বলি, তুই কিছুদিন বরং বাইরে থেকে ঘুরে আয়! এ বস্তীর জীবন তুই নিজেও সহ্য করতে পারবি না।
বটুক বললো–না না, আমাকে এখন কলকাতাতেই থাকতে হবে। ভবানীপুরের বাড়িওয়ালাকে আমার ঠিকানাটা জানিয়ে রাখতে হবে। মাসান্তে ভাড়া না দিলে ওদের উচ্ছেদ করবে
–সে তো বাইরে থেকে মনি-অর্ডার করেও পাঠাতে পারিস!
–তুই বুঝছিস না। যে-কোন দিন গগ্যা ওকে ফেলে পালাতে পারে। আমাকে হাতের কাছেই থাকতে হবে।
.
১২.
এরপর আবার বেশ কিছুদিন ওদের খবর পাই না। বরাহনগরের বস্তীতে আমি খোঁজ নিতে যাইনি। যোগেশ মিত্র রোডেও যাইনি। হগমার্কেটে একদিন বিকেলের দিকে কি একটা কাজে গিয়েছিলাম। বটুকের দোকান বন্ধ ছিল। পাশের দোকানদার জানিয়েছিল–আজ দীর্ঘদিন ধটুক দোকানে আসছে না। ওদের সম্বন্ধে কৌতূহল ছিল ঠিকই, কিন্তু সময় করে উঠতে পারিনি। পরে অবশ্য জেনেছিলাম যে কদিন ঐ বস্তীতে ছিল তার ভিতর বটুক কোন ছবি আঁকেনি। বোধহয় মন বসাতে পারেনি। আর সে ওখানে রাতটুকুই থাকত শুধু। সকালবেলা উঠে চলে যেত ভবানীপুরে। নিজের বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা চায়ের দোকানে বসে থাকত সারাদিন। গগন বাড়ি থেকে আদৌ বার হত না। দৈনিক বাজারটা পর্যন্ত করত সুলেখা। দু-একবার বটুক তার পিছনে পিছনে ঘুরেছে। সুলেখা তাকে যেন চিনতেই পারেনি। আজকের কলকাতা শহর নয়। সে আমলে বাড়ির মেয়েরা জগুবাবুর বাজারে থলি-হাতে বাজার করতে আসার কথা কল্পনাই করতে পারত না। তাই ঐ বাঙালি মেয়েটাকে সকলেই চিনে ফেলেছিল। পথের মাঝখানে ওর সঙ্গে কথা বলতে সাহস পেত না বটুক। তবু একদিন সুযোগ বুঝে বাড়ির সামনেই বটুক সুলেখার হাত চেপে ধরেছিল। তাকে ক্ষমা করতে বলেছিল। সুলেখা শুধু হাতটা ছাড়িয়েই নেয়নি, বটুককে একটি চড় বসিয়ে দিয়েছিল। কোন কথা বলেনি সে।
এ সব কথা আমি জানতে পেরেছিলাম অনেক পরে। সুলেখার মৃত্যুর পরে। চিরকাল যেভাবে বিনিয়ে-বিনিয়ে গল্প করত বটুক সেইভাবেই শুনিয়েছিল আমাকে। দু চোখের জলে ভাসতে ভাসতে, শ্মশানঘাটে বসে। আমাদের চোখের সামনেই জ্বলছিল চিতাটা। ভবানীপুর অঞ্চলে কয়েকজন শ্মশানযাত্রীও ছিল। তারা বসেছিল একটু দূরে। ওখান থেকেই হতাশ-প্রেমিক বটুককে লক্ষ্য করছিল তারা। বটুকেশ্বরের কীর্তিকাহিনীর কথা জানতে বাকি ছিল না কারও।
ব্যাপারটা নিয়ে আমি পরে অনেক চিন্তা করেছি। কেন সুলেখা এমন কাণ্ডটা করল! গগ্যার প্রতি তার তীব্র ঘৃণা সত্ত্বেও কেমন করে সে তার কাছে ধরা দিল; আর বটুকের প্রতি তার মমতা, তার ভালবাসা কিভাবে একেবারে নিঃশেষিত হয়ে গেল! বোধহয় ভুল বুঝেছিলাম আমরা, সুলেখা গগ্যাকে ঘৃণা কোনদিনই করেনি, করেছে ভয়। আর সেই
আতঙ্কের উৎসমুখে ছিল সে নিজেই। অর্থাৎ সুলেখা গগ্যাকে ভয় করেনি, করেছে। নিজেকে। আমরা তার মুখ ফিরিয়ে থাকাটা শুধু দেখেছি কিন্তু সুলেখার অবচেতন মন জানত, কেন সে অমন প্রবলভাবে মুখ ফিরিয়ে নিতে চায়। চুম্বক যেমন জানে সমধর্মী চুম্বকের দিক থেকে ছিটকে সরে আসতে হবে তাকে কারণ ঐ চুম্বকখণ্ডের বিপরীত মেরুর আকর্ষণকে সে ভয় করে। গগ্যা যেমন তার নিশ্চিন্ত নির্ভর পুরনো পল্টনের বাসা ছেড়ে অজানার আকর্ষণে একদিন ছুটে বেরিয়ে এসেছিল, সুলেখার অন্তরাত্মাও তেমনি কেন্দ্ৰাতীগ বেগে সব কিছু ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে চেয়েছিল। সুলেখা জানত, তার অতৃপ্ত কামনা বাসনাযা মিটিয়ে দেবার ক্ষমতা ছিল না বটুকের–একমাত্র তৃপ্ত হতে পারে ঐ লোমশ দানবটার কাছে। ঠিক সচেতনভাবে হয়তো জানত না; কিন্তু সে এ সত্যটা প্রতি রোমকুপ দিয়ে অনুভব করেছিল নিজের অজান্তেই। তাই ঐ চুম্বককণ্ডের বিপরীত মেরুটাকে তার ভয়। তাই ও বারে বারে মুখ সরিয়ে নিয়েছে। গগনকে ভবানীপুরের বাসায় নিয়ে আসার প্রস্তাবে সে দৃঢ় প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু বটুক শোনেনি। গগ্যাকে বটুক ভয় পায়নি–বোকাটা শুধু সুলেখার বিকর্ষণী মনোভাবেই নিশ্চিন্ত হয়ে বসেছিল। তারপর কখন কী ভাবে চুম্বকখণ্ডটা পাশ ফিরেছে জানা নেই। দক্ষ নার্সের মত নিরলস নিষ্ঠায় কাজ করে গেছে সুলেখা। ওর মুখের কাছে ধরেছে ফিডিং কাপ, বাঁ হাতে হয়তো ওর মাথাটা চেপে ধরেছে বুকে। ওর লোমশ হাত-পা স্পঞ্জ করিয়ে দিয়েছে। জামা কাপড় পালটে দিয়েছে। আঁচড়ে দিয়েছে ভিজে চুল, মুছিয়ে দিয়েছে দাড়ি। হয়তো সুলেখা নিজেও টের পায়নি, কখন সঙ্গোপনে ঐ চুম্বকখণ্ডের পাশ পরিবর্তন হল। কিন্তু তখন আর তার পালাবার পথ ছিল না। তখন সে নিরুপায়। সুলেখা তখন কামিনী নয়, কামনা!
সুলেখার মৃত্যুর কথাটা বলি।
তখনও ভাল করে সকাল হয়নি। আমি ঘুমোচ্ছিলাম। আমাকে ডেকে তোলা হল। নিচে কে ডাকছে। জরুরী ডাক। ডাক্তার মানুষের এসব বিড়ম্বনা নিত্যকর্মপদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত। ভাবলাম আমার রুগীদের মধ্যে নিশ্চয় কারও নাভিশ্বাস উঠেছে। চটিটা পায়ে দিয়ে নিচে নেমে এসে দেখি, বটুক। বললে, দীপু, সর্বনাশ হয়েছে! ও আত্মহত্যা করেছে!
তারপরে আরও কতকগুলো শব্দ ও বলে গেল। ওর ঠোঁট দুটিই নড়ছিল কথা কিছু বার হয়নি। নিতান্ত একটা বোবা ভাঁড়ের মত সে হাত-পা নেড়ে কি একটা বোঝাতে চাইছে, কিন্তু কথা বলতে পারছে না। আমার হঠাৎ ভীষণ রাগ হল। ওর কাধ ধরে একটা ঝকানি দিয়ে বলি, কী বলছিস আঁও আঁও করে? কী হয়েছে ঠিক করে লে! কে আত্মহত্যা করেছে?–যদিও আমি বুঝতে পেরেছিলাম কার কথা বলছে সে।
