বটুক প্রথমটা থতমত খেয়ে যায়। একবার সুলেখার, একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে। তারপর বোকার মত হেসে ওঠে। হাসতে হাসতেই বলে, —ও হো! তাই তো! কথাটা আমার খেয়ালই ছিল না। আজ ক্রিস্টমাস!তাই নয়? আজ কেউ কিছু চাইলে তাকে নিরাশ করতে নেই।
ধীরে ধীরে বটুক উঠে গেল ঘরের ও-প্রান্তে। উঁচু টুলের উপর যীশুখ্রীষ্টের যে ছবিখানা ছিল–যেখানা সে আজ উপহার দিয়েছে সুলেখাকে, সেই ছবিখানার উপর একটা তোয়ালে চাপা দিয়ে দিল। আমার দিকে ফিরে বললে, বাড়ি যা দীপু। রাত্রে আসিস। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, আজ ক্রিস্টমাস। রাত্রে চুটিয়ে পোলাও-মাংস দিয়ে বড়দিন করতে হবে।
আমার দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও সুলেখার মুখ থেকে সরে যায়নি। আমি এক দৃষ্টিতে দেখছিলাম তাকে। অপমানে, অভিমানে তার মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। দাঁতে দাঁত চেপে বললে, –ছবিটা ঢেকে দিলে যে?
জুতোজোড়া খুলছিল বটুক। যেন কিছুই হয়নি; বললে, –ছবিটা ঠিকমত আঁকতে পারিনি। যীসাসের ডান হাতের তালুতে ভুলে এক ফোঁটা লাল রঙ পড়ে গেছে। কাল ওটা মুছে দেব।
সামান্য কথা। হয়তো সত্যিই এক ফোঁটা বাড়তি রঙ পড়েছিল ছবিটায়। কিন্তু না, ওর ভিতর একটা গূঢ় অর্থ আছে। কী একটা নিবিড় ব্যঞ্জনা। সুলেখার মুখটা ছাইয়ের মত সাদা হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে সে নিজেকে সংযত করল। তারপর বললে, — আমায় ক্ষমা কর। যাও, নিয়ে এস তোমার বন্ধুকে। আমি আর বাধা দেব না।
বটুক এবার নির্লিপ্তর মত বললে, কী দরকার? থাক না।
সুলেখাই এবার দৃঢ়স্বরে বললে, না! এতবড় কথাটা যখন তুমি বললে, তখন আর কোন কথা নেই। আমার সব আঘাত সইবে। যাও, নিয়ে এস গগনবাবুকে।
এবার খুশিয়াল হয়ে ওঠে বটুক। আমার উপস্থিতির কথা ভুলে সুলেখার গালটা টিপে দিতে যায়। সুলেখা হাতের ধাক্কায় তাকে সরিয়ে দিয়ে বলে, অসভ্যতা কর না।
আমি পালিয়ে আসি।
পথে নেমে বলি, ব্যাপারটা কি রে বটুক?
-ওটাই ছিল আমার ট্রাম্প কার্ড! ব্যাপারটা কী, তা আমি জানি না। লেখার একটা অবসেশান আছৈযীসারের হাতের ঐ পেরেকের দাগটায়। একবার পেন্সিল কাটতে গিয়ে আমার হাতের তালুতে কেটে যায়। সেদিন তাই দেখে ফিট হয়ে গিয়েছিল সুলেখা।
মাথামুণ্ডু সেদিন কিছুই বুঝতে পারিনি। চিত্রলেখার কৈশোরের কথা তখন আমি জানতাম না।
.
বড়দিনের আনন্দটা কিন্তু সেদিন করা গেল না। রান্না করার সুযোগই পেল না সুলেখা। গগনকে নিয়ে আসতে গিয়েই হল মুশকিল। নড়াচড়ায় ওর অবস্থা খারাপের দিকে গেল। সারারাত পালা করে জেগে থাকতে হল ওদের স্বামী-স্ত্রীকে। আমিও অনেক রাত পর্যন্ত বসেছিলাম। রাত বারোটা নাগাদ বিপদের সম্ভাবনাটা কাটল। কোনরকমে কিছু মিষ্টি আর পাঁউরুটি-কেক খাইয়ে ওরা নিমন্ত্রণের মর্যাদা রক্ষা করল।
এরপর ভাইঝির বিয়েতে আমি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ি। বটুক প্রতিদিন এসে খবর দিয়ে যেত। ওষুধ আর পথ্যের ব্যবস্থা জেনে যেত। গগনকে ওরা আশ্রয় দিয়েছিল বাইরে স্টুডিও ঘরে। প্রথম দিন-তিনেক সম্পূর্ণ আচ্ছন্নের মত পড়ে ছিল সে। তারপর ওর পুরো জ্ঞান ফিরে এল। জ্বরটা ত্যাগ হল; কিন্তু ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ল গগন। বটুক দিবারাত্র ওর সেবা করে। দোকান বন্ধ। আর আশ্চর্য মানুষ ঐ সুলেখা! কে বলবে এই রোগীটাকে বাড়িতে আনায় তার প্রচণ্ড আপত্তি ছিল। দক্ষ নার্সের মত সে সব কিছু করে যায় নিরলস নিষ্ঠায়। মুখে কথা নেই। ওষুধ খাওয়ায়, পথ্য খাওয়ায়, গা স্পঞ্জ করিয়ে দেয় গরম জলে তোয়ালে ভিজিয়ে, বেডসোর যাতে না হয় তাই ওর লোমশ বুকে-পিঠে পাউডার মাখিয়ে দেয়। এমন কি ইউরিনাল-পট, বেডপ্যান পর্যন্ত সাফা করে। বটুক একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেল তার ব্যবহারে। আমি মাঝে মাঝে ওদের ওখানে গিয়ে দু-দণ্ড বসতাম। রোগীর দায়িত্ব আমার কিন্তু ঐ পর্যন্তই। মানুষ হিসাবে গগ্যাকে আমি শ্রদ্ধা করতে পারিনি। শান্তি দেবীর প্রতি তার ব্যবহারটা আমি ভুলতে পারিনি। কিন্তু রোগীর জাত নেই। তাই ডাক্তার হিসাবে যেটুকু করার করে আসি।
আরও দিন-সাতেক কাটল। এখন বটুক বাধ্য হয়ে দোকান খুলেছে। বিকেলবেলা আগের মত সে বেরিয়ে যায়। সুলেখা এখন একা নয়। সে কাজকর্ম করে আর রোগীর দেখাশোনা করে। রাতে আর রোগীর ঘরে কাউকে জেগে বসে থাকতে হয় না। গগ্যার পুরো জ্ঞান আছে; কিন্তু একটি কথাও সে বলে না। না বটুকের সঙ্গে, না তার স্ত্রীর সঙ্গে, না আমার সঙ্গে। কৃতজ্ঞতা বলে একটা শব্দ যে অভিধানে আছে, গগ্যা বোধকরি সেটা জানে না। একবারও বটুককে বলে না দুটো কৃতজ্ঞতার কথা।
কি রে, আজ কেমন আছিস?
গগ্যা ওপাশ ফিরে শোয়। যেন সে বটুকের ঘরে অন্তরীণ এক বন্দী। যেন ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে ধরে রাখা হয়েছে। এমন কি বটুক পর্যন্ত মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে ওঠে।
–ও কথা বলে না কেন? ও কি রাগ করেছে ওকে নিয়ে আসায়? ও কি বুঝতে পারে না, আমরা ওকে না নিয়ে এলে ও মরে যেত?
সুলেখাই বরং বলে, –গগনবাবু অসুস্থ। ওঁর ব্যবহার এখন স্বাভাবিক নয়।
গগ্যা কথা না বললেও সুলেখা বুঝতে পারে, কখন তার কি চাই। ওর চোখে আলোটা লাগছে, তাই আড়াল করে দেয়। ওর বালিশটা সরে গেছে ঠিক করে দেয়। ওর জলতেষ্টা পেয়েছে ফিডিং কাপটা বাড়িয়ে ধরে। গগ্যা খুশি হয় কিনা বোঝা যায় না। তার কণ্ঠস্বরে তো নয়ই, এমন কি চোখের তারাতেও কোন কৃতজ্ঞতার আভাস নেই।
