বললাম, –এবার আমি যাই?
যাবি? তা যা। হ্যাঁ, তুই আর কতক্ষণ থাকবি এখানে!
তুই সারাদিন কি করবি?
ছবি আঁকব। বোধহয় এবার আমার ছবি উৎরোবে—
খাটিয়ার নিচে গগ্যার ফেলে-যাওয়া রঙ-তুলিগুলো সে টেনে টেনে বার করছিল। হঠাৎ মুখ তুলে বলে, -আচ্ছা তুই-ই বল্ দীপু, এখানে এসে সুলেখার মত মেয়ে থাকতে পারে? তাকে কি এখানে আসতে দিতে পারি?
আমি বলি, –সে তোমার স্ত্রী। তুমি বুঝবে।
–তুই হলে কী করতিস?
–আমি সোজা তাকে খোলা দরজা দেখিয়ে দিতাম। জেনে বুঝে কেউ যদি আগুনে হাত দেয় তাহলে হাত তার পুড়বেই।
বটুক বললে, হ্যাঁ, তুই তো ওকথা বলবিই!
–কেন?
কুতকুতে চোখ দুটো আমার দিকে তুলে বটুক বললে, তুই তো আর সুলেখাকে ভালবাসিসনি!
–তা বটে! কিন্তু তুই কি এখনও তাকে ভালবাসিস?
নিশ্চয়! আগের চেয়ে বেশি! লেখা তো আর সজ্ঞানে নেই, সে এখন মোহগ্রস্ত হিপনোটাইসড়! এ আর কদিন? গগ্যা দুদিন পরেই ওকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে–পড়া-শেষ বইয়ের মত।
কৌতূহল হল। বললাম, তখন কি আবার তুই ছুঁড়ে দেওয়া বইখানা তুলে ঘরে নিতে চাস?
সুলেখা যদি কোনদিন ফিরে আসে আমি তাকে আবার ডেকে নেব। জানি সে তখন আমাকে নতুন করে ভালবাসতে পারবে না। আর সে কথা কি? ও হয়তো কোনদিনই আমাকে ভালবাসেনি। আমার মত বাঁদরকে আর কে ভালবাসবে ব? একটা ছেলেও যদি দিতে পারতাম তার কোলে! তা হোক! আমি তো তাকে ভালবেসেছিলাম! আমার প্রেমকে তো সে স্বীকার করে নিয়েছিল, বাধা দেয়নি। সেই ই যথেষ্ট।
আমি আর বিরক্তি চেপে রাখতে পারলাম না। আপনা থেকেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, -তোর মত ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সের মানুষ জীবনে দুটি দেখিনি!
ইনফিরিয়র টু হোয়াট? টু লাভ! তুই জীবনে কখনও ভালবাসিসনি দীপু! তাই জানিস না। প্রেমের বাজরে ভ্যানিটির স্থান নেই। আত্মসচেতন মানুষ ভালবাসতে জানে না।
এ আলোচনা আমার ভাল লাগছিল না। কথা ঘোরাবার জন্য বলি, –তুই কি একেবারেই কিছু সন্দেহ করিসনি?
বটুক একটুক্ষণ চুপ করে থাকে। কী যেন ভাবতে থাকে। জবাব দেয় না।
আমি বলি, –এ সব কথা যদি তোর ভাল না লাগে তবে থাক।
-না না। আমি বলতেই চাই। বললেই মনটা হালকা হয়ে যাবে। হ্যাঁ, আমি টের পেয়েছিলাম। বোধহয় লেখা তার মনকে বুঝতে পারার আগে আমি তার মন বুঝতে পেরেছিলাম।
-তাহলে তখনই গগ্যাকে বিদায় করিসনি কেন?
আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে হয়েছিল এ অসম্ভব। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি। লেখা ওকে দুচক্ষে দেখতে পারত না। এ আমি কেমন করে বিশ্বাস করব, ব? আমার মনে হল অহেতুক ঈর্ষার ভুল দেখছি আমি। ব্যাপারটা কি জানিস, আজ চোদ্দ বছর ধরেই এ কাণ্ডটা ঘটছে। সুলেখাকে আমি সব সময় সন্দেহের চোখে দেখতাম। আমার কোন বন্ধুর সঙ্গে ও হেসে কথা বললে আমার বুকটা ধড়াস। করে উঠত। তোর মনে আছে দীপু-তুই প্রথম দিন বলেছিলি পূজারিণী ছবিতে আমি কল্পনার আশ্রয় না নিলেই ভাল করতাম? তখনও আমার বুকটা ধড়াস করে উঠেছিল। কারণ আমি দেখেছিলাম, ঐ কথা শুনে লেখা রাঙিয়ে উঠেছিল। আমি তোকেও ঈর্ষা করতাম। তাই যখন দেখলাম, লেখা ঐ বর্বর জানোয়ারটাকে অন্য দৃষ্টিতে দেখছে, তখন মনে হল এবারও দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে আমার। আমি ভুল দেখছি। কিন্তু এবার ভুল হয়নি আমার।
আমি বলি, –আচ্ছা, লোকে যে বলে ভাল করলে ভাল হয়, সে সব একেবারে বাজে কথা, নয়? তুই তো গগ্যার ভাল করতেই চেয়েছিলি। ক্রিসমাসের দিনে একটি ভাল কাজ করেছিলি। তার ফল কি হল?
বটুক বললে, ওসব বাজে কথা। ভাল করলে ভাল হয়, আর মন্দ করলে মন্দ! তাহলে শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও ক্যান্সারে ভুগে ভুগে মারা যান?
একটু হাসি মিলিয়ে বলি, তার মানে, তোর এ গল্পের মরাল হচ্ছে-দুনিয়ায় কারো ভাল করতে নেই? কেমন-না?
ছোট্ট মানুষটা তার ছোট ছোট চোখ দুটো আমার দিকে মেলে বললে, ভুল করলি দীপু। ওটা এ গল্পের মরাল নয়। এ গল্পের মরাল হচ্ছে–তা সত্ত্বেও ভাল কাজ করাই মনুষ্যত্ব।
–তার ফল খারাপ হতে পারে জেনেও?…
হ্যাঁ, তাই। ফলটা তের হাতে নয়, কাজটা তোর। পাকা খুঁটি যেমন কেঁচে আসে সেভাবে আজ যদি আবার আমি সেই ক্রিসমাস ডে-তে পৌঁছাই তাহলে জেনে বুঝে আবার ঐ একই ভুল আমি করব। মুমূর্য গগ্যাকে আবার নিয়ে আসব আমার বাসায়।
আমি জবাব দিতে পারিনি। বটুক ছেলেটা জীবনে কিছুই করতে পারেনি, কিছুই করতে পারবে না। সব দিক থেকেই সে বিদূষক! সে বউকে ধরে রাখতে পারে না, নিজেকে সে বাঁদর বলে, যেখানে-সেখানে ছোট ছেলের মত ভ্যা করে কেঁদে ফেলে। একটা বাফুন! কিন্তু এমন কথা এমন সুরে কটা মানুষ বলতে পারে?
আবার কথা ঘোরাবার জন্য বলি, সুলেখার মত মেয়ে এমন বদলে যাবে এটা এখনও আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।
বটুক বললে, –কিন্তু এটাই তো জগতের নিয়ম দীপু। তোর ভুল কোথায় হচ্ছে জানিস? তুই উপন্যাস পড়া বিদ্যে দিয়ে জগতের বিচার করতে চাইছিস। ভাবছিস এ দুনিয়ার মানুষ সব বঙ্কিমের উপন্যাসের চরিত্র। যে নায়ক সে উদার মহৎ সাহসী ধীরোদাত্ত; যে খলনায়ক সে কুটিল কুচক্রী ভীরু। কিন্তু সত্যিকারের জগৎ এমন বাঁধা ফর্মুলায় চলে না। এই আমার কথাই ধর না। একদিন বরিশালে যখন লাঠিচার্জ হচ্ছে। তখন একজন নিমজ্জমান মানুষকে বাঁচাবার সাহস আমার হয়নি। অথচ তাঁকে চিনতাম, ভালবাসতাম, শ্রদ্ধা করতাম। তখন আমার কিশোর বয়স, মানুষের যখন ভয়-ডর বলে কিছু থাকে না। কিন্তু ওটাই তো আমার শেষ কথা নয়। সেই আমিই আবার একদিন দামোদরের জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছিলাম আর একজনকে বাঁচাতে–যাকে আমি চিনি না, জানি না! এতবড় কন্ট্রাডিকশানটা যদি আমার জীবনে সত্য হতে পারে তাহলে সুলেখার বেলাতেই বা তা হবে না কেন?
