আমি জবাব দেবার আগেই বটুক বলে ওঠে, -লেখা, তোমার কাছে একটা ভিক্ষা আছে।
সুলেখা ভিতরে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছিল। ঘুরে দাঁড়িয়ে মোহিনী হাসি হাসল। আমার মনে হল-কালো হলেও সুলেখা সত্যিই সুন্দরী। দ্রৌপদীও তো কালো ছিলেন অজন্তাগুহার যাবতীয় নারীরত্নও তো ঘোর রঙে আঁকা! কৃষ্ণা-অপ্সরা, কৃষ্ণা কুমারী, মাদ্রী, সীবলী, সুমনা এমন কি রাহুল-জননী! মুচকি হেসে সুলেখা বললে, –অত ভনিতা করতে হবে নাচা না কফি বলে ফেল!
বটুক আমতা আমতা করে বলে, না, ঠাট্টা নয়, ইয়ে হয়েছে..আমার একটি বন্ধু মরণাপন্ন অসুস্থ…তাকে..মানে এখানে নিয়ে আসতে চাই।
এখানে? এখানে কেমন করে–
-কেন, এখানে তো দুখানা ঘর আছে। ও এই স্টুডিও ঘরে থাকবে। বেচারির কেউ নেই। গুণ্ডায় ওর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে–এখনও জ্ঞান হয়নি।
-ও! তা সঙ্গে করে নিয়ে এলে না কেন?
এবার জবাব দিতে বটুক ইতস্ততঃ করে। করুণভাবে আমার দিকে তাকায়। সুলেখা হঠাৎ কি যেন বুঝতে পারে। বলে, ব্যাপার কি বল তো? বন্ধুটি কে? তোমার গগ্যা নয় তো?
–গগ্যাই। সে মরণাপন্ন অসুস্থ। পড়ে আছে বরানগরের একটা বস্তীতে। কেউ দেখবার নেই। এখানে তাকে না নিয়ে এলে সে বাঁচবে না।
সুলেখা হঠাৎ পাষাণে পরিণত হয়ে গেল। একটিমাত্র শব্দ উচ্চারণ করল সেঃ
না!
লক্ষ্মীটি লেখা, তুমি অমত কর না। যে অবস্থায় তাকে রেখে এসেছি তাতে এই গদির খাটে আমি ঘুমোতে পারব না।
–বেশ তো, তুমি গিয়ে সেই বস্তীতেই থাক। যতদিন না তোমার বন্ধু ভাল হয়। আমি আপত্তি করব না। এখানে আমি একাই চালিয়ে নেব।
সুলেখার স্বরে অহেতুক কাঠিন্য।
-তা হলে ও নির্ঘাৎ মরে যাবে, লেখা।
বটুক পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখটা মুছে নেয়। এই মাঘের শীতেও তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। একবার আমার দিকে তাকায়। এ বিপদে আমি তাকে কিভাবে সাহায্য করব বুঝে উঠতে পারি না। বটুক আবার শুরু করে, তুমি তো জান লেখা, গগ্যা একজন মস্ত আর্টিস্ট
না, জানি না। আর জানলেই বা কি? আমার কি? আমি তোমার বন্ধুকে ঘৃণা করি।
এরপর স্পষ্টই উত্তেজিত হয়ে ওঠে বটুক। এক পা এগিয়ে যায় তার স্ত্রীর দিকে। মিনতিমাখা কণ্ঠে বলে, –আমি তো তোমার কাছে কখনও কিছু চাইনি লেখা। আমি ভিক্ষা চাইছি। অমনভাবে তুমি বল না। আমি জানি, ওটা তোমার মনের কথা নয়। তুমি। দেবী, করুণার অবতার। একটা মানুষ ঐভাবে মরে যাবে আর তোমার করুণা হবে না, এ আমি ভাবতেই পারি না। …তুমি রাজী হয়ে যাও, ওকে আমি নিয়ে আসি। তোমার খাটুনি কিছুই বাড়বে না। যা করবার তা আমিই করব। তুমি এ-ঘরে এস না বরং…
-ওকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলেই হয়?
–হাসপাতাল? সেখানে ওকে কে দেখবে বল? দীপু বলছে, ওষুধের চেয়ে নার্সিংই এক্ষেত্রে বড় কথা। সরকারী হাসপাতালে কে ওকে যত্ন নিয়ে নার্সিং করবে বল?
সুলেখা আমাদের দিকে পিছন ফিরে চৌকির উপর ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত রঙের টিউবগুলো গুছিয়ে তুলছিল। বেশ বোঝা যায় ওর হাতটা কাঁপছে। এতটা বিচলিত হল কেন সে? আমাদের দিকে পিছন ফিরেই ও বললে, আর যদি উল্টোটা হত? তোমার মাথা যদি গুণ্ডায় ফাটিয়ে দিত তাহলে তোমার ঐ বন্ধু কি কুটোগাছটা নেড়ে সাহায্য করত?
–তাতে কি এসে যায়? আমি তো ওর মত হতভাগা নই। আমার কিছু হলে তুমি দেখবে। তাছাড়া ওর সঙ্গে আমার তুলনা? আমি একজন সামান্য নক্সানবিশ, আর ও হল জাত-আর্টিস্ট!
বটুক যেন পিছন থেকে ধাক্কা মেরেছে ওকে। চমকে ঘুরে দাঁড়ায়। ওর চোখে সেদিন কী দেখেছিলাম? অপরিসীম ঘৃণা! কিন্তু কার উপর? গগ্যা, বটুক, না তার নিজের উপর? দাঁতে দাঁত চেপে সুলেখা বললে, -ঐজন্যেই তোমার কিছু হল না। তুমি দিনরাত নিজেকে ছোট ভাব!
বটুক কিন্তু হেসে উড়িয়ে দিল সে কথা। বললে, আমি কী ভাবি, তাতে কিছু এসে যায় না সুলেখা; কথাটা নির্জলা সত্য। গগ্যার মত ছবি আমি সাতজন্মেও আঁকতে পারব না।
সুলেখা জবাব দিল না। নিরুদ্ধ আক্রোশে সে ফুঁসতে থাকে। যেন বটুক নিজেকে ছোট করছে না, যেন সুলেখার আঁকা ছবিকেই সে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলেছে। সুলেখা যীশুখ্রীষ্টের ছবিখানার দিকে একবার তাকিয়ে দেখল। ছবির নিচে একটা ধূপকাঠি জ্বলছিল। সেটাকে একটু দূরে সরিয়ে দিল, যেন জ্বলন্ত কাঠিটা ছবিতে না লাগে। তারপর স্বাভাবিক স্বরেই বললে, –তাই বুঝি তোমার বন্ধুর ছবি প্রদর্শনীতে সিলেকশান পায় না, আর তুমি প্রাইজ পাও?
-হ্যাঁ, তা সত্ত্বেও। আমি আঁকি তোমাদের জন্যে, আর গগ্যা আঁকে আমাদের মত আর্টিস্টের জন্যে।
সুলেখা রাগ করে না। হেসে বলে, অরিজিনাল কিছু বল। ওটা ধার করা কথা। শরৎচন্দ্র বলেছেন সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গে।
ব্যাপারটা অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। এতক্ষণ আমি কোন কথা বলিনি। বলি, তুমি ব্যাপারটা গুলিয়ে ফেলছ বটুক। গগ্যাকে এখানে কেন নিয়ে আসতে চাইছ তা নিজের মনকেই আগে জিজ্ঞাসা করে দেখ। সে তোমার বন্ধু বলে, না জাত আর্টিস্ট বলে?
বটুক আমার দিকে ফিরে বলে, দুটোই সত্যি দীপু। গগ্যা যদি আজ ঐ অবস্থায় ওখানে মারা যায়, আমি সমস্ত জীবনভর নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। …আর আমি তো চোদ্দ বছর ধরে লেখাকে জানি। ও রাগের মাথায় এসব কথা বলছে। ও মোটেই এত নিষ্ঠুর নয়।
সুলেখা এবার স্পষ্ট গলায় বললে, -বেশ, তোমার বন্ধুকে নিয়ে এস। কিন্তু একটা কথা। আমাকে বিদায় দাও।
