বটুক হঠাৎ থেমে পড়ে। একটু দম নেয়। ওর চোখে জল এসে যাচ্ছিল বোধহয়। অনেক কষ্টে সেটাকে ঠেকিয়ে রাখে। মুখটা নিচু করে আবার শুরু করে, বউ একটা দড়ি এনে দিল। গগ্যা আপন মনে পোঁটলা বাঁধতে থাকে আর গুনগুন করে একটা সুর ভঁজে। আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করি। গগ্যা খাটের নিচে থেকে তার জুতোজোড়া বার করে যখন পায়ে দিচ্ছে তখন হঠাৎ ফস্ করে বউ বলে ওঠে–আমি ওর সঙ্গে যাচ্ছি। আমি এখানে আর থাকব না। আমি কথা বলতে গেলাম, কিন্তু স্বর ফুটল না। গগ্যার কোন ভাবান্তর নেই। সে নিচু হয়ে জুতোর ফিতে বাঁধছিল, আর গুনগুন করে গান গাইছিল– ।
বটুক আবার চুপ করে। কোঁচার খুঁটে মুখটা মুছে নেয়। চোখ দুটোও। এতক্ষণে আমার মনে হল ব্যাপারটা সত্যিই অত্যন্ত বিশ্রী মোড় নিয়েছে। বটুকের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু সব কথা না বলেও তার পরিত্রাণ নেই। বুকটা হাল্কা করতে হবে। অরুদ্ধ কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা কথায় ও ঘটনাটা বিবৃত করে ।
বটুক তার স্ত্রীকে বোঝাতে যায়, বাধা দিতে চায়, এমন ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত থেকে বিরত করতে চায়; কিন্তু সুলেখা যেন পাষাণ দিয়ে গড়া। কোন কথাই তার কানে যায় না। বটুক তার ভালবাসার দোহাই পাড়ে, চোদ্দ বছরের সহবাসের কথা বলে, হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে সে কেমন করে ওর হাত ধরে প্রতিজ্ঞা করেছিল সে কথা মনে করিয়ে দেয়। সুলেখার কোন ভাবান্তর নেই। দামোদরের জলে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তারা কীভাবে পরস্পরকে অবলম্বন করে ডুবতে বসেছিল সে কথা শুনেও অবিচল থাকে সুলেখা। ক্রুশবিদ্ধ যীশুর ডান হাতের তালুতে জমে-ওঠা রক্তের বিন্দুটাও ব্যর্থ হয়ে যায়। বটুক শেষে বলে, –গগ্যার ঘরদোর বলে কিছু নেই। ও বস্তীতে থাকে। সেখানে তোমার মত মেয়ে থাকতে পারবে না। এ তুমি কী বলছ লেখা?
এতক্ষণে সুলেখা জবাব দেয়, খাল কেটে তুমিই তো এ কুমীর এনেছিলে একদিন?
বটুক মরিয়া হয়ে তখন গগ্যার দিকে ফিরে বলে, তুই ওকে বারণ কর গগ্যা!
গগ্যা এতক্ষণ কোন কথা বলেনি। জুতো পরা হয়ে গিয়েছিল তার। উঠে দাঁড়ায়। বলে, –আমি ওকে আসতে বলিনি। আমি ওকে বাধাও দেব না।
-কিন্তু তোর ঐ বস্তীতে গিয়ে লেখা বাস করবে কি করে? এখানে ও কীভাবে আছে আর ওখানে কীভাবে থাকতে হবে! তুই তো অন্তত সেকথা বুঝবি।
গগ্যা বললে, –আমার কাছে এটা কেমন করে আশা করছিস মটকু? আমি নিশ্চিন্ত আরামের আশ্রয় ছেড়ে নিজেই তো একদিন ওখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম
–তুই আর্টিস্ট। তোর কথা আলাদা। ও কিসের আকর্ষণে–
ঝাঁট দে–সেকথা ও বলবে। আমি নয়। পোঁটলাটা তুলে নেয় হাতে।
সুলেখা একবস্ত্রেই বেরিয়ে আসে। গগ্যার পাশে এসে দাঁড়ায়। বটুক আর নিজেকে সামলাতে পারে না। দুরন্ত ক্রোধে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। হঠাৎ ঝাঁপ দিয়ে পড়ে গগনের উপর। দু হাতে কিল-চড়-ঘুষি চালাতে থাকে। গগন প্রথমটা হকচকিত হয়ে যায়। এ আক্রমণের জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু মুহূর্ত মধ্যে সে নিজেকে সামলে নেয়। অসুখে সে দুর্বল হয়ে পড়েছে বটে, তবু বটুকের তুলনায় সে দুর্বলতা কিছুই নয়। পরমুহূর্তেই ছোট্ট মানুষটা মেজের উপর উল্টে পড়ে যায়। গগ্যা তার দিকে ফিরে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলে, -মটকু কোথাকার!
বটুক উঠে বসে। প্রথমটা কিছুই দেখতে পায় না। চোখ থেকে তার চশমাটা ছিটকে কোথায় পড়ে গেছে। ও খুঁজে পায় না। সুলেখা নিঃশব্দে সেটা কুড়িয়ে এনে ওর হাতে দেয়। একটি কথাও বলে না। চটিজোড়া পায়ে দেয়।
সুলেখা দৃঢ়স্বরে বলে, আর ন্যাকামি কর না। উঠে দাঁড়াও। আমাকে যেতে দাও।
ন্যাকামি!-বটুক উঠে দাঁড়ায়। বলে, –গগ্যার একটি পয়সা নেই। সে তোমাকে কি খাওয়াবে? তোমরা দুজনেই যে না খেয়ে মরবে
-সে তোমাকে ভাবতে হবে না।
বটুক দৃঢ়ভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, না! আমাকেই ভাবতে হবে। তুমি সে বস্তীর ঘরখানা দেখনি। সেখানে চারদিকে শুধু ময়লা আর কাদা। মোদোমাতালের আড্ডা। তুমি কিছুতেই সেখানে থাকতে পারবে না।
–সে সব তোমাকে ভাবতে হবে না। গগ্যা যেখানে যাবে আমিও সেখানে যাব।
-হ্যাঁ হ্যাঁ, জানি। বেশ, কোথাও তোমাদের যেতে হবে না। সুলেখা, তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজী হওনি। হয়তো আমার মত বাঁদরকে ভালও বাসতে পারনি কোনদিন। আমি কিন্তু তোমাকে চোদ্দ বছর ধরে স্ত্রীর মর্যাদাই দিয়ে এসেছি। তুমি মানো আর না মানো, আমার যা কিছু আছে তার আধখানা তোমার। বেশ, গগ্যাকে ছেড়ে তুমি যদি না থাকতে পার, তবে তোমরা দুজনেই থাক এখানে। যেতে হয় আমিই চলে যাচ্ছি।
এবার গগ্যা বললে, তার মানে?
তার মানে সুলেখা মানুক আর না মানুক সে আমার স্ত্রী। ঐ বস্তীতে তাকে আমি থাকতেও দেব না। তোমরা দুজনেই এখানে থাক, আমি চলে যাচ্ছি। কাল এসে আমার জামা কাপড় নিয়ে যাব। আমিই থাকব বরানগরের বীতে।
এবার আর গগ্যা কথা খুঁজে পায় না। সুলেখাও নির্বাক।
ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এসেছিল বটুক। সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরেছে তা মনে নেই। সন্ধ্যেবেলা ঢুকেছিল একটা মদের দোকানে। তারপর তার যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন নিজেকে আবিষ্কার করে মুচিপাড়া থানার হাজতে।
.
বটুককে পৌঁছে দিয়ে এলাম বরানগরের সেই বস্তীতে। গগ্যার খাটিয়ায় বসল সে আমার মুখোমুখি। আসবার পথে কিছু খাবারও কিনে এনেছিলাম। বটুক খেল আমার সামনে বসে। রাস্তার কলে খনও জল ছিল। মুখটা ধুয়ে এল সেখানে গিয়ে।
