বাতাসী তর্ক করে না। ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। মেনে নেয়। এবার ভিন্সেন্ট সজাগ হয়েছে। সে টের পায় বাতাসী তার পথ পরিবর্তন করেনি। এখন আর লুকোছাপার প্রয়োজন বোধ করে না। চক্ষুলজ্জাটা ঘুচে গেছে। সন্ধ্যাবেলা ভিন্সেন্ট ঘরে ফিরে এলে মেয়েকে তার কাছে বসিয়ে দিয়ে বলে, –অ্যারে টুক রাখ দিকিন ফাদারদা। আমি টুক ঘুর্যা আসি।
তার শাড়ি জ্যাকেটের পুটুলি বেঁধে নিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে বেরিয়ে যায়। ফিরে আসে রাত গভীরে। ভিন্সেন্টের হৃৎপিণ্ডটা কে যেন পিষতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত সে বাধ্য হয়ে বিদায় দিল বাতাসীকে। প্রায় দু বছর ঘর করার পর। হ্যাঁ, তাড়িয়েই দিল। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে ভেসে গেল বাতাসী ফিরে গেল তার। অভ্যস্ত জীবনে। রূপোপজীবিনীর উপার্জনে জীবনধারণের গ্লানি সহ্য করতে পারল না ভিন্সেন্ট। ছবি তার কেউ কেনে না। বহু চেষ্টা সে করেছে। দোকানে দিয়েছে, বাড়ি বাড়ি ফেরি করেছে, হেদোর ধারে ছবি টাঙিয়ে অপেক্ষা করছে কেউ ফিরে তাকায়নি। দু পাঁচ টাকা দিয়েও কেউ একখানা ছবিও নেয়নি। আর্ট-একজিবিশানের কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে লাভ হয়নি। একবারও তার কোন ছবি নির্বাচিত হয়নি। কিন্তু অন্য কোন জীবিকার কথা তার মনে আসেনি। সূরয তাকে চাকরির সন্ধান দিয়েছিল–ও সেখানে চেষ্টাই করেনি। পাশেই আছে এক চানাচুরওয়ালা। মাঝে সে অসুস্থ হয়ে দেশে চলে যায়। ভিন্সেন্টকে বলেছিল আঁকাটা নিয়ে সে ফেরি করতে পারে। ভিন্সেন্ট রাজী হয়নি। আত্মসম্মানে লেগেছে বলে নয়–তার দৃঢ় বিশ্বাস সে ও-সব কাজ করার জন্য পৃথিবীতে আসেনি। সে শিল্পী, সে আর্টিস্ট। আজ পৃথিবী তাকে যতই অসম্মান করুক, একদিন কড়া-ক্রান্তিতে সব শোধ দিতে হবে। আজকের এই উপেক্ষিত, অবহেলিত, অনাহার-ক্লিষ্ট ভিন্সেন্ট হয়তো সেদিন থাকবে না। কিন্তু এ একেবারে ধ্রুব সত্য যে, পৃথিবীকে একদিন নতমস্তকে সলজ্জে স্বীকার করতে হবে–পৃথিবীরই ভুল হয়েছিল, ভিন্সেন্ট ভান গর্গকে সে চিনতে পারেনি। বলতে হবে ভিন্সেন্ট যা সৃষ্টি করে গেছে তা মহত্তম শিল্প! কিন্তু সে কবে? কোন্ অনাগত প্রভাতে?
বাতাসী চলে গেল। আবার নিঃসঙ্গ জীবন। আবার ইকমিক্কুকার! আবার একা!
মাঝে মাঝে পুরনো কথা মনে হয়। ঊর্মিলা এ জীবন সহ্য করতে পারত না। ঊর্মিলা তার জীবনের সঙ্গে নিজেকে জড়ায়নি, ভালই করেছে। কিন্তু চিত্রলেখা? সে কি। ভিন্সেন্টের সঙ্গে এ দুঃখীর জীবন ভাগ করে নিতে পারত না? হয়তো একটু মানসিক শান্তি পেলে, একটু দৈহিক আরাম পেলে ও এতটা ব্যর্থ হত না। বাতাসী ওকে ভাতের থালা, কাঁচা কাপড় আর পাতা বিছানা জুগিয়েছেদু বছর শান্তিতে রেখেছে। তাতেই অনেকটা তৃপ্তি পেয়েছে ভিন্সেন্ট। কিন্তু চিত্রলেখা তাকে আরও কিছু বেশি দিতে পারত। চিত্রলেখার বাবা ছিলেন স্কুল-মাস্টার-সে লেখাপড়া জানা মেয়ে। সে উৎসাহ দিয়ে, সান্ত্বনা দিয়ে হয়তো ওকে গড়ে তুলতে পারত সার্থক শিল্পীরূপে। বাতাসী শিল্পীর মডেল হতে পারে, জীবনসঙ্গিনী হতে পারে না–সে উপাদানে বাতাসীকে গড়েননি সৃষ্টিকর্তা। চিত্রলেখা হয়তো পারত। চিত্রলেখা কখনও এভাবে তাকে ফেলে পালাত না। বাতাসীর মত নেমকহারামের মত।
নেকহারাম? কিন্তু বাতাসী কি সত্যিই অকৃতজ্ঞ? কেন সে পারল না এই নতুন জীবনকে স্বীকার করে নিতে? নিদারুণ দারিদ্র্যই কি তার একমাত্র কারণ? ভিন্সেন্ট যদি দু-চারখানা ছবি বিক্রি করতে পারত–তাহলে কি বাতাসী উপেক্ষা করতে পারত বাড়িউলি-মাসির আকর্ষণ? হয়তো না। উচ্ছলতা তার রক্তের মধ্যে বাসা বেঁধেছিল। আকৈশোর সে পুরুষমানুষের সংস্পর্শে এসেছে প্রায় বিশ বছরের অভ্যাস। রাতারাতি তা কি ত্যাগ করা যায়? আর তাছাড়া?
হ্যাঁ, আরও একটি নিদারুণ হেতু অনস্বীকার্য! ভিন্সেন্ট বাতাসীকে উদ্ধার করেছে, আশ্রয় দিয়েছে। প্রতি মাসে মনি-অর্ডারের টাকা ওর হাতে ফেলে দিয়েছে, হিসাব চায়নি। এক ঘরে রাত্রিবাস করেছে, এক শয্যায় শুয়েছে, অসংখ্য ছবি এঁকেছে। কিন্তু তবু একটা প্রকাণ্ড কিন্তু রয়ে গেছে। বাতাসীর নারীত্বকে সে স্বীকার করে নেয়নি। বাতাসীর চোখে ভিন্সেন্ট এক আত্মভোলা আর্টিস্ট! এক বিচিত্র জীব! পুরুষমানুষ নয়! বাতাসীর চোখে সে-ফাদারদা!
হয়তো এটাই সহ্য হল না উত্তীর্ণ-যৌবনা মেয়েটির। এতে সে অভ্যস্ত নয়। সে হেরে গেছে। নত মস্তকে যে ফিরে গেল সে বাতাসী নয়–অবমানিতা নারীত্ব!
.
১৪.
প্রায় মাসখানেক ধরে চন্দ্রভান । তার অতীত জীবনের কাহিনী শোনালো আমাকে। তিল তিল করে মনের ভার লাঘব করল। আমি ওকে হাওয়া বদল করার পরামর্শ দিলাম। কলকাতার ঐ অন্ধগলির কুঠুরি ঘরে সে মনমরা হয়ে আছে; ও-পাড়ায় তার পরিচিত প্রতিবেশী এমন কেউ নেই যার সঙ্গে বসে ও দুটো মনের কথা বলতে পারে। নূতন পরিবেশে নূতন পরিচয় হতে পারে। আমার একজন পয়সাওয়ালা ক্লায়েন্টের এক খানি বাড়ি ছিল রাঁচিতে। সখ করে বানানো বাড়ি শীতকালে বা পূজার সময় মাঝে-মধ্যে কর্তারা বেড়াতে যান। তাছাড়া তালাবন্ধই পড়ে থাকে বাড়িটা মালির হেপাজতে। ভাড়া দেওয়া হয় না। ভদ্রলোক আমাকে বহুবার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তার বাড়িতে কিছুদিন গিয়ে বেড়িয়ে আসার জন্য। ডাক্তারী ছেড়ে একবারও আমার যাওয়া হয়নি। সেই ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে গেল। তাছাড়া রাঁচিতে আমার এক বন্ধু আছেন, ডক্টর ডেভিডসন–আমার। সহপাঠী; বিলাতী খেতাব নিয়ে এসে রাঁচিতে বসেছেন। ডক্টর ডেভিডসন মনস্তত্ত্বের বিশেষজ্ঞ। সরকারী ব্যবস্থাপনায় ওখানে একটা উন্মাদাশ্রম তৈরী হচ্ছে। ডেভিডসন তার পরিচালক। এঁদের দুজনের সঙ্গে ব্যবস্থা করলাম। বস্তুত ভিন্সেন্টের অসুখের জন্য আমি নিজেকে পরোক্ষভাবে দায়ী করেছিলাম। ভিন্সেন্ট রোগমুক্ত না হলে আমার মনটা শান্ত হবে না। ওর ইতিহাস শুনে সহানুভূতিও জেগেছিল। ভিন্সেন্ট এ প্রস্তাবে রাজী হল। রাঁচির প্রাকৃতিক দৃশ্যও মনোরম। বিহার প্রদেশের শীতকালীন রাজধানী। ভিন্সেন্ট বললে, এবার সে ল্যাণ্ডস্কেপ ধরবে। রঙ-তুলি ক্যানভাস তাকে কিনে দিলাম এবং একদিন রাঁচির গাড়িতে তাকে তুলে দিয়ে এলাম।
