রাঁচি পৌঁছে ভিন্সেন্ট চিঠি দিল। জায়গাটা তার পছন্দ হয়েছে। বাড়িটাও। মালি সরযূপ্রসাদের সঙ্গে বন্দোবস্ত করেছে। মালির বউদি ওকে দুবলো দুটি বেঁধে দেয়। একেবারে ঝাড়া হাত-পা হয়ে ভিন্সেন্ট দিবারাত্র ছবি এঁকে বেড়াচ্ছে। শীত শেষ। রাঁচি বেশ ফাঁকা ফাঁকা। চেঞ্জারদের ভীড় নেই। দু-চারজন প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। সবাই অবাঙালী, স্থানীয় লোক। ডক্টর ডেভিডসনের সঙ্গেও দেখা করে এসেছে। অমায়িক ভদ্রলোক। ওকে পরীক্ষা করেছেন, দেখেছেন, বলেছেন মনের আনন্দে ছবি এঁকে যান। শরীর খারাপ বোধ হলেই খবর দেবেন। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ভিন্সেন্ট লম্বা লম্বা চিঠি লিখত। কখনও খামের ভিতর দু-একটা স্কেচ। আমি ওর উৎসাহটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য মাঝে মাঝে পোেস্টকার্ডে জবাব দিতাম। সূরযের চিঠিও সে নিয়মিত পায় টাকাও আসে যথারীতি।
ভিন্সেন্ট প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে যায় তার রঙ-তুলিক্যানভাস নিয়ে। কোন কোনদিন দুপুরে ফেরে না। সন্ধ্যায় এসে মধ্যাহ্ন আহার করে। প্রতিবেশীরা দু-দিনেই চিনে ফেলল এই তসবিরওয়ালা বাবুকে। ওদের বাড়ির মালি সরযূপ্রসাদের দাদাও থাকে এই বাড়ির চৌহদ্দিতে। এবাড়ির আউট-হাউসে। রঘুবীরপ্রসাদ সরকারী চাকুরে। স্থানীয় পোস্টঅফিসের ডাকপিয়ন। ওরা জাতে কাহার। লিখাপড়ি শিখে ডাকপিয়নের কাজ পেয়েছে। দু ভাই এ বাড়ি পাহারা দেয়। রঘুবীর নিজেই ভিন্সেন্টের সঙ্গে আলাপ করে। গেল মনি-অর্ডার দিতে এসে। তারপর কারণে-অকারণে অনেকবার এসেছে। এমনকি ওকে ধরে নিয়ে গেছে নিজের খাপরা-টালির ছাপরায়। চারপাই বার করে বসতে দিয়েছে। রঘুবীরের স্ত্রী একগলা ঘোমটা দিয়ে কখনও এগিয়ে দিয়েছে মোষের দুধের চা, কখনও ঘরে করা লেট্টি। মোটা মোটা রুলি-পরা দুটি হাত সর্বদাই কর্মরত। এই । মেয়েটিই ওর রান্না করে দেয়। ওদের সকলের কাছেই ভিন্সেন্ট একটা বিস্ময়। রঘুবীর, তার স্ত্রী, ছেলে ভগলু ও ভাই সরযূপ্রসাদ অবাক হয়ে দেখত তসবিরবাবুর কাণ্ডকারখানা। আজব মানুষ। সবচেয়ে উৎসাহ ভগলুর। বছর তের-চোদ্দ বয়স। প্রাণ চঞ্চল কিশোর। দিবারাত্র তসবিরবাবুর সঙ্গে মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াত। ভিন্সেন্ট যখন রঘুবীরের একখানি তৈলচিত্র আঁকার প্রস্তাব করল তখন রঘুর মুখখানা দেখবার মত। সযত্ন বিন্যস্ত দাড়ি দু ফাঁক করে গালপাট্টার আকারে সাজালো। গায়ে চড়ালো সরকারী কোট, পিতলের তকমা আঁটা সরকারী নীল পগগ চড়াল মাথায়। ছবিখানা দেখে ওরা মুগ্ধ হয়ে গেল। হুহু রঘুবীর! তাই দেখে ভগলুও বায়না ধরল। সেও তসবির আঁকাবে। ভিন্সেন্টও পিছ-পা নয়–আঁকল তাও।
মাস দুয়েক বেশ সুখেই ছিল। আপনমনে ছবি এঁকে বেড়িয়েছে। ইতিমধ্যে একবারও তার মানসিক উত্তেজনা বা অবসাদ কিছু হয়নি। ডেভিডসনের সঙ্গে দেখা করায় তিনি বলেছিলেন-যতদিন কোন অসুবিধা না হচ্ছে ততদিন ও-কথা মনে রাখবেন না, আমার সঙ্গে দেখা করতেও আসবেন না। আপনার বাড়ির চাকরকে বলে রাখবেন, প্রয়োজন বুঝলেই যেন আমাকে খবর দেয়। এখানে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেই আপনার মনে পড়ে যাবে অসুস্থতার কথা। সেটা আপনি ভুলে থাকুন, এটাই আমি চাই।
ভিন্সেন্ট মেনে নিয়েছে সে আদেশ। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ঐ উন্মাদ-আশ্রমটা সে দেখতে চায়নি। ওখানে কারা থাকে, কেমনভাবে থাকে তা দেখার জন্য কৌতূহল ছিল ভয়ও ছিল। ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মত সেসব কথা সে ভুলে থাকতে চেয়েছে।
বেশ চলছিল, হঠাৎ ভিন্সেন্ট লিখল এক বিচিত্র সংবাদ। লিখেছে–গগনকে মনে আছে নিশ্চয়? গগন পাল। ম্যাট্রিক ফেল করে সেই তার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি। তুই শুনলে অবাক হয়ে যাবি, সেও সব কিছু ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে ছবি আঁকা ধরেছে। ঠিক আমারই মতন। তার অবস্থা নাকি আমার চেয়েও খারাপ। আমার তবু সূরয আছে। তার কেউ নেই। বর্তমানে কপর্দকশূন্য। নিতান্ত ঘটনাচক্রে তার সঙ্গে সূরযের দেখা হয়ে যায় একদিন ট্রেনে। বিনা টিকিটে যাচ্ছিল বলে ওকে রেলপুলিসে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। সূরয চিনতে পেরে ওকে উদ্ধার করেছে। গগন দিল্লীতে আছে।
খবরটা পেয়ে আমি বিচলিত বোধ করি। গগনের ইতিহাসটা ভিন্সেন্টকে বলা হয়নি। ইচ্ছা করেই বলিনি। স্থির করলাম সূরযভানকে চিঠি লিখে সাবধান করে দিতে হবে। কিন্তু তার আগেই এল ভিন্সেন্টের দ্বিতীয় পত্র। সূরয নাকি তার দাদাকে লিখেছে সে গগনকে টিকিট কেটে ট্রেনে তুলে দেবে। গগনও আপাতত রাঁচিতে এসে থাকবে। আমার বন্ধুর নিশ্চয় এতে আপত্তি হবে না। ওরা দুজনে মিলে এবার ছবি আঁকবে। সূরযের ইতিমধ্যে পদোন্নতি হয়েছে–সে ওর মাসোহারাটাও বাড়িয়ে দিতে রাজী।
আমার বন্ধুর আপত্তি হওয়ার কথা নয়। আপত্তি ছিল আমার নিজেরই। গগন আর ভিন্সেন্ট দুটোই পাগল–শেষে দু বন্ধু না খুনোখুনি করে বসে! কী জবাব দেব স্থির করে ওঠার আগেই এল ভিন্সেন্টের তৃতীয় পত্র–গগন আগামী বুধবারে আসছে। আমার বন্ধুর যে আপত্তি নেই–আমার নীরবতা থেকেই সেটা ওরা অনুমান করেছে।
ওদের রাঁচিবাসের জীবনকথা পরে বিস্তারিত শোনার অবকাশ হয়েছিল।
ভিন্সেন্ট মালিকে বলে, সর, আমার এক বন্ধু পরশু আসবেন, বুঝেছ। সেও ছবি আঁকে। খুব সুন্দর ছবি আঁকে। এবার থেকে আমারা দুজনে মিলে ছবি আঁকব।
আপসে ভি আচ্ছা ক্যা? সরযূপ্রসাদ একটা তুলনামূলক প্রশ্ন করে বসে।
