সূরয দিন তিনেক পরে আমার নির্বাচিত ডাক্তারের রিপোর্ট নিয়ে এল। চন্দ্রভান কোন দৈহিক অসুখে ভুগছে না। তার ওজন কম, রক্তচাপ অস্বাভাবিক, অন্যান্য উপসর্গ নেই; আর সবচেয়ে বড় কথা, যে অসুখের কথা আমি আশঙ্কা করেছিলাম সে অসুখ তার নেই, কখনও হয়নি।
কিমাশ্চর্যমতঃপর!
চন্দ্রভান কিন্তু কিছুতেই আমার কাছে আসতে রাজী হল না। অগত্যা সূরযকে সঙ্গে নিয়ে আমিই তার বাসায় গিয়েছিলাম। অভিমান করার হক্ আছে বইকি চন্দ্রভানের!
অপমানটা তো সেদিন আমি কম করিনি!
শ্যামবাজার অঞ্চলে একটা এঁদোস্য-এঁদো কানা গলি। দুজন লোক পাশাপাশি চলতে পারে না। আগু-পিছু হাঁটতে হয়। তারই ভিতর একটা খোলার চালের ঘর। দু-অংশে ভাগ করা। ও-অংশে কতকগুলি মেহনতী মানুষের বাস। দিনের বেলায় কেউ ঠেলা চালায়, কেউ রিকশা। কেউ বা ঝকা নিয়ে চলে যায় শ্যামবাজার অথবা হাতিবাগানের বাজারে মোট বইতে। অপর অংশে বাস করে শিল্পী ভিন্সেন্ট ভান গর্গ। একটা চৌকি, খানকয় এনামেল আর অ্যালুমিনিয়ামের বাসন। একটা স্টোভ আর ইন্দুমাধব মল্লিক মশায়ের নব-আবিষ্কৃত একটা অদ্ভুত যন্ত্র। ওতে নাকি একসঙ্গে ভাত-ডাল-আলুসেদ্ধ রান্না হয়ে যায়। আর আছে তার আঁকবার নানান সরঞ্জাম। রঙ, তুলি, ক্যানভাস। সে গৃহস্থালীর সঙ্গে তুলনা করা চলে একমাত্র বরানগরে দেখা গগ্যার ঘরখানার।
চন্দ্রভান কিন্তু আমাকে আদর করে বসালো। আমি প্রথমেই বললাম, কিরে, রাগ করে আছিস নাকি?
ও পুরাতন প্রসঙ্গটাকে আমলই দিল না। বললে, –আয় আয়, বস!
চৌকির উপর তেলচিটে মাদুরটা পেতে দেয়।
.
চন্দ্রভানের চিকিৎসার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম আমি।
বন্ধুকৃত্য ছাড়া আরও দুটি কারণ ছিল সে সিদ্ধান্তের পিছনে। প্রথমত, কেমন একটা অপরাধবোধে অনুশোচনা জেগেছিল আমার। দু বছর আগে ওভাবে যদি আমি তাকে তাড়িয়ে না দিতাম, তাহলে হয়তো চন্দ্রভান এ রোগে পড়ত না। সকলের কাছ থেকে ক্রমাগত অপমান, আঘাত আর প্রত্যাখ্যান পেতে পেতে ও বোধহয় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে বসেছে। দু বছর আগে সে অনেক আশা নিয়ে তার পুরনো বন্ধুর কাছে এসেছিল একটু সহানুভূতির আশায়। সেখানে আবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে সে মানসিক স্থৈর্য হারিয়ে বসে থাকতে পারে। অর্থাৎ পরোক্ষভাবে আমি হয়তো ওর মানসিক ব্যাধির অন্যতম কারণ। দ্বিতীয়ত, আমার দুরন্ত কৌতূহল হয়েছিল চিকিৎসা বিজ্ঞানী হিসাবে। ডক্টর মিসেস্ স্মিথ-এর রিপোর্টটার কথা আমি ভুলতে পারিনি। যার স্ত্রীর যৌনব্যাধি অমন শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছিল সে কেমন করে এমন সুস্থ সবল থাকল দৈহিক নিরিখে?
মনোবিজ্ঞানের চর্চা তখনও ভারতবর্ষে খুব ব্যাপকভাবে শুরু হয়নি। গিরীন্দ্রশেখর বসু মহাশয়ের গবেষণাপ্রসূত জ্ঞান তখনও আমরা জানতাম না। কিছু কিছু আধুনিক বিলাতী ম্যাগাজিনে সাইকোঅ্যানালিসিসের পদ্ধতি মোটামুটিভাবে জানা ছিল। দুএকজন চিকিৎসক এ নিয়ে পড়াশুনা করছেন, গবেষণা করছেন কিন্তু তাদের সাহায্য পাওয়ার মত আর্থিক সামর্থ্য ছিল না আমার বন্ধুর। ও যে একজন মস্তবড় শিল্পী এমন ধারণা আমার আদৌ ছিল না, তবে ও যে আমার বন্ধু এ তো অস্বীকার করতে পারি না! তাই নিজেই যেটুকু সম্ভব তা করব বলে স্থির করি। মনের অসুখের বিষয়ে বই এনে পড়তে শুরু করলাম। একজন অস্ট্রিয়ান বৈজ্ঞানিকের সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বই পেয়ে গেলাম লাইব্রেরীতে। বইটি সবেমাত্র ইংরাজিতে অনুবাদ করা হয়েছে। তার চিকিৎসা-পদ্ধতির মূল কাঠামো এবং কয়েকটি কেস হিস্ট্রিও লেখা আছে। বৈজ্ঞানিকের বয়স পঁয়ষট্টি, নাম দেখলাম সিগমুণ্ড ফ্রয়েড–চিকিৎসা-পদ্ধতির নাম সাইকোঅ্যানালিসিস। রাত জেগে পড়ে ফেললাম বইটা। স্থির করলাম, চন্দ্রভানই এ পদ্ধতিতে আমার প্রথম রোগী হবে। ফ্রয়েড নামধেয় ডাক্তার সাহেব বলেছেন, মানসিক ব্যাধির মূল মানুষের অবচেতন মনে বাসা বাঁধে। কোন একটা গোপন কামনা তার অন্তস্তল কুরে কুরে খায়। রোগী যদি তার অতীত জীবনের সমস্ত ঘটনা অকপটে কোন বন্ধুর কাছে অথবা ডাক্তারের কাছে খুলে বলতে পারে তাহলে অনেক সময় তার রোগের নিরাময় হয়। সেকথা ফ্রয়েড সাহেবকে বলতে হবে কেন? এ তো আমরাও জানি। মনের ভার নামিয়ে দেওয়ার একমাত্র উপায় কাউকে সব কথা খোলাখুলি বলে ফেলা। এ-ক্ষেত্রে সুবিধা এই-যে ডাক্তার সেই হচ্ছে ওর বাল্যবন্ধু। সুতরাং ও নিশ্চয় নিঃসঙ্কোচে সব কথা বলতে পারবে। আমাকে শুধু ধৈর্য ধরে শুনতে হবে, ওকে উৎসাহিত করতে হবে, আগ্রহ দেখাতে হবে, সহানুভূতি জানাতে হবে।
সূরযভান আমার কাছে দাদাকে বুঝিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তভাবে ছুটির শেষে তার কর্মস্থলে ফিরে গেল। মাসান্তে সে মনি-অর্ডার করে দাদার সংসার-খরচ পাঠায়। চিকিৎসার যাবতীয় খরচ সে যোগাবে বলে প্রতিশ্রুত হল।
চন্দ্রভানের সঙ্গে নূতন করে বন্ধুত্ব হল। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর সে আমার কাছে আসত। তার অতীত জীবনের সমস্ত ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করে যেত। তার গৃহত্যাগের কথা, বাওয়ালীতে আগমন, সেখানে ঊর্মিলা শারদাঁর প্রতি তার আকর্ষণ, তার ধর্মান্তর গ্রহণ। তারপর ধর্মপ্রচারক হিসাবে তার জোড়-জাঙ্গাল কোলিয়ারিতে আবির্ভাব, গীর্জার সংস্কার। যোসেফ মুর্মু-এককড়ি সরখেল–পাঁচু হালদারের দল জীবন্ত হয়ে উঠল আমার কাছে। ফাদার মার্লো, ব্রাদার দাভিদ অথবা নাথানিয়াল সাহেবদের আমি চোখ বুজলেই দেখতে পেতাম। তারপর সে এল পাঁচু হালদারের বোনঝির প্রসঙ্গে। এবার আর আমার নির্বাক শ্রোতা হয়ে থাকা সম্ভবপর হল না। বলি, চিত্রলেখা! কেমন দেখতে মেয়েটা? তার বাপ-মা কোথায় গেল?
