আমি বলি, –ও আমার স্কুলের বন্ধু। ত্রিশ বছর ধরে জানি। ওকে একদিনও মদ খেতে দেখিনি। খেলে আমি নিশ্চয়ই জানতে পারতাম।
দারোগাবাবু বলেন, আপনি ওঁর মদের দামটা মিটিয়ে ওঁকে খালাস করে নিয়ে যেতে চান? ভদ্রলোকের ছেলে বলে বুঝতে পারায় আমি এখনও কেসটা ডায়েরি করিনি।
আমি তৎক্ষণাৎ মদের বিল মিটিয়ে বটুককে উদ্ধার করলাম। মাত্র সাতদিন আগে যে বটুককে মনোহরদাস তড়াগে ছবি আঁকতে দেখেছি, এ যে সেই লোক কে বলবে?
আমাকে দেখে ও হাউমাউ করে কেঁদে একটা সীন করল থানার ভিতরেই। এতক্ষণে তার নেশা ছুটে গেছে। এ মাতালের কান্না নয়। গাড়িতে তুলে বলি, -খালি পকেটে মদ খেতে এসেছিলি কেন?
ও রুমাল দিয়ে চোখ দুটো মুছতে মুছতে বললে, খালি পকেটে আসিনি। মানিব্যাগটা কেউ মেরে দিয়েছে।
কত ছিল তাতে?
–তা জানি না। কিন্তু কোথায় যাচ্ছিস?
–কোথায় আবার? তোর বাড়িতে? যোগেশ মিত্র রোডে।
বটুক এমনভাবে আমার হাত চেপে ধরেছে যে আর একটু হলে অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যেত। পথের পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বলি, কী ব্যাপার?
-ওখানে আমি যাব না।
–তবে কোন্ চুলোয় যাবি?
বটুক একটু ভেবে নিয়ে বলে, বরানগরে চল্।
-বরানগর? গগ্যার ওখানে? গগ্যা কি তাহলে ফিরে গেছে?
বটুক বললে, –কোথাও গিয়ে বসে তোকে সব বলি।
একগাদা রুগী বসিয়ে রেখে এসেছি। খোশগল্প করার সময় আমার নেই। কিন্তু বটুকের অবস্থা দেখে করুণা হল। প্রচণ্ড একটা সাইক্লোন যেন বয়ে গেছে এ কদিনে। ওর ব্যাপারটা জানা দরকার। বটুকের অবশ্য চরিত্রগত একটা ঝোঁক আছে মেলোড্রামাতে বিদূষকের ভূমিকায় অভিনয় করার। সেই ফর্মূলা অনুসারে যথারীতি মনের দুঃখে সে মদ খেয়েছে। তবে ঐ–একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। মানিব্যাগটা কখন খোয়া গেছে টের পায়নি। তাই এক রাত হাজতবাস।
গাড়িটাকে রাস্তার একপাশে রেখে একটা পার্কে ঢুকি। বেঞ্চির উপর লোকজন; আমরা ফাঁকা দেখে ঘাসের উপর এসে বসলাম। বলি, -এবার বল, কী হয়েছে?
বটুক ঘাসের শিষ ছিঁড়তে ছিঁড়তে মুখ নিচু করে জবাব দিল, বউ আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।
ঐ কটা কথা বলতেই ওর গলা বুজে এল। সুলেখাকে তো চিনি! যা একরোখা মেয়ে! গগ্যাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে আসায় তার ঘোরতর আপত্তি ছিল। বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার কথা সে প্রথম দিনেই বলেছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বটুকের পীড়াপীড়িতে ঐ জংলী মানুষটাকে বরদাস্ত করতে রাজী হয়েছিল। আমার মনে হল, সুলেখা নিশ্চয় বটুককে বলেছে এবার তার বন্ধুকে বিদায় দিতে; আর নপুংসক বটুক সে সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি। তাই বোধকরি সুলেখা সহ্যের সীমা পার হওয়ায় বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। গেলেই বা কতদূর যাবে? গগ্যাকে এবার তার স্ব-স্থানে পাঠিয়ে দিলে নিশ্চয় সুলেখা ফিরে আসবে। বটুকের টোবা গাল বেয়ে দু ফোঁটা জল ঝরে পড়ল। আমি হাসতে পারলাম না অমন হাস্যকর দৃশ্যটা দেখে; বলতে পারলাম না–দুঃখ করিস না বটুক, অভাগার ঘোড়া মরে, আর ভাগ্যবানের বউ মরে! বরং বললাম, -আরে বন্ধু, কাঁদছিস কেন? ও ফিরে আসবে। রাগের মাথায় অমন সবাই বলে রইল তোমার ঘরদোর, আমি চললাম।
বটুক মুখটা তোলে না। মাটিতে আঁচড় কাটতে কাটতে অস্ফুটে বলে, তুই বুঝতে পারছিস না। বউ ওকে ভালবাসে–ঐ গগ্যাকে।
-কী! প্রথমটা ভীষণ চমকে উঠেছিলাম; কিন্তু পরমুহূর্তে নিজেই নিজের উপর রাগ করি। এতটা চমকে ওঠার কি আছে? এ যে নিতান্ত অসম্ভব! ও পাগলটা বলছে বলেই বিশ্বাস করতে হবে? বলি, –তোর খোঁয়াড় কি এত বেলাতেও ভাঙেনি রে বটুক? এখনও নেশার ঘোরে আছিস? গগ্যাকে হিংসে করতে তোর লজ্জা হচ্ছে না? তুই নিজে চোখে দেখিসনি–গগ্যাকে কী ভীষণভাবে ঘৃণা করে তোর বউ!
বটুক বাঁ হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ দুটো মুছে নিয়ে বললে, তুই বুঝছিস না।
-না, আমার বুঝে কাজ নেই। কাল রাতে তো পাঁট পাট মদ গিলেছিলি, সলিড খাবার সঙ্গে কিছু খেয়েছিলি?
এতক্ষণে ও মুখ তুলে তাকায়। বলে, –শুধু কাল রাতে নয়, দিনেও কিছু খায়নি।
তবে চল্, দ্বারিকের দোকানে চল্। খালি পেটে অমন উদ্ভট চিন্তা হয়। মনে হয়, ঘরের বউ বুঝি বাইরের লোকের সঙ্গে প্রেম করছে। সকালবেলা গরমাগরম হিঙের কচুরি ভাজে। আর আলুরদম। ভাল করে খেয়ে নে-দুঃস্বপ্ন ছুটে যাবে। তারপর তোকে যোগেশ মিত্তির রোডে পৌঁছে দিয়ে তবে আমার ছুটি।
-বললাম যে, ওখানে আমি যেতে পারব না। ওরা ওখানে আছে। আমি ওবাড়ি ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে এসেছি।
তাই বল্! তার মানে তোর বউ গৃহত্যাগ করেনি; তুই নিজেই তাকে ত্যাগ করে চলে এসেছিস!
দীপু, প্লীজ ওভাবে বলিস না।
আমি বলি, -বেশ, আর ওভাবে বলব না। নে, ওঠ, চল, তোকে কিছু খাইয়ে আনি
–আমার ক্ষিদে পায়নি। বস্, তোকে সবটা আগে বলি।
ধমক দিয়ে উঠি, কাল সারাদিন কিছু খাসনি, ক্ষিদে পায়নি কি রকম?
প্লীজ দীপু, আগে আমার সব কথা শোন্। মনটা হালকা না করলে আমি কিছু খেতে পারব না।
অগত্যা আবার বসে পড়ি। হয়তো ঠিক কথাই বলছে বটুক। মনটা খালি না হলে পেটটা সে ভরাতে পারবে না।
কাল সকালবেলা আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারিনি। আমি গগ্যাকে বললাম তোর শরীর তো একেবারে ভাল হয়ে গেছে। এবার তুই নিজের ডেরায় যা—
আমি বলি, একথা অনেক আগেই বলা উচিত ছিল তোর। তারপর?
–গগ্যা হেসে উঠল। ওর হাসি তো জানিস–গা জ্বালা করে। অবজ্ঞার হাসি। বললে, –সে তখনই চলে যাবে। ও নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নেয়। তুই তো জানিস, ইতিমধ্যে বরাগনগর থেকে আমি ওর জিনিসপত্র কিছু নিয়ে এসেছিলাম। ও একটা পোঁটলা বাঁধে। লেখাকে বলে একটা দড়ি নিয়ে আসতে।
