বটুক পকেট থেকে একটা সুদৃশ্য সিগারেট কেস বার করে। একটা সিগারেট ধরায়। আমাকেও বার করে দেয় একটা। বলে, -তোর চেয়ে বড় বন্ধু আমার নেই। এসব কথা কখনও কাউকে বলিনি। বলা যায় না; কিন্তু তোকে বলব।
আমি বললাম, –শুধু বন্ধু বলে নয়, বটুক। আমার ধারণা, সুলেখা ভুগছে একটা মানসিক ব্যাধিতে। সেদিন বলেছিলাম, ছেলেপুলে না হলে ওর ফিটের ব্যারাম সারবে না। আজ মনে হচ্ছে ব্যাপারটা আরও জটিল। তাই শুনতে চাইছি। মনে হয়, ও একটা মানসিক অবদমনে ভুগছে। তুই সব কথা খুলে বল্ আমাকে–
সংক্ষেপেই বলেছিল বটুক। সব কথা সে বলেনি। সঙ্কোচে অথবা অন্য কোন কারণে হবে হয়তো। বটুকের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক চুকে গেছে। ওর বাবা এখনও জীবিত। সুলেখার ব্যাপারে তিনি ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র করেছেন। বটুক একটি খ্রীষ্টান মেয়ে বিয়ে করেছে এইটুকুই জানেন তিনি। বিয়ে যে বটুক করেনি, মেয়েটি খ্রীষ্টান নয়, তা তিনি জানেন না। সুলেখার সাক্ষাৎ সে পেয়েছিল নদীর ধারে। বটুক একদিন একখানা ল্যাণ্ডস্কেপ আঁকছিল নির্জন এক আঘাটায়। নদীবক্ষে সূর্যাস্তের দৃশ্য। হঠাৎ তার নজরে পড়ল একটি মহিলা ঘড়ায় করে জল নিয়ে যেতে এসেছেন। এখানে কোন ঘাট নেই। দামোদরের পার তিন-চার ফুট খাড়া উঠে গেছে। সন্ধ্যা তখন হয়-হয়। এই অবেলায় অমন আঘাটায় মেয়েটি কেন জল নিতে এসেছে বটুক বুঝে উঠতে পারেনি। মেয়েটি ঘড়ায় একটি দড়ি বেঁধে যখন নামিয়ে দিল তখনও সে চুপ করে ছিল। ভেবেছিল, ঐভাবেই সে দু-তিন হাত নিচু খাড়া পাড় থেকে জল ভরতে চায় বুঝি। কিন্তু দড়ির অপর প্রান্ত যখন সে নিজের মাজায় বাঁধতে শুরু করে তখন বিদ্যুৎ চমকের মতো ওর মনে হল, মেয়েটি আত্মহত্যা করতে এসেছে! ও চিৎকার করে ওঠে, –ও কী করছেন আপনি? মেয়েটি তখন পাড়ে দাঁড়িয়ে উদ্দেশ্যে কাকে যেন নমস্কার করছিল। ওর চিৎকার তার কানে যায়। মেয়েটি ঘুরে ওকে দেখতে পায় এবং তৎক্ষণাৎ জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে। বটুকেশ্বর ছোট্ট মানুষ। দৈহিক ক্ষমতা তার সীমিত। কিন্তু সে বরিশালের বাঙাল! মেঘনায় সাঁতার শিখেছে সে। তৎক্ষণাৎ সেও ঝাঁপ দিয়ে পড়ে। এরপর আর তার ভাল মনে নেই।…একটা নরম নারীদেহ…অজগর সাপের মত দুটি বাহুর কঠিন বেষ্টনী: ফুসফুঁসে প্রচণ্ড যন্ত্রণা…মৃত্যুভয়! আর কিছু মনে নেই তার। সাঁতারে সে ওস্তাদ কিন্তু ঐ দীর্ঘদেহী যুবতী মৃত্যুযন্ত্রণায় ওকে এমন নিবিড়ভাবে আলিঙ্গনবদ্ধ করেছিল যে, ক্ষুদ্রকায় বটুক নিজেকে মুক্ত করতে পারেনি। নিমজ্জমান শুধু ওরা দুজনই তো নয়, ঐ সঙ্গে ছিল জলভরা ঘড়ার একটা জগদ্দল পাহাড়! মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল বটুক দামোদরের গভীরে।
জ্ঞান ফিরে আসে মিশনারী হাসপাতালে। নিতান্ত ঘটনাচক্রে বলতে হবে, অথবা বাপ-দাদার আশীর্বাদও বলতে পারঐ সময় একজন খেজুরগাছ ঝোড়াই করতে নদীতীরের একটা খেজুর গাছে উঠেছিল। বটুকের চিৎকার শুনে সে সচকিত হয়ে এদিকে তাকায়। পরবর্তী ঘটনা সে দেখেছিল গাছের উপর থেকেই। দুর্জয় সাহসী লোকটা। খেজুরগাছ কাটা ধারালো কাস্তেখানা মাজায় খুঁজে সে অকুতোভয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে দামোদরে। জলভরা ঘড়াটা সে প্রথমেই কেটে বাদ দেয়, আর সংজ্ঞাহীন দুজনকে টেনে তোলে ডাঙায়।
ব্যাখ্যা করতে কারও দেরি হয়নি। ব্যর্থ প্রেমিক দুজন। যুগলে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। ডাক্তারবাবু পুলিস-কেস করেননি। নিতান্ত দুর্ঘটনা বলে খাতায় লিখে প্রেমিক যুগলকে বিদায় দিয়েছিলেন।
এর পরে অনিবার্য একটি রোমান্টিক অধ্যায় নিশ্চয় ছিল সন্দেহাতীতভাবে। যুগল প্রেমিক হিসাবে যারা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে এল, সেই অপরিচিত ছেলে ও মেয়ের মধ্যে কীভাবে মন জানাজানি হল, সেকথা বটুক আমাকে বলেনি। শুধু বলেছিল, অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের অভিশাপ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্যই মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। বটুক স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ঐ অজাত শিশুর পিতৃত্বের দায় নিতে রাজী হয়। মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা আর করেনি। ওর ঘরে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। সৌভাগ্য কি দুর্ভাগ্য বলতে পারে না বটুক—-শিশুটি বাঁচেনি।
উপসংহারে বটুক বলল, –এমন নাটকীয় ঘটনা না ঘটলে আমার মত চেহারার মানুষের ঘরে ওর মত মেয়ে হয়তো কোনদিনই আসত না। না রে?
আমি ধমক দিই, –কেন তুই নিজের সম্বন্ধে এইসব কথা ভাবিস?
ম্লান হেসে ও বলে, মিথ্যে সান্ত্বনা কেন দিচ্ছিস? আমি কি জানি নাও আমার বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা? বিউটি অ্যাণ্ড দি বীস্ট!
–পাগলা কোথাকার! মানুষের চেহারাটাই কি সব? সুলেখা তো তোকে খুব ভালবাসে। এখন বিয়ে করলেই পারিস?
বটুক বোকার হাসি হেসে বললে, বউ রাজী হয় না।
যোগেশ মিত্তির রোডে ওর বাসায় এসে যখন পৌঁছলাম তখন ঠিক দুপুর। সুলেখা দরজা খুলে দিল। আমাকে দেখতে পেয়ে ঘোমটা তুলে দিল মাথায়। আমাকে সে প্রত্যাশা করেনি, বলে, কী ডাক্তারবাবু, চাখতে এসেছেন নাকি? হাঁড়ি কাবাব এখনও নামেনি।
আমি কী জবাব দেব ভেবে পাই না। ক্রিস্টমাস ট্রিটা সাজানো হয়েছে, সাজগোছ সব শেষ। কোণায় টেবিলের উপর দাঁড় করানো রয়েছে তৈলচিত্রটি। ক্রুশবিদ্ধ যীশু। সুলেখা বললে, –আপনার বন্ধুর ক্রিস্টমাস প্রেজেন্ট। অপূর্ব হয়েছে ছবিটা, তাই না?
