চন্দ্রভান স্থির করল–তাকে ন্যুড স্টাডি করতে হবে।
কিন্তু কে সিটিং দেবে? কে বসবে ঐ নিলজ্জ ভঙ্গিতে?
রঙ-তুলি ক্যানভাস নিয়ে চন্দ্রভান অবশেষে অবতীর্ণ হল রূপোপজীবিনীদের পাড়ায়।
দুঃসাহস বলতে হবে। কিন্তু দুঃসাহসে ভিন্সেন্ট কোনদিনই বা পিছ-পাও হয়েছে? সে নীতি মানে না, ধর্ম মানে না, ঈশ্বর মানে না। মানে বিবেক। সেই বিবেকের নির্দেশে সে এসে হাজির হল দেহের তীর্থে!
পাৎলুন আর হাফসার্ট পরা অদ্ভুতদর্শন মানুষটাকে দেখে খিল খিল করে হেসে উঠেছিল ওরা। সরু গলি। আধো-আলো আধো-অন্ধকার। ডিমের ডালনা না কঁকড়ার তরকারি কিসের একটা উৎকট রসুন-মিশ্রিত গন্ধের সঙ্গে মিশেছে বেলফুলের সৌরভ। খোলা দরজার ওপাশে একটা জোরালো বাতি–তারই এক প্রস্থ আলো আছাড় খেয়ে পড়েছে গলি-পথটায়। নেপথ্যে হারমনিয়াম তবলা সহযোগে ভেসে আসছে আবহ গজল। দেওয়াল-সেঁটে দাঁড়িয়ে আছে সাত-আটটি মেয়ে। মাথায় বেলফুলের মালা, চোখে কাজলচড়া রঙের রুজ মেখেছে গালে। কপালে কাঁচ পোকার টিপ। সদর। দ্বারের কাছে ঐ খোঁচাখোঁচা দাড়িওয়ালা বিচিত্র জীবটাকে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে ওরা এ-ওর গায়ে লুটিয়ে পড়ে হাসতে হাসতে। কে একজন বলে, কি গো ভাল মানুষের পো? ভির্মি যাবে নাকি?
পিছন থেকে বর্ষীয়সী একজন স্থূলকায়া রমণী ওদের ধমক দিয়ে ওঠে, কী ছেনালি করিস তোরা? আসতে দে না ওরে! পথ আটকে আছিস কেন?
সামনের মুখরা মেয়েটি বলে ওঠে, –ওমা, কি যে বল মাসি? পথ আটকাবো কোন্ দুঃখে গো? কারে নজরে ধরল তা তো ও বলবে? না কি ও তোমার কাছেই যেতে চায়?
আবার খিল্ খিল্ হাসি।
ভিন্সেন্ট অপ্রস্তুত হয়নি মোটেই। ইতিমধ্যে তার নজর পড়েছিল আর একদিকে। ভীড়ের পিছনে দেওয়াল-সেঁটে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। মধ্যবয়স্কা। উৎকট প্রসাধন করেছে সে। কুচকুচে কালো গায়ের রঙ। কিন্তু মেয়েটি মাতৃত্বের ভারে আনত! ভিন্সেন্ট তৎক্ষণাৎ মনস্থির করে ফেলে। জীবন রহস্যের মর্ম উদ্ঘাটনে সে অভিযাত্রী-আর জীবন-রহস্যের মূল তো সৃষ্টিতত্ত্বে! এই পঙ্কিল দুনিয়ার পঙ্কিলতম অন্ধকারে পিতৃ পরিচয়হীন যে শিশু আবির্ভাবের জন্য প্রহর গুনছে-আঁকতে হয় তারই মায়ের ছবি আঁকবে ভিন্সেন্ট! ঐ অনাগত শিশুর সম্মুখেও মাতৃজঠরের আবরণ–কিন্তু নিরাবরণ জননীতত্ত্বের ছবিই বা কে কবে এঁকেছে? ভিন্সেন্ট মনে মনে তার চিত্র-অভিজ্ঞতার পাতা উল্টে যায়। প্রাচ্য বা প্রতীচ্য–কে কবে নিরাবরণা মাতৃত্বের ছবি এঁকেছে? ন্যুড স্টাডি হাজার বছর ধরে করেছে শিল্পীদল; কিন্তু সেখানে বিষয়বস্তু নারী, জননী নয়! কেন? শিল্পীর চক্ষে কি এতাবৎকাল স্ফীতোদর জননীর চিত্রটা সুন্দর মনে হয়নি? সত্য কি সুন্দর নয়? সৃষ্টিই কি সত্য নয়? সুন্দর নয়? মুহূর্তমধ্যে মনস্থির করে ভিন্সেন্ট; ভীড় ডিঙিয়ে ঐ মেয়েটিকে প্রশ্ন করে, তোমার ঘর কোষ্টা?
-ওমা আমি কোথায় যাব! তা হ্যাঁগা ভাল্ মানুষের পো! ওর মুখখানাই শুধু দেখলে তুমি-কেঁচড়ে যে মুড়ির মোয়র পুঁটুলি বেঁধেছে সেটা নজর হল নি?
–তুই চুপ যা দেখি চামেলি! ধমকে ওঠে বর্ষীয়সী বাড়ি-উলি। এগিয়ে এসে সে
ভিন্সেন্টের হাতখানা ধরে, বলে, তুমি ভিতরে এস বাছা; নইলে অরা তোমারে ছিঁড়ে খাবে!
ভিন্সেন্টকে বাড়িউলি মাসি হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যায়। তাকে বসিয়ে দেয় একটা ঘরে। এটা বোধহয় মাসির নিজস্ব ঘর। বলে, -কিছু মনে কর না ভাই। নতুন যারা আসে তাদের নিয়ে ওরা এমনি মস্করা করে। কিন্তু তাও বলি ভাই তুমি ঠিক বুদ্ধির পরিচয় দাওনি।
তারপর মুখটা কানের কাছে এনে বলে, বুঝতে পারনি তুমি? ওর বাচ্চা হবে!
–তাহলে ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলে কেন?
–কোথায় যাবে বল ভাই? ঐ তো, এক অন্ধকূপ কুটুরি! সাঁঝের বেলা একটু নিঃশ্বাস নিতে দাঁড়ায় ওখানে! ও কি এখন তোক বসাতে পারে?
ভিন্সেন্ট কি একটা কথা বলতে যায়; কিন্তু তার আগেই দ্বারের কাছে এসে কে। ডাকে, মাসি!
-কি রে?
মাসি দ্বারের কাছে সরে আসে। আগন্তুক সেই আসন্নজননী মেয়েটি। সে নিম্নস্বরে কি বললে তা শোনা গেল না; কিন্তু মাসির আপত্তিটা শোনা গেল। মাসি কিছুতেই রাজী হতে চায় না। শেষ পর্যন্ত সে হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে আসে। ভিন্সেন্টকে বলে, কি জানি বাপু! ও আবাগিরও দেখি তোমারে মনে ধরেছে। তা বেশ। তিন টাকা লাগবে বাপু। দু-ট্যাকা অর, এক টাকা আমার! প্রথম দিন, কম করেই ধরলাম। আর শোনো
মুখটা কানের কাছে এনে ভিন্সেন্টকে একটু সাবধান করে দেয়। দু-একটা উপদেশ দেয়। ভিন্সেন্টের খরগোশের মত খাড়া কান দুটো লাল হয়ে ওঠে।
ছোট্ট ঘর। সেখানে ঘর জোড়া চৌকি। পরিষ্কার বিছানা পাতা তাতে। নরম গদি। দুটি বালিশ। দেওয়ালে কালীঘাটের একটি পট। অন্নপূর্ণা ভিক্ষা দিচ্ছেন ভোলানাথকে। কুলুঙ্গিতে একটি লক্ষ্মীর পট। কাল বৃহস্পতিবার গেছে। ফুলের মালাটা পটের উপর এখনও শুকিয়ে যায়নি। দেওয়ালে টাঙানো একটা হাত-আয়না। কোণায় একটা হাতলহীন চেয়ার। ভিন্সেন্ট চেয়ারে গিয়ে বসল। মেয়েটিও ঢুকেছে ঘরে।
ভিন্সেন্ট তখনও মুখ তুলে মেয়েটিকে ভাল করে দেখেনি। কাঁধের ঝোলা ব্যাগ। থেকে সে রঙ-তুলি ক্যানভাস বার করতে থাকে। ঘরে আলো বড় কম। বললে, একটা ভাল লণ্ঠন আনতে পার?
