তার মানে? তুমি কোথায় যাবে?
-সে তোমাকে ভাবতে হবে না। তোমার বন্ধু যে কদিন এ বাড়িতে থাকবে সে। কদিন আমি অন্য কোথাও থাকব। তিনি তাঁর বস্তীতে ফিরে গেলে আমিও ফিরে আসব।
বটুক হতাশার ভঙ্গি করে। অত্যন্ত উত্তেজিত হয়েছে ছোট্ট মানুষটা। সুলেখা যে এমন একটা চাল চালতে পারে এটা সে আশঙ্কাই করেনি। আমার দিকে ফিরে বললে, এর পর আর কথা চলে না। অগত্যা আমি নিরুপায় দীপু। মরুক, গগ্যা ঐখানেই মরুক। বন্ধুর খাতিরে বউকে তো আমি বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারি না। আবার সুলেখার দিকে ফিরে বলে, –এই তো তোমার শেষ কথা?
সুলেখা দাঁত দিয়ে ঠোঁটটা কামড়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বললে, বাড়ি তোমার, শেষ কথা বলার আমি কে?
হঠাৎ নাটকীয় ভঙ্গিতে বটুক সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। হাত দুটি জোড় করে একেবারে থিয়েটারি ঢঙে। দৃশ্যটা রীতিমত মেলোড্রামাটিক। বটুকের ফোলা ফোলা গাল আর কুতকুতে চোখে মিনতি মাখানো। আমার মনে হল–ও বুঝি কোন পৌরাণিক যাত্রার আসরে বিদূষকের অভিনয় করছে! বললে, –ওহ! লেখা…লেখা…আমি যে তোমাকে দেবী বলে পূজা করতাম!
সুলেখার ভূতে জেগেছে কুঞ্চন। এবার আর রাগ অভিমান নয়, বিরক্তি। বললে, ভুল করতে! আমি নিতান্ত মানুষ। রক্ত-মাংসের মানুষ।
আমার দিকে ফিরে বললে, একটু বসুন, চা করে আনি।
বেশ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে সে। মনে হল ব্যপারটা এখানেই মিটে গেল। মাথার আঁচলটা কখন উত্তেজনার মুহূর্তে খসে পড়েছিল। এবার সেটা তুলে দেয়। ধীর গতিতে ভিতরের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য পা বাড়ায়। কিন্তু না, নাটকটা তখনও শেষ হয়নি। বটুক আবার বলে ওঠে, –ও! রক্তমাংসের মানুষ! তা যে লোকটা মরতে বসেছে সেও তো রক্তমাংসের মানুষ! তার কথা এ-ভাবে উপেক্ষা করছ কি করে?
আবার দাঁড়িয়ে পড়ে সুলেখা। ঠিক দ্বারের কাছে। আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, — নিতান্ত জীবনধারণের তাগিদে। কে বলতে পারে, হয়তো তোমার বন্ধুকে বাঁচাতে গেলে আমারই মৃত্যু হবে!
কথাটা অসংলগ্ন। যুক্তিহীন। অন্ততঃ আমার মনে হল, সুলেখা নেহাৎ কথার পিঠে কথা বলার তাগিদে এঁড়ে-তর্ক করছে। গগ্যা এখানে এলে, একটা ঘর আটকে রাখলে সুলেখার অসুবিধার চূড়ান্ত হবে–কিন্তু সে অসুবিধাটাকে এভাবে আকাশচুম্বী করে তোলাটা নেহাত্ব বাড়াবাড়ি! কথাটা বলে সেও অপ্রস্তুত হয়। শুধু আমি আর বটুক নয়, সে নিজেও তার ঐ অসংলগ্ন কথাটার অর্থ খুঁজে পায় না। আবার প্রস্থানের জন্য পা বাড়ায়।
এবারও বটুক ফস্ করে বলে বসে, তবু ঐটাই তো রক্তমাংসের মানুষের শেষ কথা নয়। নিজের মৃত্যুকে তুচ্ছ করেও মানুষে তো নিমজ্জমান বিপন্নকে বাঁচাবার জন্য জলে ঝাঁপ দেয়? না কি, এমন কোন ঘটনা ঘটতে পারে বলে বিশ্বাসই হয় না তোমার?
সুলেখা তার কথা শেষ করে পিছন ফিরেছিল। এ কথায় তার প্রতিক্রিয়া কী হল তা আমি দেখতে পাইনি। সে কোন জবাব দিল না। এগিয়েও গেল না। হাত বাড়িয়ে চৌকাঠটা ধরল। তারপর মনে হল যেন টলছে। পরমুহূর্তেই সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল সুলেখা।
মিনিট দশেক পরে ওর জ্ঞান ফিরে এল। আমরা ধরাধরি করে ওকে খাটে শুইয়ে । দিয়েছিলাম। মাথায় মুখে জলের ঝাঁপটা দিয়েছিলাম। সুলেখার এমন মাঝে মাঝে ফিট। হয়। জ্ঞান ফিরে এলে সে গায়ের কাপড় ঠিক করে নেয়। আমি ধীরে ধীরে উঠে যাই। বাইরে গিয়ে দাঁড়াই। দেখতে না পেলেও শুনতে পাচ্ছিলাম ওদের কথা, টুকরো টুকরো । কথার ছিটে। সুলেখা কাঁদছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। তার অশ্রুআর্দ্র গুমরানির মাঝে মাঝে বটুকেশ্বরের অসংলগ্ন কয়েকটা আদরের ডাক।
খানিক পরে বটুক আমাকে ডাকতে এল। বললে, ওর স্ত্রী রাজী হয়েছে, সম্মতি দিয়েছে।
আমি ঘরে ফিরে এলাম। আমাকে দেখে সুলেখা উঠে বসতে যায়। আমি বারণ করি। একটু গরম দুধ খাইয়ে দিলে ভাল হয়। বটুক রান্নাঘর থেকে দুধটা গরম করে আনতে গেল। সুলেখা শুয়ে আছে। আমি একটু দূরে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম। ও বললে, -একটা সীন ক্রিয়েট করলাম।
সান্ত্বনা দিয়ে বলি, –এ আপনার একটা অসুখ সুলেখা দেবী। লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।
ভিতরের দরজার দিকে চকিত দৃষ্টিপাত করে সুলেখা নিম্নকণ্ঠে আমাকে বললে, ও বুঝতে পারছে না। আপনি ওকে বারণ করুন ডাক্তারবাবু। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি একটা প্রকাণ্ড সর্বনাশ হতে চলেছে!…কিছু মনে করবেন না, আমি আপনাদের ঐ বন্ধুটাকে ভীষণ ঘৃণা করি। …আমি ওকে সহ্য করতে পারব না। আপনার বন্ধু যদি কোন কুষ্ঠ রোগীকে এখানে এনে তুলত, বিশ্বাস করুন, আমি আপত্তি করতাম না। কিন্তু…কিন্তু ঐ লোকটা..ব্লুট!
আমি বলি, আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তো কিছু হতে পারে না। আপনার যদি সত্যিই এত তীব্র অনিচ্ছা থাকে তবে সেকথা বলুন।
–আমি তো বলছি। ও শুনছে না যে।
দুধের বাটি নিয়ে বটুক ফিরে এল। সুলেখাকে খাইয়ে দিল দুধটা।
বললাম, বটুক, গগ্যাকে এখানে আনা বোধহয় ঠিক হবে না।
বটুক খিঁচিয়ে ওঠে, তোকে আবার নতুন করে পোঁ ধরতে হবে না। বউ তো রাজী হয়েছে। আবার এখন কেন কেঁচে-গণ্ডুষ করছিস?
-না, উনি মন থেকে সায় দেননি!
–ও! ওর মনের খবর তুই আমার চেয়ে বেশি জানিস?
আমি সুলেখার দিকে তাকাই। তার ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে। তারপর হঠাৎ সে বলে বসে, –আজ ক্রিস্টমাস। তোমার কাছে আমি ভিক্ষা চাইছি। আমার এত বড় সর্বনাশ তুমি কর না। আমি মিনতি করছি।
