মেয়েটি নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল এবং একটা লণ্ঠন এনে নামিয়ে রাখে মেঝেতে। ভিন্সেন্ট সেটা ঠিক করে বসিয়ে দিল। মেয়েটি দরজাটায় খিল এঁটে চুপচাপ গিয়ে বসল খাটের উপর। এবার মুখ তুলে ভিন্সেন্ট দেখে মেয়েটি ওকে অবাক দৃষ্টিতে দেখছে! চোখাচোখি হতেই চমকে ওঠে ভিন্সেন্ট। ঐ রূপোপজীবিনীকে সে আগে কখনও দেখেছে? চেনা চেনা লাগছে কেন ওকে? না! মেয়েটি তার পূর্ব-পরিচিত হতেই পারে না। এ পাড়ায় সে কখনও আসেনি। কত বয়স হবে ওর। উত্তীর্ণ-যৌবনা বলা যায় না। তাকে। কুচকুচে কালো গায়ের রঙ। মুখে বসন্তের দাগ। মাথায় বেলফুল জড়ানো। খোঁপা। গায়ে সস্তা ব্রোকেডের জ্যাকেট। পরনে হলুদ রঙের তাঁতের শাড়ি। দু-হাতে দুটি গিল্টি করা বালা, কানে পিতলের ঝুমকো দুল।
ভিন্সেন্ট হঠাৎ বলে বসে, –একটা কথা জিজ্ঞাসা করা হয়নি। কতক্ষণ থাকতে দেবে আমাকে?
মেয়েটি মুখ নিচু করে বলে, আপনার যতক্ষণ ইচ্ছে। ভাল লাগলি তামাম রাত!
-ও আচ্ছা! তবে তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। শোন আমি তোমাকে কোন কষ্ট দেব না। তুমি খাটে শুয়ে থাকবে, আমি তোমার একখানা ছবি আঁকব শুধু। যে ভঙ্গিতে অনেকক্ষণ শুয়ে থাকতে তোমার অসুবিধে হবে না সেভাবে শুয়ে পড়।
মেয়েটি বোধহয় ওর কথাগুলো ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। সে ডাগর চোখ মেলে শুধু তাকিয়েই থাকে।
কী আশ্চর্য! ওকে এত চেনা-চেনা লাগছে কেন? ঐ রকম মুখ সে কোথায় দেখেছে? বত্তিচেল্লি-পেরুজিনোকরেজজো? না হোলবাইন ব্ৰখেল-ফ্র্যাঞ্জ হ্যাঁলস? না কি আরও পরের যুগের দেলাক্রোয়ে-মানে-এগার-দেগা-রেনোয়? কোন এক দিকপাল শিল্পী নিশ্চয় ঐ রকম একখানা মুখের ছবি এঁকেছিলেন–সেই ছবি-দেখার স্মৃতিটাই ওকে এই বিভ্রমের মধ্যে ফেলছে–মনে হচ্ছে ওকে আগেও দেখেছি।
–ছবি আঁকবেন? অস্ফুটে প্রশ্ন করে মেয়েটি।
বেশ্যাপল্লীতেও ভদ্রতার এই রীতি নাকি? দেহদানের পূর্ব মুহূর্তেও অপরিচিত পুরুষকে আপনি সম্বোধন!
–হ্যাঁ। শুয়ে পড় তুমি। ছবিই আঁকব তোমার।
তারপর ইতস্তত করে বলে, -ভেবেছিলাম ন্যুড-স্টাডি করব; কিন্তু থাক, তোমার অসুবিধা হবে।
-কি করবেন?
–ও কিছু নয়, থাক।
–শুব?
–হ্যাঁ, তাই তো বলছি তখন থেকে।
জামা কাপড় খুলবনি?
খুলবে? বেশ, তাই কর।
চেয়ারটা অন্যদিকে সরিয়ে ভিন্সেন্ট দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে। উপায় নেই। এতটুকু ঘরে স্থানান্তরে সে যাবে কোথায়? কোন ভদ্রমহিলা বেশ পরিবর্তন করতে চাইলে যেটুকু শালীনতা বজায় রাখতে হয় সেটুকু রাখতেই বেচারির কপালে ঘাম ফুটে ওঠে।
দীর্ঘ তিন ঘন্টা ধরে পোর্ট্রেটখানা আঁকল ভিন্সেন্ট। মেয়েটি ওর দিকে ফিরেই শুয়েছিল। হাতখানা আলো আড়াল করতে রেখেছিল চোখের উপর। ভিন্সেন্ট ছবি আঁকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। ঘন্টা তিনেক পরে ও বললে অনেক কষ্ট দিলাম তোমাকে। এবার জামা কাপড় পরে নাও। আমার ছবি শেষ হয়ে গেছে।
আবার পিছন ফিরে বসে। মেয়েটি তার পরিধেয় বস্ত্রটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বলে, — ই- চায় আপনি এই পেরথম আসিছেন, লয়?
ভিন্সেন্ট জবাব দেয় না। পকেট থেকে তিনটি টাকা বার করে সে রাখে খাটের উপর। বলে, -এবার যাই আমি?
মেয়েটি চট করে উঠে দাঁড়ায়। ভিন্সেন্টের হাতখানা চেপে ধরে। গুঁজে দেয় টাকা তিনটে। সে নেবে না ওর দান। ভিন্সেন্ট চমকে ওঠে। এতক্ষণ স্পর্শ বাঁচিয়ে চলছিল সে। হাতখানা চেপে ধরায় বিব্রত বোধ করে। হাতটা ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে; কিন্তু মেয়েটি দৃঢ়মুষ্টিতে ধরে রাখে তাকে। বলে, -হাই বাবা গ! তুমি আমারে চিনতে লারলেক ফাদারদা?
অবাক বিস্ময়ে এবার তাকিয়ে থাকে ভিন্সেন্ট। বিস্মৃতির যবনিকা উঠে যায় তার চোখের উপর থেকে। কী আশ্চর্য! একে চিনতে পারেনি সে? বলে, তুই? বাতাসী?
বারবনিতারও, তা হলে লজ্জা থাকে? দু হাতে মুখ ঢেকে বাতাসী বলে, হাই!
তুই এখানে কেমন করে এলি? মুখে ওসব কি দাগ? বসন্ত হয়েছিল তোর? এ কী চেহারা করেছিস?
বাতাসী ওকে ছাড়ে না। অনেক, অনেক কথা জমে আছে ওর পেটে। ভিন্সেন্ট জোড়-জাঙাল কোলিয়ারি ছেড়ে আসার পর কত কথা! দূরন্ত মারীরোগে মরতে বসেছিল সে। কিন্তু যম তাকে নিল নাফিরিয়ে দিল। মরল মুর্মুর মেয়েটা। মুখে বিশ্রী দাগ, চুল উঠে গেছে। বাতাসী উঠে বসল অসুখ থেকে কিন্তু জোড়-জাঙালে তার মন বসল না। নানুক চলে গেছে। যোসেফের মেয়েটাও থাকল না। শুনল তাদের ফাদারদাও কোথায় চলে গেছে। আর চ্যাতরা দিদিমণি? সেও ডুবে মরেছে। দামোদর খেয়েছে তার বাপকে, মাকে, ভাইকে। সেই দামোদরই জুড়িয়েছে চ্যাতরা দিদিমণির জ্বালা। তারপর অনেক ঘাট ঘুরে বাতাসী এসে পড়েছে এখানে। মাসি তাকে ঠাই দিয়েছে। তার উপার্জনের এক-তৃতীয়াংশ চুক্তিতে তাকে খেতে দেয়, পরতে দেয়, থাকতে দেয়। কত মানুষ দেখেছে বাতাসীকত বিচিত্র মানুষ। গরীব গুর্বো, হঠাৎ বড়লোক, বাবু মশাইরা বাঙালি বিহারী-মাড়োয়ারী, মায় কাবুলিওয়ালা! বহুভোগ্যা বাতাসী আজও বেঁচে আছে। বসন্তের দাগ? ওসব ওরা দেখে না। ওরা যা চায় তার সম্বল আজও নিঃস্ব হয়ে যায়নি বাতাসীর। যেদিন তা ফুরাবে? সেদিন ভিক্ষে করতে বসবে।
সেরাত্রে ভিন্সেন্ট আর বাড়ি ফেরেনি। সারা রাত ছিল ওখানে।
তার পর থেকে সে প্রায়ই যেত ওখানে। বাতাসীর কাছে। ওর ভাল লাগত বাতাসীকে। অন্তত কথা বলার লোক তো পেল এতদিনে। মাঝে মাঝে খরচ করতে হত–না হলে মাসির রসনা মুখর হয়ে উঠবে। ভিন্সেন্ট বাতাসীর অনেক ছবি আঁকল। কিন্তু শুধু ছবি এঁকে ওর তৃপ্তি নেই। নতুন চিন্তা ঢুকেছে তার মাথায়। এভাবে বাতাসীকে সে মরতে দেবে না।
