ও ধপ্ করে বসে পড়ে একখানা চেয়ারে। আমার বাহুল্য প্রশ্নটার জবাব সে দিল না। বললে, কাল রাত্রে। গগ্যা কাল সকালেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে!
কিভাবে আত্মহত্যা করেছে?
–বিষ খেয়ে!
কতক্ষণ আগে মারা গেছে?
–না, মারা যায়নি, এখনও বেঁচে আছে।
–তাহলে পাগলের মত কী বকছিস এতক্ষণ? কোথায় আছে সে? ভবানীপুরে?
না, শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে।
–একটু বস্। আমি জামা-জুতো পরে আসি। ওখানকার সব ডাক্তারই আমার চেনা। দাঁড়া, গাড়িটা বার করি।
আমি জামা-জুতো পরে নিতে নিতেই বটুক দুচারটে অসংলগ্ন কথা বলে গেল। যা থেকে মোটামুটি বুঝতে পারি–খবরটা প্রথম টের পায় দ্বিতলবাসী ভাড়াটে। কাল সকালে নাকি গগ্যা আর সুলেখা ঝগড়া করে। তারপর গগ্যা তার জামাকাপড় বেঁধে নিয়ে কোথায় চলে যায়। সুলেখা রাতে একাই ছিল বাড়িতে। সদর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে। মাঝরাতে একটা গোঙানির শব্দ শুনে ওঁরা প্রতিবেশীদের ডেকে তোলেন। বটুক দরজা ভেঙে ফেলতে চায়
–তুই ওখানে অত রাত্রে কোথা থেকে এলি?
-ঝগড়াটা কাল সকালে যখন হয় তখন আমি ঐ চায়ের দোকানেই ছিলাম। গগ্যা চলে গেল তা আমি দেখেছি। তারপর আমি গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ি-সুলেখা খুলে দেয়আমাকে দেখে থাক সেকথা! মোট কথা আমি আর বরানগরে ফিরে যাইনি। ঐ চায়ের দোকানের সামনের বেঞ্চেই রাত্রিটা
দরজা ভেঙে এঁরা দেখতে পান যন্ত্রণায় সুলেখা কাতরাচ্ছে! খাটের উপর থেকে আধখানা দেহ ঝুলে পড়েছে তার। সম্পূর্ণ জ্ঞান ছিল সুলেখার। ওঁরা পাশের বাড়ি থেকে একজন ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে এলেন। তখনই অ্যাম্বুলেন্সে খবর দেওয়া হল। সুলেখা বিষ খেয়েছিল। জিভটা তার বিশ্রীভাবে পুড়ে গেছে। কিন্তু তখনও সে কথা বলতে পারছিল।
-তোকে কিছু বললে?
বটুক মুখটা নিচু করে। তারপর আবার আমার মুখের দিকে তাকায়। বলে, –ও আমাকে চলে যেতে বললে! ডাক্তারবাবু আমাকে ওর সামনে থেকে সরে যেতে বললেন।আমি বাইরের ঘরে সরে এলাম। অ্যাম্বুলেন্স যখন এল, তখন আমাকে ওরা রান্নাঘরে লুকিয়ে থাকতে বলল। আমি রান্নাঘরে চলে গেলাম।
ইতিমধ্যে আমি তৈরী হয়ে নিয়েছি। প্রতিবেশীদের তাড়া খেয়ে বটুক কখন কোথায় লুকিয়ে ছিল শোনার ধৈর্য ছিল না আমার। বলি, -চ, হাসপাতালে চল্।
শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের একটি কেবিনে সুলেখাকে রাখা হয়েছে। ওখানকার ডাক্তার-নার্স অনেকেই আমাকে চেনে। রোগীকে দেখতে কোন অসুবিধা হল না। কিন্তু বটুককে ওরা কেবিনে যেতে দিল না। নার্স বললে, -ডাক্তারবাবুর বারণ আছে। ওঁকে দেখলেই উনি উত্তেজিত হয়ে উঠবেন।
বটুক ওয়ার্ড অ্যাটেণ্ডেন্টের টুলে বসল। বললে, তুই বরং দেখে আয়। জিজ্ঞাসা করিস, গগ্যাকে দেখতে চায় কিনা। সে হতভাগা কোথায় তা অবশ্য জানি না; কিন্তু লেখা যদি চায়…
আমরা এগিয়ে যাই। সুলেখার জ্ঞান ছিল। কথা বলছিল না। মুখটা পুড়ে গেছে। আমাকে দেখে চিনতে পারল। চোখ দুটি বন্ধ করল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলি, -খুব কষ্ট হচ্ছে?
সুলেখা জবাব দিল না। ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
আবার বলি, বটুক এসেছে। বাইরে বসে আছে। তাকে ডাকব?
না, না, না! আমাকে শান্তিতে মরতে দিন!
বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। নার্স বললে, –অক্সালিক অ্যাসিড। বাঁচবে না নিশ্চয়। তবে দু-তিন দিন বেঁচে থাকবেন বোধহয়। ডাক্তারবাবু বিকেলে আসবেন। পুরো ব্যাপারটা তখন এলে জানা যাবে।
জিজ্ঞাসা করলাম, ডান হাতে ব্যাণ্ডেজ কেন?
সিস্টার বললে, কি জানি! ওঁর ডান হাতের তালুতে বিরাট একটা ফোস্কা পড়েছে। পুড়ে গেছে। কেমন করে জানি না। সে একটা মিস্ট্রি!
বলি, অজ্ঞান হয়ে যাবার পর ওর হাতটা জ্বলন্ত কোন কিছুর উপর পড়েছে নিশ্চয়।
না! যাঁরা ওঁকে রেসকিউ করেন তাঁরা বলেন, তেমন কোন জ্বলন্ত জিনিস ছিল না ওঁর হাতের কাছে-পিঠে! অজ্ঞানও উনি হননি!
এ রহস্যের সমাধান হয়নি। ও কি গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল? তাহলে সারা গায়ে আর কোথাও তো আগুন লাগেনি? শুধু হাতটা পুড়ল কেমন করে? যেন মনে হয়–সে হাতের তালুতে একখণ্ড জ্বলন্ত অঙ্গার নিয়ে মুঠা করেছিল; অথবা প্রদীপের শিখায় পুরো এক মিনিট ধরে রেখেছিল হাতখানা। কেন? সুলেখা তার জবাবদিহি করে যায়নি।
কেবিন থেকে বেরিয়ে আসতেই বটুক বললে, ঘরে আর কে ছিল?
আর কে থাকবে?
–তবে আমাকে শান্তিতে মরতে দিন বলল কে?
সিস্টার বললে, উনিই বলেছেন। ওঁর ভোকাল কর্ডটা জ্বলে গেছে কিনা, তাই স্বরটা আপনি চিনতে পারেননি।
বটুক শুধু বললে, -ও!
তৃতীয় দিনে সুলেখা মারা গেল। গগন কোথায় আমরা জানতাম না। তাকে খবর দেওয়ার উপায় ছিল না। খবর পেলেও সে আসত কিনা সন্দেহ। বটুকের স্ত্রীর পরিচয়ে হিন্দু মতেই ওর সৎকার হল। বটুকই মুখাগ্নি করল।
চিতায় জল ঢেলে দিয়ে বললাম, চ, আমার বাড়িতে চল্।
বটুক রাজী হল না। পাঞ্জাবির পকেট থেকে সদর দরজার চাবিটা বার করে সে। একদৃষ্টে খানিকক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বললে, না, আমি বাড়ি যাব।
-আমি আসব তোর সঙ্গে?
না, আমি একাই যেতে চাই। একটু একলা থাকতে চাই।
যোগেশ মিত্র রোডের মুখে ওকে নামিয়ে দিয়ে আমি ফিরে এলাম।
দিন-সাতেক পরে বটুক এসে আমার সঙ্গে একদিন সন্ধ্যায় দেখা করল। এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে সে। শ্মশান-বৈরাগ্যেই বোধহয়, মনের সাম্য ফিরে পেয়েছে। কথা বলল পরিষ্কারভাবে, অসংলগ্ন কাটা কাটা ভাষায় নয়। বললে, এতদিনে কলকাতার বাস তুলে দিয়ে সে দেশে ফিরে যাবে বলে স্থির করেছে। ওর বাবা এখনও জীবিত। তার কাছেই ফিরে যাবে। ও আশা করছে বাপ-মা ওকে ক্ষমা করবেন। দোকান সে বিক্রি করে দিয়েছে। ওর ছবি আর ফার্নিচার একটি নিলামওয়ালার কাছে পৌঁছে দিয়েছে। বিক্রয়লব্ধ অর্থ তাকে বরিশালের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে বলেছে।
