ওপাশে থাক দিয়ে রাখা আছে ওর আঁকা ছবি। যীশুখ্রীষ্টের ছবির তলায় পোড়া ধূপকাঠি আর ছাই। হঠাৎ বটুকের নজর পড়ল ঘরের ও-প্রান্তে একটা বড় ক্যানভাসের দিকে। ছবিটা দেওয়ালে ঠেসান দেওয়া; দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। বড় সাইজের ক্যানভাস। এতবড় ছবি কোনটা? ওর মনে পড়ে না। সে উঠে এসে ছবিটা তুলে বসিয়ে দেয় চৌকির প্রান্তে। একটু দূরে সরে গিয়ে তাকিয়ে দেখে।
তৎক্ষণাৎ বটুকের মাথার মধ্যে টলে উঠল। সুলেখা যেমন টলতে টলতে পড়ে যেত ফিট হবার সময় তেমনি করেই ও বসে পড়ে একটা চেয়ারে। একটা আর্ত চিৎকার তার কণ্ঠনালী বিদীর্ণ করে বেরিয়ে আসতে চায় কিন্তু স্বর ফোটে না তার মুখে। ওর হাত পা যেন অসাড় হয়ে যায়।
ওর থেকে হাত চারেক দূরে খাটের উপর খাড়া করে রাখা আছে একটা ক্যানভাস। এইমাত্র যেটা সে নিজেই বসিয়েছে। ছবিটা বটুকের আঁকা নয়। ছবিটা এ বাড়িতে ছিল না। ছবিটা একটা ন্যুড! যে পোজে সুলেখার ছবি এঁকে সে প্রাইজ পেয়েছিল অবিকল সেই ভঙ্গিমায় মেয়েটি শুয়ে আছে। শুধু কল্কাপাড় বেনারসী শাড়িখানা অন্তর্হিত! ডাচেস অফ আলভা নয়–লেখা, দি ন্যুড!
হঠাৎ হিংস্র শ্বাপদের মত লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। লেখা নেই, গগ্যা নেই, কিন্তু ঐ ছবিখানা আছে! ওর সমস্ত আক্রোশ ফেটে পড়ল ঐ ছবিখানার উপর। ঐ ক্যানভাসখানা ফালা ফালা করে ছিঁড়ে না ফেলা পর্যন্ত ওর আত্মা শান্ত হবে না। ও হাত বাড়িয়ে ধারালো একটা কিছু খুঁজতে থাকে। ঐ নগ্নিকার নরম বুকের মাঝখানে ওকে এখনই বসিয়ে দিতে হবে তীক্ষ্ণ একটা শলাকা! সেই হবে ওর চরম প্রতিশোধ! বটুকের হাতে ঠেকল একটা পেন্সিল কাটা ছুরি। উন্মত্ত ঘাতকের মত সেখানা নিয়ে সে এগিয়ে এল
দৃশ্যটার বর্ণনা করছিল বটুক আমার টেবিলের অপর প্রান্তে বসে। উত্তেজনায় সে থরথর করে কাঁপছিল। যেন সে রাত্রে ঘটনাটা সে আবার সর্বাঙ্গ দিয়ে অনুভব করছে। যেন সে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে তার ব্যভিচারিণী স্ত্রীর নিলজ্জ উলঙ্গ দেহটা। হঠাৎ সে আমার টেবিল থেকে তুলে নিল একটা পেন্সিল কাটা ছুরি। মুষ্টিবদ্ধ হাতটা ওঠালো–ঠিক যে ভঙ্গিতে বোধকরি সে সেরাত্রে ঐ ছবিটার বুকে ছুরি বসিয়েছিল। তারপর ওর হাতটা আলগা হয়ে গেল। আমার টেবিলের উপর ঝন্ঝন্ করে ঝরে পড়ল ছুরিটা।
বিদূষক বটুকের অভিনয় নিখুঁত। আমি বলি, তারপর?
–আমার হাতটা সেদিন অবশ হয়ে গেল দীপু। লেখার বুকের মাঝখানে ঐ তীক্ষ্ণ অস্ত্রটা বিঁধিয়ে দেবার জন্য আমি মুষ্টিবদ্ধ হাতটা তুললাম। আর ঠিক তখনই আমার নজরে পড়ল–
কী?
–ছবিখানা!
ছবিখানা? মানে?
ইট ওয়াজ এ গ্রেট পীস্ অফ আর্ট!
দু হাতে মুখ ঢেকে বটুক বলে উঠল, –পারলাম না রে দীপু, কিছুতেই পারলাম না। সেই রাত্রেই চুড়ান্তভাবে হেরে গেলাম আমি গগ্যার কাছে। প্রতিশোধ নেওয়া হল না আমার। ন্যুড স্ট্যাডি তো কতই দেখেছি কিন্তু একটা চরিত্রকে ছবির মাধ্যমে এমনভাবে প্রাণ পেয়ে উঠতে আমি কখনও দেখিনি। লেখা মরেনি। তার মৃত্যু নেই। ঐ ছবিখানার মধ্যে সে বেঁচে আছে। লেখাকে আমি নতুন করে চিনতে পারলাম। যে কথা গগ্যা মুখ। ফুটে বলেনি, যে কথা লেখা স্বীকার করে যায়নি–ঐ ক্যানভাসটা আমাকে তাই জানিয়ে দিল। ওর রতিক্লান্ত অর্ধস্তিমিত চোখের তারা, ওর বাণীহীন ওষ্ঠাধর, ওর অনাবৃত যৌবনপুষ্ট দেহের প্রতিটি আনন্দঘন লোমকূপ যেন চিৎকার করে বলে উঠলগগ্যার কাছে ও এমন কিছু পেয়েছে, যার স্বাদ সে বত্রিশ বছরেও জানত না! আমি আর্টিস্ট! আমার কাছে এ ছবি মৃত্যুঞ্জয়ী। এ আমি নষ্ট করতে পারি না! কিন্তু আর্টিস্ট হলেও আমি তো মানুষ। কদাকার কুৎসিত হলেও আমি তো প্রেমিক। জানি না, কেন এ ছবিটা গগ্যা ফেলে রেখে গেছে; কিন্তু ওটাকে যেমন নষ্ট করতে পারি না তেমনি ওটাকে সহ্যও করতে পারব না। কাকে দেব? ও ছবি যে আমার স্ত্রীর লাজবস্ত্র হরণ করেছে। তোকেও দিতে পারি না।
আমি বলি, -তাই বুঝি সেই ছবিখানা গগ্যাকে দিয়ে এলি?
–একমাত্র তাকে দেওয়া ছাড়া আর আমার কি উপায় ছিল বল?
গগ্যা কি বলল?
বললে তুই এতদিনে একটা বুদ্ধিমানের মত কাজ করতে যাচ্ছিস মটকু। মহাজনী কারবারে তোর পসার হবে?
বটুক নির্বিকারভাবে বলেছিল কথাটা। কিন্তু আমার গালে সে যেন ঠাস্ করে একটা চড় মারল। গগ্যা তার দৈত্যের মত দেহটা নিয়ে যদি সেই মুহূর্তে আমার সামনে উপস্থিত হত তাহলে বটুকের হস্তচ্যুত ঐ পেন্সিল কাটা ছুরিটা আমি বোধকরি আমূল বসিয়ে দিতাম তার চোখের মধ্যে! যে চোখ দিয়ে সে দেখেছিল–লেখা, দি ন্যুড!
বটুকের নিলামদারের কাছ থেকে পূজারিণী ছবিখানা আমি নিলামে ডেকে কিনেছিলাম। তার পঁচিশ বছরের শিল্প-সাধনা কোন এক রবিবারে নিলামদারের মাধ্যমে মানুষের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। পূজারিণীখানা কিনেছিলাম একশ ষাট টাকায়। বড় দু-একটি ক্যানভাস আড়াইশ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হয়। অভিমান করে রঙ-তুলি ছুঁড়ে ফেলে দিল বটুক, লেগে থাকলে আরও নাম করত সে।
বটুকের চিত্রসম্ভারের মধ্যে একখানার তলায় স্বাক্ষর ছিল জি. পি.। সেটা বরানগরের সেই বস্তীর অয়েল কালারখানা। সেই নিচে সবুজ বাচ্চা, উপরে চিল, আর মাঝখানে মড়া-বেড়ালের ছানা! নিলামদার সেখানাও বটুকেশ্বর দেবনাথের আঁকা ছবি বলে দিব্যি চালিয়ে দিল। বিষয়বস্তুটা কী, তাই নিয়ে অনেক শিল্পরসিক নিজেদের মধ্যে গবেষণা করছিলেন। নিলামদার প্রারম্ভিক দর ধরেছে পাঁচশ টাকা। গগ্যার হাতে-আঁকা ছবি আমার কাছে একখানিও ছিল না। হাজার হোক সে আমার বাল্যবন্ধু!
