চন্দ্রভান জানায়, মেদিনীপুরে বন্যায় এক রাত্রে কিভাবে চিত্রলেখার বাপ-মা-ভাই ভেসে গিয়েছিল। চিত্রলেখার একটা নিখুঁত আলেখ্য আঁকল সে কথার জাল বুনে। একহারা লম্বা ছিপছিপে শ্যামলা মেয়ে, চোখ দুটি উজ্জ্বল, চিবুকটা নিখুঁত। আমি চিনতে পারলাম তাকে। বুঝতে পারি চন্দ্রভান ভুল বলছে দামোদরের জলে ডুবে মরেনি ওর সেই চিত্রলেখা, মরেছে অক্সালিক অ্যাসিড খেয়ে। আমি নিজে হাতে তাকে পুড়িয়েছি কেওড়াতলার শ্মশানঘাটে। সেকথা জানে না চন্দ্রভান। সেকথা আমিও জানাই না। কী লাভ ওকে নতুন করে আঘাত দিয়ে?
চন্দ্রভান বলে, –ঐ জোড়-জাঙ্গাল ছেড়ে আসার সময়েই আমার প্রথমবার অ্যাটাক হয়।
–অ্যাটাক হয়! কিসের অ্যাটাক?
–পাগলামির। একটা খণ্ডমুহূর্তে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি কী করছি তা আমি জানতাম না। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল আমার ডান হাতখানা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাকে শাস্তি দিতে হবে। কঠিন শাস্তি দিয়েছিলাম হাতটাকে। এই দেখ–সে প্রায়শ্চিত্ত আমার আজীবনের সঙ্গী হয়ে আছে।
ডান হাতখানা আলোর সামনে মেলে ধরে সে। হাতের তালুতে প্রকাণ্ড একটা পোড়া দাগ। বিধাতা ওর হাতে আয়ু-রেখা, ভাগ্য-রেখা, যশ-রেখা কী লিখেছিলেন তা আর কোনদিন পড়া যাবে না। বিধাতার দেওয়া সে হস্তরেখার সমস্ত চিহ্ন চন্দ্রভান পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। বিধাতাকে সে মানে না। বিধাতার দেওয়া হস্তরেখার নির্দেশও সে মানবে না। সে আপন দুর্ভাগ্য আপনি গড়ে তুলেছে অতঃপর। বললে, মোমবাতির শিখায় আধ মিনিট হাতখানা কেমন করে ধরে রেখেছিলাম আজও ভেবে পাই না! কিন্তু যতদূর মনে আছে আমি তখন একতিলও কপিনি, যন্ত্রণায় একটি আর্তনাদও করিনি! আমি ঐ এক মিনিট ধরে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম।
এবার যে আমার পাগল হওয়ার পালা! ওর সে পাগলামির বর্ণনা শুনে মুহূর্তে আমার চোখের উপর থেকে একটা পর্দা সরে গেল। বহুদিনের একটা সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। বটুক বলেছিল বটে–যীশুখ্রীষ্টের ডান হাতের তালুতে পেরেকের দাগটার বিষয়ে সুলেখার মনে একটা অবসেশান ছি। বটুকের ডান হাতের তালুতে একবার সামান্য একটু কেটে যাওয়ায় ফিট হয়ে গিয়েছিল সুলেখা। মনে পড়ল শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের সেই নার্সটির কথাসুলেখার মূৰ্ছিত দেহের কাছে কোন প্রদীপ জ্বলছিল না। তবু তার হাতে একটা ফোস্কা হয়েছিল। চিত্রলেখা কি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে চন্দ্রভানের যন্ত্রণার অনুভূতিটাকে হাত বাড়িয়ে ধরতে চেয়েছিল?
জোড়-জাঙ্গাল কলিয়ারি ছেড়ে আসার পরের ইতিহাসটা এবার সে বলতে শুরু করে।
সূরযভান তখন কলকাতার একটি মেসে থাকে। মাত্র উনিশ কুড়ি বছর বয়স তখন তার। সবে চাকরিতে ঢুকেছে ম্যাট্রিক পাস করে। মেসে দাদাকে এনে তুলতে পারল না। বাধা ছিল। চন্দ্রভান খ্রীষ্টান, মেসবাবুরা সবাই হিন্দু। বাধ্য হয়ে চন্দ্রভান একটি ঘর ভাড়া নিল। প্রতিদিন অফিস ছুটির পর সূরয এসে দাদার খবরদারি করত। ক্রমে ওর হাতের
ঘা সারল। চন্দ্রভান লেগে থাকল তার ছবি আঁকার সঙ্কল্পে। সূরয ছবির কিছুই বোঝে। না; কিন্তু ওর দৃঢ় ধারণা দাদার ছবি একদিন না একদিন সমাদর পাবেই। এর কিছুদিন পর সূরয বদলি হয়ে গেল দিল্লীতে। একা পড়ে গেল চন্দ্রভান। দিনরাত সে ছবি এঁকে বেড়ায়। ঘরেবাইরে। দুজনের সঙ্গে তার পত্রালাপ চলত। চিঠি যেত দিল্লী-মুখো আর আসানসোল-মুখো। জবাব আসত সূরযের কাছ থেকে, আসত দেবনারায়ণবাবুর কাছ থেকে। সূরয অন্ধ বিশ্বাসে ওকে উৎসাহ যোগাতো, আর দেবনারায়ণবাবু ওকে যে। আশীর্বাদ করতেন তার পিছনে থাকত দক্ষ শিল্পীর ধ্যান-ধারণা।
ল্যাণ্ড স্কেপ আর স্টিল-লাইফ আঁকার দিকে ঝোঁক। মানুষজনের কিছু কিছু স্কেচ করেছে, পেনসিলে বা ক্রেয়নে। পোর্ট্রেট আঁকবার সুযোগ কই? কে ওর জন্য ধৈর্য ধরে সময় নষ্ট করবে? জোড়-জাঙ্গালের মালকাটারা তবু ওর খেয়াল চরিতার্থ করবার সুযোগ দিত। হাজার হোক সে ওদের ফাদারদা। কলকাতা শহর সে হিসাবে নিতান্ত উদাসীন। কাজের চাকায় বাঁধা এর লক্ষ বাসিন্দা।
এই সময় আরও একটা ধারণা অঙ্কুরিত হয়ে ওঠে শিল্পীর মনে। তার মনে হত যে জগন্টা সে দেখতে পাচ্ছে সেটা সত্য নয়। এ যেন প্রেক্ষাগৃহের সামনে প্রলম্বিত একটা প্রকাণ্ড যবনিকা। রূপরস-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের চিত্র বিচিত্র করা ঐ পর্দাটা টাঙানো আছে চোখের সামনে, কারণ দর্শকদের কে যেন আড়াল করে রাখতে চায় ভিতরের গোপন আয়োজন থেকে। ঐ পর্দাটা যখন উঠে যাবে তখন শুরু হবে আসল অভিনয়। ভিন্সেন্ট তার ক্যানভাসে পথ-ঘাট, গাছ-পালা আঁকে কিন্তু তার মন ভরে না; তার মনে হয়–এহ বাহ্য। ঐ পথ যেন কী একটা কথা বলতে চায়, ঐ গাছ যেন তার প্রাণের কথা শোনাতে চায়—-ঐ বর্ষণোম্মুখ মেঘ, ঐ সান্ধ্য আকাশের অস্তরবিচ্ছটার যেন আরও কিছু বক্তব্য আছে কিন্তু তারা সে কথা বলতে পারছে না। ওর ক্যানভাসে সেই গোপন কথা ফুটে উঠছে না। দৃশ্যমান জগতের অন্তরের নিবিড় বাণী যদি তার ক্যানভাস মূর্ত না হয়ে ওঠে তবে আর কী ছবি আঁকল সে? সেটা তো ফটোগ্রাফ।
আর সৃষ্টির সবচেয়ে বড় রহস্য-মানুষ! তার সামনে যে আবার ডবল পদা! সে কথা বলে মনের ভাব ব্যক্ত করতে নয়, গোপন করতে! সে হাসে কান্না লুকোতে! সে কাঁদে-ধরা পড়ে যাবার ভয়! তার উপর সে চড়িয়েছে আবরণ। শুধু মন নয়, দেহের উপরেও টেনে দিয়েছে পর্দা! ভিন্সেন্ট ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়েছে কিন্তু বাইবেল বর্ণিত ঈশ্বর ও-ভুল করেননি। তিনি আদিম আদম আর ঈভকে অনাবৃত রেখেছিলেন। তাই রেনেসাঁস যুগের শিল্প-ঋষির দল টেনে খুলে ফেলেছিলেন ঐ নির্মোক!
