বললাম, -খাঁ সাহেব, এ-ছবির নিচে জি. পি. সই কেন? বটুকেশ্বরবাবুর আর কোন ছবিতে তো এমন সই দেখিনি!
কথাটা খরিদ্দারদের অনেকের কানে যায়। সবাই সইটা লক্ষ্য করে দেখে নিলামদার ভদ্রলোক আমার এ মন্তব্যে কিছুটা বিরক্ত হন। কিন্তু খরিদ্দার হচ্ছেন মা লক্ষ্মী, তার উপর রাগ করতে নেই। বলেন, আজ্ঞে না স্যার, ওটা পি নয়, ডি। একটু কায়দা করে লেখা। আর্টিস্টিক স্টাইলে। ডি-এর বাঁকা লাইনটা খাড়া-লাইনের তিন পোয়া অংশে এসে লেগেছে। বটুকবাবুর ডাকনাম ছিল গোপাল। তাই সই আছে জি. ডি.-গোপাল দেবনাথ। এটা নতুন ঢঙে এঁকেছেন বলে নতুন নামে এটাকে অভিষিক্ত করেছেন।
ওর কৈফিয়তে খরিদ্দারদের মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন ওঠে। ছবিটা জাল–এমন একটা কথা উঠে পড়ে। একে তো স্বাক্ষরে গণ্ডগোল, তায় এটা বটুকেশ্বরের স্টাইলের সঙ্গে মিলছে না, এবং বিষয়বস্তুটা যে কী তাই ভাল বোঝা যাচ্ছে না। এ ছবির ডাক হল না। নিলামদার দাম কমিয়ে ধরলেন। তাও কেউ ডাকে না। শেষে আমি বলি যে, –খাঁ সাহেব, দশটা টাকা দিতে পারি। দেবে?
খাঁ সাহেব রাজী হয়ে গেল। সেও বোধকরি বুঝতে পেরেছিল ছবিটা সাচ্চা নয়। জাল।
১৩-১৪. বছর দুয়েক পরে
প্রায় বছর দুয়েক পরের কথা।
এ দু বছরের ভিতর আমার জীবনে গগন বা চন্দ্রভান কোন ছায়াপাত করেনি। ওদের খবরই জানতাম না। বরিশাল থেকে মাঝে মাঝে বটুকের চিঠি আসত। পাটোয়ারি ব্যবসা তার ভালই চলছে। একদিন আমার সঙ্গে ডাক্তারখানায় দেখা করতে এলেন এক ভদ্রলোক। বলিষ্ঠ সুগঠিত শরীর। যুবাপুরুষ। বলেন, আমায় চিনতে পারলেন না দীপুদা? আমি সূরয!
–আরে তাই তো? কত বড় হয়ে গেছ সূরয! কী খবর? কী করছ, কোথায় আছ?
সূরযভান তার সব খবর জানায়। দিল্লীতে কমিসেরিয়েটে চাকরি করে। প্রথম কলকাতাতেই চাকরিতে ঢুকেছিল। যে বছর মোহনবাগান শীল্ড পেল, সে বছরই ভারতের রাজধানী চলে গেল দিল্লীতে। সূরযও ঐ সময় দিল্লী চলে যায় বদলি হয়ে। সে আজ বছর পনের আগের কথা। ইতিমধ্যে প্রথম যুদ্ধ এসেছে এবং গেছে। সূরযের বয়স এখন বছর তেত্রিশ। বিবাহ করেনি। একাই আছে দিল্লীতে। পৈতৃক সম্পত্তি সে পায়নি। সে একা নয়, ওরা দু ভাই বঞ্চিত হয়েছিল পৈতৃক সম্পত্তি থেকে। কাকা একটি উইল বার করে তাঁর নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। উইলটা জাল কি সাচ্চা যাচাই করবার মত আর্থিক সঙ্গতি ছিল না সূরযভানের। আর তার দাদা তো আগে থেকেই নেপথ্যে সরে গেছে। ফলে সূরয কোন দাবী করেনি; নীরবে মেনে নিয়েছে দুর্ভাগ্যকে। দুঃখ নেই তার। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে আবার।
জিজ্ঞাসা করি, –তোমার দাদা কোথায়?
কলকাতাতেই আছে। সেই দাদার ব্যাপারেই এসেছি আপনার কাছে। দাদা আমার কাছে দিল্লীতে গিয়ে থাকতে চায় না। তাছাড়া–মানে, সে অনেক কথা। মোট কথা দাদা বরাবরই কলকাতাতেই আছে। একাই। আমিই মাসে মাসে তাকে খরচ পাঠাই। ও আপন মনে ছবি এঁকে যায় শুধু। দাদার ছবি এখনও লোক নেয়নি।
আবার প্রশ্ন করি, তোমার দাদা একা থাকে মানে? তোমার বউদি কোথায়?
–বৌদি দাদার কাছে থাকে না। দাদাকে ছেড়ে চলে গেছে।
একটু ইতস্ততঃ করে বলি, তোমার বৌদিকে নিয়ে চন্দ্রভান বছর দুই আগে আমার কাছে এসেছিল, তখন তাঁর সন্তান সম্ভাবনা ছিল। বাচ্চাটা–
-হ্যাঁ, জানি। দাদা বলেছে। একটি মেয়ে হয়েছিল তাঁর।
সুস্থ সবল?
হ্যাঁ।
–ও! তারপর?
সূরযভান একটা সঙ্কোচকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বলে, –আপনাকে বরং খোলাখুলি সব কথা বলি। ডাক্তারের কাছে কোন কিছু গোপন করা ঠিক নয়। দাদা ঐ মেয়েটিকে বিয়ে করেনি; একসঙ্গে ওরা থাকত। মেয়েটি খুব ভাল ঘরের নয়। সে যাই হোক, সে দাদাকে ছেড়ে চলে গেছে। দাদা শ্যামবাজারের ওদিকে একাই থাকে। নিজে হাতে রান্না করে খায়। আপনার কাছে যে জন্য এসেছি তা এবার বলি। আজ মাস দুয়েক হল দাদার একটু মস্তিষ্কবিকৃতির লক্ষণ দেখা দিয়েছে। এমনি ভালই থাকে, কিন্তু মাঝে মাঝে সে কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করে বসে। হঠাৎ ভীষণ উত্তেজনা অনুভব করে। তখন ও এমন সব কাজ করে বসে যার কোন মানে হয় না। ও নিজেই পরে অনুতপ্ত হয়। নিজের কাছে নিজেই কোন কৈফিয়ৎ দিতে পারে না। গত এক বছরে এমন বার-তিনেক হয়েছে। প্রথমটা আমাকে সে কিছু জানায়নি। গোপন করতে চেয়েছিল; কিন্তু এবার সে ভয় পেয়ে আমাকে জানায়। আমি ছুটি নিয়ে চলে এসেছি। আপনি একবার দাদাকে পরীক্ষা করে দেখবেন?
কি জবাব দেব বুঝে উঠতে পারি না। রতিজ রোগ থেকে মস্তিষ্ক বিকৃতি হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু এসব কথা কি সূরযকে বলা উচিত? আবার গোপন করাও ঠিক নয়; বস্তুত সেই তো এখন রোগীর গার্জেন। শেষে বলি, –সূরয, তোমার দাদার সঙ্গে বছর দুই আগে আমার একটা মনোমালিন্য ঘটেছিল
জানি, দাদা সব কথা বলেছে আমাকে। তাই তো সে আজ আমার সঙ্গে এল না।
-তুমি এক কাজ কর। আমি একজন ডাক্তারকে একখানা চিঠি লিখে দিচ্ছি। তুমি প্রথমে তাকে দিয়ে চন্দ্রভানকে দেখাও। তারপর আমাকে রিপোর্টটা দেখিও। আমি পরবর্তী ব্যবস্থা করব।…আচ্ছা সূরয, একটা কথা বল তো! তোমাদের বংশে কারও উপদংশ অথবা প্রমেহ অসুখ ছিল বলে শুনেছ?
না। একথা কেন জিজ্ঞাসা করছেন?
-মস্তিষ্ক বিকৃতির কারণ হিসাবে বংশানুক্রমিক ইতিহাসটাও তো বিবেচনা করতে হয়।
