জিজ্ঞাসা করলাম, ছবিগুলো দিলি কেন?
–ছবি আঁকা ছেড়ে দিলাম যে! বাবার মহাজনী কারবার দেখব এবার থেকে।
অর্থাৎ আমার তিন আর্টিস্ট বন্ধুর একজনের মৃত্যু হল। চন্দ্রভান, গগ্যা আর বটুকেশ্বর–আমার তিন সহপাঠী বন্ধুই ছবি আঁকতে চেয়েছিল। চন্দ্রভান আর গগ্যা এখন কোথায় কি করছে জানি না; কিন্তু আর্ট স্কুলের পাস করা বন্ধুটি এতদিনে খসে পড়ল এ প্রতিযোগিতা থেকে।
বটুক কাগজে-মোড়া একখানা ছবি আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলে, –এখানা তোর জন্যে এনেছি। এটা দেখলে আমার কথা মনে পড়বে।
ক্রুশবিদ্ধ যীশু! যেখানা বড়দিনে সে সুলেখাকে উপহার দিয়েছিল।
আমি বলি, –তোর নিলামদারের নাম-ঠিকানা বল্। আরও একখানা ছবি কিনতে হবে আমাকে
–কোনখানা? পূজারিণী?
না। সেই ডাচেস অফ-আলভার পোজে আঁকা ছবিখানা। সেই বেনারসী পরে শুয়ে থাকা ছবিটা। যেটা প্রাইজ পেয়েছিল।
বটুক মুখটা নিচু করে আস্তে আস্তে বললে, –সেখানা নেই। নষ্ট করে ফেলেছি।
নষ্ট করে ফেলেছিস? বলিস কি রে! কেন?
বটুক জবাব দিল না। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। মনে হল সে কিছু একটা কথা বলতে চায়; কিন্তু মনস্থির করে উঠতে পারছে না। তারপর সে বোকার মত হেসে উঠল।
-কি হল, হাসছিস যে?
–তুই রাগ করবি না বল?
রাগ করব কেন? কি করেছিস তুই?
কাল গগ্যার ওখানে গিয়েছিলাম। ওর বরানগরের বস্তীতে।
শেষ বিদায় জানাতে এসেছে বটুক। না হলে আমি ওকে উঠতে বলতাম। এত কাণ্ডের পরেও বটুক যে বন্ধুকৃত্য করতে গগ্যার ওখানে যেতে পারে এ আমার সহ্য হচ্ছিল না। আমার দৃষ্টিতে কিছু একটা ছিল। তাই বটুক বললে, –তুই তো আগেই বলেছিস, আত্মসম্মানজ্ঞান বলে আমার কিছু নেই। তাহলে আজ আবার নতুন করে চটছিস কেন?
সেই চিরন্তন বিদূষক!
–গগ্যার কাছে কেন গিয়েছিলি? বিদায় জানাতে?
না, ওর আঁকা একখানা ছবি ফেরত দিতে।
–ওর?
–হ্যাঁ। শোন তাহলে বলি।
বটুক অতঃপর একটা বিচিত্র কাহিনী শুনিয়েছিল আমাকেঃ
শ্মশান থেকে ফেরার পথে সেদিন আমি যখন যোগেশ মিত্র রোডের মোড়ে বটুককে নামিয়ে দিয়ে গেলাম তখন বাড়ির দিকে যেতে ওর পা সরছিল না। কত দিনের কত কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একবার উপরের দিকে তাকায়। দ্বিতলে আলোগুলো নেবানো। দ্বিতলের ভাড়াটে নিশ্চয় কোথাও বেরিয়েছেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল তার-না হলে প্রতিবেশীর সান্ত্বনায় উত্যক্ত হতে হত ওকে। নিঃশব্দে তালা খুলে ঘরে ঢোকে। বাইরের ঘরে ঢোকে। বাতিটা জ্বালে না। যেন নিজের বাড়িতেই চুরি করতে ঢুকেছে–প্রতিবেশীরা যেন টের না পায়! দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দেয়। ঘরে প্রতিটি আসবাবের অবস্থান তার মুখস্থ। রাস্তায় আবছা আলোয় অল্প অল্প নজর চলছে। বটুক ওর শয়নকক্ষে প্রবেশ করে। এ-ঘরে পাশের বাড়ির থেকে আলো বেশ আসছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সব কিছু। যেখানে যা ছিল সব আছে। বিশৃঙ্খলার। আভাসমাত্র নেই। শুধু বিছানার চাদর এলোমেলো। কিন্তু ও কি? ওদের জোড়া খাটে তো দু-জোড়া বালিশ নেই! আলোটা জ্বেলে দেয় সে এবার। না। ওদের ডবল বেডের খাটে শুধু একটাই বালিশ! বটুক ছুটে এসে এবার বাইরের ঘরের আলোটা জ্বালে। কী আশ্চর্য! বাইরের ঘরের খাটে একটা বিছানা পাতা। বটুক বসে পড়ে খাটের প্রান্তে। কেন এমন হল? ওরা কি ঝগড়া করেছিল? শেষ দিকে ওরা কি আলাদা বিছানায় শুতো? না কি বরাবর সুলেখা ও-ঘরে একলা শুয়েছে? সেটা অবিশ্বাস্য–তবু জলে-ডোবা মানুষ যেভাবে ভাসমান খড়কুটোর দিকে হাত বাড়ায় তেমনিভাবে বটুকের মনে হল-গগ্যা কোনদিনই ওর খাটে এসে শোয়নি। সুলেখা ঐ বর্বরটাকে ঢুকতেই দেয়নি ওদের শোবার ঘরে। আপন মনে হেসে ওঠে বটুক। খুশিয়াল হয়ে ওঠে।
আলনায় সুলেখার শাড়ি সায়া-জ্যাকেট। জুতোর র্যাকে তার জুতো আর চটি। বটুক রান্নাঘরে গিয়ে একবার উঁকি মারল বাসনপত্র সব সাজানো আছে। ঝি আসত বিকেল বেলায়। তাহলে সে রাত্রে লেখা কিছুই খায়নি। না হলে এঁটো বাসনটা থাকত। রান্নাও হয়নি সেদিন। উনানে ছাই নেই। তার মানে শেষ দিনটা শুধু মনের সঙ্গে লড়াই করেছে সুলেখা। রান্না-খাওয়ার কথা মনেই আসেনি তার। আর কেমন করে তা আসবে? মৃত্যু যাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে তার কি রাঁধার কথা মনে থাকে?
হঠাৎ বটুকের নজরে পড়ল টেবিলের উপর একটা মোমবাতি খাড়া করে বসানো রয়েছে। মোম গলে গলে পড়েছে। ওদের বাড়িতে বিজলি বাতি আছে। শেষ দিন কি আলো ফিওজ করেছিল? না হলে মোমবাতি জ্বেলেছিল কেন সুলেখা? ঝুঁকে পড়ে দেখল মোমবাতির সলতেটা মোমের মধ্যে ঢুকে গেছে, সেটা থেতলে গেছে–যেন জ্বলন্ত অবস্থায় সেটা কেউ উপর থেকে চাপড় মেরে নিবিয়ে দিয়েছে। এ রহস্যের কোন কিনারা করতে পারল না বটুক।
আশ্চর্য, সবই আছে কিন্তু সব কিছুই আজ নিরর্থক।
হঠাৎ দু হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে বটুক, –লেখা! লেখা!
সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। দ্বিতলের বাসিন্দা বোধহয় ফিরলেন। চট করে বাতিটা নিবিয়ে দিল বটুক। ওঁরা উঠে গেলেন। বটুক আবার চলে আসে বাইরের ঘরে। এখন এ-ঘর ওর! কেউ বাধা দেবার নেই! কেউ এসে বলবে না–আর কত বেলা করবে, এবার ওঠ! স্নান করগে যাও! কেউ এসে ওর হাত থেকে তুলি কেড়ে নিয়ে ধমকাবে না রাত কত হল খেয়াল আছে! চোখের মাথাটা না খেলেই নয়! চোদ্দ বছর পর আজ সে একা!
