একদিন বটুক আমাকে জনান্তিকে বলল, আশ্চর্য! ওরা দুজন ঘন্টার পর ঘন্টা মুখোমুখি বসে থাকে। কেউ কোন কথা বলে না।
একদিন দৃশ্যটা আমারও নজরে পড়ল। গগ্যা চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল। আমি আর বটুক ভিতরের বারান্দায় বসে কথা বলছিলাম। ঘরের ভিতরটা আমি দেখতে পাচ্ছি। সুলেখা বসে একটা সার্টে বোম লাগাচ্ছিল। আমার হঠাৎ খেয়াল হল, এটা গগ্যার সেই রক্তমাখা সার্টটা। কাঁচা হয়েছে কিন্তু রক্তের দাগটা ঠিকমত ওঠেনি। লক্ষ্য করে দেখি, গগ্যা একদৃষ্টে সুলেখার দিকে তাকিয়ে আছে। সুলেখার গায়ে যেন সে দৃষ্টিটা বিধল। সে চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে। দুজনে দুজনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। কেউ কথা বলে না। সুলেখার চোখের ভাষা আমি বুঝতে পারিনি। মনে হল কেমন যেন। আতঙ্ক মেশানো। পরমুহূর্তেই গগ্যা কড়িকাঠ গুনতে শুরু করে; কিন্তু সুলেখার দৃষ্টি তখনও রোগীর দিকে। এখন তার দৃষ্টিতে ভয় নয় কি যেন একটা মিশে গেছে।
কিছুদিন পরেই গগ্যা উঠে বসল, কিন্তু সে আমাদের সেই চিরপরিচিত দানব-গগ্যা নয়। নিতান্তই একটা কঙ্কাল। একমুখ দাড়ি, একমাথা চুল–একটা হাড়-জিরজিরে শীর্ণকায় মানুষ। এখন সে দু-একটা কথা বলে–কী তার চাই, কী অসুবিধা হচ্ছে, জানায়। বিছানা থেকে নেমে নিজেই বাথরুমে যায়। কখনও বটুকের হাত ধরে, কখনও। সুলেখার কাঁধে ভর দিয়ে।
এরর বেশ কিছু দিন আমি ওদের খোঁজ-খবর আর নিইনি। বটুকও আর আসে না। ওষুধ বন্ধ হয়েছে। মাথার ঘাটা শুকিয়ে গেছে। ড্রেসিং-এর দরকার হয় না। এখন পথ্যই একমাত্র ওষুধ। বটুক ফল নিয়ে আসে, মাংস-ডিম নিয়ে আসে। গগ্যা দিন দিন তার স্বাস্থ্য ফিরে পায়। আমি নিজের প্র্যাকটিসে ফিরে আসি। ওদের খবর আর রাখিনি।
মাসখানেক পরে চৌরঙ্গী দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ মনে হল মনোহরদাস তড়াগের কাছে একটা লোক বসে ছবি আঁকছে-ঠিক বটুকের মত দেখতে। হ্যাঁ, বটুকই তো। গাড়ি থামিয়ে আমি নেমে আসি। বটুক ইদানিং আর ল্যাণ্ডস্কেপ আঁকে না। এতদিন পরে হঠাৎ নৈসর্গিক চিত্র আঁকতে বসেছে কেন জানবার কৌতূহল হল।
-কি রে বটুক? আবার ল্যাণ্ডস্কেপ শুরু করলি নাকি?
আমাকে দেখতে পেয়ে ও চমকে ওঠে। ম্লান হাসে। বোকার হাসি। আমতা আমতা করে বলে, -হা, –আবার কিছুদিন ধরে আউট-ডোর ধরেছি।
-গগ্যা ফিরে গেছে বরানগরে?
না; ও আমার বাসাতেই আছে।
কেমন যেন খটকা লাগল।
–একেবারে ভাল হয়ে যায়নি সে? কী করে আজকাল?
–হ্যাঁ, ভাল হয়ে গেছে। ও আমার স্টুডিওতে আঁকে তো। তাই আমি আবার আউট-ডোর ধরেছি।
–সে আবার কি রে?
বটুকের মুখ-চোখ কেমন যেন লাল হয়ে ওঠে। বলে, –দোষটা আমারই। ভেবেছিলাম দুজনে একই সঙ্গে কাজ করব আমার স্টুডিওতে। গগ্যার এখন এমন ক্ষমতা নেই যে বরানগরে ফিরে যায়। অথচ সারাদিন সে করেই বা কি! তাই ভেবেছিলাম, দুজনে একসঙ্গে ছবি আঁকলে ভালই হবে। গগনেন্দ্রনাথ আর অবনীন্দ্রনাথ যেমন পাশাপাশি বসে আঁকেন। ওর জন্যে ক্যানভাস, তুলি সব এনে দিলাম। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর।
তার মানে? আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না।
ঘরে অন্য লোক থাকলে গগ্যা আঁকতে পারে না!
আমি চাপা গর্জন করে উঠি, চুলোয় যাক গগ্যা! বাড়িটা কার? ঘাড় ধরে বার করে দিতে পারিসনি এতদিনেও?
হঠাৎ অবাক হয়ে দেখি বটুকের দু চোখ জলে ভরে উঠেছে। কী ব্যাপার?
বটুক মাথাটা নীচু করে কোনক্রমে বললে, -ও আমাকে বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছে।
আমি আকাশ থেকে পড়ি। বটুক বলে কী? তার বাড়ি থেকে তাকে বার করে দিয়েছে মানে? ওর কাধ ধরে একটা ঝকানি দিয়ে বলি, তুই মানুষ, না কি রে? তোর বউ কি বলে?
ও কিছুই বলে না। ওকে বলেছিলাম, তাতে বললে, আমি তো ওকে এখানে আনিনি। তুমি পার তো তাড়াও!
আমি বলি, উঠে আয় আমার গাড়িতে। আপদ কি করে বিদায় করতে হয়, চল্ তোকে দেখিয়ে দিই!
ও আমার হাত দুটি ধরে বললে, –প্লীজ দীপু! তুই এর ভিতর নাক গলাস না। ও আমিই ম্যানেজ করে নেব।
বেশ বুঝতে পারি, ও আমার কাছ থেকে কিছু লুকোতে চাইছে।
সেদিন যেটা বুঝতে পারিনি; সেটা বোঝা গেল আরও দিন সাতেক পরে। সকালবেলা ডাক্তারখানায় বসে আছি, একটি লোক এসে বললে, মুচিপাড়া থানার ও. সি. তাকে পাঠিয়েছেন। কী ব্যাপার? ব্যাপার আর কিছুই নয়, গতকাল রাত থেকে হাজতে একটি লোক আটক আছে। নাম বটুকেশ্বর দেবনাথ। সে নাকি ঠিকানা বলছে না। শেষ পর্যন্ত আমার নাম বলেছে।
তখনই গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম মুচিপাড়া থানায়। বটুক কাল রাত থেকে থানার হাজতে পড়ে আছে? কী করেছে সে? ও. সি.র সঙ্গে দেখা করতে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, পোশাক-পরিচ্ছদ দেখেই বুঝতে পেরেছি ভদ্রঘরের ছেলে। কিন্তু কী করব বলুন?
ঘটনা যা শোনা গেল, তা হচ্ছে এইঃ
কাল রাতে বটুককে একটি রিকশায় চাপিয়ে থানায় নিয়ে এসেছে একজন মদের লাইসেন্সড ভেণ্ডার। সন্ধ্যারাত্রি থেকে সে দোকানে বসে মদ্যপান করেছে। দোকান বন্ধ হবার সময় সে সম্পূর্ণ বে-এক্তিয়ার। পকেট তালাস করে দেখা গেছে, তার পকেটে। একটি পয়সা নেই। ঘড়ি-আংটি খুলে নিলে অবশ্য মদের দামের দশগুণ আদায় হত; কিন্তু দোকানদার ভদ্রলোক সে চেষ্টা করেননি। ওকে থানায় পৌঁছে দিয়ে গেছেন। সঙ্গে তার মদের একটি বিলও আছে। দারোগাবাবু কাহিনী শেষ করে বলেন, -দেবনাথবাবু কি রেগুলার ড্রিঙ্কার?
