোনো ভেজাল নীতি ছিল না। তাই কাগমারী সম্মেলনে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও দল হিসেবে আমরা যাইনি। আমাদের প্রবীণ নেতা প্রখ্যাত অতীন্দ্রমোহন রায় কাগমারী সম্মেলনে গিয়েছিলেন। তখনো মওলানা ভাসানী তাকে একসঙ্গে রাজনীতি করার কথা বলেছিলেন। অতীনদা বলেছিলেন, অন্য দলে ঢুকে নিজের দলের আদর্শ বাস্তবায়ন করা যায় না। সুতরাং রাজনীতি ও কৌশলের দিক থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আমাদের মৌলিক পার্থক্য ছিল।

জানতাম যে ন্যাপ গঠনের পর নতুন কোনো ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠিত হোক এটা কমিউনিস্ট পার্টি চাইবে না এবং সে সংগঠনে আমার যাওয়াই সম্ভব হবে না। বাস্তবে তাই হয়েছিল। মওলানা ভাসানীর প্রচেষ্টা সফল হয়নি। আমারও পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

তবে ন্যাপ গঠনের পর বিপদ এল অন্যদিকে থেকে। পূর্ব পাকিস্তানে তখন আতাউর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী কংগ্রেস কোয়ালিশন সরকার। বিরোধী দলে আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং নেজামে ইসলাম। এ পরস্থিতিতে ন্যাপ যে দিকে ভোট দেবে সে সরকারই একমাত্র টিকে থাকবে। কারণ আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত অনেক পরিষদ সদস্যই তখন ন্যাপে যোগদান করেছে। অপরদিকে কেন্দ্রে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রীত্ব তখন টালমাটাল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাশ্চাত্য ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে তখন পাশ্চাত্য জগতে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠলেন। কথা হচ্ছে ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সারা পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে ভয় ছিল পাকিস্তানের সামরিক বেসামরিক আমলাদের। ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচন তাদের আরো শঙ্কিত করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনে মুসলিম লীগ উচ্ছেদ হয়ে গেছে।

আমলাদের ভয় হচ্ছে সাধারণ নির্বাচন হলে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। আমলাদের হাতের পাঁচ মুসলিম লীগ এবং ইস্কান্দার মীর্জার হাতে গড়া রিপাবলিকান পার্টি নির্বাচনে লাপাত্তা হয়ে যেতে পারে। তাই মীর্জার নেতৃত্বে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হলো শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে। ৮০ সদস্যের সংসদে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন ১২ সদস্যের নেতা। তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন রিপাবলিকান পার্টির সমর্থনে। ইস্কান্দার মীর্জার ইঙ্গিতে একদিন সুপ্রভাতে রিপাবলিকান পার্টি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করল। অধিকাংশ সদস্যের সমর্থন নেই এই অজুহাতে প্রেসিডেন্ট মির্জা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পদত্যাগের অনুরোধ জানালেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজি হলেন না। তিনি মির্জাকে জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডাকার পরামর্শ দিলেন। প্রেসিডেন্ট মির্জা রাজি হলেন না। পদচ্যুত হবার অপমানজনক পরিস্থিতি এড়াবার জন্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী পদত্যাগ করলেন।

পূর্ব পাকিস্তানে তখন আওয়ামী লীগের মধ্যেই চরম কোন্দল। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। অবশেষে শেখ সাহেবকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়। তাঁকে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয় এবং বিদেশে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে প্রেরণের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁকে সফর করতে দিতে অসম্মতি প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নে রওনা হন। কিন্তু ইতোমধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। শেখ সাহেবকেও ফিরে আসতে হয়।

এসময় আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকারে তুমুল কোন্দল দেখা দেয়। এই সুযোগ গ্রহণ করে কৃষক শ্রমিক পার্টি। বিভক্ত কৃষক শ্রমিক পার্টি আবু হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান বুঝতে পারেন, যে কোনো সময় তাঁর মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হতে পারে। তিনি গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন মুলতুবি করার আহ্বান জানান। তাঁর কথা না শুনে ৩০ মার্চ গভর্নর তাঁকে পদচ্যুত করেন। নতুন মুখ্যমন্ত্রী হন আবু হোসেন সরকার। আবু হোসেন সরকারের অনুরোধে ঐদিনই পরিষদের অধিবেশন মুলতুবি হয়। কেন্দ্রে তখন প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নুন। তাঁর সঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পরামর্শে ফিরোজ খান নুন গভর্নর ফজলুল হককে ৩১ মার্চ অপসারণ করেন। ১ এপ্রিল আতাউর রহমান আবারও মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পাকিস্তানের রাজনীতিতে চরম অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।

১৮ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়। পরিষদে ন্যাপের সদস্য সংখ্যা ৩৩। ন্যাপ ভোটাভুটিতে নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবার ফলে আতাউর রহমান সরকারের পতন ঘটে ১৯ জুন। নতুন মুখ্যমন্ত্রী হন আবু হোসেন সরকার। ২২ জুন আবু হোসেন সরকার অনাস্থা ভোটে পরাজিত হন। ২৫ জুন পূর্ব পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট শাসন প্রবর্তিত হয়। এই রাজনৈতিক উত্থান-পতনের জন্যে মূলত দায়ী ছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। তারা কখনো আওয়ামী লীগ আবার কখনো কৃষক শ্রমিক পার্টিতে ভোট দিয়ে এক অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টাবার জন্যেই শেষ পর্যন্ত একটির পর একটি মন্ত্রিসভার পতন ঘটে।

পূর্ব পাকিস্তানে এই প্রেসিডেন্ট শাসনও দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি। শহীদ সোহরাওয়াদী পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে সমঝোতা করতে থাকেন। তাঁর প্রধান দাবি ছিল ১৯৫৯ সালে সাধারণ নির্বাচন দিতে হবে। এই শর্তে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ফিরোজ খান নুনকে সমর্থন দিতে রাজি হন এবং এই ভিত্তিতেই ফিরোজ খান নুন পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রেসিডেন্ট শাসন প্রত্যাহার করেন। ২২ জুলাই পুনরায় আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রাদেশিক অধিবেশন বসে। তখন পরিষদের স্পিকার ছিলেন জনাব আবুল হাশিম। আবুল হাশিমের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। সরকার পক্ষ থেকে স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।

নতুন স্পিকার নির্বাচিত হন ডেপুটি স্পিকার জনাব শাহেদ আলী। শাহেদ আলীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরিষদে তুমুল হাঙ্গামা হয়। হাঙ্গামায় আহত হয়ে শাহেদ আলী ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এই পরিবেশে কেন্দ্রীয় সরকার আর একটি চাল দিলেন। এবার বলা হলো। আওয়ামী লীগকে কেন্দ্রীয় সরকারে অংশ নিতে হবে। সিদ্ধান্ত হলো আওয়ামী লীগের দু-একজন সদস্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগদান করবে। অনেকেই সম্মত হলো না। বলা হলো ১৯৫৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সারা পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন হবে। শেষ পর্যন্ত ২ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কতিপয় সদস্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। দফতর বণ্টনের ব্যাপারে অসভ্রষ্ট হওয়ায় ৭ অক্টোবর তাঁরা পদত্যাগ করেন। ওই দিনই ইস্কান্দার মীর্জা তাঁর বাসভবনে একটি পার্টির ব্যবস্থা করেন। আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরাসহ সকলেই এই পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন। পার্টি শেষে সকলেই যে যার বাসায় ফিরে যান। আর ওই রাত্রিতেই প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা সারা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করেন। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ এবং মন্ত্রিসভা বাতিল করেন। সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করেন। সংবিধান রহিত করেন। প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক শাসক নিয়োগ করেন। আমি তখন ঢাকা হলে। ঢাকা হলেও তখন এক অস্থির পরিস্থিতি।

ইতোমধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে আমার রাজনৈতিক জীবন ও ঢাকা হলের জীবনে। আমি, এনায়েতুল্লাহ খান, আহমেদ হুমায়ুন, আব্দুল হালিম, কাজী বারী প্রমুখ ছাত্রলীগ ছেড়ে দিলাম। আমি ব্যতীত অন্যান্য সকলে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। তাদেরকে কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্রলীগে কাজ করতে বলেছিল। কমিউনিস্ট পার্টির ধারণা ছিল তারা ছাত্রলীগে ঢুকে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করবে। এটা নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনেও ঘটেছিল। এককালে ছাত্র ফেডারেশনেও ঘটেছিল। কমিউনিস্ট পার্টি ও জয়প্রকাশ নারায়ণের কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টির দ্বন্দ্ব ছিল। আর অপ্রত্যাশিত হলেও সত্য যে কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টি অর্থাৎ সিএসপির ছাত্রফ্রন্টের নেতা ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির অমিয় দাশগুপ্ত। তবে কমিউনিস্ট পার্টির এই অন্যের দল দখলের নীতি তেমন কাজে আসেনি। কমিউনিস্ট পার্টিকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হারিয়ে।

আমাদের ক্ষেত্রে ঠিক তেমনটি হলো না। মাত্র একটি জেলার ক্ষেত্রে আমাদের আশাভঙ্গ হলো। কুমিল্লার তাহেরুদ্দীন ঠাকুরকে আমরা কমিউনিস্ট পার্টি ঘেঁষা মনে করতাম। তিনি আমাদের সঙ্গেই চলতেন। কিন্তু দেখা গেল যে ছাত্রলীগ ছাড়বার সময় আমাদের সঙ্গে এলেন না। যদিও পরবর্তীকালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেলে ঢাকা হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। এনায়েতুল্লাহ খান হয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। এ সংসদের অন্যতম সদস্য ছিলেন শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের সিদ্দিকুর রহমান, ওয়ার্কার্স পার্টির হায়দার আকবর খান রননা, প্রয়াত নাট্যজন আবদুল্লাহ আল মামুন।

এনায়েতউল্লাহ খান, আহমেদ হুমায়ুন, আব্দুল হালিম, আজিজুর রহমান, জহিরুল ইসলাম এবং কাজী বারীর সিদ্ধান্ত ছিল ছাত্র ইউনিয়নে যাবার। তবে তাদের সকলেরই ইচ্ছা ছিল আমরা সকলে যেন এক সঙ্গেই ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিই। আমার দলেরও সিদ্ধান্ত ছিল ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেবার। তাই ঠিক হলো ছাত্র ইউনিয়নেই যোগ দিতে হবে।

কিন্তু কীভাবে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেয়া যাবে? ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে তখন ভিন্নভাবে দেখা হলো। ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা মুকুল সেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি তাঁদের কয়েকজন সদস্য নিয়ে আমার কাছে একদিন ঢাকা হলে এলেন–আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানে আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁর কথা হলো, আপনি ছাত্রলীগের একজন নেতা ছিলেন। আর পাঁচজনের মতো আপনি আমাদের সদস্যপদ গোপনে নেবেন তা হতে পারে না। আর আপনি যদি কোনো পদে যেতে চান তাও বলুন।

সে ছিল আমার পক্ষে এক বিড়ম্বনা। আমি ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক ছিলাম। সভাপতি আব্দুল মোমিন তালুকদার এবং সম্পাদক এম এ আওয়ালের সঙ্গে আমার এমন সমঝোতা ছিল যে, এককভাবে আমি কোনো কিছু করলে তাঁরা কিছু বলতেন না। প্রকৃতপক্ষে ছাত্রলীগের সকল খবরই আমার কাছে থাকত। তাই ছাত্র ইউনিয়নে কোন পদে যাবো এ নিয়ে আমার কোনোদিন চিন্তা-ভাবনা ছিল না। এটাও জানা ছিল, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত ছাত্র ইউনিয়নে আমার অবাধ বিচরণ সম্ভব হবে না। কারণ এ ধরনের রাজনৈতিক উদারতা ঐ দলটির কোনোদিন পরিলক্ষিত হয়নি প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রশ্নে। এছাড়া সেখানে বামপন্থী রাজনীতিতে আমাদের দল আরএসপির তেমন কোনো প্রভাব না থাকলেও কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা জানতেন আরএসপির একটি বিকল্প বক্তব্য আছে মার্কসবাদ-লেলিনবাদ সম্পর্কে। স্টালিনকে তারা সঠিক বলে মনে করে না এবং এও মনে করে যে ক্রুশ্চেভের সহাবস্থানের নীতি স্টালিনের আমলেই শুরু হয়েছিল।

সুতরাং মুকুল সেনের সকল সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমাকে ছাত্র ইউনিয়নে নেয়া সহজ হলো না। ব্যাপারটা খুবই বিস্ময়কর নয় কি? একজন ছাত্র, একটি ছাত্র প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে অন্য একটি ছাত্র প্রতিষ্ঠানে যোগ দেবে, তাকে নিতে হলে প্রতিষ্ঠানের কাউন্সিল ডাকতে হবে।

আমার ক্ষেত্রে তাই-ই হয়েছিল। ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ কাউন্সিল ডাকায় অধিবেশন বসলো বার লাইব্রেরি হলে। আমাকে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যপদ দেয়া নিয়ে একমাত্র বরিশাল জেলা থেকে আপত্তি এল। অবস্থান এমন দাঁড়ালো, তারা নোট অব ডিসেন্ট দেবে। কাউন্সিলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্র ইউনিয়নের লেখা। আমার লেখা চিঠি পেশ করা হলো।

বলা হলো নির্মল সেনের জন্যে ঐক্য হয়নি। তাই তাকে ছাত্র ইউনিয়নে নেয়া যাবে না। সম্মেলনের সভাপতি ড, আলমগীর বললেন, এ চিঠি ছাত্রলীগ সম্পাদক এম এ আউয়ালের পক্ষ নিতে নির্মল সেন লিখেছেন, তাই এ আপত্তি গ্রাহ্য নয়।

এ সময় আমার খুব খারাপ লাগছিল। বললাম, আমি কিছু বলব। বাধা দিলেন আজিজুর রহমান খান। তখন তিনি ফজলুল হক হলের ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট, পরবর্তীকালে অর্থনীতিবিদ এ আর খান নামে পরিচিত। আজিজ আমাদের সঙ্গেই ছাত্রলীগ ছেড়েছিলেন। আজিজ বললেন, আমরা বিবৃতি দেব। আপনি আমাদের সঙ্গে এসেছেন। আমরাই আপনাকে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য পদ দেব।

ইতোমধ্যে আমাকে নিয়ে বক্তৃতা শুরু হয়েছে কাউন্সিলে। এ সময় কক্ষে ভাষণ দিলেন বগুড়ার সাদেক আলী আহমদ ও দুর্গাদাস মুখার্জী। পুরো এক ঘন্টা বক্তৃতা দিলেন আজিজুর রহমান খান। আমার মনে হয়েছিল লেডি ম্যাকবেথের মৃত্যুর পর ম্যাকবেথের বলা কথা শুনছি। আজিজের বক্তৃতার পর কাউন্সিলে ভোট হলো। আমার বিরুদ্ধে দুটি ভোট পড়ল। এ দুটি ভোটই বরিশালের।

কাউন্সিলে আমাকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচন করা হলো। পরবর্তী দিন কমিটি নির্বাচিত হবে। তখন ছাত্র ইউনিয়নের গঠনতন্ত্রে এমন বিধি ছিল। কাউন্সিলে পুরো কমিটি নয়। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হবে। এ সদস্যরাই পরবর্তীকালে সভাপতি, সম্পাদক নির্বাচন করবে।

পরদিন এই সভাপতি সম্পাদক নির্বাচন নিয়ে দুঃখজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। যারা আমার ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যপদ দেয়া ঠেকাতে পারেনি তারা। সারা রাত তৎপর ছিল। মুখে মুখে রটে গিয়েছিল আমাকে নাকি সহসভাপতি করা হবে। খুলনার গাজী শহীদুল্লাহ এবং গাজী লুৎফর রহমান বলল, আমাদের পক্ষে আপনাকে আর সমর্থন করা সম্ভব হবে না। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে ভিন্ন নির্দেশ এসেছে। কিন্তু জহিরুল ইসলামসহ অনেকে কমিউনিস্ট পার্টির লোক হলেও এ নির্দেশ মানতে রাজি ছিল না। জহির ছিল ঢাকা হলে আমার রুমমেট এবং আমার সঙ্গে ছাত্রলীগ ছেড়েছিল। এ ধরনের আমার অনেক সমর্থক ছিল যারা প্রকৃতপক্ষে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রফ্রন্টের লোক ছিল।

এ পরিস্থিতিতে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের বৈঠক বসল। যতদূর মনে আছে ড, আলমগীরই সভাপতি হলেন। সাধারণ সম্পাদক হলেন সাইফুদ্দিন আহমদ, দপ্তরবিহীন সম্পাদক হলেন আহমেদ হুমায়ূন। প্রশ্ন দেখা দিল আমার নাম সহসভাপতি হিসেবে উত্থাপিত হওয়ায়। প্রস্তাব উত্থাপন করলেন জহিরুল ইসলাম। উপর থেকে ভিন্ন প্রস্তাব এল। কিন্তু কোনো পক্ষই ভোটে যেতে রাজি নন। এক সময় জহির ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে পদত্যাগের কথা বললেন। আমি এ পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। এতদিন বাইরে থেকে ছাত্র ইউনিয়নের কথা শুনে একটি ধারণা জন্মেছিল এ সংগঠনটি ঐক্য চায় না। আমার ঘটনাতেই তা প্রমাণিত। প্রকৃত পরিস্থিতি তেমন নয়। তাই বৈঠকে আমি এক সময় বললাম আমি প্রার্থী হচ্ছি না। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবেই আমি কাজ করব। গণ্ডগোল মিটে গেল। এবারের জন্যে যবনিকাপাত হলো। পরবর্তীকালে খবর হচ্ছে আমি ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসেবেই জেলে গিয়েছিলাম। জেল থেকে এসে দেখি ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলন হচ্ছে। কিন্তু সে সম্মেলনে আমাকে ডাকা হলো না। সে ঘটনা আরো পরে।

এদিকে ঢাকা হলে এখন ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইছেন না অমুসলমান ছাত্ররা ঢাকা হলে থাক। তাই প্রতিদিন গণ্ডগোল সৃষ্টি করা হতো ঢাকা হলে। ঢাকা হল কসমোপলিটন হল হলেও মুসলমান ও অমুসলমান ছাত্রদের জন্যে পৃথক রান্নার ব্যবস্থা ছিল। হলের কিছু কর্মকর্তার প্ররোচনায় কতিপয় মুসলিম ছাত্র প্রায় দিনই অমুসলমান ছাত্রদের খাবার খেয়ে ফেলত, হামলা চালাতো এদের রান্নাঘরে। এ ছাত্ররা ছিল মুখ্যত ন্যাশনাল ছাত্র ফেডারেশন এনএসএফ-এর অনুসারী। এ পরিস্থিতিতে অমুসলমান ছাত্ররা জগন্নাথ হলে যাওয়া শুরু করল।

নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো সরস্বতী পূজা নিয়ে। কসমোপলিটন হলে হিন্দু ছাত্ররা সরস্বতী পূজা করতে চায়নি। আমি বললাম, এটা সঠিক নয়। আপনারা সরস্বতী পূজা করলে মুসলিম ছাত্ররা যদি গরু কোরবানি দেয় এ হলে থাকবেন আপনারা। ওদের গরু কোরবানিও আপনাদের পূজার মতো। আমি তাদের, বোঝাতে পারলাম না। সাড়ম্বরে সরস্বতী পূজা হলো ঢাকা হলে এবং পরবর্তীকালে মুসলমান ছাত্ররা ঈদুল আজহায় গরু কোরবানি দিল। কী এক করুণ অবস্থা। হলের একশ্রেণির কর্মকর্তা এ কাজে ইন্ধন যোগালেন। যিনি প্রত্যক্ষ সব কিছু করলেন তিনি হলের অন্যতম হাউস টিউটর মীর ফখরুজ্জামান। মিষ্টভাষী এবং সদালাপী এই মানুষটি যে কি করতে পারেন তা সেদিন হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলাম। আবার দৃঢ়তাও খুঁজে পেয়েছিলাম অন্যান্য কর্মকর্তার মধ্যে।

ঢাকা হলে (আজকের শহীদুল্লাহ হল) আমার কক্ষ নম্বর তখন ১০৬। এ কক্ষে আমি, জহিরুল ইসলাম (এককালের সরকারি কর্মকর্তা এখন অনিয়মিত কলাম লেখক) ও আহমদ হোসেন (যুগ্ম সচিব হিসেবে অবসর নিয়েছেন)। আমাদের সঙ্গে ছিলেন হিমাংশুরঞ্জন দত্ত (অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব)। হিমাংশু দত্ত চলে গেছেন জগন্নাথ হলে। আমাদের কক্ষে এসেছেন প্রয়াত শান্তিরঞ্জন কর্মকার (বাংলাদেশ ব্যাংকের এককালীন কর্মকর্তা)।

সেদিন ঈদুল আজহা। আমাদের মন ভালো না। হলে গরু জবাই হয়েছে। না খেয়ে অমুসলমান ছাত্ররা হল ছেড়ে চলে গেছে। ক্ষুব্ধ জহিরুল চলে গেছে বাইরে। আহমেদ হোসেন বললেন, আমাদেরও হলে খেয়ে কাজ নেই। চলুন হোটেলে খেয়ে আসি। স্টেডিয়ামের সামনে মোটামুটি অভিজাত হোটেল লা সানি। আমরা দু’জন সেখানে খেয়ে হলে ফিরে এলাম।

হলে ফিরে দেখি আমার টেবিলে পরিপাটি করে খাবার সাজানো। এমনিতেই আমি ডাইনিং হলে খেতাম না। আমার হলে ফেরার সময়ের ঠিক ছিল না। তাই আমার খাবার টেবিলেই ঢাকা থাকল। তবে এমনটি করে পরিপাটি করে সাজানো নয়। ঢাকনি খুলে খাবার দেখারও প্রবৃত্তি হলো না। সারাটা দিন হলে শুয়ে থাকলাম। রাত বারোটার দিকে আমাকে জানানো হলো হাউস টিউটর ফখরুজ্জামান সাহেব আমাকে ডেকেছেন। তিনি আমাকে সাধারণত গভীর রাতেই ডাকতেন। হাউস টিউটরের কোয়ার্টারে আমাকে যেতে হলো। ঢুকতেই প্রশ্ন করলেন, দুপুরে খেয়েছি কিনা। বললেন, তোমার খাবারও পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। কোনো অসুবিধা হয়নি তো। আমি বললাম, স্যার আমাকে খাইয়ে কী হবে? ঈদ তো আনন্দের। গরুর পরবর্তে খাসি জবাই করলে সবাই মিলে খাওয়া যেতো। আমার কোনো ব্যাপারে আপত্তি নেই। কিন্তু যাদের আপত্তি তারা তো কেউ হলে খেল না। আমাকে এখন গভীর রাতে ডেকে কোনো লাভ আছে কি?

মীর ফখরুজ্জামান সাহেব একটু সরে বসলেন। মনে হলো তিনি ভয় পেয়েছেন। জানতে চাচ্ছেন আমি কোনো গণ্ডগোল করবো কিনা। তাই হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, নির্মল তুমি কী করে চলো। শুনেছি তোমার কেউ নেই। শুধু রাজনীতি করো। আমি বললাম–স্যার, টিউশনি করি। ছাত্র পড়িয়েই চলে যায়। কারো অধীনে কোনো কিছু করা আমার ধাতে সয় না।

নির্মল তোমাকে আমি সাহায্য করতে পারি। ভালো টিউশনি দিতে পারি। তুমি নেবে? গভীর রাতে হাউস টিউটরের এ কথা শুনে মনে হলো কর্তৃপক্ষ এবার আমাকে কিনতে চাচ্ছে। আমি বললাম-স্যার, জেলে যেতে না হলে

আর নিয়মিত পড়ার সুযোগ পেলে আমিও হয়তো এতোদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারতাম। আমাকে আপনার সাহায্য করতে হবে না। আমি নিজেই চলতে পারব। আমাকে যেতে দিন। বিদায় নিয়ে কাউকে কিছু না বলে শুয়ে পড়লাম।

কিন্তু হল কর্তৃপক্ষকে এড়ানো গেলো না। ভোরবেলা দেখি প্রভোস্ট এস এন কিউ জুলফিকার আলী সাহেব আমার কক্ষে হাজির। বললেন, কেমন আছেন? খুব স্নেহের কণ্ঠে বললেন, এমনি করে কি দিন চলবে? আপনি আজ দুপুরের দিকে আমার বাসায় যাবেন।

প্রভোস্টের বাসা ১০ ফুলার রোড। আজকে সেখানে সায়েন্স এনেক্স। এককালে নির্মিত হয়েছিল ব্রিটিশ ধাচে। পূর্ববঙ্গ আসাম প্রদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এ ভবনগুলো হস্তান্তরিত করা হয়। ভাবছিলাম প্রভোস্টের বাসায় যাব কিনা। কারণ এর মধ্যে আরো কিছু ঘটনা ঘটে গেছে।

একদিন সকালের দিকে আমাকে হাউস টিউটরের কক্ষে ডাকা হলো। কক্ষে ঢুকে দেখি চারজন হাউস টিউটরই বসে আছেন। এ চারজন হচ্ছেন ড. সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক মুনীম, মুকলেসুর রহমান এবং মীর ফখরুজ্জামান। ড. ইসলাম বললেন, তুমি কি জবাব দিতে পার তোমাকে হল থেকে বহিষ্কার করার হবে না কেন? তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে গতকাল রাত বারোটার পর তোমার কক্ষে গান হয়েছে। এটা হলের শৃঙ্খলা বিরোধী।

প্রশ্ন শুনে আমি কিছুটা অবাক হলাম। কারণ ওই গানের কথা আমি জানতাম না। পরে শুনেছি সত্য সত্যই আমার কক্ষে সে রাতে গান হয়েছিল। গান গেয়েছিলেন সুরেশ বাবু। বাড়ি নড়াইল কি মাগুরা। ইতিহাসের ছাত্র। তিনি স্বভাব গায়ক। শেষ বর্ষের পরীক্ষা হয়ে গেছে। হল ছেড়ে যাবেন। তাই মনে হয় সকলকে গান শুনিয়েছিলেন। সকলে তাঁকে ডাকত সুরেশদা। সুরেশদা আমার কক্ষে গান গেয়েছিলেন আমার অনুপস্থিতিতে। বুঝলাম আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ খুঁজে না পেয়ে এ অভিযোগ আনা হয়েছে।

আমি বললাম, রাত বারোটার পর কোনো কক্ষে গান গাওয়া অপরাধ তা আমি জানতাম না। আপনারা আমাদের কোনো নিয়ম জানাননি। আমরা ড, গোবিন্দ দেবের অধীনে ছিলাম। তিনি কোনোদিন এ সম্পর্কে কিছু জানাননি। আপনারা এ হলে নতুন। আপনারাও জানাননি। তাই আমার অপরাধ কোথায়? আমার কথা শুনে সকলে নীরব হলেন। শুধুমাত্র মুনীম সাহেব বিড়বিড় করে বলতে থাকরেন–হি ইজ টু মাচ ইনটেলিজেন্ট-ইউ ক্যান নট ক্যাচ হিম।

মীর ফখরুজ্জামান এবার মুখ খুললেন। তিনি বললেন, তুমি প্রতিদিন গভীর রাতে হলে আস। তুমি জানো না যে, রাত ন’টার পূর্বেই হলে আসতে হবে। এ অপরাধে তোমাকে বহিষ্কার করা যায়, তা কি তুমি জানো?

প্রকৃতপক্ষে আমি রাত এগারোটা, বারোটা, একটা, দু’টায়ও ফিরতাম। তবু আমি প্রশ্ন করলাম–স্যার, এর কি প্রমাণ আছে? কেউ কি সাক্ষ্য দেবে? বা আপনাদের গেটের বইয়ে এ ধরনের কোনো কিছু লেখা আছে কি?

এবারও হাউজ টিউটরেরা চুপ করে গেলেন। একই কথা বিড়বিড় করে বললেন মুনীম সাহেব। আমি চুপ করে বসে থাকলাম।

এবার মোক্ষম অস্ত্রটি ছাড়লেন ড. সিরাজুল ইসলাম। তিনি বললেন, তুমি এখন হলের নিয়মিত ছাত্র নও। তুমি হলে আছ কী করে? আমি বললাম, স্যার যদি পাল্টা প্রশ্ন করি–আমি হলের ছাত্র না হলেও হলে আপনারা রাখছেন কী করে? আমার খাওয়ার টাকা নিচ্ছে কী করে? আমার নামে কক্ষ বরাদ্দ হয়েছে কী করে?

এবারও তারা চুপ করে গেলেন, মুনীম সাহেব এবার জোরে বললেন, ইউ ক্যান নট ক্যাচ হিম। ড. ইসলাম বললেন, তুমি যাও। তবে সকাল থেকে রাত ৯টার মধ্যে হলে ফিরবে এবং গেটে বইয়ে স্বাক্ষর করবে।

এখানে একটি ভিন্ন কাহিনী আছে। আমার রাজনৈতিক কারণে ১৯৫৭ সালে পরীক্ষা দেয়া হয়নি। পরীক্ষা দিতে হবে ১৯৫৮ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি চেয়ে আবেদন জানিয়েছি। সেই আবেদনপত্র কিছুতেই প্রভোস্ট অফিস রেজিস্ট্রি অফিসে পাঠাচ্ছে না। আর আমাকেও কিছু বলতে পারছে না। থাকতে দিতে হচ্ছে হলে।

আমি কক্ষে চলে গেলাম। পরদিন রাত ৯টায় ফিরলাম হলে। গেটে দারোয়ান প্রমোদ বলল বইয়ে স্বাক্ষর দিন। বইয়ে স্বাক্ষর দিলাম। সময়ের জায়গায় লিখলাম, রাত তিনটা। প্রমোদ বলল, একি করছেন? আমি বললাম, দেখো না কী হয়? পরপর সাতদিন এভাবে স্বাক্ষর করায় একদিন প্রমোদ বলল–স্যার বলেছেন, আপনাকে বইয়ে সই না দিতে।

পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নিল হলের হিন্দু কর্মচারিরা কালীপূজা করায়। ঢাকা হল কসমোপলিটন হল। সকলেরই সকল ধর্ম পালনের অধিকার আছে। তাই হাউস টিউটর ড. সিরাজুল ইসলাম তাদের পূজার অনুমতি দিয়েছিলেন। ফলে তাকে শোকজ করা হয়। ড, ইসলামকে চলে যেতে হয় ঢাকা হল থেকে। যাবার আগে তিনি আমাকে ডাকলেন। বললেন, নির্মল, সতর্ক থেকো। তোমার সম্পর্কে একটি চিঠি আছে আমার কাছে। চিঠিটা লিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে লেখা হয়েছে–আউট এ কেস এগেনস্ট হিম অ্যান্ড এক্সপেল হিম ফ্রম দি হল (তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ আনো এবং তাকে হল থেকে বহিষ্কার করো)। হল থেকে বহিষ্কার করার অর্থ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার। ছাত্রজীবন শেষ।

এ পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহা আসে। ঢাকা হলে গরু কোরবানি হয়। অমুসলমান ছাত্ররা হল ছেড়ে যায়। আমাকে সাহায্য করার প্রস্তাব দেন হল কর্তৃপক্ষ। প্রভোস্ট হলে এসে আমন্ত্রণ জানান তাঁর কোয়ার্টারে।

হাউস টিউটর ড. সিরাজুল ইসলাম হল থেকে চলে গেলেন। আমাকে বলে গেলেন সতর্ক থাকতে। যেহেতু তার কাছে চিঠি আছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।

আমি তখন সকল দিক থেকে বিপর্যস্ত। প্রভোস্ট জুলফিকার আলী সাহেবের দুকন্যা, এক পুত্র পড়াবার দায়িত্ব নিয়েছি। অথচ তার সঙ্গে আমার বনিবনা হচ্ছে না। তিনি আমাকে হলে রাখছেন। কিন্তু ভর্তি হবার জন্যে আমার ফাইল পাঠাচ্ছেন না কোথাও।

রাজনীতির দিক থেকে তখন প্রায় একাকী। দলের অবস্থানটি আশানুরূপ নয়। কমিউনিস্ট পার্টিকে আগেই অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তারা কেউ ন্যাপে, কেউ আওয়ামী লীগে ঢুকে কাজ করছে। আমাদের দলের ব্যাপারে ভিন্ন মত। কোনো দলে ঢুকে নিজস্ব রাজনীতি করা যায় না। অন্যের রাজনীতিই করতে হয় অথচ প্রকাশ্যে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল (রিভল্যুশনারি সোসালিস্ট পার্টি অর্থাৎ আরএসপি) করার পরিবেশ তখন ছিল না। এ নিয়ে দলের মধ্যে মতানৈক্য আছে। নিতাই গাঙ্গুলির মতে, প্রকাশ্যে নামা উচিত। দলের অধিকাংশ সদস্যের ভিন্নমত। ১৯৫৩ সালে গঠিত দলের কেন্দ্রীয় কমিটি কাজ করছে না। এবিএম মুসা রাজনীতিতে নেই। রুহুল আমিন কায়সার অসুস্থ। মাত্র কিছুদিন আগে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বর্ষিয়ান নেতা অতীন্দ্রমোহন রায় কুমিল্লায় আছেন। এককালে ডাকসাইটে শ্রমিক নেতা নেপাল নাহা নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে কুমিল্লায় শিক্ষকতা করছেন। বরিশালের সুধীর সেন কখন জেলে যান আর কখন মুক্তি পান তার হিসাব রাখা কঠিন। জিয়াউল হক রইসউদ্দিন নোয়াখালিতে আছেন। রাজনীতির সঙ্গে তার তেমন সম্পর্ক নেই।

বেশ কিছুদিন আগে রুহুল আমিন কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করি যে তিনি অসুস্থ। আমার রুমমেট হিমাংশুরঞ্জন দত্ত। তাঁর বাবা হাজীগঞ্জের নরেন্দ্রনাথ দত্ত ডাক্তার ছিলেন। পরবর্তীকালে একাত্তর সনে তাঁকে খুন করা হয়। আমি যাচ্ছিলাম চাঁদপুরে ছাত্রলীগ সম্মেলনে। হিমাংশু বলেছিল আমাদের বাসা হাজীগঞ্জে, যাবেন? বলেছিলাম যাব। আমি বললাম, দেখুন আমি কথা দিলে কথা রাখি। আমি গেলে বিপদে পড়বেন না তো।

হিমাংশু আশা করেনি। তবুও হাজীগঞ্জে রেল স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল। সেখানে ট্রেনেই চাঁদপুর হয়ে মানুষ হাজীগঞ্জ যেত। হাজীগঞ্জ গিয়ে বিপদে পড়ে গেলাম। আমি কোনোদিন প্রকৃতপক্ষে কোনো সংসারে মানুষ হইনি। শৈশবে বাবা মারা গেছেন। বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পড়েছি। কলেজে পড়তে গিয়ে বাড়ি যাওয়া হয়নি। জেলে চলে গেছি। মা, ভাই-বোন কারো সঙ্গে তেমন কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তাঁরা ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন। মার সঙ্গে শেষ দেখা ১৯৪৮ সালে। ১৯৫৭ সালে হিমাংশু বাবুর মায়ের সঙ্গে দেখা। তিনি প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী খেতে ভালোবাসো?

আমি বললাম, জানি না। কারণ এ প্রশ্ন আমাকে কোনোদিন কেউ জিজ্ঞাসা করেনি। খানিকটা অবাক হলেন তিনি। বললেন–তোমার মা কোথায়?

– পশ্চিমবঙ্গে।

– কতদিন দেখা হয় না?

– ন’বছর।

এবার তিনি রেগে গেলেন। বললেন, তুমি আমার বাড়ি থেকে চলে যাও। এ কেমন ছেলে তুমি, নিজের মায়ের সঙ্গে দেখা করো না?

আমি বিব্রত বোধ করলাম। বললাম, আপনি আমাকে পাসপোর্ট দেবেন? গত ৮ বছরের সাড়ে চার বছর জেলে ছিলাম। দু’বছর ছিলাম খুনের মামলার আসামী হয়ে আত্মগোপন করে। কার খবর রাখব, বলুন।

এবার তিনি যেন শান্ত হয়ে গেলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথায় যাবে? আমি বললাম, বিকালে আপনাদের মসজিদ প্রাঙ্গণে জনসভা আছে যুক্ত নির্বাচনের দাবিতে। আমি এবং মহিউদ্দিন আহমদ বক্তা। বক্তৃতার পর রাতেই রামগঞ্জ থানার পানিওলা যাব। সেখানে আমার বন্ধু রুহুল আমিন কায়সার প্রধান শিক্ষক একটি স্কুলের।

হিমাংশু বাবুর মা বললেন, তুমি এখন বারান্দায় শুয়ে থাকবে। বিকেলে জনসভায় যাবে। সন্ধ্যার আগে ফিরে আসবে। আমরা নৌকা করে দেব। ভোরবেলা পানিওয়ালা যাবে।

বিকালে জনসভা শেষ হতে সন্ধ্যা ছাড়িয়ে গেল। দেখলাম ছোট্ট একটি মেয়ে হারিকেন হাতে আমাকে খুঁজছে। মেয়েটির বয়স সাত-আট বছর হবে। হিমাংশু বাবুর ছোট বোন দীপু। আমার বিলম্ব দেখে তাঁর মা পাঠিয়েছেন আমাকে খুঁজতে।

সকালে নৌকায় হাজীগঞ্জ ছেড়ে গেলাম। হাজীগঞ্জ থেকে নৌকায় পানিওয়ালা। আজ মনে হয় কল্পনা করাও যায় না। বাঁধে বাঁধে এখন জমি আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। কোথাও জল নেই নৌকা চলার মতো।

পানিওয়ালা পৌঁছে আমার আক্কেল গুড়ুম। শুনলাম প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন কায়সার ১২ দিন যাবৎ অসুস্থ। প্রবল জ্বর। আমাকে ঢাকায় খবর দেয়া হয়েছে। তাদের ধারণা, খবর পেয়েই আমি ওখানে গিয়েছি। তাই আমার পানিওয়ালা থাকা হলো না। পানিওয়ালা থেকে নৌকায় মেহের কালীবাড়ি (বর্তমানে মেহের) রেল স্টেশন। মেহের থেকে লাকসাম। লাকসাম থেকে রাতে ঢাকা পৌঁছে রুহুল আমিন সাহেবকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে।

এ পরিস্থিতিতে আমাকে ঢাকা হল নিয়ে অনশন করতে হয়েছে। দলের নির্দেশে ছাত্রলীগ ছেড়ে ছাত্র ইউনিয়নে আসতে হয়েছে। অপরদিকে সামরিক শাসন জারি হয়েছে। হাজার হাজার নেতা কর্মী গ্রেফতার হয়ে যাচ্ছে। আমিও বা কতদিন বাইরে থাকব তার নিশ্চয়তা নেই। বুঝতে পারলাম আমার ঢাকা হলে থাকাও সম্ভব হবে না।

ড. ইসলাম যাবার পর একদিন হাউস টিউটর আমাকে ডাকলেন। বললেন, তুমি ভর্তি হতে পারছ না। তাই তোমার হলের আসন বাতিল করা হলো। আমি বললাম, স্যার এটা কী করেছেন? আপনারা আমার ভর্তির আবেদনপত্র আদৌ রেজিস্ট্রার অফিসে পাঠালেন না। ফলে আমার ভর্তির কোনো সুরাহা হলো না। দেশে সামরিক আইন। আমি কোথায় যাব? হলের বাইরে গেলে গ্রেফতার হয়ে যাব। আপনারা নির্দেশ দিলেও আমি যাব না।

ড, জামান বললেন, তোমাকে যেতে হবে না। তুমি তোমার কক্ষে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করে থাকবে। তুমি হলেই টাকা দিয়ে খাবে। তোমাকে ডিস্টার্ব করা হবে না। জানি না, প্রভোস্টের বাসায় শিক্ষকতা করতাম বলে এ সুবিধা দেয়া হলো কিনা। পরদিন আমি প্রভোস্টের কক্ষে ঢুকে বললাম, আমাকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দিন। তিনি আমতা আমতা করলেন। কোনো জবাব দিলেন না।

আমি বুঝলাম আমার ঢাকা হলে থাকা হবে না। পরীক্ষার অনুমতি পাব। অবশেষে জেলে যেতে হবেই। জেলে গেলে বিজ্ঞান পড়া হবে না। তাই একদিন ঢাকেশ্বরী এলাকায় সিটি নাইট কলেজে গেলাম। অধ্যক্ষকে বললাম, আমি বিএ ক্লাসে ভর্তি হব। আমার বিষয় হবে অর্থনীতি ও দর্শন। এককালে রসায়নেও অনার্স-এর ছাত্র ছিলাম। তারপর ছাত্র হলাম পাস কোর্সে পদার্থ, রসায়ন এবং গণিত নিয়ে। এবার আর বিজ্ঞান নয়। বিজ্ঞান আমাকে জেলখানায় অনেক জ্বালা দিয়েছে। জেলের বাইরে নিয়মিত ক্লাস করতে পারিনি। পরীক্ষা দেয়া হয়নি। এবার বিএ ক্লাসের ছাত্র হলাম, হল কর্তৃপক্ষ জানলেন না। ২/১ জন বাদে কোনো বন্ধু জানল না। জানতে পারল না সরকারি গোয়েন্দা বিভাগ। তবে বিএ ক্লাসে ভর্তি হলেও সিটি নাইট কলেজে আমি কোনোদিন ক্লাস করিনি।

এ পরিস্থিতিতে এগিয়ে এল ১৯৫৯ সাল। সামরিক আইনের কবলে পাকিস্তান। ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে ডাকসু–ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন। আমার জন্যে আর এক পরীক্ষা। আর এক বিপদ।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়েছে। দেশে সংবিধান, পার্লামেন্ট বাতিল হয়েছে। সামরিক আইন জারি করে ঢাকা স্টেডিয়ামে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খান এসেছেন। স্টেডিয়ামে হাজার হাজার মানুষ তাকে স্বাগত জানিয়েছে।

মাত্র ৪ বছর। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলায় সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করেছিল। সে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নূরুঙ্গ আমিন, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খানের কাছে। সেদিন ঢাকায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল। মাত্র চার বছরে সব কিছু উল্টে গেল।

কিন্তু কেন? এর একটি স্বাভাবিক জবাব দেয়া যায়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ভোট ছিল নেতিবাচক অর্থাৎ আমরা মুসলিম লীগকে চাই না। এ কথা সত্যি যে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা দাবি ছিল। এ দাবিকে কেন্দ্র করে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে গিয়েছিল। সে দাবি বাস্তবায়ন করা হবে। এ প্রতিশ্রুতি যুজফ্রন্ট নেতারা দিয়েছিলেন। তবুও যুক্তফ্রন্টের নেতাদের আচরণ প্রথম থেকে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে।

যুক্তফ্রন্টের প্রধান তিন নেতা ছিলেন–(১) শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, (২) মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও (৩) শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই তিন নেতার মধ্যে পার্থক্য ছিল একান্তই স্পষ্ট। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে এঁরা একমত হতে পারেননি। এমনকি শেষ পর্যন্ত এক আসনে দুই প্রার্থীও থেমে গেছে। এছাড়াও যুফ্রন্টের শরিক দল ছিল নেজামে ইসলামী ও গণতন্ত্রী দল। রাজনীতির ব্যাখ্যায় একটি জগাখিচুড়ি। এ যুক্তফ্রন্ট প্রথম দিকে আওয়ামী মুসলিম লীগ বা কৃষক শ্রমিক পার্টি (কেএসপি)-ও চায়নি। এ যুক্তফ্রন্টের উদ্যোক্তা ছিল পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। অর্থাৎ দেশের যুব ও ছাত্র সমাজ। বার বার নেতারা দ্বিমত পোষণ করেছেন। মনে হয়েছে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাচ্ছে। আর বারবার ছাত্ররা মিছিল করেছে। নেতাদের ঘেরাও করেছে। এদের কথা, ঐক্যবদ্ধ না হলে মুসলিম লীগকে হারানো যাবে না। শেষ পর্যন্ত ভাঙা যুক্তফ্রন্ট একসঙ্গে নির্বাচন করেছে। কেএসপি বলেছে গণতন্ত্রী দল কমিউনিস্টদের। কমিউনিস্টদের ভারসাম্য বিধান করে নিতে হয়েছে ইসলামপন্থী মওলানা আতাহার আলীর দল নেজামে ইসলামকে। অর্থাৎ যুক্তফ্রন্ট ছিল একটি অপূর্ব রাজনৈতিক জোড়াতালি। এই যুক্তফ্রন্টের প্রশ্নে আমাদের দল আরএসপি একমত ছিল না। আমরা বলেছিলাম এ ঐক্য টিকবে না। শেষ পর্যন্ত হতাশা সৃষ্টি করবে এবং আরএসপি ওই নির্বাচনে প্রার্থী দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মওলানা ভাসানী এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুরোধে প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করা হয়। আমরা একমত না হলেও যুক্তফ্রন্টের পক্ষে কাজ করেছি। সারাদেশে তখন যুক্তফ্রন্টের নামে জোয়ার আর এই নির্বাচনেই প্রথম নৌকা প্রতীক নির্বাচনের রাজনীতিতে আসে। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল নৌকা। নৌকা প্রতীক নিয়ে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ২৩৭ আসনের মধ্যে ২২৭ আসনে জয়লাভ করল। সেদিন ঢাকায় ছিল মিছিল আর মিছিল।

কিন্তু সে যুক্তফ্রন্ট টিকল না। পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগের পরাজয় স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার এবং বেসামরিক ও সামরিক আমলারা। তাদের ধারণা পূর্ববাংলার সবকিছু হয়েছে কমিউনিস্টদের প্ররোচনায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ছিল তখন কমিউনিস্টবিরোধী জোটে। এ জোটের নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই পূর্ববাংলার নির্বাচনের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন–এ নির্বাচনের কোনো প্রভাব পাকিস্তানের রাজনীতিতে পড়বে না।

তাই তারা প্রথম থেকেই চেষ্টা করছিল যুক্তফ্রন্টকে ভাঙতে। আর এ সুযোগ দিয়েছিল যুক্তফ্রন্ট নেতারা। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হলেও যুক্তফ্রন্ট একটি ঐক্যবদ্ধ মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারল না। প্রথমে কেএসপির তিনজন সদস্য নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হলো। এপ্রিলে সকলকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই কর্ণফুলি পেপার মিল ও আদমজী জুট মিলে বাঙালি-বিহারী দাঙ্গার অজুহাতে পূর্ববাংলার মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে প্রেসিডেন্ট শাসন জারি করা হলো। শেরেবাংলা ফজলুল হককে দেশদ্রোহী ঘোষণা করা হলো। তাঁকে নজরবন্দি করা হলো। শেখ মুজিবুর রহমানসহ হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করা হলো।

এ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মাঝখানে ষড়যন্ত্রকারীরা জিতে গেল। যুক্তফ্রন্ট ভেঙে গেল। কখনো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা, আবার কখনো কেএসপির নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হলো। নিজের দলকে তোয়াক্কা না করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভার আইনমন্ত্রী হলেন। পূর্ববাংলার স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে সংখ্যাসাম্য ও দুইউনিট মেনে পাকিস্তানের সংবিধান রচনার চেষ্টা করলেন। অপরদিকে দেশদ্রোহী নজরবন্দি শেরেবাংলা একে ফজলুল হক–যারা তাঁকে নিগৃহীত করেছিল, সেই মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন। পরে একসময় গভর্নর হলেন পূর্ববাংলার।

অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গেলেন এই নেতারা। মানুষের তখন চরম ঘৃণা এই নেতাদের বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত প্রাদেশিক পরিষদে ডেপুটি স্পিকার নিহত হলেন। তারপর এলো সামরিক শাসন। সামরিক শাসক এলেন ত্রাতারূপে। তাই ১৯৫৮ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে জেনারেল আইয়ুবের সংবর্ধনা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। ছিল রাজনীতিকদের চরম পরাজয়ের স্বাক্ষর।

১৯৫৪ সালে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। এরপর ছিল সাধারণ নির্বাচন। পড়াশুনা ব্যাহত হলো। আমরা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল হকের কাছে গেলাম। অনুরোধ জানালাম এবার যেন হঠাৎ করে কোনো কঠিন প্রশ্ন করা না হয়। আমরা চাই না ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থীরা গোলযোগ করুক। কারণ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন একটা কিছু ঘটতে পারে। তিনি রাজি হলেন। কথা দিলেন তিনি সতর্কতা অবলম্বন করবেন।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কাজটি হলো উল্টো। ইংরেজিতে একটি রচনা এলো, রচনার নাম হলো-এ জব। ড. হক স্কাউটের কর্মসূচির অঙ্গ মনে করে তিনি এ কাজটি করেছেন। অথচ গ্রামবাংলার ছাত্র এমন কি অধিকাংশ শিক্ষকও এ ধরনের রচনার খবর রাখেন না। সুতরাং আবার ড. হক সাহেবের কাছে যেতে হলো। তিনি আশ্বাস দিলেন, উত্তরপত্র নিরীক্ষণের সময় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সে সময় পাক-মার্কিন সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। তাই আমাদের স্কুলের পাঠ্যবইও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রিত হয়ে আসত। আমরা প্রতিবাদ করলাম। আবার ড. হকের কাছে গেলাম। তিনি উচ্চকণ্ঠে হাসলেন। বললেন, বলেন কী এতে অসুবিধা কোথায়? তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রিত বইয়ের একটি কপি হাতে নিয়ে বললেন, দেখুন এ বই কত শক্ত। এ বই টানলেও ঘেঁড়ে না। আমরা বললাম, শক্ত বই নয়। পড়ার যোগ্য দেশে মুদ্রিত বই চাই। পরবর্তীকালে এ নিয়ে তুমুল আন্দোলন হওয়ায় বাধ্য হয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হয়।

এরপর বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়ে এলেন ড. কুদরত-ই খুদা। তিনি আবার বাংলায় কথা বলতে চাইতেন না। তখন চারিদিকে দাবি উঠেছে বাংলা ভাষায় সকল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করতে হবে। এমনকি গণিতের প্রশ্নও বাংলায় হতে হবে। সেদিন আমি একাই বোর্ড অফিসে গেলাম। ঢুকতেই ড, খুদা বললেন, হোয়াট হ্যাঁজ ব্রট ইউ টু মি? আমি চুপ করে থাকলাম। বললাম, বাংলায় বলুন। তিনি বললেন, কী চাই? আমি বললাম, ছাত্রদের দাবি, গণিতের প্রশ্ন বাংলায় করতে হবে। মনে হলো, উনি আমাকে স্কুলের ছাত্র মনে করেছেন। আবার তিনি ইংরেজিতে বললেন, ডু ইউ নো হোয়াট ইজ এ রাইট অ্যাঙ্গেল? তুমি কি জানো সমকোণ কাকে বলে? গো, রিড অ্যান্ড সিট ফর একজামিনেশন।

আমার ইচ্ছে হচ্ছিল চিৎকার করি। আমি বললাম, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, স্কুলে পড়ি না। স্কুলের ছাত্র পড়াই। তবে আপনাকে বলে যাই, গণিতের প্রশ্নপত্র বাংলায় হবেই। আর বিড়বিড় করে বললাম, ব্যাটা ইংরেজি ছাড়া কথা বলে না।

ঢাকা হলে ফিরে নবকুমার স্কুলের একজন ছাত্র এবং কামরুন্নেসা স্কুলের এক ছাত্রীকে বললাম, পরদিন মিছিল নিয়ে আসতে। মিছিল আসবে শিক্ষামন্ত্রীর বাসভবনের সামনে। শিক্ষামন্ত্রী আশরাফউদ্দীন চৌধুরী। এককালে ফরোয়ার্ড ব্লক করতেন। নেতাজী সুভাষ বসুর আমলে বাংলা কংগ্রেসের সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীকালে নেজামে ইসলামে যোগ দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী হয়েছেন নেজামে ইসলামের কোটায়।

পরদিন মিছিল এল। শিক্ষামন্ত্রী নিজ ভবন থেকে বের হয়ে এলেন। ছাত্রছাত্রীদের আশ্বাস দিলেন, গণিতের প্রশ্নপত্র বাংলায় হবে। বছরখানেক পরের কথা। ১৫৭ নবাবপুর রোডের ছাত্রলীগ অফিসে বসে আছি। একজন ছাত্র এলো। সে ম্যাট্রিক এক বিষয়ে ফেল করেছে। তখন নিয়ম ছিল ম্যাট্রিকে এক বিষয়ে ফেল করলে স্যাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দিতে পারবে। তার অভিযোগ হলো-সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার জন্যে এক বছর বসে থাকতে হলে একটি বছর নষ্ট হয়। তাই তার প্রস্তাব, তিন মাসের মধ্যে এ পরীক্ষা নিতে হবে। আবার ড, খুদার দফতরে গেলাম। তিনি এবার হেসে বাংলায় কথা বললেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার আরজি কী? আমি আমার কথা বললাম। ড, খুদা বললেন–আমরাও একথা ভাবছি। তুমি যেতে পার।

তবে ছাত্র আন্দোলন করতে গিয়ে মনে হয়েছে আমাদের আন্দোলনের সবচে’ ন্যক্কারজনক দিক ছিল পরীক্ষার তারিখ পাল্টানোর দাবি।

১৯৫৬ সাল। আওয়ামী লীগ-কংগ্রেস কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায়। প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান। প্রধানমন্ত্রী একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সভায় এসেছিলেন। ছাত্ররা তাঁর কাছে আবেদন জানালে ডিগ্রি পরীক্ষার তারিখ সরিয়ে দিতে তিনি রাজি হন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল একমত হয়নি।

ডিসেম্বর মাসে আবারো একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান আসলেন। আবারো তাঁর কাছে অনুরোধ জানানো হয় পরীক্ষার তারিখ পিছাতে। কিন্তু এবার তিনি রাজি হলেন না। এক সময় বললেন, প্রয়োজন হলে আমার মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করবে। তবুও পরীক্ষা পিছাবার দাবি মানবে না।

ছাত্রদের বক্তব্য ছিল–বিএ পরীক্ষা মার্চ মাসে অথচ একখানা পাঠ্যপুস্তক তখনও প্রকাশিত হয়নি। আমার যতদূর মনে আছে বইটির নাম ‘সিলভার স্কুল। এছাড়া বিএসসির ছাত্রদেরও অনেক দাবি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মনোভাব হলো এভাবেও পরীক্ষা হয়।

এবার তা হলো না। প্রধানমন্ত্রী কার্জন হল থেকে চলে গেলেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি ইব্রাহিমের বাসার সামনে অবস্থান ধর্মঘট করলাম।

রাত বাড়তে থাকল। রাত ১২টার দিকে দেখলাম প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমানের ১ নম্বর গাড়িটি ভাইস চ্যান্সেলরের কম্পাউন্ডে ঢুকল। প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করলেন ইব্রাহিম সাহেবের সঙ্গে। ইব্রাহিম সাহেব আইন ক্লাসে আতাউর রহমান সাহেবের শিক্ষক ছিলেন। যতদূর শুনেছি প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, স্যার পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে দিলে ভালো হয় না কি? এটা আমার অনুরোধ। ইব্রাহিম সাহেব বলেছিলেন-প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুরোধ হয় না; প্রকৃতপক্ষে নির্দেশ। আমি কাল একাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডাকব।

এ ঘটনার পর আমরা অবস্থান ধর্মঘট প্রত্যাহার করি। পরদিন একাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠক। পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে গেল। বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট অর্থনীতির শিক্ষক ড. মযহারুল হক।

কিন্তু এ আগুন থামল না। পরবর্তী বছর পরীক্ষার তারিখ পেছানোর দাবিতে অনশন ধর্মঘট শুরু করল জগন্নাথ কলেজের ছাত্ররা। নেতৃত্ব ছাত্রলীগের। আমি সম্পাদক আউয়ালকে বললাম-আমি জগন্নাথ কলেজে যাব এবং এই অনশনের বিরুদ্ধে অনশন করব। শেষ পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজে গিয়ে সকলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি মীমাংসায় পৌঁছাই। সেবার আর পরীক্ষার তারিখ পেছানো হয়নি। আমরা ধারণা পরীক্ষায় তারিখ পেছালে খুব একটা লাভ হয় না। শুধুমাত্র বিপদে পড়ে গরিব পিতামাতার সন্তানেরা। এদের কথা কেউ ভাবে না।

এ সময় আর একটি অবাঞ্ছিত কাজের সঙ্গে আমি জড়িয়ে পড়ি। দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম লীগ শাসনকালে ছাত্র আন্দোলন ঠেকাতে অনেক কলেজে আমলাদের অধ্যক্ষ করে পাঠানো হয়েছিল। এসময় কয়েকজন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছিল। তাই বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ, দৌলতপুর ব্রজলাল একাডেমী, রংপুর কারমাইকেল কলেজ, চাঁদপুর কলেজ, যশোর কলেজসহ আরো কয়েকটি কলেজের অধ্যক্ষকে সরানোর আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। তবে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বাধ্যতামূলকভাবে বরখাস্ত করলে ২০ ঘণ্টার মধ্যে তাকে পুনর্বহাল করেছিলাম। সেকালে প্রয়োজনে অনেক সমালোচনা সহ্য করেছি। কিন্তু কেউ বুঝতে চাননি, আমাদের অধ্যক্ষ সাহেবেরা কেমন আমলা মনোভাবাপন্ন হয়ে গিয়েছিলেন।

তখন আন্তর্জাতিক ছাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল কমিউনিস্ট প্রভাবিত আন্তর্জাতিক ছাত্র ইউনিয়ন (আইইউএস)। তবুও ছাত্র ইউনিয়ন নয়। পূর্ববাংলায় আমাদের সঙ্গে প্রথম সম্পর্ক স্থাপিত হয় আইইউএস-এর। যক্ষ্মা রোগীদের জন্যে আইইউএস-এর একটি হাসপাতাল ছিল বেইজিংয়ের কাছে বাঙাচু-তে। এ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্যে আমরা গাইবান্ধার নির্মলেন্দু মজুমদারকে পাঠিয়েছিলাম। চেকোশ্লোভাকিয়ায় স্কলারশিপ পেয়েছিল নূরুল হক বাচ্চু (পরবর্তীকালে সিনেমা পরিচালক)। কিন্তু পাকিস্তান সরকার পাসপোর্ট না দেয়ায় তার যাওয়া হয়নি। সেকালে ছাত্রলীগের বন্ধুরা অনেকেই এ খবর রাখতেন না। এ কালের সদস্যরাও জানে না।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। সরকারি আমলা এবং শিল্পপতিরা এ অভ্যুত্থান মেনে নেয়। কিন্তু কেন?

আমার মনে হয়, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে একটি বুর্জোয়া বিপ্লব হয়েছিল। অর্থাৎ পুঁজিবাদীরা ক্ষমতা দখল করেছিল।

লক্ষণীয়, মুসলিম লীগকে ইস্পাহানি দাউদ-আদমজীসহ এক শ্রেণির শিল্পপতি সমর্থন করলেও সঠিক অর্থে মুসলিম লীগ একটি প্রকৃত পুঁজিপতিদের রাজনৈতিক দল ছিল না। এ দল খান সাহেব, খান বাহাদুর, উকিল মোক্তারদের সংগঠন ছিল। অর্থাৎ বিক্ষুব্ধ উঠতি মুসলিম মধ্যবিত্তরা ছিল এ দলের নেতৃত্বে। তাও আবার পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে তফাৎ ছিল। মুসলিম লীগের পেছনে কলকাতাভিত্তিক মুসিলম শিল্পপতিরা থাকলেও দেশভাগের সময় কলকাতা ভারতে চলে গেল। বোম্বাই, ভারতভিত্তিক মুসলিম শিল্পপতিরা বরাবরই জানত, পাকিস্তান সৃষ্টি হলে তারা ভারতেই পড়বে। তাই দেশ বিভাগের পর দেখা গেল পূর্ববাংলার মুসলিম লীগের নেতৃত্বে এসেছে উকিল-মোক্তার, ছোট জমিদার-জোতদারসহ এক শ্রেণির নিম্নমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী। আর পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশে ক্ষমতায় এলো যারা এককালে রাজনৈতিকভাবে মুসলিম লীগ বিরোধী এবং মুখ্যত জমিদার-জায়গিরদার। ব্রিটিশ ভারতের সেই অংশ নিয়েই পাকিস্তান গড়ে উঠল–যেখানে কোনো শিল্প-কলকারখানা ছিল না, ছিল না সংগঠিত পুঁজিপতি শ্রেণি। ফলে দেশভাগ হওয়ার পর মুসলিম লীগকে কেন্দ্র করেই একটি পুঁজিপতি শ্রেণি গড়ে উঠবার সম্ভাবনা দেখা দিল।

কিন্তু মুসলিম লীগ সে ধরনের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। উকিল মোক্তার জমিদার-জায়গিরদারদের একমাত্র বাসনা ছিল ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করা। নিজের জন্যে ক্ষমতা দখল করা। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রথম দিকে এদের জনপ্রিয়তা ছিল। তাই দেখা গেল নিজের জনপ্রিয়তা এবং দলবাজি সম্বল করে এরা ক্ষমতা দখল করছে এবং মন্ত্রিসভা ভাঙছে আর গড়ছে। দেশে কোনো ধরনের শিল্পায়ন হচ্ছে না। তাই এই শিল্পায়নের জন্যেই পুঁজিপতিদের নিজস্ব রাজনীতি বেছে নিতে হয়।

পাকিস্তানের প্রথম দিকেই প্রথম সারির দু’নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী মারা যান। ক্ষমতা চলে যায় গোলাম মোহাম্মদের নেতৃত্বে আমলাদের হাতে। কারণ, সমগ্র পাকিস্তানে গ্রহণযোগ্য কোনো নেতা তখন ছিল না। অপরদিকে কমিউনিস্টবিরোধী জোটে পাকিস্তান ছিল বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং ঘাটি। পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি ছিল। এ সূত্রে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মার্কিন সরকারের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। এ প্রেক্ষিতে সামরিক-বেসামরিক আমলারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তাদেরই একদিন ক্ষমতা দখল করতে হবে। এর প্রেক্ষিতে ১৯৫৪ সালে জেনারেল আইয়ুব একটি সংবিধান রচনা করেন পাকিস্তানের জন্যে। তখন জেনারেল আইয়ুব পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান। রাজনীতির ব্যাপারে তাঁর নাক গলাবার কথা নয়।

১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ববাংলার নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে। এ রাজনীতি মুখ্যত মার্কিনবিরোধী। তবে এদের অন্যতম নেতা মার্কিনপন্থী শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কেন্দ্রের পাকিস্তান সরকারকে এ বাস্তবতা মেনে নিতে হয়। পূর্ববাংলার যুজফ্রন্টকে ভেঙে দিতে হয়। পূর্ববাংলার যুক্তফ্রন্টকে ভেঙে দিতে না পারলে সামরিক অভ্যুত্থান পূর্ববাংলার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। অপরদিকে পূর্ববাংলায় যুক্তফ্রন্ট জিতে যাওয়ায় পাকিস্তান রাজনীতিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একটি নতুন অবস্থান সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে না পারলে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হবে না। অভ্যুত্থানও সম্ভব নয়।

পাকিস্তান রাজনীতির ব্যাখ্যা এ রকম সাজালে পরবর্তী চিত্র অনুধাবন করা সহজ হবে। এ পটভূমিতে পূর্ববাংলায় ৯২(ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টির নেতৃত্ব বদলের প্রতিযোগিতায় যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যায়। প্রধানমন্ত্রীত্বের টোপ দিয়ে কেন্দ্রে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে আইনমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় পাকিস্তানের আমলা প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংখ্যা সাম্যের নামে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেড়ে নেয়া হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী সহযোগিতা না করলে সাংবিধানিকভাবে পূর্ববাংলাকে বঞ্চিত করা সহজ হতো না।

সংবিধান পাস হবার পর পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলারা শেষ খেলা শুরু করেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। ৮০ জনের সংসদে ১২ জন সদস্যের নেতা শহীদ সোহরাওয়াদী ছিলেন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জার ওপর নির্ভরশীল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী চাইলেন ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন দিয়ে একটি রাজনৈতিক সরকার গঠন করতে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাজি হলো না। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংগঠন থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানে তার তেমন সংগঠন বা সমর্থক ছিল না। তাদের আশঙ্কা ছিল সারা পাকিস্তানের নির্বাচন হলে মার্কিন বিরোধী শক্তি জয়লাভ করবে। তাই মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্যে আমলাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা পাকিস্তানের নতুন পুঁজিপতি শ্রেণি এবং মার্কিন সাহায্য নির্ভর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আমলা যৌথভাবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। তারপর একের পর এক প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত এবং বরখাস্ত হন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক শাসন জারি হয়। আর সামরিক শাসনকালেই পাকিস্তানে প্রথম ভূমি সংস্কারের কর্মসূচি নেয়া হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নে বুর্জোয়া ধারার কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা হয়। মৌলিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। গমের বিনিময়ে কাজ কর্মসূচি শুরু হয়। সারাদেশে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ বাজার অর্থনীতির কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং আইয়ুব খানই প্রথম পরিবার আইন প্রণয়নের সাহস করেন। এ প্রেক্ষিতে আমার মূল্যায়ন হচ্ছে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান ছিল এক ধরনের আমলা পুঁজিপতিদের ক্ষমতা দখল।

১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি হয়। ১৯৫৯ সালে ডাকসু নির্বাচন এগিয়ে আসে। একদিকে ছাত্র ইউনিয়ন অপরদিকে ছাত্রলীগ, ছাত্রশক্তি এবং এনএসএফ। সেবার ভিপি হওয়ার কথা ঢাকা হল থেকে জিএস অর্থাৎ সাধারণ সম্পাদক এসএম হল থেকে। আমাদের ভিপি প্রার্থী এনায়েতুল্লাহ খান। ছাত্রলীগের ভিপি আবুল হোসেন (তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে এমপি হয়েছিলেন)।

ডাকসুর সদস্য সংখ্যা ১৬। হিসেব করে দেখা গেল আমরা ছাত্র ইউনিয়ন-৮ প্রতিপক্ষও ৮। প্রতিপক্ষের আটজনের মধ্যে ছিল নোয়াখালীর আবদুল মালেক। তিনি এককালে নোয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। আমার সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল। মালেক সাহেব পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকে চাকরি করতেন। আমি আর অজিত তাঁর সঙ্গে আলাপ করলাম। সিদ্ধান্ত হলো আমাদের পক্ষে আট ভোট পড়লে তিনি আমাদের ভোট দেবেন। সুতরাং বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলাম।

আমার ওপর বিপদ এল ভিন্ন দিক থেকে। আমাকে প্রভোস্ট বাসায় ডাকলেন। কিছুদিন ধরে শুনছিলাম ভাইস চ্যান্সেলর আমার খোঁজ করছেন এবং আমাকে হল থেকে বের করার কথা বলছেন। তখন ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন বিচারপতি হামিদুর রহমান। প্রভোস্ট বললেন, আপনি এনায়েতুল্লাহ খানকে সমর্থন করতে পারবেন না। আপনি সমর্থন প্রত্যাহার করলে এনায়েতুল্লাহ জিততে পারবে না। আমি বললাম, তা হয় না। আর আপনার কথা আমার শোনারও কোনো প্রয়োজন নেই। প্রভোস্ট বললেন, আপনার ভালোর জন্যে বলছি। আমার কথা না শুনলে আপনার বিপদ হতে পারে।

আমি জানতাম প্রভোস্টের কথা না রাখলে হয়তো হল থেকে আমাকে বের করে দেয়া হবে। আমি বললাম, এনায়েতুল্লাহ আমাদের প্রার্থী। তাকে পাস করাতেই হবে।

প্রভোস্ট-এর বাসা থেকে হলে ফিরলাম। দেখলাম হলের গেট একটি নোটিস টাঙানো আছে। লেখা ২৪ ঘন্টার মধ্যে নির্মল সেনকেহল ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া যাচ্ছে।

নোটিস দেখে আমি রুমে চলে গেলাম। কাউকে কোনো কথা বললাম না। চুপচাপ শুয়ে থাকলাম। রাত ১২টার দিকে হাউস টিউটর ড. কামরুজ্জামান আমাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, তুমি নোটিস দেখেছ? আমি বললাম, দেখেছি। হাউস টিউটর বললেন, তোমাকে কাল হল ছেড়ে দিতে হবে। আমি বললাম, আমার পক্ষে হল ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সামনে ডাকসু নির্বাচন। নির্বাচন শেষ হোক-দেখা যাবে। ড. জামান তেমন কিছু বললেন না। তারপর একদিন নির্বাচন এলো। আমরা আমাদের পক্ষের সদস্যদের জগন্নান্ধ হলে থাকবার ব্যবস্থা করলাম। পুরের দিকে জহিরুল ইসলাম (বর্তমানে অনিয়মিত কলামিস্ট) ছুটে এলো আমার কাছে। বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমাদের একজন সদস্যকে কিডন্যাপ করেছে। যিনি কিডন্যাপ হয়েছিলেন তখন তিনি সমাজে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। আর যারা কিডন্যাপ করেছিল তারাও আজ অচেনা নয়। ফলে নির্বাচনে আমাদের পক্ষে ৭ ও বিরুদ্ধে ৮ ভোট হলো। আমরা প্রতিবাদ জানালাম। নির্বাচন স্থগিত রাখতে বললাম। বিচারপতি হামিদুর রহমান কোনো কথাই শুনলেন না। পরবর্তীকালে এই কিডন্যাপ নিয়ে আমরা দেন-দরবার করেছিলাম। তখন এককালের পুলিশের ডিআইজি আবদুল্লাহ সাহেব আইনের ছাত্র ছিলেন। তিনি বললেন, বৃথা আপনারা এ নিয়ে হইচই করছেন। কারণ সিদ্ধান্ত নিয়েই আপনাদের হারানো হয়েছে। সকল মহল না জানলে সামরিক শাসন আমলে ডাকসুর একজন সদস্য কিডন্যাপ হওয়া আদৌ সম্ভব কি?

ডাকসু নির্বাচনে হেরে গেলাম। এবার বিপদ ঘনিয়ে এলো। বুঝলাম ঢাকা হলে থাকা আর সম্ভব হবে না। এমন কি ঢাকায় থাকাও আর সম্ভব হবে না। ঢাকা হলের বাইরে গেলে গ্রেফতার অনিবার্য। দেশে রাজনীতি নেই বললেই চলে। সর্বত্রই গ্রেফতারের ভয়।

সামরিক শাসন জারি হবার পর আমি এবং আমার রুমমেট আহম্মদ হোসেন হেঁটে হেঁটে সেগুনবাগিচা গিয়েছিলাম। সেগুনবাগিচায় শেখ মুজিবুর রহমান থাকতেন। জানতাম তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি তখন মন্ত্রিত্ব ছেড়ে চা বোর্ডের সভাপতি। সেগুনবাগিচায় গিয়ে দেখলাম এই বাসা থেকে শেখ সাহেবের পরিবার-পরিজনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। সকলেরই এক কথা–এ সময় রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। গ্রেফতার হলে কেউ খোঁজ নেবে না।

সত্যি সত্যি সঙ্গে তখন কেউ নেই। মাত্র বছরখানেক আগের কথা। ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিলাম ছাত্রলীগ থেকে। ছাত্র ইউনিয়নের পুরুষ নেতৃত্বের একাংশ প্রবল বিরোধিতা করেছিল। আমাকে কিছুতেই গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে না দেবার জন্যে জোট বেঁধেছিল। দেশে সামরিক শাসন জারি হবার পর তারা কেউ নেই। ডাকসু নির্বাচনে দাঁড়ালেন এনায়েতুল্লাহ খান। তিনি এসেছিলেন আমাদের সঙ্গে ছাত্রলীগ থেকে। ডাকসু নির্বাচনের জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করলাম আমি জহিরুল ইসলাম ও আজিজুর রহমান খান। আমরা সকলেই এসেছিলাম ছাত্রলীগ থেকে। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন সালউদ্দিন আহমদ (অধ্যাপক সাদউদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন ৯০ দশকে)। অন্যতম নেতা ছিলেন কাজী জাফর আহমদ। কেউই এলেন না এ নির্বাচনের সময় সামনা-সামনি, একমাত্র আমানুল্লাহ ব্যতীত।

নিজের দলে প্রায় এক অবস্থা। নিতাই গাঙ্গুলি আবারো ঢাকেশ্বরী মিলের চাকরি ফিরে পেয়েছেন। রুহুল আমিন কায়সার আবার অসুস্থ হয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে। ১৯৫৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে কিছুদিন থাকার পর তিনি

কিছুটা সুস্থ হন। তারপর চলে যান ভাইয়ের কাছে চুয়াডাঙ্গা। ভাই রেলে চাকরি করতেন। থাকতেন চুয়াডাঙ্গা। তখন ঢাকা থেকে সরসারি চুয়াডাঙ্গা যাওয়া যেত না। নারায়ণগঞ্জ থেকে স্টিমারে গোয়ালন্দ। গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে চুয়াডাঙ্গা। আজকের দৌলতদিয়া ঘাটে বা গোয়ালন্দে সেদিনের গোয়ালন্দ খুঁজে পাওয়া যাবে না। দৌলতদিয়া এখন নদী গর্ভে। আজকের গোয়ালন্দ বন্দরেই সেকালে স্টিমার ভিড়ত।

রুহুল আমিন কায়সারকে চুয়াডাঙ্গা পৌঁছে দিয়ে এসে ভাবলাম হয়তো সুস্থ থাকবেন কিছুদিন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে যক্ষ্মায় ভুগছেন। বারবার হাসপাতালে যাচ্ছেন আর আসছেন। কিন্তু আমার প্রত্যাশা সঠিক হলো না। রুহুল আমিন সাহেব চুয়াডাঙ্গা থাকলেন না। একটু সুস্থ হয়েই প্রধান শিক্ষকের চাকরি নিয়ে চলে গেলেন বরিশালের গৌরনদী। আমি কিছুই জানতাম না।

১৯৫৮ সালের প্রথম দিকে হঠাৎ একদিন এসে হাজির হলেন ঢাকা হলে। রুহুল আমিন কায়সার আবার অসুস্থ। কিন্তু কী করব? কোথায় রাখা যাবে? মিটফোর্ড হাসপাতালে কোনো সিট নেই। চিকিৎসক ড. নূরুল ইসলাম রোগী দেখে বললেন, এ মানুষ বেঁচে আছে কী করে। একটি লাংগস নেই। অপরটির এক-তৃতীয়াংশ চলে গেছে। ইনজেকশন দিলে ৬ ডিগ্রি জ্বর ওঠে। অনেক কষ্টে তাকে ভর্তি করা হলো বেআইনিভাবে, সাধারণ রোগী ওয়ার্ডে চারিদিকে কাপড় ঘিরে দিয়ে। কিছুদিন পরে টিবি ওয়ার্ডে সিট পেয়েছিলেন। সে সিটে ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কালীদাস চক্রবর্তী। কালীদাস চক্রবর্তী মারা যাওয়ায় সে সিট রুহুল আমিন কায়সারকে বরাদ্দ করা হয়।

কিন্তু যক্ষ্মা রোগীর ওষুধ কে জোগাবে? এতো পয়সা কোথা থেকে আসবে? আমার টিউশনি জুটছে না। জুটছে না, ঠিক নয়। থাকছে না। কারণ কারো সঙ্গে আমার বনছে না। একটি টিউশনি পেলাম পুরানা পল্টনের জামায়াতখানার পেছনে। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের ছাত্র-ছাত্রী। সে পরিবারটি বিরাট ব্যবসার মালিক। একদিন অনুপস্থিত হওয়ায় জিজ্ঞাসা করেছিল : Why did you not come yesterday? আমি জবাব দিলাম, I will not come from tomonow. কারণ আমার টিউশনির শর্ত ছিল আমি সপ্তাহে সাতদিন আসতে পারি কিন্তু একদিন না এলে আমাকে জিজ্ঞাসা করা যাবে না, আমি কেন আসিনি। কারণ আমি কারো পিতার কোম্পানিতে চাকরি করি না।

আমার ছাত্র-ছাত্রীরা ভড়কে গেল। তাদের মা এলেন। বললেন, এমন আর হবে না। আমি বললাম, আপনারা ভবিষ্যতে কোনোদিন বিপদে পড়লে আমার কাছে আসবেন। আমি সাহায্য করব। সত্যি সত্যি বছরখানেক বাদে এক মাসের জন্যে তাদের আবার পড়াতে গিয়েছিলাম। তবে ওরা বড় হিসেবি। প্রথমবার ২৭ দিন টিউশনি করার পর ছেড়ে দিলাম ওরা আমাকে ঠিক ২৭ দিনের টাকা হিসাব করে দিয়েছিল। দ্বিতীয়বার পড়িয়েছিলাম ৩৬ দিন। এবার তারা গুণে গুণে ৩৬ দিনের টাকা দিয়েছিল। ঢাকা হলে এসে এবার ৩৬ দিনের টাকা নিয়ে পুরানা পল্টনে ওদের বাসায় গেলাম। ওদের মাকে ডাকলাম। বললাম, দেখুন ব্যবসা করেন ভালো কথা। এমন ব্যবসা করলে ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পারবেন না। ওরা ব্যবসায়ী হবে, মানুষ হবে না। আমি ৩০ দিনের টাকা পেলেই ৩৬ দিন পড়াতাম। মাস শেষ হবার পর ৬ দিনের জন্যে কোনো টাকা নিতাম না। এই বলে ৬ দিনের টাকা দিয়ে চলে এলাম। ওরা ছিল এককালে ঢাকার অভিজাত লাসানি হোটেলের মালিক। বায়তুল মোকাররমের হোভা দোকানের মালিক। দেশ স্বাধীন হবার পর ওদের খোঁজ করতে গিয়েছিলাম। দেখলাম ওদের কর্মচারিরাই ওদের সকল দোকানের মালিক হয়ে বসেছে। কর্মচারিরা অবশ্যই জন্মসূত্রে বাঙালি।

এমনি করেই আর এক টিউশনি ছাড়তে হলো। মতিঝিল কলোনিতে দুজন ছাত্রী পড়াতে হবে। টাকার বড় অভাব। ত্রিশ দিন পড়ালে ত্রিশ টাকা। হলের চার্জ ৩২ টাকা। তারপর অন্যান্য খরচ। প্রথমদিন পড়াতে গিয়ে দেখলাম অনেক খাবার ব্যবস্থা। বললাম, খাবার কম দিয়ে বেশি টাকা দিলে সুবিধা হয়। আর প্রতিদিন এ ধরনের খেতে হলে খাবার পাটটা এখানেই শেষ করতে হয়। টিউশনি বাড়ির লোক রাজি হলো না। এক, দুই, তিনদিন দেখলাম। তারপর বললাম, আমি ৩০ দিনের পর আর পড়াব না। ছাত্রীরা কাঁদল। আমার মনে হচ্ছিল টিউটর বলে যেন সবাই করুণা করে। ত্রিশ দিনের ত্রিশ টাকা নিয়ে চলে এলাম। এরপর একেবারে বেকার।

এবার এগিয়ে এলেন ক্ষিতীশ দা। ক্ষিতীশ চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সেকালে স্টেডিয়ামের মতো কিছু ছিল না। পশ্চিম দিকে কিছু কক্ষ ছিল। ওই মাঠ দিয়ে হাঁটতে গেলে একটি পরিচিত লোক চিৎকার করে উঠতেন খাঁটি ঢাকার আদি ভাষায়। ক্ষিতীশ দা ডাকছেন। ক্ষিতীশ দা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টসের সঙ্গে আছেন। কী তার পদ, কী তার পরিচয় জানি না। এককালে ঢাকা হলের ছাত্র ছিলেন। খেলাধুলার ক্ষেত্রে সকলের দাদা। ক্ষিতীশ দার এলাকায় গেলে চা খেতে হবে। গল্প শুনতে হবে। পাকিস্তানের বাঘা বাঘা সকল সিএসপি আমলারা তাঁর হাতে গড়া। সকল এলাকায় তাঁর যাতায়াত। মনে হতো জন্মসূত্রে ক্ষিতীশ দা হয়তো ঢাকার কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে ছিলেন। একদিন ডেকে বললেন, কেমন আছ? বললাম ভালো নেই। টিউশনি প্রয়োজন। ক্ষিতীশ দা চমকে দিয়ে অট্টহাসি করে উঠলেন। বললেন চিঠি দিচ্ছি, এখন যাও। আমি ফোন করে দেব। এক সম্ভ্রান্ত মানুষের বাড়িতে পড়াবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একক