বাতাসী রাজী হয়ে গেল। মাসির সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করে একদিন বের হয়ে এল ঐ নরককুণ্ড থেকে। এসে উঠল ভিন্সেন্টের এক কামরার ঘরে। নৃতন পরীক্ষায় মেতেছে। ভিন্সেন্ট। মাসান্তে সে যে কটা টাকা পায়, সমঝে চললে তা থেকে দুজনে আধ-পেঠা খেয়ে বাঁচতে পারে। তারপর যদি দু-একখানা ছবি বেচতে পারে তখন আর তাকে পায় কে? সংসারধর্ম তার পক্ষে সম্ভবপর নয়। বাতাসীই তার সহধর্মিণী। বাতাসী তাকে বুঝেছে। তাকে স্নেহের চোখে, শ্রদ্ধার চোখে দেখেছে। বাতাসী রান্না করতে পারে, ঘরদোর গুছিয়ে রাখতে জানে। ওর এক কামরার গৃহস্থালী নৃতন রূপ নিল। প্রতিবেশীরা সব সাড়ে বত্রিশ ভাজা। রিকসা-আলা ঠেলাওয়ালা ভাজিওয়ালা। তারা নাক গলাতে এল না। বাতাসী হল এ গৃহের ঘরণী। সমস্ত কথা খোলাখুলি লিখে জানালো সূরযকে। সে যখন চিঠির জবাব দিল তখন এ-প্রসঙ্গের উচ্চবাচ্য পর্যন্ত করল না।
বাতাসীর মাসির পরামর্শ ছিল বাচ্চাটাকে পৃথিবীর মুখ দেখতে না দেওয়া; কিন্তু ভিন্সেন্ট কিছুতেই রাজী হল না। পাখি-পড়া করে সে বাতাসীকে বোঝালো। শেষে বাতাসী রাজী হল ডাক্তারের কাছে যেতে। ঐ সময়েই সে দীপু-ডাক্তারের কাছে আসে। কিন্তু ওর বাল্যবন্ধুও ওকে দরজা থেকে হাঁকিয়ে দিল। তা দিকজাগতিক বিধান কারও নীতিবাক্যে থেমে থাকে না। যথাসময়ে বাতাসীর একটি কন্যাসন্তান হয়েছিল। ভিন্সেন্টের সে কী আনন্দ। কে মেয়ের বাপ তা বাতাসী জানে না। কিন্তু পিতৃপরিচয়হীন অনেক মহাপুরুষই তো অক্ষয় কীর্তি রেখে গেছেন দুনিয়ায়। ভিন্সেন্টই বেশি মাতাল মেয়েকে নিয়ে।
একেবারে নির্ভেজাল আনন্দ কিছু নেই এ দুনিয়ায়। দেবনারায়ণবাবু ওর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করলেন। তিনি কি কারণে কলকাতায় এসেছিলেন। ঠিকানা খুঁজে ভিন্সেন্টের বাসায় এসে মর্মাহত হয়েছিলেন। ভিন্সেন্ট মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারেনি। স্বীকার করেছিল, বাতাসী তার বিবাহিতা স্ত্রী নয়। দেবনারায়ণবাবু তৎক্ষণাৎ চলে গিয়েছিলেন। ত্যাগ করেছিলেন শিষ্যকে।
সূরযভান কিন্তু ওকে ত্যাগ করেনি। প্রতি মাসে দাদাকে মনিঅর্ডার করে গেছে। জানতে চেয়েছে সে নূতন কি আঁকল। সকল আঘাত সইতে প্রস্তুত ছিল ভিন্সেন্ট। বাতাসীকে সে বিবাহ করতে চেয়েছিল। রাজী হয়নি বাতাসী। বলে কী বুলছিস রে তুই? বেবুশ্যের কি বিয়া হয়?
কে বোঝাবে ওকে? ভিন্সেন্ট অনেক কথা বলেছে। সমাজতত্ত্বের কথা, দেশ বিদেশের নরনারীর সম্পর্কের কথা, দেশাচার ভেদে বিবাহের নিয়মাবলী কেমনভাবে বদলায়; কিন্তু বাতাসী ওসব কথায় কর্ণপাত করে না। বলে, –তু কি পাগল হয়ে গেলি ফাদারদা? চ্যাহ্বা দিদিমণি তুরে কেনে বিয়া করতে লারলেক, সি কথাটো বুঝা মোরে।
বিচিত্র যুক্তি বাতাসীর। চ্যাতরা দিদিমণি লেখাপড়াজানা ভদ্র ঘরের মেয়ে। এমন অশুচি অবস্থায় বিবাহ যদি বিধিসম্মত হত তা হলে কেন চ্যারা দামোদরে ডুবে মরতে যাবে? ফাদারদা তো তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। চ্যাতরা দিদিমণি যে ফাদারদাকে। ভালবেসেছিল এটুকুও কি বোঝেনি বাতাসী? তাহলে? বাধা তো ঐখানে। ফাদারদা আর চ্যাতরা দিদিমণির মাঝখানে সেদিন মূর্তিমান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল লম্পট নাথানিয়েল। এই যদি সত্য হয়, তাহলে এবার? ঐ ফাদারদা আর বাতাসীর মাঝখানে আছে কয়েকশ মূর্তিমান বাধা বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন জাতের। বাঙালি বিহারী-মারোয়াড়ী-পাঞ্জাবী, মায় কাবুলিওয়ালা। না, না, ছি ছি!
ঈশ্বর না মানো, নাই মানলে–একটা কিছু মানতে হবেই। তাকে ভাগ্যই বল, নিয়তিই বল, আর যাই বল। না হলে চন্দ্রভানের পিছনে অতন্দ্রভাবে কে এমন করে লেগে আছে? সে যা কিছুতে হাত দেয় তাই ছাই হয়ে যায়। সারা জীবনে কোথাও সে সফল হতে পারল না। বাতাসীকে নিয়ে এই অদ্ভুত পরীক্ষাতেও শেষ পর্যন্ত হার স্বীকার করতে হল তাকে। কী আশ্চর্য! কী অপরিসীম আশ্চর্য! বাতাসী এখানে টিকতে পারল না। ভিন্সেন্টের অভাবের সংসারনুন আনতে পান্তা ফুরায়; কিন্তু বাতাসী কিছু রূপার চামচ-মুখে জন্মায়নি। অভাব কাকে বলে বাতাসী তা ভাল মতই জানে। সেজন্য তো নয়। তাহলে কেন? বোধহয় অমিতাচারেই বাতাসী অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল-সাত্ত্বিক জীবনযাত্রা সহ্য হল না তার।
প্রথম প্রথম এ-পাড়ায় এসে বাতাসী আদপেই বাড়ির বার হতে চাইত না। নেহাৎ পথে নামতে হলে একগলা ঘোমটা দিত। তার জীবনে যে অসংখ্য পুরুষ এসেছে। তাদের কাছ থেকে ও আত্মগোপন করতে চাইত। পথে-ঘাটে কেউ যেন না হঠাৎ বলে বসে, -আরে, বাতাসী যে!
কিন্তু শেষদিকে সে বেপরোয়া হয়ে পড়ল। ভিন্সেন্ট বেরিয়ে গেলে মেয়ে কোলে নিয়ে সেও কোথায় বেরিয়ে যেত। ভিন্সেন্ট টের পেত, প্রশ্ন করত কিন্তু বাতাসী কোথায় যায় তা বলে না। একদিন ভিন্সেন্ট বলে বসল, তুমি কি মদের নেশায় বাড়ির বাইরে যাও বাতাসী? তার প্রয়োজন কি? তুমি বাড়িতে বসেই খেও!
–ঈ বাবা গ! কী বলছিস্ তু? মদ আমি খাই না গ!
ডাহা মিথ্যে কথা। জোড়-জাঙালেও বাতাসী হাঁড়িয়া খেত, বেশ্যাপল্লীতেও নিশ্চয় খেয়েছে। অথচ এখন এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন মদ কাকে বলে সে জানেই না!
বাতাসী যে কোথায় যায় তা টের পাওয়া গেল অচিরেই। একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এসে ভিন্সেন্ট দেখে বাড়িউলি বসে আছে তার ঘরে। বাতাসী স্টোভে খাবার করছে। সুজির মোহনভোগ। বাতাসী পয়সা পেল কোথায়? না কি মাসিই সুজি আর চিনি কিনে দিয়েছে? ভিন্সেন্টের মুখটা কালো হয়ে ওঠে। বাতাসী যদি তার ঐ জীবনকে একেবারে না মুছে ফেলতে পারে তবে কোনদিনই তার পরীক্ষা সাফল্যলাভ করবে না।
