–এস জামাই। বস। আহা, সারাদিনমানে মুখখানা যে রাঙা হয়ে গেছে গো!
ভিন্সেন্ট জবাব দেয় না। খুকিকে কোলে তুলে নিয়ে পার্কের দিকে চলে যায়।
এই নিয়েই বিবাদ। ভিন্সেন্টের স্পষ্ট নিষেধ সত্ত্বেও মাসি এ বাড়িতে ঘন-ঘন আসতে। শুরু করল। শেষে সে অন্য কাউকে সঙ্গে নিয়ে আসা আরম্ভ করে। কখনও ময়না, কখনও চাপা, কখনও পদ্ম। ভিন্সেন্ট ওদের চেনে। সে মনে মনে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এটা ভদ্রপল্লী। বাতাসীর বিষয়ে কেউ কৌতূহলী হয়নি। তার সাজ-পোশাক সে পাটে ফেলেছিল এ পাড়ায় এসে; কিন্তু ওদের যে দেখলেই চেনা যায়!
ভিন্সেন্ট বাতাসীকে বললে, -তুমি কি চাও স্পষ্ট করে বল তো? আমি কিন্তু বেঁধে। রাখিনি তোমাকে। এখানে যদি ভাল না লাগে তুমি সোজাসুজি ও পাড়ায় চলে যাও। এ রকম দু-নৌকোয় পা দিয়ে চলতে পারবে না।
-কী করলাম আমি? হাই বাবা গ! ধমকাইছ কেনে?
–তোমাকে বারণ করেছি তবু তুমি ওদের এখানে কেন নিয়ে আসছ?
–উরা আমারে এত বছর খাওয়াইলেক, দেখভাল করলেক, সিটি কি ভুলি যাব?
–হ্যাঁ, ভুলে যাবে। ওরা খেতে দিয়েছে, পরতে দিয়েছে–তুমিও গতরে খেটে শোধ দিয়েছ। সে সব চুকেবুকে গেছে। আর ভুলতে যদি না পার তো স্পষ্টাস্পষ্টি সেখানে চলে যাও। এ অধ্যায়টা ভুলে যেও।
–আমারে তাড়াই দিছিস ফাদারদা?
হঠাৎ চমকে ওঠে ভিন্সেন্ট ওর সম্বোধনে। তাই তো! ও এখনও বাতাসীর ফাদারদা। দেড় বছর সে বাতাসীর সঙ্গে ঘর করছে–তবু সে আজও আছে তার সম্মানের উচ্চ আসনে। এক ঘরে দুজনে রাত কাটায়। বাতাসীর একাধিক ন্যুড স্টাডি এঁকেছে সে–তবু বাতাসীর চোখে আজও ভিন্সেন্টফাদারদা! ফাদার অথবা দাদা!
কথা বলছিস না কেনে রে, তাড়ায়ে দিছিস?
তাড়িয়ে আমি দিচ্ছি না, তুই আমাকে ছেড়ে যাচ্ছিস বাতাসী?
এবার ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললে প্রায়-প্রৌঢ় বাতাসী। ভিন্সেন্ট কি বুঝবে বাতাসীর যন্ত্রণা? আপনভোলা উদাসীন মানুষটার সংসারের কোন খোঁজ রাখে? সব কিছু বাতাসীর হাতে তুলে দিয়ে সে নিশ্চিন্ত হয়েছে। এতদিন ধরে সে মেতে আছে তার রঙ-তুলি নিয়ে। সারাটা দিনভর বাইরে বাইরে ছবি এঁকে বেড়ায়, ঘরে ফিরলে মেয়েকে নিয়ে পড়ে। এক বছরের মেয়েটার সঙ্গে তখন তার কত গল্প, কত আলাপ! কিন্তু বাতাসী? তাকে এই হালভাঙা পালছেঁড়া নৌকোটাকে বেয়ে নিয়ে যেতে হয় এক মাস পয়লার ঘাট থেকে পরের মাসের মাস-পয়লায়। সূরযভানের মাসিক বরাদ্দ আছে অপরিবর্তিত। অথচ সংসারে মানুষ এক থেকে দুই হল, তারপর দুই থেকে আড়াই। কিন্তু বাঁধা বরাদ্দ অপরিবর্তিত। একদিকে এই অবস্থা, অপরদিকে বাড়িউলি মাসির ক্রমাগত প্রলোডন! আকৈশোর যে-জীবনে সে অভ্যস্ত হয়ে আছে সেই জীবনের ডাক শুনতে পেত-চামেলি, চাপা, ময়নাদের কণ্ঠে! মনকে শক্ত করত বাতাসী–না, সে ঐ জীবনে আর ফিরে যাবে না। কিন্তু মন কি কারও পোষা পাখী? আর পাখীও তে শিকল কেটে পালায়? ভিন্সেন্টের চোখ এড়িয়ে দু-পাঁচ টাকা রোজগার শুরু করতে বাধ্য হল বাতাসী। না হলে তিনজনকেই উপোস করে থাকতে হত! এমন সরল আত্মভোলা মানুষটা-সে ভেবে দেখল না, কিভাবে সংসারটা চলছে!
আকৈশোর পুরুষের সোহাগ পেয়েছে বাতাসী–কিন্তু সত্যিকারের স্নেহ ভালবাসা কাকে বলে তা জানত না। সে অভিজ্ঞতাটাই কি কম? একটা আত্মভোলা মানুষের জন্য ঘুম-ঘুম চোখে ভাত আগলে বসে থাকার যে আনন্দ সেটা সে কবে পেয়েছে? নিজের পাতের মাছখানা হাতসাফাই করে ওর পাতে চালান করে দিয়ে, নিজের ভাতের থালা ওর পাতে ঢেলে দিয়ে উপবাসে থাকার যে কষ্ট, সে আনন্দ সে কবে পেয়েছে? এ এক অনাস্বাদিতপূর্ব জীবনমাধূর্য! এটাকেও বাতাসী ছাড়তে চায়নি। তাই এতদিন দু-নৌকোয় পা দিয়ে সে চলেছিল কোনক্রমে। আজ ধরা পড়ে গেল নাকি?
ভিন্সেন্ট তাগাদা দেয়, কই, জবাব দিলি নে যে? আমি তোকে তাড়িয়ে দিচ্ছি, না তুই আমাকে ছেড়ে যাচ্ছিস?
–আমি কেনে যাব? টুক বাইরে না গেলি চলবে কেমনে, বল কেনে?
-কেন? সংসার তো চলছে। উপোস তো করতে হচ্ছে না কাউকে। সেদিন তো সুজি করলি; ভাতের পাতে আজকাল তো মাছও দিচ্ছিস?
বাতাসী অশ্রুসিক্ত মুখটা তুলে বলে, –তুরে কেনে বুঝাই ফাদারদা? কী বুলব তুকে?
বিদ্যুদস্পৃষ্টের মত চমকে ওঠে ভিন্সেন্ট। তাই তো! বাতাসী আসার আগে তার সংসার চলতে চাইত না। মাসের বিশ তারিখের পর তাকে একবেলা আহার বন্ধ করতে হত। মাসের শেষ, তিন-চারটে দিন ঐ একবেলাও সে অর্ধাহারে থাকত। পরের মাসে ডাকের গণ্ডগোলে মনি-অর্ডার আসতে দেরি হলে মাস-পয়লার প্রথম কদিন উপবাসেও থাকতে হয়েছে। কিন্তু কই, গত এক বছর ধরে এমন অবস্থা তো একবারও হয়নি! অথচ সংসারে মানুষ বেড়েছে। তার একটিমাত্র অর্থই হয়। বাতাসী উপার্জন করছে। তাই মাঝে-মাঝে বাড়িউলি-মাসি আসে এখানে। তাই মাঝে মাঝে বাতাসী কোথায় যেন চলে যায়! একটা তীব্র আত্মগ্লানিতে ওর সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে আসে। সে অশক্ত, অসহায়, উপার্জনহীন! তাই বাতাসী–
ভিন্সেন্ট বসে পড়ে চৌকির প্রান্তে। ক্লান্তভাবে বলে, কতদিন এভাবে দেহ বেচে আমাকে খাওয়াচ্ছিস বাতাসী?
ঈ বাবা গ! আমি কেনে খাওয়াব তুকে? ভগবান খাওয়ায়,
–চুপ কর! ভগবান নেই!
–ঈ কথাটো তু বুললি ফাদারদা! তু?
-হ্যাঁ, বললাম। শোন! ও-ভাবে তোকে রোজগার করতে হবে না। দরকার হয় আমরা তিনজনেই উপোস করব। বুঝলি?
